নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত ঢাকা

পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত ঢাকা

Monday 17 December 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

ডিসেম্বর স্বাধীনতার মাস, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির বিজয়ের মাস। বছরের অন্য মাসগুলোর চাইতে নিশ্চয়ই ডিসেম্বর কিছুটা মহিমাময়। আর ঋতু বৈচিত্র্যে ডিসেম্বর আমাদের জন্য বেশ আনন্দের মাস। নানার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া, পিঠে খাওয়ার ধুম পড়ে যায় গ্রাম-গঞ্জে।

মুক্তিযুদ্ধে ডিসেম্বরের প্রথম দিন ছিলাম কেদারপুরে। ভারত থেকে আমাদের প্রতিনিধি দলের আনোয়ারুল আলম শহীদ, ফারুক আহমেদ, শাহাজাদা চৌধুরীর সঙ্গে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফিরেছিলেন। ৩০ নভেম্বর নাগরপুর থানা আক্রমণ করা হয়েছিল। অমন বিপুল শক্তি নিয়ে কাদেরিয়া বাহিনী আর কোথাও আক্রমণ করেনি। উপর্যুপরি দু’দিনের প্রবল আক্রমণে থানার পতন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এটাই কাদেরিয়া বাহিনীর জন্য সবচাইতে বড় ব্যর্থতা। আমি নিজে উপস্থিত থেকেও কয়েক হাজার যোদ্ধা এবং অগণিত গোলাগুলি খরচ করে হানাদার ঘাঁটির পুরোপুরি পতন ঘটাতে পারিনি। সেখানে হানাদাররা যে খুব বেশি বীর ছিল তা নয়। নাগরপুর যুদ্ধে আমাদের এক কমান্ডারের সামান্য ভুলে আমরা এই অসুবিধায় পড়েছিলাম। উত্তর-পশ্চিম দিকে ছিল হুমায়ুন বাঙালের কোম্পানি। তাকে বলা হয়েছিল হানাদাররা ঘাঁটি ছেড়ে অনেকদূর পালিয়ে গেলে তবেই যেন আক্রমণ চালায়।

কিন্তু দক্ষিণ-পুব থেকে আমাদের আক্রমণে যখন ঘাঁটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছিল তখনই তাদের ওপর হুমায়ুন বাঙাল সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বিপুল হতাহত করে। কিন্তু হুমায়ুন বাঙালের আক্রমণে ভীত সন্ত্রস্ত বাকি হানাদাররা আবার শিয়ালের গর্তে লুকায়। সে গর্ত থেকে আর সেদিন বের করা সম্ভব হয়নি। দখলের পর দেখেছি মাটির নিচে অমন সুদৃঢ় সুড়ঙ্গ যেখানে কিয়ামত পর্যন্ত বসে থাকলেও কোনো অসুবিধা হতো না। নাগরপুর থানায় আটকেপড়া হানাদারদের উদ্ধারে টাঙ্গাইল থেকে অতিরিক্ত হানাদার এলে এলাসিন ঘাটে প্রবল যুদ্ধে হানাদারদের কতটা কি ক্ষয়ক্ষতি হয় বলতে পারব না। কিন্তু আমাদের বীর যোদ্ধা কামুটিয়ার ছানোয়ার মারাত্মক আহত ও দু’জন শহীদ হয়। একদিন সারাদিন যুদ্ধের পর আমরা সরে গেলে নাগরপুরে অবরুদ্ধদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিহত দুই যোদ্ধা নিয়ে কেদারপুর পৌঁছলে মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে এক কান্নার রোল পড়ে যায়। কেদারপুর হেডকোয়ার্টারে আগের রাতে খবর রটেছিল হানাদাররা আমাকে ধরে ফেলেছে।

লাশ দাফনের জন্য কেদারপুরে আগেই খবর পাঠানো হয়েছিল। সেইমত ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমান কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে কয়েকশ’ টাকায় ছোট একটু জায়গা কিনে দু’জনের জন্য পাশাপাশি কবর খুঁড়েছিলেন। যথারীতি সামরিক কায়দায় সালামের মাধ্যমে লাশ দাফন করা হয়। ৩ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় বাহিনী ঢাকার ওপর আক্রমণ চালায়। কারণ পাকিস্তানিরা এরই মধ্যে ভারতের অনেক বিমান ঘাঁটিতে হামলা করেছিল। তার বদলা হিসেবে তারা যেমন পশ্চিম পকিস্তানে হামলা করে, ঠিক তেমনি ঢাকাতেও হামলা করে। বিমান হামলার জন্য এক মাস আগে থেকে আমরা ঢাকায় লোক নিয়োগ করেছিলাম। তার দেয়া খবর ভারতীয় বাহিনীর কাছে যথাসময়ে পাঠানোও হয়েছিল। কুর্মিটোলা সেনা ছাউনি এবং তেজগাঁ বিমানবন্দরে এমন নিখুঁত নিশানায় ভারতীয় বিমান বোমাবর্ষণ করেছিল, যা মনে রাখার মতো ব্যাপার। ডা. মালেক মন্ত্রিসভা বঙ্গভবনে যখন মন্ত্রণায় বসেছিল, ঠিক সেই সময় বঙ্গভবনের ওপর বিমান হামলা হওয়ায় ডা. মালেক মন্ত্রিসভা সব ছেড়েছুড়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

৪ ডিসেম্বর সকালে ভারত থেকে ফিরে আসা প্রতিনিধি দলকে সখিপুর হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে উত্তর রণাঙ্গনে রওনা হই। ৭ ডিসেম্বর নিকড়াইল স্কুলমাঠে সবচাইতে বড় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কাদেরিয়া বাহিনীর অত বিপুল সংখ্যক যোদ্ধা কখনও কোথাও একত্র হয়নি। মাঝে-মধ্যে কমান্ডারদের বৈঠক হলেও কোথাও তেমন মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ হয়নি। আমরা চরম আঘাত হানতে চলেছিলাম। তাই শুধু কমান্ডার পর্যায়ে নয়, যোদ্ধা পর্যায়েও সবাইকে কলাকৌশল এবং আমরা কী করতে চাই তা বুঝিয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই অমন বিপুল সমাবেশ। আগের রাতে কাদেরিয়া বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধান ড. নুরুন্নবী কিছু শক্তিশালী বেতার, যুদ্ধাস্ত্র ও ক্যাপ্টেন পিটার নামে এক ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছিল।

বেতার যোগাযোগ চালু হলে ব্রিগেডিয়ার সানসিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় জামালপুরের শত্রুঘাঁটি খুবই শক্তিশালী। শুধু উত্তর দিক থেকে কিছু করা যাচ্ছে না। তাই দক্ষিণ থেকেও আঘাতের প্রয়োজন। তাদের কথামত কাদেরিয়া বাহিনীর একটি অংশ দক্ষিণ দিক থেকে জামালপুর হানাদারদের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। যার ফলে ৯ ডিসেম্বর রাতে জামালপুরের পতন ঘটে। এরপর দুর্বার গতিতে মিত্র বাহিনী ঢাকার পথে টাঙ্গাইলের দিকে এগুতে থাকে। আর আমরা ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্ত করে ফেলি। জামালপুর-ময়মনসিংহ থেকে পিছিয়ে আসা হানাদাররা পথে পথে আমাদের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ১৩ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার কাদের খান কালিয়াকৈরের ঠেঙ্গারবান্দে আমাদের হাতে ধরা পড়ে। ১৪ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলমাঠে কাদেরিয়া বাহিনীর উদ্যোগে এক জনসভা হয়। তাতে মিত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সানসিং বাবাজী অংশ নেন। পাকিস্তান প্রশাসনের পরাজিত দালাল কর্মকর্তাদের সেখানে হাজির করা হলে যে যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়।

ব্রিগেডিয়ার ক্লের এর কলাম গাজীপুরের মৌচাকে ঘাঁটি গাড়ে। অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার সানসিংয়ের কলাম চন্দ্রা থেকে নবীনগরের পথ ধরে। প্রায় ১০ জন দুর্ধর্ষ কমান্ডারের নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনীর চার হাজার যোদ্ধা কড্ডা কাশিমপুরকে বাঁয়ে রেখে বিলের মধ্য দিয়ে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ নৌকায় মিরপুরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যাদের সঙ্গে ১৬ ডিসেম্বর সকালে আমাদের হেমায়েতপুর আমিন বাজারের মাঝামাঝি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দেখা হয়। তাদের অতদূর এগিয়ে যাওয়ায় মিত্র বাহিনীর কমান্ডাররা তো বিস্মিত হয়ই, আমি নিজেও অবাক হই। ১৫ ডিসেম্বর সারারাত একদিকে কড্ডায় ক্লের এর ব্রিগেডের সঙ্গে, অন্যদিকে সাভারে সানসিংয়ের ব্রিগেডের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। উভয় রণাঙ্গনে হানাদারদের ছয়-সাতশ’ নিহত হয়। চারশ’র মতো ধরা পড়ে। আহতের সংখ্যা প্রায় শ’দেড়েক। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর হতাহত একেবারে কম ছিল না। কিন্তু মনোবলহীন দিশেহারা হানাদাররা কোথাও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তাই ১৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে আটটায় ঢাকা-আরিচা সড়কের হেমায়েতপুর সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল নাগরা আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে নিয়াজীকে এক পত্র লিখেন,
প্রিয় আবদুল্লাহ,

আমরা এসে গেছি। তোমার সব ভেল্কি খতম হয়ে গিয়েছে। আমরা তোমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছি। বুদ্ধিমানের মতো আত্মসমর্পণ কর। না হলে তোমার ধ্বংস অনিবার্য। আমরা কথা দিচ্ছি, আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তোমাদের সঙ্গে আচরণ করা হবে। তোমাকে বিশেষভাবে লিখছি, আত্মসমর্পণ করলে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা দেয়া হবে।
তোমারই
মেজর জেনারেল নাগরা
১৬.১২.৭১ ইং
০৮.৩০ মিনিট
আমাদের চার দূত পত্র নিয়ে ছুটে শত্রুশিবিরে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুশিবিরে যেতে সাদা পতাকা ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সাদা পতাকা না থাকায় এক মুক্তিযোদ্ধার সাদা শার্ট জিপে লটকে দেয়া হয়। নিয়াজীর কাছে নাগরার পত্র পৌঁছলে তিনি আত্মসমর্পণে সম্মতি জানান। আর যুদ্ধ হচ্ছে না জেনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে দূতেরা বিদ্যুেবগে ছুটে আসতে থাকে। আনন্দে কখন জিপে লটকানো সাদা শার্ট উড়ে গেছে বুঝতেও পারেনি। শত্রু ধেয়ে আসছে ভেবে আমাদের অগ্রবর্তী দল গুলি চালায়। নিমিষেই সব শেষ হয়ে যায়। চারজনের তিনজন সঙ্গে সঙ্গে শহীদ হয়। গুরুতর আহত মেজর শুভ সংবাদ দেয়, হানাদাররা আত্মসমর্পণে সম্মত আছে। পিছে পিছেই আসছে শত্রু বাহিনীর মেজর জেনারেল জামশেদ। সেই চরম বিষাদের মাঝেই মেজর জেনারেল জামশেদ মিরপুর আমিন বাজারে কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে তার ক্যাপ, বেল্ট, রিভলবার আর জেনারেল ফ্ল্যাগ আমাদের হাতে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। দ্বিতীয় আত্মসমর্পণ সম্পন্ন হয় ১০টা ৫ মিনিটে শত্রু সেনাপতি টাইগার নিয়াজীর গুহায়। আনুষ্ঠানিক দলিল স্বাক্ষরিত হয় বিকাল ৫টা ৫ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

এখনও বেঁচে আছি। ঢাকা দখলের প্রতিটি পর্বে হাজির ছিলাম। কেউ দয়া করে, প্লেনে তুলে আনেনি। বাহুবলে সসৈন্যে এসেছিলাম। অথচ ৪২ বছর পর বেঁচে থাকতেই সেই আত্মসমর্পণের কত রকমের নতুন নতুন ইতিহাস শুনছি। যা শুনে বড় বিস্ময় লাগে। ভারতীয় এক পণ্ডিত ৯৩ বছর বয়সে তার পদমর্যাদার কথা চিন্তা না করেই ইদানীং নানা কথা বলছেন।

আর আমাদের মিডিয়াও তার কথাকেই বেদবাক্য মনে করে না বুঝেই ইতিহাস বিকৃতিতে সহায়তা করছে। জেনারেল জ্যাকব একটি বই লিখেছেন, তাতে তিনি একাই মুক্তিযুদ্ধের সব কৃতিত্ব লুটে নিয়েছেন। তার সরাসরি কমান্ডার লে. জেনারেল জাগজিত্ সিং অরোরাকে অদক্ষ বলে চিত্রিত করেছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ’কে অবমূল্যায়ন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতিত্ব স্বীকার করতে তার কলমে কালি জোটেনি। শুধু বলেছেন, বাঙালি জনগণ খুব সাহসী। আর আমার ব্যাপারে যা বয়ান করেছেন তা কহতব্য নয়। তিনি বলেছেন, বিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ঢাকা দখলে আমার কোনো ভূমিকাই নেই। তার কথায় মনে হয় আমি যেন এক মস্তবড় বেঈমান! তেজগাঁ বিমানবন্দরে আমাকে দেখে নাকি তিনি রুষ্ট হয়েছিলেন। কী আজব ব্যাপার! দেশ তখনও স্বাধীন হয়েই সারেনি, তিনি রুষ্ট হন!

৯ মাস নিয়াজী রুষ্ট ছিলেন, কেয়ার করিনি। তার রুষ্ট হওয়ায় আমার কী এসে যায়? তার নাকি মনে হয়েছিল আমি নিয়াজীকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম। তিনি লিখেছেন, দু’জন ভারতীয় সৈন্যকে আমাকে দেখে রাখতে বলেছিলেন। কী বলি এমন নাদান জেনারেলকে! একটা যুদ্ধের ময়দান, রাতদিন যুদ্ধ করে ঢাকা দখল নিয়েছি, যুদ্ধের সময় আমার দেহরক্ষী বাহিনীতে প্রায় দুইশ’র ওপর সবচাইতে চৌকস যোদ্ধা, যাদের সবার কাছে আধুনিক অস্ত্র। ভারতীয় এসএলআর-এর এক গুলি বেরুতে বেরুতে চায়নিজ রাইফেল, কারবাইন, এলএমজি থেকে দশ গুলি বেরুতো। সে রকম দুর্ধর্ষ তিন-চারশ’ যোদ্ধা যাকে মৌমাছির মতো ঘিরে রাখতো তাকে নাকি দু’জন ভারতীয় সৈন্য দিয়ে চোখে চোখে রাখা যায়! আর সে সৈন্যরাও মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আমাদেরই সঙ্গে একসঙ্গে ঢাকা দখল করেছে। সৈন্যহীন সেনাপতি জ্যাকব একেবারেই একা যশোর থেকে এসেছিলেন। পিপাশা লাগলে তাকে পানি এগিয়ে দেয়ারও কেউ ছিল না। এসব লোকের কথাবার্তায় বিরক্ত না হয়ে পারা যায় না। ঢাকা দখলে মুক্তিবাহিনী কিছুই করেনি, কাদেরিয়া বাহিনী কিছুই করেনি—স্বাধীনতার এত বছর পর কোনো ঠাণ্ডা ঘরে বসে বই লিখলেই কি হয়? ঢাকা দখলের দিন ১৬ ডিসেম্বর অগ্রবর্তী বাহিনীর প্রায় বিশ হাজার যোদ্ধার কাদেরিয়া বাহিনী নাস্তার ব্যবস্থা করেছিল। কারণ অতদূর এগিয়ে যাওয়ায় এবং প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ হওয়ায় অগ্রবর্তী দলের সকালের খাবার ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না।

তাই জেনারেল নাগরা রাত ১২টায় আমাকে নাস্তার কথা বলেছিলেন। বিশ হাজার যোদ্ধার নাস্তা চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা করা খুব সোজা কাজ ছিল না। মাংস, লুচি, সবজি, হালুয়া, পরোটা বানানো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রতিজনের জন্য ১০০ গ্রাম করে মাংস হলে ২০,০০০ সৈন্যের জন্য ২০০০ কেজি, ১০০ গ্রাম আটা হলে ২০০০ কেজি, ১০০ গ্রাম সবজি হলে ২০০০ কেজি, ১০০ গ্রাম হালুয়া হলে ২০০০ কেজি। আর ১০০ মি.লি. চা হলে ২০০০ লিটার। মোট কত টন পাঠক এবার আন্দাজ করতে পারেন। টাকা থাকলে কেনা যায় কিন্তু ব্যবস্থা করা যায় না। ৪-৫ ঘণ্টায় এসব ব্যবস্থা সেও এক যুদ্ধের মতো ব্যাপার। যারা সম্ভব করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম শ্রমিক নেতা হবি মিয়া, নুরুল ইসলাম, আমাদের এক বিরল চরিত্রের যোদ্ধা মেজর আলী হোসেন, ক্যাপ্টেন নিয়ত আলী, চাপা-এ বাঙাল মোয়াজ্জেম হোসেন খান ও ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমান। যদি জেনারেলের সামান্যতম বিচারবোধ থাকতো তাহলে যুদ্ধরত অগ্রবর্তী বাহিনীর জন্য বিজয় দিনের শুধু নাস্তা সরবরাহের জন্যই আজীবন কৃতজ্ঞ থাকতেন। ঢাকা বিজয়ে আমার কোনো ভূমিকা না থাকলে, কাদেরিয়া বাহিনীর কোনো ভূমিকা না থাকলে আমাকে তিনি ভাঙাচুড়া তেজগাঁ বিমানবন্দরে দেখলেন কী করে? যুদ্ধ করে হোক আর না করে হোক, আমি যে সেই সময় ঢাকায় ছিলাম এটা তো ঠিক। আমি যে ছিলাম এটা তো তার কথায়ই প্রমাণ হয়। আর অত দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধানকে যে মেরে ফেলতে চায়, সে তো আর নবুছবু কেউ হতে পারে না। তারও তো কিছু শক্তি থাকা প্রয়োজন। স্বাধীনতার এত বছর পর স্বাধীনতা নিয়ে এভাবে ছেলেখেলা করা, বাঙালির গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করা মোটেই প্রশংসার কাজ নয়। আমাকে পছন্দ না হয় অপমান অপদস্থ করুন, প্রয়োজনে শেষ করে দিন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ষড়যন্ত্র করে কেউ ছোট বা খাটো করবেন না। বিজয়ের এই দিনে জাতির পিতা, জাতীয় চার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধে সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

(আমার দেশ, ১৭/১২/২০১২)

Keywords: