নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > পাপী নিয়াজির সঙ্গে হাত মিলাব না

পাপী নিয়াজির সঙ্গে হাত মিলাব না

Sunday 16 December 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

দেখতে দেখতে ৪২ বছর চলে গেল। এই ৪২ বছরে প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তি তেমন সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে এই ডিসেম্বরে জাতি বড় বেশি হতাশ। আমাদের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক যুদ্ধাপরাধ, নারী ধর্ষণ, হত্যা, লুট, গৃহদাহ। অনেক বিলম্বে হলেও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ বিচারের একটা প্রক্রিয়া চলছিল। দেশবাসী আশা করেছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল না করে প্রকৃত অপরাধীদের একটা প্রভাবমুক্ত বিচার হবে। শুরুতে বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেকেই সম্পৃক্ত থাকলেও, কেন যেন অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্টের মতো সরকারের একরোগা মনোভাবে সাধারণ মানুষ উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। তার ওপর ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের ই-মেইল, স্কাইপিতে আলাপ-আলোচনা ও পদত্যাগ দেশবাসীকে মর্মাহত করেছে।

ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস, স্বাধীনতার মাস। এই মাসে মানবতার অপমৃত্যু হলে স্বাধীনতার মর্যাদা থাকে কোথায়? ১৮-দলীয় জোটের অবরোধে শ্রমজীবী দরিদ্র বিশ্বজিৎ দাসের অমন নিষ্ঠুর হত্যা জাতির বিবেকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে। সাধারণ মানুষ ভীষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ রকম একটি থমথমে সময়ে আজ মহান বিজয় দিবস। দুই বছর ধরে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে যেতে পারি না। সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে বেশরমের মতো যাই না। একমাত্র বিজয়ী বাঙালিকে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার বলে গালাগাল করায় মহাজোট সরকারের আমলে আর কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে যাওয়ার ইচ্ছা রাখি না। বন্দী করে নিলে ভিন্ন কথা। স্বইচ্ছায় কোনো অনুষ্ঠানে যাব না।

গত ১০ ডিসেম্বর বহুল প্রচারিত দৈনিক কালের কণ্ঠের মুক্তধারা পাতায় পিতৃতুল্য বড় ভাই পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী ’কে কার মুখ দেখতে চাননি?’ শিরোনামে দারুণ সুন্দর একটা প্রবন্ধ লিখেছেন। গত বছর লিখেছিলেন, ’যদি সেই নথ খসালি তবে কেন লোক হাসালি’ তার ওপর দৈনিক আমার দেশে ২১ পর্বে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। কত নম্বর পেয়েছি, পাস না ফেল এখনো জানি না। তবে একুশের বইমেলায় ’তারা আমার বড় ভাই-বোন’ নামে একটা বই প্রকাশ করেছি। ’কে কার মুখ দেখতে চাননি?’-এর ওপর আগামী বইমেলায় আরেকটা বই ছাপা সম্ভব নয়। তিন-চার মাস আগে হলেও চেষ্টা করতাম। মাননীয় মন্ত্রী বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর যত লেখা পড়েছি তার মধ্যে এই লেখা আমার খুবই ভালো লেগেছে। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি আমায় সর্বনিম্ন স্তরেও বিবেচনা করেন না। যোদ্ধা হিসেবে নিজে খুব উৎসাহবোধ করি না। ওদিকটায় আমার তেমন আকর্ষণ নেই। তবু ভালো বীর নয়, একটা পাগল বীর হিসেবে আমায় মাঝেসাজে মনে করেন।

পিতা-মাতার কাছে পাগল সন্তান সব সময় প্রিয়। আমিও যে তার সন্তানদের থেকে বেশি প্রিয়, এটা বহুভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। দুই ভাই যখন ’৮৯-এ লন্ডনে গিয়েছিলাম, যে লন্ডনে ২০-২৫ জন একত্র হলে বিশাল মিটিং বলে বিবেচিত হয়_ সেখানে হলের ভেতরে বাইরে তিল ধরার ঠাঁই ছিল না। বর্তমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ছিলেন অতি সাধারণ শ্রোতা। যাকে ডেকে নিয়ে দুটি কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। বর্তমান জাতীয় সংসদের উপনেতার উপস্থিতিতে বড় ভাই তার বক্তৃতায় বিশ্ববাসীর কল্যাণে আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন। মনে হয় আমার কলম আরও শাণিত করার জন্যই আমার কোনো লেখাই কিছু না, একেবারে ফানুস বলেছেন। ছোট্ট একটা পিন ফুটালেই উবে যাবে। আমি কি কখনো বলেছি, আমার লেখার গুরুত্ব আছে? পিতা-মাতাহীন একটা এতিম হিসেবে যখন যা কলমের ডগায় আসে কোন ভ্রূক্ষেপ না করে প্রাণের তাগিদে লিখি। কিছু হলে হলো, না হলে না হলো। এ জন্য তো কোনো খেতাব চাই না। ছেলেবেলায় শুদ্ধ করে একটা বাক্য লিখতে পারতাম না।

এখন যে শুদ্ধ হয় তাই বা বলি কি করে? মার খেলে প্রাণের দায়েই চিৎকার করতে হয়। সেই চিৎকারও আবার বাক্য শুদ্ধ করে করতে হবে সে তো কখনো ভাবিনি। নতুন বছরে নতুন উদ্যমে পিতার বরাবরে ’কে কার মুখ দেখতে চাননি?’ নিয়ে লিখব। আজ শুধু পিতারূপী বড় ভাইকে ইতিহাসের কয়েকটি লাইন শুনিয়ে রাখি। মহাবীর আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ে বেরুবার জন্য যখন পিতা মেসিডনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন, পিতা তাকে বলেছিলেন, ’তুমি বিশ্ব জয়ে বেরুবে। ঘোড়াশালে একটা অবাধ্য ঘোড়া আছে। কেউ তাকে বশ মানাতে পারছে না। যাও আগে অবাধ্য ঘোড়াকে বাধ্য করে এসো। যদি পারো বিশ্বজয়ের অনুমতি নিতে এসো।’ পিতার আদেশে মহাবীর আলেকজান্ডার গিয়েছিলেন ঘোড়াশালে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলেছিলেন, ’মহান পিতা, অবাধ্য ঘোড়াকে আমি বাধ্য করে এসেছি।’ পিতা আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন, ’তুমি কিভাবে এত দিনের অবাধ্য ঘোড়াকে বাধ্য করলে?’ আলেকজান্ডার বলেছিলেন, ’এ তো খুবই সোজা। ঘোড়াশালে গিয়ে দেখলাম, ঘোড়া তার ছায়া দেখে লাফালাফি করছে। আমি তাকে এক ঝটকায় উল্টোদিকে করে দিলাম। ঘোড়া আর ছায়া দেখতে পেল না। ধীরে ধীরে সে শান্ত হয়ে এলো।’

পিতৃতুল্য বড় ভাইকে কবে কোনো দিন বলতে পারব, আমার রক্তে ভেজা দেশ ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অব্যবস্থাপনা আর দুঃশাসনের ছায়া দেখে যে ছটফট করছে, ধুঁকে ধুঁকে মরছে, আমি কবে এই যন্ত্রণার ছায়ার দিক থেকে দেশের মুখ শান্তির দিকে, অগ্রগতির দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারব? ততদিন কি আমার আয়ু হবে, আমি কি বেঁচে থাকব? আর কেই-বা বলবে যাও অশান্ত দেশ ও জাতিকে শান্ত করে এসো। আজ মহান বিজয়ের দিনে কেন যেন সেই আকাঙ্ক্ষাই মনে এক গহিনে বার বার জাগছে।

হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি জাতির খুব একটা নিরঙ্কুশ বিজয় নেই। শৌর্যবীর্য বাহুবলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের এক নিরঙ্কুশ বিজয়। আজ যে যাই বলুক সেই মহান বিজয়ের মূল কারিগরের একজন হতে পেরেছিলাম। আল্লাহ হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনা ভাগ্যে রাখেননি তাই অংশ নিতে পারিনি। কিন্তু স্বাধীনতার গাছটি যখন বোনা হয় তখন দুই হাতে পরম যত্নে তা বুনেছিলাম। আজকের অনেক বড় বড় নেতার সে সুযোগ হয়নি। কাউকে লুকিয়ে চুরিয়ে বলি না বলে চিত্তহীন বিত্তবানরা নিশ্চয়ই কিছু না কিছু রুষ্ট। আমি তো তাদের খুশি করতে চাই না। সদা সর্বদা আমি আমাকে খুশি করতে চাই। আমার স্রষ্টাকে খুশি করতে চাই। খুশি করতে চাই অসহায় নাম গোত্রহীন অতি সাধারণ মানব সন্তানদের। যাক বিজয়ের দিনে বিজয়ের কথা বলি। বেশি পেছনে গেলে বলে শেষ করা যাবে না। মাত্র একদিনের কথা বলি। আজ যে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে কত লোক জমায়েত হয়েছে, কত শিশু পিতা-মাতার কোলে স্বাধীনতার বেদিতে ফুল দিতে গেছে। ওখানে আমার নামও থাকতে পারত। সেটাই ভালো হতো। কোনো গালাগাল শুনতে হতো না, সমালোচনা হতো না।

একদিনের জন্য হলেও অবনত শিরে কত সম্মান জানাত। সেই জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সারা রাত যুদ্ধ হয়েছিল। সেটাই ছিল ঢাকা দখলের শেষ যুদ্ধ। হানাদারদের ৩০০ আহত-নিহত ও ৩০০ বন্দী হয়েছিল। মিত্র ও মুক্তিবাহিনীরও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সকাল ৮টার দিকে জেনারেল নাগরার সঙ্গে হেলিকপ্টারে হেমায়েতপুর সেতুর কাছে আসি। যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। একদিকে ভারতীয় নিয়মিত বাহিনীর দুই ব্যাটালিয়ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে আমিনবাজারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রায় চার হাজার যোদ্ধা মিরপুরের উত্তর-পশ্চিমে নানা জায়গায় সুবিধামতো পজিশন নিয়েছিল। ১৫ ডিসেম্বর বিদেশি নাগরিকদের ঢাকা ছাড়ার জন্য যুদ্ধ বিরতি দেয়া হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টা থেকে আবার আকাশ এবং ভূমি থেকে গোলাবর্ষণের প্রস্তুতি চলছিল। আমাদের ভারী কামানগুলো সুবিধামতো জায়গায় বসানো হয়েছিল। সব কামানের মুখ ক্যান্টনমেন্টের দিকে। এখন আর হেমায়েতপুর থেকে ঢাকার কিছু দেখা যায় না। কিন্তু ’৭১ সালে সংসদ ভবনের প্রায় বুক অবধি দেখা যেত। এ রকম অবস্থায় জিপের বনাটে এক তা কাগজ ফেলে আমাদের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল নাগরা নিয়াজিকে লিখলেন :

প্রিয় আবদুল্লাহ,

আমরা এসে গেছি। তোমার সব ভেল্কি খতম হয়ে গিয়েছে। আমরা তোমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছি। বুদ্ধিমানের মতো আত্দসমর্পণ কর। না হলে তোমার ধ্বংস অনিবার্য। আমরা কথা দিচ্ছি, আত্দসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমাদের সঙ্গে আচরণ করা হবে। তোমাকে বিশেষভাবে লিখছি, আত্দসমর্পণ করলে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা দেয়া হবে।

তোমারই

মেজর জেনারেল নাগরা

১৬/১২/৭১ ইং

০৮-৩০ মিনিট।

পত্র নিয়ে চার বীর যোদ্ধা ছুটল শত্রু শিবিরে। আমরা এগিয়ে এলাম আমিনবাজারের কাছে। হঠাৎ মেশিনগানের শব্দে চমকে উঠলাম। কোনো কিছু বোঝার আগেই খবর এলো আমাদের গুলিতে আমাদের দূতেরা হতাহত হয়েছে। ছুটে গিয়ে দেখলাম, চারজনের তিনজনই প্রাণহীন, একজন গুরুতর আহত মেজর জীপের স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে কাতরাচ্ছে। আমরা কাছে গেলে দারুণ ক্ষত নিয়েও মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে সেই দুর্লভ আরাধ্য সংবাদটি শোনালেন, হানাদাররা আত্দসমর্পণে রাজি আছে। তাদের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল জামশেদ তক্ষুনি আসছেন।

বেশি সময় লাগেনি। আহত নিহতদের পেছনে পাঠাতে পাঠাতে কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার, কর্নেল, মেজর, ক্যাপ্টেন নিয়ে জামশেদ এলেন। মাথার টুপি, কোমরের বেল্ট, রিভলবার এবং গাড়ির জেনারেল ফ্ল্যাগ আমাদের হাতে দিয়ে আত্দসমর্পণের প্রথম পর্ব শেষ করেন। ভারতীয় জেনারেল ফ্ল্যাগ জামশেদের গাড়িতে লাগিয়ে আমরা চারজন চললাম অবরুদ্ধ ঢাকার দিকে। সামনের সিটে জামশেদ, পেছনে আমরা চারজন। পাকিস্তানি জেনারেল ফ্ল্যাগ নামিয়ে ভারতীয় ফ্ল্যাগ লাগানোয় সেই তখনই মনটা বড় কচকচ করছিল। এটা কি হলো! স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। যৌথ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। পাকিস্তানি জেনারেল ফ্ল্যাগ সরিয়ে ভারতীয় ফ্ল্যাগ কেন? যৌথ বাহিনীর তো একটা ফ্ল্যাগ বানানো যেত। সময় খুব দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল। তাই বেশি কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। বাঘের গুহায় যাওয়ার আগে বাঘের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম। মিরপুর চেকপোস্ট থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু সব ফোন মৃত। মিরপুরের স্বাধীনতা সেতু, বিজয়ের সেতু, মিরপুর পুলের তলে এখন চাপা পড়ে গেছে। যা ঢাকা বিজয়ের সাক্ষী হিসেবে শত শত বছর সংরক্ষিত হওয়ার কথা। সেই সেতু পেরিয়ে মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে জামশেদের হেড কোয়ার্টারে এলাম। কিন্তু সেখানেও সবকটি ফোন মৃত। সব ফোন মৃত পেয়ে ব্রিগেডিয়ার সানসিং কিছুটা শঙ্কিত হলেন।

আলাদা ঘরে ডেকে নিয়ে উদ্বিগ্নভাবে বললেন, ’আমরা নিয়মিত বাহিনীর। আমাদের নিয়ে চিন্তা করি না। যত চিন্তা তোমাকে নিয়ে। ওরা যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাদের মেরে ফেলে তাহলে তো ঢাকা বিজয় পিছিয়ে যাবে।’ সেদিন তাদের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। বলেছিলাম, ’আপনাদের কথা বলতে পারব না। তবে আমাকে হত্যা করলে কাদেরিয়া বাহিনীকে রোধ করা হানাদারদের পক্ষে সম্ভব হবে না।’ সেখান থেকে আমরা গিয়েছিলাম লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ নিয়াজির ১৪ ডিভিশনের গুহায়। যেতে যেতেই হানাদার সেনাপতি নিয়াজির সঙ্গে দেখা হয়। এক পাশে আমরা চারজন অন্য পাশে নিয়াজি একা। ঘরে ঢুকেই আমাদের স্যালুট করেন। আমরা তার জবাব দেই। নাগরার সঙ্গে নিয়াজি করমর্দন করেন। তিনি পরিচয় করিয়ে দেন ব্রিগেডিয়ার সানসিং ও ক্লের এর সঙ্গে। শেষে আমার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ’এ হচ্ছে তোমার পরম বন্ধু। মনে হয় যার জন্য যুদ্ধের সময় এক রাতও ঘুমাতে পারনি। একমাত্র বাঙালি_ টাইগার সিদ্দিকী।’ নাম শুনে কেমন যেন হয়ে গেলেন। আচমকা আবার স্যালুট করলেন। আগেরবার আমরা চারজন নিয়াজির স্যালুটের জবাব দিয়েছিলাম। এবার হাত উঠল না। ততক্ষণে আমার চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছিল, কপাল ঘেমে গিয়েছিল। কোনো ভয়ে-ডরে নয়, এক তীব্র ঘৃণা ও উত্তেজনায়। স্যালুট করেই সে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি আর হাত এগুচ্ছিলাম না। বিব্রত নাগরা বলছিলেন, ’পরাজিত সেনাপতির সঙ্গে বিজয়ী সেনাপতির হাত মেলানো বীরত্ব ও পৌরুষের লক্ষণ। হাত মিলাও টাইগার।’ কেন যেন দারুণ রূঢ়ভাবে বলেছিলাম, ’না, এই হাতে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্ত লেগে আছে। মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্টে অভিযুক্ত। আমি তার সঙ্গে হাত মেলাতে পারি না। আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন না।’ তারপরও নাগরা, ক্লের হাত মেলাতে বলছিলেন। একটা বিশ্রী বিব্রতকর পরিবেশ হয়েছিল। অমন পরিবেশের স্রষ্টা আমি আর কখনো হইনি। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে আমরা গিয়েছিলাম নিয়াজির গুহায়। বিকালে মিত্রবাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল অরোরা আসবেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্দসমর্পণের আনুষ্ঠানিক দলিল স্বাক্ষরিত হবে। প্রথম প্রথম নিয়াজি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেতে আপত্তি করছিলেন। তার ভয় ছিল, সাধারণ মানুষ তাদের পায়ে পিষে মেরে ফেলবে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই তাকে আত্দসমর্পণ করতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র দু-একবার একা হয়েছি। নিয়াজির গুহায় একেবারে একা গিয়েছিলাম। নিয়াজির গুহা থেকে বেরিয়ে বাহিনীর অন্য যোদ্ধাদের সঙ্গে একত্র হতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গিয়েছিল। ওই সময়টা ছিল আমার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ৪টার দিকে লে. জেনারেল অরোরা সস্ত্রীক তেজগাঁও বিমানবন্দরে আসেন। নিয়াজিসহ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বিকাল ৫টা ৫ মিনিটে বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য স্বাধীনতার ঐতিহাসিক দলিল পাকিস্তান হানাদারদের আত্দসমর্পণ পত্রে নিয়াজি আর অরোরার মধ্যে স্বাক্ষর হয়। দুর্ভাগ্য আমাদের এই গৌরবের দিনে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী ছিলেন না। কলকাতা থেকে অরোরার সঙ্গে এসেছিলেন এ কে খোন্দকার। তাকে কিছু করতে হয়নি। পেছনে যে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাই যথেষ্ট। ইদানীং শুনছি জনাব শফিউল্যাহও নাকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিলেন। আমি দেখিনি। টেলিভিশন চ্যানেলের কল্যাণে তার নিজের কণ্ঠে শুনেছি ডেমরা থেকে পাকিস্তান মিলিটারিদের গাড়িতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেছিলেন। ভালো কথা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলেন, ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাদের হুকুম বরদার ছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ-বিগ্রহ করেছি, তাতে যেভাবেই হোক জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর শেষ বিকালে আবার সেই পাকিস্তানিদের সঙ্গে মিলেমিশে তাদের গাড়িতেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেছিলেন, তাতে আর দোষ কী?

আশা করেছিলাম এবারের বিজয় দিবস অন্যবারের চেয়ে মহিমান্বিত হবে। কিন্তু কেন যেন এবারের বিজয় দিবসে জাতি বড় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। একজন নগণ্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিজয়ের এই মহান দিনে দেশবাসীর কাছে বিনীত প্রার্থনা_ দেশটাকে মানবের বসবাসযোগ্য করে তোলার জন্য একটু সক্রিয় হোন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক : রাজনীতিক।

(বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৬/১২/২০১২)

Keywords: