নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > ফেইক নিউজ মেইড ইন ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশ

ফেইক নিউজ মেইড ইন ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশ

Thursday 27 August 2020, by আবু সালেহ
Updated: Friday 2 October 2020

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পশ্চিমা বিশ্ব ফেইক নিউজের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করে। সবার সন্দেহের তীর যখন রাশিয়ার দিকে তাক করানো, বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে আবিষ্কৃত হয় ফেইক নিউজ উৎপাদনের পেছনে ইন্ডিয়ার লম্বা কালো হাত। ইংরেজ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়:

ব্রাসেলস-ভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ’ইইউ ডিজইনফো ল্যাব’ তাদের অনুসন্ধানে এমন ২৬৫টি ভুয়া ওয়েবসাইটের একটি নেটওয়ার্কের খোঁজ পেয়েছে যেগুলো ৬৫টি দেশে সক্রিয়। গবেষকরা এসব ওয়েবসাইটের পেছনে একটি ভারতীয় কোম্পানির যোগসাজশ খুঁজে পেয়েছেন, যেটির নাম শ্রীবাস্তব গ্রুপ। ইউরোপে পাকিস্তান বিরোধী লবি করে এমন কিছু গ্রুপও এই নেটওয়ার্কের অংশ। গবেষকদের বিশ্বাস এই নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য মূলত ভারতের প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো। ইইউ ডিজইনফো ল্যাব এর নির্বাহী পরিচালক অ্যালেক্সান্ডার আলফিলিপে বিবিসিকে বলছেন, "এই নেটওয়ার্কে শুধু যে ভুয়া সংবাদ ওয়েবসাইট রয়েছে তাই নয়, অনেক ভুয়া এনজিও রয়েছে যেটা সত্যিই উদ্বেগজনক। কারণ সমন্বিত-ভাবে একটি আদর্শের পক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে জনমত তৈরির চেষ্টা হচ্ছে এবং এরকম ক্ষেত্রেই মিথ্যা খবরাখবর রটানোর প্রয়োজন হয়। "— source

ধরা খাওয়ার পরেও থেমে নেই ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডা মেশিন। পাকিস্তানের সাথে এবার শুরু হয়েছে চীনবিরোধী ফেইক নিউজ। সাথে জেনে না জেনে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশের কিছু জাতীয় পত্রিকা ও তথাকথিত পগ্রতিশীল ব্লগাররাও।

বিগত ১২ই অগাস্ট ২০২০ সালে আসাদ নূর নামক এক ইসলামবিদ্বেষি ব্লগার তাঁর ফেইসবুক পোষ্টে দাবি করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মেদ বিন সালমান এশিয়ার মোসলমানদেরকে "খাঁটি মোসলমান নয়" এবং "নিম্ন শ্রেণীর মোসলমান" বলে উক্তি করেছে। নিজের পোষ্টের পক্ষে আসাদ নূর চারটি ওয়েবসাইটের লিঙ্ক (bd-protidin), (sonalinews), (asianworldnews), (newsmtv) প্রকাশ করেন যেখানে আরও দাবি করা হয় বিন সালমান পাকিস্তানিদেরকে "ক্রীতদাস" বলেছেন।

মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায়, আসাদ নূর প্রদত্ত উৎসগুলো হয় বাংলাদেশভিত্তিক বেওয়ারিশ ওয়েবসাইট নয়তো ইন্ডিয়ান ওয়েব সাইটের আর্টিকেল কৌট করে লিখা সংবাদ। বাংলাদেশ ভিত্তিক পত্রিকা বিডি-প্রতিদিন তাদের সূত্র "কলকাতানিউজ টোয়েন্টিফোর সেভেন" উল্লেখ করলেও এই নামের কোন ওয়েবসাইট পাওয়া যায়নি। কলকাতা ২৪/৭ নামক একটি সাইট পাওয়া গেলেও ২০১৭ সালে প্রকাশিত এই ধরনের কোন সংবাদ তাদের সাইটে পাওয়া যায়নি। তাহলে এই সংবাদের জন্মদাতা কে?

ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ২০১৭ সালে তানভির এরেন (Tanveer Arain) নামক "পাকিস্তানি সাংবাদিক/ ব্লগার" টুইটারে একটি আরবি ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশট প্রকাশ করে দাবি করেন, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেখানে পাকিস্তানিদেরকে ক্রীতদাস হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু তাঁর দেয়া ছবিতে কোথাও এই ধরনের কথা উল্লেখ নাই বলে একাধিক লোক কমেন্ট প্রকাশ করলে তিনি আরেকটি "ডকুমেন্টের" ছবি প্রকাশ করেন। যাচাই করার পর দেখা যায় সেখানেও এই ধরনের কোন কথা উল্লেখ নাই।

তথাকথিত পাকিস্তানি লোকের দেয়া তথ্য কোন প্রকার যাচাই বাছাই না করে লুফে নেয় ইন্ডিয়ান অনলাইন পত্রিকাগুলো। এমনকি সুপরিচিত ইন্ডিয়াটাইমসও এই মিথ্যা তথ্য নিয়ে একটি আর্টিকেল ছাপায় যা ইন্ডিয়ান উগ্র ডানপন্থীদের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইন্ডিয়াভিত্তিক আরেকটি ওয়েব সাইট thequint.com এই আর্টিকেলকে ফেইক নিউজ আখ্যায়িত করে একটি আর্টিকেল প্রকাশ করলেও হিন্দুত্ববাদী উগ্র সংগঠনের ওয়েবসাইটগুলো তাদের প্রচারে কোন পরিবর্তন আনেনি। উপরন্তু এই ফেইক নিউজ ভিত্তি করে অবিরাম মোসলমান বিরোধী প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বেওয়ারিশ কিছু ওয়েবসাইট ও সুপরিচিত পত্রিকা বিডি-প্রতিদিন। আসাদ নূরের প্রকাশিত পোষ্টটি ইতিমধ্যে ফেইসবুক ফলস নিউজ হিসেবে ঘোষনা করেছে। তার পরেও ভুয়া সংবাদ কৌট করে তার পোষ্ট প্রকাশ থেমে নেই।

আসাদ নূরের প্রচারিত আরেক পোষ্টের কল্যাণে দেখা যায় ইন্ডিয়ান ফেইক নিউজ কারখানার সাথে শুধু বাংলাদেশের বিডি-প্রতিদিন পত্রিকা নয়, ইত্তেফাক ও যুগান্তরের মত সুপরিচিত অনেক দৈনিক পত্রিকাগুলোও পরিপুর্নভাবে জড়িত।

১৮ এবং ১৯ তারিখে যুগান্তরইত্তেফাক "উইঘুরে মসজিদ গুঁড়িয়ে পাবলিক টয়লেট বানাল চীন!" নামক একই শিরোনামে দুইটি আর্টিকেল প্রকাশ করে।

ডিএনএ ও টাইমস নাউ সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ইত্তেফাক দাবি করে

"আতুশ শহরের সুনতাঘ গ্রামের নেইবারহুড কমিটির প্রধান রেডিও ফ্রি এশিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০১৮ সালে তোকুল মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। পরে এখানে ওয়াশরুম, গেস্টরুম এবং শৌচারগার তৈরি করে উইঘুরবিরোধী হোন গোষ্ঠীর নেতারা।...গত বছর ওয়াশিংটন ভিত্তিক উইঘুর হিউম্যান রাইটস প্রজেক্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজারের মত মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে চীনা প্রশাসন।"

একই উৎসের রেফারেন্সে কিছু যোগ বিয়োগ করে একই সংবাদ প্রকাশ করে যুগান্তর।

তাদের এই আর্টিকেলগুলো পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায় প্রথমত সকল তথ্যের উৎস নাম না জানা রহস্যজনক এক ব্যাক্তি এবং দ্বিতীয়ত সূত্রগুলো হয় ইন্ডিয়ান বেওয়ারিশ ওয়েবসাইট নয়তো আমেরিকাভিত্তিক রেডিও ফ্রি এশিয়া।

কিভাবে সিআইএ উৎপাদিত সংবাদ ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশ প্রচার করে

আমাদের অনুসন্ধানে ডিএনএইন্ডিয়া এবং টাইমসনাউনিউজ নামক দুইটি সাইট পাওয়া যায় যেখানে চীনা উইঘুর সম্পর্কে দুইটি একই প্রকার আর্টিকেল প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের দেয়া রেফারেন্সের উৎস ঘুরে ফিরে একই রেডিও ফ্রি এশিয়া

এখন প্রশ্ন হল এই রেডিও ফ্রি এশিয়া কি নির্ভরযোগ্য কোন সংবাদ মাধ্যম যার দেয়া তথ্য প্রশ্ন ছাড়াই আমরা গ্রহন করতে পারব? ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করলে দেখা যায় রেডিও ফ্রি এশিয়া সিআইএ প্রতিষ্ঠিত এক কুখ্যাত সংবাদ মাধ্যম। উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায় বিগত শতাব্দিতে ঘটে যাওয়া শীতলযুদ্ধের সময় আমেরিকা একাধিক প্রপাগান্ডা রেডিও চালু করে যার মধ্যে অন্যতম রেডিও ফ্রি এশিয়া ও রেডিও ফ্রি ইওরোপ।

দেখা যাচ্ছে, সিআইএর প্রপাগান্ডা মেশিন হিসেবে খ্যাত রেডিও ফ্রি এশিয়ার প্রসবিত আর্টিকেলে রহস্যজনক এক অগান্তুক ব্যাক্তি দাবি করেছে চীন উইঘুরদের মসজিদ ধ্বংশ করে পাবলিক টয়লেট তৈরি করছে। আর এই সন্দেহজনক খবর চক্ররেফারেন্সে ফেরি করে বেড়াচ্ছে ইন্ডিয়ান বেওয়ারিশ কিছু ওয়েবসাইট আর বাংলাদেশের কিছু জাতীয় পত্রিকা।

উপরের দুই উদাহরন থেকে বোঝা যায় বিশ্ববাসীকে ধোকা দেয়ার জন্য ইন্ডিয়ানরা বড় প্রপাগান্ডা মেশিন স্থাপন করেছে। বুঝে কিংবা না বুঝে বাংলাদেশের জাতীয় পত্রিকা ও ইন্ডিয়াশ্রিত তথাকথিত পগ্রতিশীল আসাদ নূর কিংবা তসলিমা নাসরিন, (Twitter) হয়ে পড়েছেন ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডার বাহক। মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে তারা এশিয়ার জাতিগুলোর মাঝে উগ্রতা ও সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা চাইছে দক্ষিন এশিয়ার মোসলমাদেরকে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সার্থে সকল ইন্ডিয়ার প্রপাগান্ডাবাহক এজেন্টকে নিস্ক্রিয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে।


এই আর্টিকেলে উল্লেখিত সকল রেফারেন্সঃ

  • উইঘুরে মসজিদ গুঁড়িয়ে পাবলিক টয়লেট বানাল চীন! (যুগান্তর)
  • উইঘুরে মসজিদ গুঁড়িয়ে পাবলিক টয়লেট বানাল চীন! (ইত্তেফাক)
  • চীনে মসজিদ ভেঙে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, জবাব দিলেন তসলিমা (সময়নিউজ)
  • China constructs toilet after demolishing Uyghur mosque in Xinjiang; Pakistan still won’t react (ডিএনএইন্ডিয়া)
  • Uighur oppression: Toilets, cigarette and liquor shops built atop demolished masjid in China’s Xinjiang (টাইমসনাউসিউজ)
  • Did Saudi Defence Minister Really Call Pakistan a ‘Slave Country’? (Thequint)
  • Journalist tweets: Saudi minister says Pakistanis are our slaves (ইন্ডিয়াটাইমসও)
  • Tanveer Arain (স্ক্রিনশট ১), (স্ক্রিনশট ২)
  • পাকিস্তানের একজনও প্রকৃত মুসলমান নয় : সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী (bd-protidin, 12/06/2017)
  • পাকিস্তানের একজনও ‘প্রকৃত’ মুসলিম নয়: সৌদি (sonalinews, 12/06/2017)
  • ‘Pakistani’s Are Our Slaves’ says Saudi Defence Minister (asianworldnews, 17/07/2018)
  • পাকিস্তানের একজনও প্রকৃত মুসলমান নয় : সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী (newsmtv, 02/06/2020)
  • বিন সালমান কি বলেছেন ’উপমহাদেশের মুসলিমরা প্রকৃত মুসলিম নয়’? (Boombd, 21/08/2020)