নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > বিদায় ২০১২

বিদায় ২০১২

Monday 31 December 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

আজ বছরের শেষদিন। দেখতে দেখতে ২০১২ চলে গেল। বছরটি কত ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ২০১২ বাংলাদেশে ঘটন-অঘটন পটিয়সীর তালিকায় একেবারেই উপরের দিকে স্থান করে থাকবে। কবি নজরুল বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারিতে লিখেছিলেন,
‘বিদায়, হে মোর বাতায়ন-পাশে নিশীথ জাগার সাথী!
ওগো বন্ধুরা, পাণ্ডুর হয়ে এল বিদায়ের রাতি!
আজ হ’তে হ’ল বন্ধ মোদের জানালার ঝিলিমিলি,
আজ হ’তে হ’ল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি।’

বছরটাকে যদি কবির ভাষায় বিদায় দেয়া যেত, তাহলে কতই না ভালো হতো। কিন্তু তেমন সুযোগ কোথায়! আমরা মহাপণ্ডিতদের রাজ্যে বাস করছি। কেহ কারে নাহি জিনে- সমানে সমান। একজন বলে সাপ আরেকজন সাপের কারবারী। কারও উক্তি—সাপের ঝাঁপি নিয়ে ঘুরেন। কেউ বলেন, ওটা সাপের নয়, উন্নয়ন আর প্রশান্তির ঝুড়ি। রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ে এত নিম্নমানের গালির ধারের গালি পৃথিবীর আর কোনো দেশে স্থান পায়নি—যেটা আমাদের দেশে স্থান করে নিয়েছে। আরাকানের রাজকবি আলাওলকে বাংলা সাহিত্যে পড়ানো হয়, চর্যাপদ পড়ানো হয়, মহামতি আকবরের নবরত্ন—কত বড় বড় জ্ঞানী, গুণী, কবিদের নিয়ে রাজদরবারের কত উপাখ্যান রচিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের রাজকার্য পরিচালনায় ভাষার শৈলী যদি খুঁজতে হয়, অভিধানও ফেল করবে। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইংরেজি ডিকশনারি, বাংলার অভিধান, সংস্কৃত, পালি, উর্দু, ফারসি, আরবি কোনো ভাষায় এসবের গোড়া খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সবই ইদানীংকালের নতুন আবিষ্কার। বছর শেষে সব থেকে কঠিন বিস্ময় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে লন্ডন ইকনোমিস্ট এবং আমার দেশ-এ দুই মহাজ্ঞানীর লাগামহীন কথোপকথন। অত উপরের লোকরা এত দরিদ্র ভাষায় কথা বলে অনেকে আন্দাজই করতে পারিনি। আমার দেশ-এ স্কাইপি প্রকাশ নিয়ে গত সংখ্যায় লিখেছিলাম। কত যে সাধুবাদ পেয়েছি তার হিসাব দিতে পারব না। সে হিসাব মেলাতে গেলেও আরেকটা স্কাইপির সাহায্য নিতে হবে। কারণ ফোনে যেসব কথা হয় তা আধুনিক যন্ত্র খুব সহজেই হিসাব দিতে পারবে। শুধু সাধুবাদেই ক্ষান্ত থাকেনি। সেদিন হঠাত্ মিরপুরের মোহন আর শাহজাহান এসেছিল। মোহন মাঝেসাজেই আসে। ’৭১-এ আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে ছিল। এখনও সেই একইভাবেই সম্মান সমীহ করে। ওর এক ছেলে ওমর ফারুক খুব সুন্দর ছবি তোলে। দু’এক জায়গায় আমার ছবিও তুলেছে। গরিবের সংসার কোনো রকমে চলে। মাঝে খুব অসুস্থ ছিল। এখনও পুরো সুস্থ নয়।

তবে বছর দুই আগে যতটা ভেঙে পড়েছিল তার চাইতে কিছুটা শক্তি সামর্থ্য হয়েছে। মোহন কবিতাও লেখে। সদ্য প্রকাশিত ‘এই সময়ের ছড়া’ শামসুল আলম মোহন হাতে দিয়ে গেছে। হঠাত্ দেখলাম বইটি আমার নামে উত্সর্গ করেছে, ‘আমার রণগুরু বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম।’ আমার ঘনিষ্ঠ আরেক কবি ও ছড়াকার পাবলিক লাইব্রেরির পরিচালক যুগ্ম সচিব নুর হোসেন তালুকদার। সেও অনেক ছড়া লিখেছে, ‘শিথিল মনির নানা তা না না না তা না না না’। তিনদিন আগের ঘটনা তাই ছড়াগুলো ভালো করে পড়াও হয়নি। একবার মেয়র হানিফের নির্বাচনে মিরপুর গিয়েছিলাম। সেই সময় কমিশনার পদে দাঁড়িয়েছিল দেওয়ান শাহজাহান আর আগা খান মিন্টু। ওরা আমার খুবই প্রিয়। শেষ পর্যন্ত ছিলাম এই জন্য যে লেঃ জেঃ মীর শওকত এক সময় আড়ালে ডেকে বলেছিলেন, ‘কাদের ভাই, শক্তভাবে থাকবেন। কারচুপি করে ঘোষণা দিয়ে ফল নিয়ে নেবে।’ তাই শক্তভাবে ছিলাম ফল বেরুনোর আগ পর্যন্ত। আগা খান মিন্টু, দেওয়ান শাহজাহান ওরা কেউ বিরাট পণ্ডিত না। রাজনীতিতেও না, বিদ্যা বুদ্ধিতেও না।

একদিন কী নিয়ে কথা হচ্ছিল। আশরাফ গিরানী অথবা কেউ গ্রামে কার কত বাপ-দাদার জমিজমা আছে তাই নিয়ে চ্যালেঞ্জ। হঠাত্ শাহজাহান বলে উঠেছিল, ‘পাগার পুগার যাই থাকুক, আপনাদের এক একর আর আমাদের এক ডিসিমল সমান কথা।’ সেটা ১৫-২০ বছর আগের কথা। ইদানীং তাই দেখছি। ঢাকা শহরের গুলশান বনানীতে এক কাঠা আর আমাদের গ্রামগঞ্জের ২০-২৫ একর, তাও দরদামে মিল পড়ে না। কেন যেন বহুদিন পর দেওয়ান শাহজাহান ফোন করেছিল। জনাব আবদুল জলিলের মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সখীপুর শাখা উদ্বোধনে দাওয়াত করেছিলেন। আসলে আওয়ামী লীগারদের দাওয়াতে যেতে ইচ্ছে করে না। যে সখীপুরকে পাদপ্রদীপের নিচে এনেছিলাম; মুক্তিযুদ্ধে সারা পৃথিবীতে পরিচিত করেছি; ৩৫-৪০ বছর আগে যে সখীপুর লেখাপড়ায় ছিল খুবই পশ্চাদপদ; কাছা দিয়ে ৩০-৩৫-৪০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পড়তে যেতে হতো; তাদের জন্য স্বাধীনতার পর মুজিব ডিগ্রি কলেজ করেছিলাম। যে কলেজের সিংহভাগ জমি দিয়েছিল সালাম ফকির। আর হামিদুল হক বীর প্রতীক, আউয়াল সিদ্দিকী, শম আলী আজগর, আমজাদ হোসেন, শওকত মোমেন শাহজাহান, খোরশেদ আলম, গজারিয়ার মোজাম্মেল রাত-দিন খেটে কলেজটাকে দাঁড় করিয়েছিল। ’৭২-এ প্রতিষ্ঠিত কলেজ ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হলে মেজর মান্নান নামে এক জল্লাদ বা ডাকাত সখীপুরের দায়িত্বে ছিল। কত মানুষকে যে নির্যাতন করেছে তার শেষ নেই।

প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কলেজটি। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর প্রচেষ্টায় ’৮৩ সালে আবার চলতে শুরু করে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে শওকত মোমেন শাহজাহান এমপি এবং বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী হন মন্ত্রী। কলেজের লোকজন আসে তাদের সম্বর্ধনার কথা বলতে। আমি খুশি হয়ে সম্বর্ধনায় সম্মতি দেই। পরে দেখি সে সম্বর্ধনার সভাপতি এক চ্যাংড়া ইউএনও, বিশেষ অতিথি জনাব শওকত মোমেন শাহজাহান, প্রধান অতিথি লতিফ সিদ্দিকী। এসবের পরেও সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যাবার ইচ্ছে ছিল না। সঙ্গে স্ত্রী ছিলেন, ছিলেন সুসাহিত্যিক সৈয়দ আবুল মকসুদ। সম্বর্ধনার দিন বেশ কয়েকবার শাহজাহান ফোন করেছিলেন। কিন্তু কালিয়ানের বাড়ি থেকে সিলিমপুরে গিয়ে দেখি পুলিশ দাঁড়িয়ে। কেন? আপনি যেতে পারবেন না। ‘কী কারণে নিষিদ্ধ হলাম? কাগজপাতি দিন।’ ‘না, কোনো কাগজপাতি নেই। উপরওয়ালার হুকুম।’ পুলিশরা দাঁড়িয়েছিল। ওর মধ্যেই গাড়ি চালিয়ে চলে গিয়েছিলাম।

সখীপুর বাজারের তালতলায় আবার পুলিশ সাহেবরা ফণা তুলে দাঁড়ালেন। এক ভাঙা জিপ নিয়ে সামনে কেরাবেরা করছিল। মন বলছিল পাছায় লাথি মেরে উড়িয়ে দেই। এক ধাক্কা দিতেই ছিটকে পড়ল। হাজার হাজার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যারা বীর ছিল তারা অনেকেই তখন কাপুরুষে পরিণত হয়েছে। তবু তামাশা দেখছিল। আমার আর কলেজে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। চলে এসেছিলাম। নিজের মায়ের পেটের ভাই আওয়ামী লীগ করেন বলে আমারই প্রতিষ্ঠিত কলেজে শওকত মোমেন শাহজাহানের প্ররোচনায় আমাকে যেতে দেয়নি। আমার বাড়িতে আমার অনুপস্থিতিতে তষ্করের মতো গিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এখন শেষের বছর। কত ডাকাডাকি, জাতীয় দুর্দিনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাইকে একত্র হওয়া দরকার। এক সুরে কথা বলা দরকার। কিন্তু কেন যেন সুর মেলে না, তাল কেটে যায়। তাই তাদের ডাকাডাকিতে সাড়া দিতে পারি না।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জনাব এমএ জলিল একজন অসুস্থ মানুষ। সপ্তাহে তিনবার ৭-৮ ঘণ্টা করে ডায়ালাইসিস করেন। যে কারণে তার প্রতি মমতা একটু বেশি। তাদের ব্যাংকের শাখা খুলবেন। তাই দাওয়াত করেছিলেন, রাজি হয়েছিলাম। তবে জনাব শাহজাহান দাওয়াত দেননি। অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসিনি, নিচে ছিলাম। জনাব আবদুল জলিল অনেক পীড়াপীড়ি করেছেন, তবু যাইনি। দু’কথা বলার আহ্বান করলে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। তার আগে জনাব শাহজাহান সর্বনাশ করে ফেলেছিলেন। সখীপুরে স্থাপিত ব্যাংকে বড় পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া না গেলেও যেন কিছু পিয়ন-দারোয়ান পাহারাদার ঝাড়ুদার চাকর-বাকর, চাপরাশির চাকরি তার সুপারিশে সখীপুরের লোককে দেয়া হয়—এই ছিল তার আবদার। তাই আমি তার কঠোর প্রতিবাদ করেছিলাম। পাকিস্তান আমলে দেখেছি, ব্যাংকের ম্যানেজার হতো পাকিস্তানি—তার পিয়ন-চাপরাশি বাঙালি। ডিসি-ওসি পশ্চিম পাকিস্তানি, তার পিয়ন চাপরাশি কনস্টেবল বাঙালি।

বাংলাদেশেও যদি তাই হয় আমি আর কী করতে পারি। পাকিস্তানের সময়ও আমাদের দেশের দালালরা তাদের প্রভুদের কাছে অমন করে আবদার করত। কথাই আছে, কয়লার ময়লা যায় না ধুইলে, খাসলত যায় না মরলে। জনাব এমএ জলিল একজন বুদ্ধিমান সজ্জন ব্যক্তি। তিনি আমার আপত্তির কারণ বুঝেছিলেন। ঢাকা ফেরার পথে দেওয়ান শাহজাহান ফোন করেছিল, ‘দাদা, আসতে চাই।’ ‘৮টার পর এসো।’ ভেবেছিলাম একা আসবে, দেখলাম মোহনকে নিয়ে এসেছে। বিদায়ের সময় সে করুণভাবে বলল, ‘দাদা, মাহমুদুর রহমানকে এটা কী বললেন? সে যে বিএনপির পক্ষের লোক।’ হাসতে হাসতে বলছিলাম, ‘আমি তো আওয়ামী লীগ করি না, বিএনপিও না। আমার মনে হয়েছে মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১৭ ঘণ্টা কথোপকথন জনসম্মুখে প্রকাশ করে আমার দেশ একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছে—তাই লিখে দিয়েছি। আমি লিখলেই কী আর না লিখলেই কী? আমি তো বালতি আর তোরা আওয়ামী লীগ মহাসমুদ্র। এত চিন্তা কেন?’

২০১২-র শেষের দিকের সবচাইতে বড় ঘটনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৯তম জাতীয় সম্মেলন। যে লাউ সেই কদু, সাবেক বহাল। কত ঢাকঢোল পিটিয়ে কত আয়োজন করে এই যদি হবে তাহলে আগে বলে দিলেই হতো, সভানেত্রী সব করে ফেলতেন। কিডনি নষ্ট মানবের ডায়ালাইসিসের মতো নতুন রক্ত সঞ্চালন হলো দলীয় সম্মেলন। দলীয় কর্মীদের নতুন প্রেরণায় উজ্জীবনের এক শুভ কর্ম সম্মেলন। একত্রিশ বছর সভাপতি, কোনো প্রস্তাব ছাড়াই সাবেক বহাল। বাকিটুকু নেত্রী করবেন। আওয়ামী লীগ কী করল না করল—এ নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু সমস্যা হলো আওয়ামী লীগ একটি প্রবীণ দল, আমাদের দেশে আগের হাল যেদিক দিয়ে যায় পিছের হালও সেদিক দিয়ে যায়। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে কিছু না কিছু বলতেই হয়। যাক, আরও তিরিশ বছর জননেত্রী আওয়ামী লীগের সভানেত্রী থাকলে আমার আপত্তি কী? আমি করি গামছার দল। গ্রামেগঞ্জে ঘরে ঘরে গামছা ছড়িয়ে দিতে পারলেই আমি খুশি। ওই একইদিনে গরিবের দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গামছার দলের ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অনেক কর্মী-সমর্থক এসেছিল। প্রাণ ভরে গেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানাতে প্রবীণ নাগরিক ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত করেছিলাম।

দাওয়াত করেছিলাম জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আসম আব্দুর রবকে। জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, আরেক অংশের শেখ শহীদুল ইসলাম, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান আরও অন্যদের। দাওয়াত ছাড়াই যাওয়ার পথে আরেক প্রবীণ নাগরিক জাতির বিবেকসম ব্যারিস্টার রফিকুল হক অংশ নিয়েছিলেন। বস্তির ভাড়ার লোক ছাড়া হল ভর্তি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ঢাকা শহরে খুব একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি হয় না। এর আগে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি সম্মেলনে গিয়ে যেমন মন ভরে গিয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে আমার সমস্ত অন্তরাত্মা দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। বিত্তশালীদের চিত্ত নাই তবু তাদের পিছে পিছে দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে বছরখানেক আগে উদ্যোগ নিয়েছি দলীয় তহবিল গঠনের। যখন যে দলীয় অনুষ্ঠানে যাই সেখানেই কর্মীদের কাছে আর্থিক সাহায্য চাই। ঠিকানাসহ অনেক সময় অনেক জায়গায় দারুণ সাড়া পাওয়া যায়।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি সম্মেলনে চিন্তা-ভাবনার ভুলের জন্য সব কর্মীর নাম-ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও অনুদান পরে সংগ্রহ করা হবে বলায় কর্মীরা সেভাবে বুঝতে না পেরে এখন পর্যন্ত অনেকেই তাদের নাম-ঠিকানাসহ তেমন অনুদান দিতে পারেনি। তবে মধুপুর আর মির্জাপুরের অনেকেই ছবিসহ সাধ্যমত অনুদান পাঠিয়েছে। কিন্তু ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে নাম-ঠিকানাসহ নেতাকর্মীদের অনুদান প্রদান দেখে বিস্মিত হয়েছি। সবাইকে চিঠি দেব—এজন্য তালিকা করতে গিয়ে অনুদানের ধরন দেখে মাথা ঘুরে গেছে। অপ্রস্তুত অবস্থাতে যদি সাধারণ নেতা-কর্মীদের অন্তরাত্মা এত উদার হয় প্রস্তুতি থাকলে কেমন হবে ভেবে বিস্মিত হই। সবার কাছে চেয়েছিলাম সর্বনিম্ন দশ টাকা। দশ টাকাও যেমন দিয়েছে, দশ হাজারও দেয়ার লোকের অভাব হয়নি। ভীষণ আশান্বিত হয়েছি। দলীয় কর্মীরাই যদি এখন থেকে মাসে নিয়মিত একশ’ টাকা চাঁদা দেয় তাহলে কার কাছে আমার যাওয়ার দরকার! টাকার জোরেই তো বড় বড় দল পোদ্দারি করে।

ডেসটিনির মতো ফটকাবাজরা যদি ফটকাবাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটতে পারে তাহলে আমাদের সমর্থক নেতাকর্মী যারা দলের জন্যে হৃদয় উজাড় করে দেয়, রাতদিন পরিশ্রম করে, প্রতিদিন কত টাকা ফ্লেক্সিলোড করে মোবাইলে ভরে—তারা কি প্রতি মাসে দশ-বিশ, শ’ টাকা দলকে সাহায্য করতে পারে না? নিশ্চয়ই পারে। আমাদেরই চেতনার ভুল। আমরা টাকাওয়ালা রাঘব-বোয়ালদের দিকে চেয়ে থাকি, চিত্তওয়ালা মানুষের দিকে চাই না। আমার সমস্ত জড়তা কেটে গেছে, চোখ খুলে গেছে ২০১২ সালের শেষদিকে। মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম একেবারে হতদরিদ্র সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাহায্যে। এখন একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছি। সাধারণ মানুষের শুভেচ্ছা ভালোবাসা ছাড়া যে এটা হবে না কখনো জোর দিয়ে ভাবার চেষ্টা করিনি, পরিবেশই আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আমার বিশ্বাস নতুন মানে ২০১৩ সাল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের আর আর্থিক দৈন্যের বছর হবে না, হবে সাফল্যের বছর।

যেভাবেই বলি, বছরটি আমরা ভালোভাবে পার করতে পারলাম না। আরেকটু সহনশীল মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দিয়ে ২০১২ কে বিদায় করতে পারলে কতই না ভালো হতো। জাতীয়ভাবে তো অশান্ত ছিলামই, আন্তর্জাতিকভাবেও বছরটি শান্ত যায়নি। প্রতিটি জিনিসের মূল্য নাগালের বাইরে। মহররমের আশুরার দিনে নতুন কারবালা সৃষ্টি হয়েছিল আশুলিয়ায়। শ্রমিকের বড় দুর্দিনের, বড় দুঃসময়ের বছর ছিল ২০১২। সাংবাদিকদের জীবন শঙ্কামুক্ত নয়। মহিলা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাগর-রুনীর হত্যাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনের হাতে সৌপর্দ করতে চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম ৪৮ মাসেও হবে না। ৪৮ সপ্তাহ এর মধ্যেই পেরিয়ে গেছে, কোনো সুরাহা হয়নি। সফলতার কথা বলে দিবানিশি ঢেঁকুর তুললেও এসবই আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। এসব আড়াল করার কোনো উপায় নেই। আমাদের বর্তমান মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের আজ্ঞাবহ কর্মচারী ছিলেন। সেদিন দেখলাম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি কোনো যুদ্ধাপরাধী নন। জানিনা কে তাকে যুদ্ধাপরাধী বলেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করলে যদি যুদ্ধাপরাধ হয় তাহলে নিশ্চয়ই তিনি যুদ্ধাপরাধী। এখনকার অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বড় বড় ব্যক্তি তখন পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন।

আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মুক্তিযুদ্ধের সময় এডিসি ডিসি ছিলেন। ’৭২-’৭৩ এর গেজেট দেখলেই চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ আরও কোথায় কোথায় কাজ করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। শুধু তিনি একা নন, আরও অনেকেই ছিলেন। ক’দিন আগে সব কয়টি জেলার ডিসি, এডিসি, এসপির নাম দিয়েছিলাম। কে কার খোঁজ রাখে। পক্ষে থাকলে ভালো, সত্য কথা বললে খারাপ। ক’দিন আগে নাম-ঠিকানা ছাড়া এক উন্মাদ ছাত্রলীগারের দশ পৃষ্ঠার চিঠি পেয়েছি। কখনও কখনও সে আমাকে বাবার বাবা আখ্যায়িত করেছে। আবার কখনও তার কাছে আমি কিছুই নই। একেবারে শেষে এসে বলেছে, ‘আপনার অতীত যাই থাকুক, আপনি দেশের জন্য যতকিছুই করুন না কেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকলে তবেই আপনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের মাথার মুকুট।

বিএনপিতে যাওয়াতো দূরের কথা তাদের সমর্থন করলেই আপনি রাজাকার।’ এরকম চেতনার ছাত্রলীগাররা বিশ্বজিেক কুপিয়ে হত্যা করবে না তো কোন মুমূর্ষুকে সেবাযত্ন দিয়ে ভালো করে তুলবে? বিশ্বজিতের খুনিরা নিজেরাই বলেছে, নাম ফোটাবার জন্য, পাদপ্রদীপের নিচে আসার জন্য ওভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আবার বলিহারি যাই, ময়না তদন্তের ডাক্তারের।

এমন দলীয় ডাক্তার হতে পারে! লাখ লাখ মানুষ কতবার চাপাতি দিয়ে কোপানোর কত ছবি দেখেছে, কিন্তু আওয়ামী ডা. ভদ্রলোক বিশ্বজিতের শরীরে কোনো ধারালো অস্ত্র বা চাপাতির কোপের আঘাত পাননি। পাবেন কী করে? তার কাঁধে ছাত্রলীগের দা’র কোপ পড়ার আগে তিনি কোনোদিন পাবেন না। সরকারি ক্ষমতার লোভে অন্ধ, শ্রবণ-বধির, বিবেকহীন এক অশুরের শামিল। তাই তার কাছে মানবতা এমন করে অপমানিত হবে—এটাই তো স্বাভাবিক। হে ২০১২ তোমাকে বিদায়।

(আমার দেশ, ৩১/১২/২০১২)

Keywords: