নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > শফিক রেহমান > খালেদা হাসিনার ঝাপিতে সাপতত্ত্ব

খালেদা হাসিনার ঝাপিতে সাপতত্ত্ব

Tuesday 1 January 2013, শফিক রেহমান Print

শান্তির পর ঝড়।

জীবনের পর মৃত্যু।

আলোর পর অন্ধকার।

ভালোর পর মন্দ।

সুখের পর কষ্ট।

প্রাচুর্যের পর অভাব।

আনন্দের পর বেদনা।

হাসির পর কান্না

স্রোতের পর বন্যা।

বর্ষার পর খরা।

জোয়ারের পর ভাটা।

পূর্ণিমার পর অমাবস্যা।

দিনের পর রাত।

তারপর? তারপর? তারপর?

বিশ্বের কিছুই অ্যাবসলিউট নয়।

তাই তো আসে শান্তির পর ঝড়।

জীবনের কিছুই অবিমিশ্রিত নয়।

তাই তো আসে আলোর পর অন্ধকার।

দিনের পর রাত।

কিন্তু তারপর? তারপর? তারপর?

শামীমের মনে এই একই প্রশ্ন ঘুরপাক দিচ্ছিল।

সে তার ওমেগার দিকে তাকাল।

রাত আটটা বাজতে মিনিট পাচেক।

ফাইনাল এপ্রুভালের জন্য এখনই আসতে থাকবে পেইজ মেকআপের পৃন্টগুলো।

একটার পর একটা এ-থৃ সাইজের শাদা কাগজে কালো রংয়ের ছবি ও অক্ষরগুলো।

পরদিন অবশ্য দৈনিক শুকতারা-র পৃষ্ঠায় কালোর সঙ্গে থাকবে লাল হেডলাইন এবং বহু রংয়ের সব ছবি।

একটু পরে ছবিগুলো সিলেক্ট করতে হবে মেরির রুমে তার পাশে বসে।

শামীম হাসান এডিটর। মীমভাই। বয়স পঞ্চাশ ছুই ছুই।

মরিয়ম খান নিউজ এডিটর। মেরি। বয়স চল্লিশ ছুই ছুই।

প্রটোকল অনুযায়ী নিউজ এডিটরেরই আসা উচিত এডিটরের রুমে।

তারপর কমপিউটার স্কৃনে বিভিন্ন ঘটনার একাধিক ছবি দেখতে হবে।

নির্বাচিত করতে হবে পরদিন সকালের ফ্রন্ট পেইজ, লাস্ট পেইজ এবং বিভিন্ন পেইজে পাঠকরা কি ছবি দেখবে? সারা দেশে যে মাত্রায় খুন জখম গুম ধর্ষণ বেড়ে চলেছে সেটা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কতোটা বীভৎস, কতোটা মর্মান্তিক ফটো পাঠককে দেখানো উচিত হবে।

বিবেচনায় রাখতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বী নিউজপেপারগুলো কতোটা ভয়ঙ্কর ছবি ছাপাবে।

শামীমের টেবিলে ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো।

ওদিক থেকে ভেসে এল মেরির ভয়েস।

মীমভাই, ছবিগুলো সব রেডি।

আমি আসছি দু মিনিট পরে। এর মধ্যে তুমি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর বের করো। শামীম বলল।

কি প্রশ্ন?

দিনের পর রাত। তারপর কি?

আপনি যদি আশাবাদী হন, অপটিমিস্ট হন, তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর হবে, রাতের পর দিন। আর আপনি যদি নিরাশাবাদী হন, পেসিমিস্ট হন, তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর হবে রাতের পর রাত। মেরি তার সমাধান দিল।

তুমি দুটো উত্তর দিলে। হ্যা, রাতের পর দিন অবশ্যই আসবে। তবে এই অতি দুঃসময়ে দেশ পার করছে রাতের পর রাত। এই রাত শীতার্ত ও কষ্টকর। এই রাত মনে হয় অনেক লম্বা। তীব্র শীতে উত্তর বাংলায় মানুষ মারা যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ৩৭ শিশুসহ ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রংপুর, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়ে শীতের প্রকোপ বাড়ছে। রাজধানীর প্রায় ৪,৫০০ বস্তিতে কয়েক লক্ষ মানুষ শীতে কাপছে। শামীম জানালার বাইরে তাকালো। কিছু মানুষ ফুটপাথে ডালপালা, শুকনো পাতা, পলিথিন-প্লাস্টিক জড়ো করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে ঘিরে বসে আছে। হাত-পা গরম করছে।

একটা কালো সুট পরে থাকলেও শামীমের ঠাণ্ডা লাগছিল। রুম হিটারের হিটিংটা একটু বাড়িয়ে দিল।

কিন্তু হঠাৎ ইলেকটৃসিটি চলে গেল।

ড্যাম ইট। শামীম শাপান্ত করল কুইক রেন্টালকে। বিদ্যুতের দাম এই বছরে ছয়বার বাড়িয়েও এই দুরবস্থা! শেখ হাসিনা অবশ্য বলেছেন, আগে দেশে কি অবস্থা ছিল সেটা দেশবাসীকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য দুই ঘণ্টা লোড শেডিংয়ের নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। কুইক রেন্টালওয়ালাদের এত তেল মেরেও এই নির্দেশ কেন? ড্যাম পিএম। এর চেয়ে আর কোনো খারাপ গালি শামীম সেই মুহূর্তে খুজে পেল না।

অফিসের নিজস্ব জেনারেটরে ইলেকটৃসিটি ফিরে এলো।

আজ আরো মৃত্যুর খবর আছে? শামীম জানতে চাইল।

না। সে রকম খবর নেই। রাজশাহী বিভাগে ছিল দেশের সর্বনিম্ন টেমপারেচার। ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বনিম্ন টেমপারেচার ছিল ১২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মেরি জানালো।

ঢাকায় টেমপারেচার তো বেশি থাকবেই। চলতি সপ্তাহে বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার জনসংযোগ কর্মসূচি ছিল। তার জ্বালাময়ী ভাষণের উত্তাপে এবং জনসমাবেশে উপস্থিত জনমানুষের টেমপারেচারেই তো এখনো ঢাকার গরম থাকার কথা। সব ওয়েদার রিপোর্ট পেয়েছ? শামীম জিজ্ঞাসা করল।

প্রটোকল উপেক্ষা করে শামীম প্রায়ই এই সময়টায় যায় মেরির রুমে।

সেদিনও শামীম যখন মেরির রুমে গেল তখন সে কমপিউটার স্কৃনে ছবিগুলো দেখায় মগ্ন ছিল। নীল জিন্স, শাদা শার্ট আর একটা গোলাপি কার্ডিগান পরে ছিল সে। তাকে দেখতে সুন্দর লাগছিল। সে টেরই পেল না কখন কাচের দরজা ঠেলে শামীম তার রুমে ঢুকেছে।

মেরির আইপড ক্র্যাডল-এ খুব লো ভলিউমে বাজছিল সুদক্ষিণার গাওয়া গান।

জ্বলতে জ্বলতে পুড়ে যায়

জ্বলতে তবু মন যে চায়

ভালোবাসা রাখতে দাও

উদাসী হয়ে থাকতে দাও।

বৃন্ত কিছু মনকে যে ছুয়ে যায়

ধূপ হয়ে তবু সে জ্বলে যায়

পুড়তে পুড়তে গন্ধ হতে

রাত কেটে যে আধারে ঢেকে যায়

আধারে থাকতে দাও।

ওহ। এই গান শুনছো? তাই তো রাতের কথা বলছিলে। তুমি তাহলে নিরাশাবাদী। আধারেই থাকতে চাও? শামীম ধীরে ধীরে বলল।

মীমভাই! আমি টেরই পাইনি। লাজুক মুখে মেরি বলল। গানের ভলিউম আরো লো করে দিল।

মেরির বিপরীতে খান চারেক চেয়ার ছিল। একটিতে শামীম বসে জিজ্ঞাসা করলো, আজকের টপ স্টোরি কি দেবে ভাবছো?

রানিং স্টোরিগুলোর মধ্যে আছে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও বিএনপির দফতর সম্পাদক রিজভি আহমেদের নিজেদের অফিসে চলমান স্বেচ্ছা অবরোধ বাস। বায়তুল মোকাররমে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের প্রতি জুতাবৃষ্টির পর তার স্বেচ্ছাপলাতক জীবন। খালেদা-হাসিনার সাপতত্ত্ব। আর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। এ ছাড়া ২০১২-এর সালতামামি, ইয়ার এন্ড রিভিউ, করতে হবে। মেরি বলল।

জুতা বৃষ্টির ঘটনার টৃটমেন্ট অন্যরা কি করেছে? শামীম জানতে চাইল।

মেরি তার সামনে রাখা ফাইলগুলো দেখে বলতে থাকলো,

নয়া দিগন্তে লিড নিউজ। হেডলাইন, বায়তুল মোকাররমে নৌমন্ত্রী লাঞ্ছিত। সাবহেডিং, জুতা নিক্ষেপের মুখে পুলিশের সহায়তায় পলায়ন।

আমার দেশ-এ লিড নিউজ। হেডলাইন, নৌমন্ত্রীর ওপর জুতাবৃষ্টি। সাবহেডিং, ঢাকায় আন্তর্জাতিক কিরাত সম্মেলনে ইসলাম নিয়ে মন্তব্যের জের।

যুগান্তর-এ ফ্রন্ট পেইজে থার্ড লিড, কিরাত সম্মেলনে নৌপরিবহন মন্ত্রীর ওপর জুতা নিক্ষেপ।

ইত্তেফাক-এ ফ্রন্ট পেইজে সিঙ্গল কলাম নিউজ, বায়তুল মোকাররম মসজিদে নৌমন্ত্রী লাঞ্ছিত।

মানবজমিন-এ ব্যাক পেইজে ডাবল কলাম নিউজ, তোপের মুখে নৌপরিবহন মন্ত্রী।

প্রথম আলো-তে তৃতীয় পৃষ্ঠায় নিচের দিকে সিঙ্গল কলাম নিউজ, বায়তুল মোকাররমে নৌমন্ত্রী অপদস্থ।

কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন আর ডেইলি স্টার নিউজটা ব্ল্যাক আউট করেছিল।

আমি মনে করি এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্টোরি। মেরি বলল, বিশেষত এক দিকে মাহমুদুর রহমান ও রিজভী যখন স্বেচ্ছা অবরুদ্ধ হয়ে আছেন, অন্য দিকে তখন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান স্বেচ্ছাপলাতক হয়ে আছেন। খুব ইন্টারেস্টিং সিচুয়েশন। আমার দেশ থেকে পড়ে শোনাচ্ছি :

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রধান অতিথির বক্তব্যের এক পর্যায়ে মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ইসলাম পবিত্র ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এ ধর্ম নিয়ে রাজনীতির খেলা বন্ধ করুন। রাসুল (সা.) ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন নি। কোরআনের কোথাও ধর্মীয় রাজনীতির কথা নেই। কোরআনে এ সম্পর্কে কোনো আয়াত নেই। রাসুল (সা.) ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করতেন না। তিনি এ কাজটি কখনো করেন নি।

তখন মুসল্লিদের মধ্য থেকে একজন দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করেন এবং জানতে চান, মুসলমান হিসেবে মন্ত্রী কেন তাহলে রাজনীতি করছেন। এ সময় অন্য মুসল্লিরাও মন্ত্রীর এ কথার ব্যাখ্যা দাবি করে হইচই করতে থাকলে মন্ত্রী কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে উত্তেজিত বক্তব্য রাখলে মুসল্লিরা তাকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করতে থাকেন। এ সময় মন্ত্রীসহ অনেকের গায়ে জুতা গিয়ে পড়তে থাকে। মুসল্লিরা উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, আমরা তোমাকে চাই না, ওকে আনছেন কেন, কুত্তা এখান থেকে ভাগ।

এ সময় বৃষ্টির মতো জুতা নিক্ষেপ হতে থাকে মঞ্চে।

অবস্থা বেগতিক দেখে মন্ত্রীর নিরাপত্তাকর্মী ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লোকজন মন্ত্রীকে দ্রুত মঞ্চ থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। অতি দ্রুত তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। এ সময় পেছন থেকে মুসল্লিরা ধর ধর আওয়াজ দিতে থাকেন। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পরও মুসল্লিরা বলতে থাকেন, যে জুতা মারছে, একেবারেই রাইট কাম করছে। গালে দুইটা মারা দরকার ছিল।

এ ঘটনায় সেখানে উপস্থিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকসহ আয়োজকরা হতভম্ব হয়ে যান। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর দেখা যায় মঞ্চে বহু জুতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যেগুলো মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

এর আগে অনুষ্ঠানে শাজাহান খান আরো বলেন, বিশ্বের অনেক স্থানের চেয়ে বাংলাদেশের মুসলমানরা বেশি ধর্মপরায়ণ। শেখ মুজিব ও তার মেয়ে শেখ হাসিনাও ইসলামের অন্যতম খেদমতকারী।

বেসরকারি সংগঠন আন্তর্জাতিক কোরআন রিসাইটেশন অ্যাসোসিয়েশনের (ইকরা) উদ্যোগে আন্তর্জাতিক কিরাত সম্মেলন বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এতে বাংলাদেশ ছাড়া ইজিপ্ট, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, ব্রুনাইসহ সাতটি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জানা গেছে, অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইরান সংস্কৃতি কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা এবং ইকরার চেয়ারম্যান কারি ইউসুফ উপস্থিত ছিলেন।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মূল অংশের বাইরে পূর্ব চত্বরে বেলা তিনটা থেকে শুরু হয় এ অনুষ্ঠান। এতে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। তবে বাদ মাগরিব প্রতিযোগিতার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান।

জুতা নিক্ষেপের ঘটনার পরপরই তার সঙ্গে ইফা ডিজি চলে যান। মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর বাদ এশা ফের কিরাত প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

এ ব্যাপারে মন্ত্রী শাজাহান খান ওই অনুষ্ঠানে ঝামেলা হয়েছে উল্লেখ করে আমার দেশ-কে বলেন, এটা জামায়াতি চক্রান্ত। বহির্বিশ্বের সাতটি দেশের প্রতিনিধিদের সামনে এ ঘটনার মাধ্যমে এ দেশের মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে।

মেরি তার পড়া শেষ করল।

সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাংক আওয়ামী লীগের বড় সম্বল। ইনডিয়ার সাপোর্ট আওয়ামী লীগের বড় সহায়। এই দুটো ফ্যাক্টরকে ব্যালান্স করার জন্য আওয়ামী লীগকে প্রায়ই অযাচিতভাবে ইসলাম ভক্তি দেখাতে হয়। বিশেষত ইলেকশনের আগে তাদের ইসলামি বয়ান দিতে হয়। ইসলামি লেবাস পরতে হয়। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে ষোল বছর আগে ১৯৯৬-এ শেখ হাসিনার ফুলহাতা ব্লাউজ পরা ও মাথায় ফুল ঘোমটা দেয়া ছবিতে দোয়াপ্রার্থী লেখা পোস্টারে সারা দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। শামীম মনে করিয়ে দিল।

হ্যা। আমার দেশ-এর এই রিপোর্টে ইনট্রোর একটি শব্দ খুব তাৎপর্যপূর্ণ। মেরি বলল।

কোন শব্দটি? শামীম জিজ্ঞাসা করলো।

ইনট্রোতে লেখা হয়েছে, আন্তর্জাতিক কিরাত সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে জুতা নিক্ষেপের শিকার হন শাজাহান খান। এখানে প্রথম শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম মানে এরপরে মহাজোট সরকারের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রভৃতি মন্ত্রীও এভাবে লাঞ্ছিত হতে পারেন। আমার দেশ রিপোর্টার সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। মেরি তার মত প্রকাশ করলো।

একেই বলে নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস। মাহমুদুর রহমান ও রিজভী নিশ্চয়ই অচিরে অবরোধ মুক্ত হবেন। কিন্তু শাজাহান খান কবে পলাতক জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন? এখন কি তিনি আর পুলিশের হেভি সিকিউরিটি ছাড়া বায়তুল মোকাররমে যেতে পারবেন? শামীম বলল।

অবস্থা আরো করুণ এই জন্য যে, নিরাপদ সড়ক চাই সংস্থার নেতা, অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি সংবলিত পোস্টারের ওপর বাস-ট্রাক চালক শ্রমিকরা জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন যে সমাবেশে সেখানে উপস্থিত ছিলেন শাজাহান খান। এই মন্ত্রীই বলেছিলেন, ড্রাইভারদের গরু-ছাগল চিনলেই চলবে। দেখা যাচ্ছে সেদিন বায়তুল মোকাররমে শ্রোতারা তাকে ঠিকই চিনেছিলেন। মেরি বলল।

টেলিভিশনের টকশো-তে শাজাহান খান চোখ উপড়ে ফেলার, তথা অন্যের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়ার হুমকি দেয়ার পর তাবৎ টিভি দর্শকের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন। এখন তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম শ্রোতাদের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছেন। এরা সবাই জানতে উৎসুক তিনি কোথায় কিভাবে জীবন যাপন করছেন? ইট ইজ এ গুড স্টোরি। সঞ্জীবকে বলো পলিটিকাল লিডারদের জুতা খাওয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাস আমি চাই। শামীম বলল।

মেরির কল পেয়ে রেফারেন্স লাইব্রেরিয়ান সঞ্জীব এল পলিটিকাল লিডারদের জুতা খাওয়ার ইতিহাসের একটা পৃন্ট আউট নিয়ে।

শামীম চটপট পড়লো।

১৪ ডিসেম্বর ২০০৮। বাগদাদে একটি প্রেস কনফারেন্সে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাবলিউ বুশের প্রতি পরপর দুটি জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন ইরাকি সাংবাদিক মুনতাদির আল-জায়দি। এর পরিণতিতে তিনি গোটা আরব বিশ্বে টপ হিরো হয়েছিলেন। তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২০ ডিসেম্বর ২০০৮-এ মন্টৃয়ল ও টরন্টোতে প্রতিবাদকারীরা বুশের পোস্টারে জুতা বৃষ্টি করেছিল।

২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। ইংল্যান্ডে কেমবৃজ ইউনিভার্সিটিতে চায়নিজ প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও যখন একটি ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন তার প্রতি জুতা ছুড়েছিলেন জার্মান প্রতিবাদকারী মি. জানকে।

৭ এপৃল ২০০৯। দিল্লিতে একটি প্রেস কনফারেন্সে ইনডিয়ার অর্থমন্ত্রী পি. চিদামবরম-এর প্রতি জুতা ছুড়েছিলেন শিখ সাংবাদিক জার্নাইল সিং।

২৬ এপৃল ২০০৯। আহমেদাবাদ শহরে নির্বাচনী সমাবেশে ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর প্রতি জুতা ছুড়েছিল জনৈক ২৮ বছর বয়সী যুবক।

২৩ অক্টোবর ২০০৯। তেহরানে বিরোধী নেতা মেহেদি কারুবি-র প্রতি জুতা ছুড়ে মেরেছিল প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনিজাদ-এর সমর্থকরা।

ফেব্রুয়ারি ২০১০। স্পেনে সেভিয়া শহরে টার্কিশ প্রধানমন্ত্রী রেসেপ তাইয়েব এরদোগান-এর প্রতি কুর্দিস্তানের দাবিতে জুতা ছুড়েছিল জনৈক কুর্দি যুবক।

৭ আগস্ট ২০১০। ইংল্যান্ডে বার্মিংহাম শহরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির প্রতি জুতা ছুড়েছিল শামীম খান নামে এক যুবক।

৪ সেপ্টেম্বর ২০১০। আয়ারল্যান্ডে ডাবলিন শহরে নিজের বই প্রকাশনা উৎসবে উপস্থিত বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের প্রতি জুতা ছোড়া হয়েছিল। সঙ্গে বোনাস রূপে ছিল একটি ডিম।

১১ সেপ্টেম্বর ২০১০। গৃসের প্রধানমন্ত্রী জর্জ পাপানদ্রুর প্রতি জুতা ছোড়া হয়েছিল।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০১১। লন্ডনে একটি জনসমাবেশে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফের প্রতি জুতা ছোড়া হয়েছিল।

২৩ জানুয়ারি ২০১২। দেরাদুনে একটি জনসভায় কংগ্রেস নেতা ও এমপি রাহুল গান্ধীর প্রতি জুতা ছোড়া হয়েছিল।

জুন ২০১২। ডেগেনহাম, পূর্ব লন্ডনে প্রকাশ্য রাজপথে জনৈক বাংলাভাষী মানি লন্ডারকারী ও অসত্য তথ্য দানকারী বিচারপতি জুতা দ্বারা নির্মমভাবে প্রহৃত হন। পরবর্তীকালে ইউটিউবে সেই প্রহারের ভিডিও প্রচার হয়।

এসব নাম বিবেচনা করলে বলতেই হবে বাংলাদেশের নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গ এখন পেয়েছেন। গোপন জীবন যাপন করলেও তার আক্ষেপের কোনো কারণ নেই। তিনি এখন বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। কিন্তু এতগুলো জুতা কাদের ছিল? তারা সবাই খালি পায়ে ফিরে গেল? শামীম লিস্টটা পড়ে আত্মগতভাবে বলল।

ঘটনার পরই বায়তুল মোকাররম, পল্টনসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে নিয়মিত মুসল্লিসহ কয়েকজনকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেয়া হয়। এদের মধ্যে পুরানা পল্টন এলাকার কিছু ফুটপাথ হকারও আছে। পাচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পরেও গোয়েন্দারা কাউকে শনাক্ত করতে পারে নি। মেরি বলল।

ওরা ভুল লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ঘরে ঘরে অন্তত একটি চাকরি এনে দেবেন। তা হয়নি। বরং অনেকেই দেশে ও বিদেশে চাকরি খুইয়েছে। আমার ধারনা, জুতাগুলো ছিল ওই বেকার মানুষদের। চাকরির খোজে ওদের জুতা ও স্যানডালের তলি ক্ষয়ে গেছে। তাই সেসব শাজাহান খানের সভায় ফেলে দিতে দ্বিধা বোধ করে নি। শামীম বললো।

মীমভাই, সমস্যাটা এই যে, এরপর থেকে মহাজোটের অন্য মন্ত্রীরাও সাবধান হয়ে যাবেন। মানুষের কাছ থেকে দূরে নিরাপদে থাকতে চাইবেন। ফলে তারা আরো জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। আপনার হয়তো মনে পড়বে কিছুকাল আগে সোনারগাও হোটেলের সামনে আইনমন্ত্রীর গাড়ি আক্রান্ত হয়েছিল। এভাবে কতো দিন চলবে? মেরি বলল।

এ প্রশ্নের উত্তর মহাজোট মন্ত্রীরাই জানেন। সেকেন্ড রানিং স্টোরি খালেদা-হাসিনার সাপতত্ত্ব সম্পর্কে কি বলবে?

বুধবার ২৭ ডিসেম্বর ২০১২-তে রাজধানীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে গণসংযোগ করেন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া। তার সামনে পেছনে ছুটেছে গাড়ি, মোটরসাইকেল। মুহুর্মুহু স্লোগান মুখে দু পাশে ছুটেছে হাজার হাজার মানুষ। দীর্ঘ চল্লিশ কিলোমিটার পথ জুড়ে গণসংযোগ বহরটি সকাল এগারোটায় গাবতলী থেকে শুরু হয়ে শ্যামলী, আগারগাও, কাওরান বাজার, মগবাজার, গুলিস্তান, ধোলাই খাল, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, খিলগাও, রামপুরা, বাড্ডা হয়ে ভাটারা গিয়ে শেষ হয় রাত প্রায় নয়টায়।

এটি ছিল সুশৃঙ্খল শান্তিপূর্ণ অভিযান। কোনো জ্বালাও পোড়াও ছিল না। কোনো ভাঙচুর সংঘর্ষ ছিল না। কোনো পালটা পুলিশি হামলা ছিল না। তুলনামূলকভাবে সেদিন রাজধানীতে গাড়ির সংখ্যা ছিল কম। অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির এই নতুন দৃশ্যে নতুন রূপে আবির্ভূত হন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। সরকার ও সরকারি দলের অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের জবাব তিনি দিয়েছেন শাণিত কিন্তু শালীন ভাষায়। আবেগী কিন্তু যৌক্তিক কথায়।

প্রতিটি পথসভা রূপান্তরিত হয়েছিল জনসভায়। সাধারণ মানুষকে পল্টনে যেতে হয়নি নেত্রীর কথা শুনতে। নেত্রীই সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছেন তার কথা শোনাতে। নতুন ধরনের এই অভিযানে, তিনি দেখিয়েছেন আওয়ামী লীগ-জামায়াত নেতাদের মধ্যে অতীতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকের ছবি। প্রশ্ন করেছেন, কেন এর আগের বার ক্ষমতায় থাকার সময়ে আওয়ামী লীগ যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার করেনি। অঙ্গীকার করেছেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে বিএনপিই করবে প্রকৃত যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার। দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীসহ তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের নাম করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল দাবিতে অতীতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল আওয়ামী লীগ এবং এবার ক্ষমতায় এসে সেই আওয়ামী লীগই আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। সেটা মনে করিয়ে দিয়ে খালেদা বলেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে নয়। এসব কথা বলার পর তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহালের আহ্বান তিনি জানান সরকারের প্রতি। তিনি বলেন, অন্তত একটি ভালো কাজ করুন।

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ নেত্রীর কথা বিশ্বাস করা যায় না। তিনি শুধু মিথ্যা কথা বলেন। অশ্লীল কথা বলেন। তার কথার উত্তর আমরা দিতে পারবো না। তিনি গালাগালি করেন। এর আগের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে হাই কোর্টের ফুল বেঞ্চ বলেছিল, তিনি রং হেডেড। একজন মাথা খারাপ লোককে চেয়ারে রাখলে কেউ নিরাপদে থাকতে পারে না। পাগল দিয়ে দেশ চলে না।

খালেদা প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কিভাবে দাবি করে? তারা তো যুদ্ধ করে নি। তাদের নেতা ছিল পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। সত্যিকার রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের দল বিএনপি।

খালেদা তার সহজাত সৌজন্য, ভদ্রতা ও বিনয়ের কারণে বলেন নি, সেই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা ইচ্ছা করলে যুদ্ধক্ষেত্রের নেতা হতে পারতেন। সেটা না করে তিনি পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। অন্য দিকে তার স্বামী তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ ঘোষণার পর নয় মাস রণাঙ্গনে ছিলেন।

এসব জনসভায় খালেদা জিয়া আহ্বান জানান যুবসমাজের প্রতি। তিনি বলেন, যুবকরা জাগো, জাগো। নিজের জন্য, দেশের জন্য, তোমাদের জাগতে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হবে।

খালেদা জিয়ার এসব উক্তির পরদিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, আসলে তিনিই (খালেদা জিয়া) সাপ নিয়ে খেলছেন। সাপের ঝাপি মাথায় নিয়ে চলছেন।

এর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও পার্লামেন্ট উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, আমরা (আওয়ামী লীগ) সাপ নই। আমরা সাপ থেকে জাতিকে রক্ষা করছি। খালেদা জিয়াই সাপ ভালো চেনেন। এক সাপ আরেক সাপকে চেনে। খালেদা জিয়া সাপ ছেড়ে দিয়েছেন। এই সাপের দংশনেই তিনি ধ্বংস হবেন।

এসব বক্তব্যের প্রতি-উত্তরে বিএনপি এমপি ও পার্লামেন্ট চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, সাপের ঝাপি নয়Ñ খালেদা জিয়া মাথায় গণতন্ত্রের ঝাপি নিয়ে চলছেন। মেরি থামলো।

আসলে হাসিনা-সাজেদা-জয়নুল আবদিন ফারুক, কেউই ঠিক বলছেন না। বিএনপির চেয়ারপারসনের হেয়ার স্টাইল দেখলে সবাই একমত হবে যে অতি যতেœ তার ওই উচু করা চুলে তিনি কখনোই কোনো ঝাপি রাখবেন না। বরং সাপের ঝাপি আওয়ামী লীগ নেত্রীর ফ্যাট চুলেই মানাবে ভালো। তাছাড়া সাপের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহু পুরনো। অতীতে খন্দকার মোশতাকের জনসভায় বোমা বিস্ফোরিত হবার পরে কে বা কারা সেখানে কয়েকটি সাপ ছেড়ে দিয়েছিল। তখন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে এজন্য আওয়ামী লীগকে কেউ কেউ দায়ী করেছিলেন। সে যাই হোক। এই সাপতত্ত্ব বিষয়ে স্টোরি করতে গেলে সাপ সম্পর্কে কিছু ইনফরমেশন দিতে হবে পাঠকদের। শামীম বলল।

সেটা ভেবেই আমি একটা ফাইল খুলেছি যার নাম, যে বিশটি তথ্য আপনাকে জানতেই হবে : সাপ। দেখুন ফাইলটি। মেরি তার কমপিউটার স্কৃন দেখতে বলল শামীমকে।

থার্ড রানিং স্টোরি সম্পর্কে কি বলবে? শামীম প্রশ্ন করলো।

আওয়ামী লীগে সপ্তমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন শেখ হাসিনা এবং দ্বিতীয় বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এই কাউন্সিল অধিবেশন ছিল নিষ্প্রাণ ও নিষ্প্রভ। এই দুজনার নির্বাচিত হবার বিষয়টি আগেই জানা ছিল সবার। তবে যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বয়সের কারণে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অবসর নেয়ার কথা বলে আওয়ামী লীগ তখন সঙ্গত কারণেই কথা ওঠে শেখ হাসিনা, যিনি সাতান্ন বছর বয়সে রিটায়ার করবেন বলেছিলেন, তিনি কেন রিটায়ার করলেন না। মেরি উত্তর দিল।

আন্তর্জাতিক খবর কি? শামীম জানতে চাইলো।

টাইম ম্যাগাজিন পারসন অফ দি ইয়ার হিসেবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নির্বাচিত করেছে।

সঠিক নির্বাচন। তবে এই প্রথম টাইম পারসন অফ দি ইয়ার কভার করেছে রুপালি বর্ডার দিয়ে এবং পারসন অফ দি ইয়ারের শর্ট লিস্টে যারা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে এসেছেন তাদেরও কভার সাইজ ছবি ছেপেছে। তবে এদের ছবি ছেপেছে লাল বর্ডারে। মেরি বলল।

এরা কারা?

দ্বিতীয় স্থানে এক পাকিস্তানি স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাই। তৃতীয় অ্যাপল প্রতিষ্ঠানের সিইও টিম কুক। চতুর্থ ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুর্সি। আর পঞ্চম স্থানে পার্টিকল ফিজিসিস্ট ফেবিওলা জিয়ানটি। টাইমের মতে এই পাচজনই ২০১২-র বিভিন্ন ঘটনার ওপরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছেন। মেরি বলল।

শেখ হাসিনার নাম নেই?

না। কোথাও নেই।

শেখ হাসিনা এবারও নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন না। এবারও টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে এলেন না। ইকনমিস্টের পর এখন তিনি টাইমের ওপর খ্যাপা হতে পারেন। শামীম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার ভান করলো।

আরেকটি ইন্টারন্যাশনাল খবর হচ্ছে প্রায় আশি বছর পরে আমেরিকার দ্বিতীয় প্রভাবশালী ম্যাগাজিন নিউজউইক ৩১ ডিসেম্বর ২০১২-র ডেটলাইনে তার সর্বশেষ পৃন্ট এডিশন বের করেছে। এখন থেকে নিউজউইক আর ছাপা হবে নাÑ তবে অনলাইনে প্রকাশিত হবে। বিশ্বজুড়ে এখন পৃন্ট মিডিয়া অস্তিত্বের সঙ্কটে আছে। পৃন্ট এডিশন থেকে নিউজউইকের বিদায় তার সর্বশেষ প্রমাণ। আমেরিকায় উদার মত প্রকাশে নিউজউইক সুদীর্ঘ আশি বছর জুড়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। মেরি দুঃখ প্রকাশ করলো।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ২০১২-কে কিভাবে আখ্যায়িত করবে ভেবেছ? আগামী কাল ফ্রন্ট পেইজে কি বলবে? শামীম জিজ্ঞাসা করলো।

আপনিই বলুন মীমভাই। ২০১২-কে কোন টাইটেল দেবেন? বিচার বিভাগ দলীয়করণ ও স্কাইপ তথ্য ফাসের বছর? অথবা হলমার্ক-ডেসটিনি-পদ্মা সেতুর আর্থিক কেলেংকারির বছর? মেরি সাজেশন দিল।

দুটোই হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে ২০১২ হতে পারে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বছর। আর বিএনপি সমর্থকদের কাছে হতে পারে দেশের রাজনীতিতে বিএনপির সবলভাবে ফিরে আসার বছর। যে বিএনপি ২০০৭-এর আওয়ামী সমর্থিত সামরিক ক্যু-তে এবং ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচনে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল, সেই বিএনপির পুনরুত্থান হয়েছে ২০১২-তে। টেক ইয়োর পিক। চয়েস ইজ ইয়োর্স। তোমরাই ঠিক করো ২০১২ সালকে কিভাবে চিহ্নিত করবে। বাই দি ওয়ে, আমি জানতে চেয়েছিলাম রাতের পর কি? রাতের পর রাত? নাকি রাতের পর দিন? সেই প্রশ্নের স্ট্রেইট অ্যানসার দাও। শামীম হাসিমুখে বলল।

উত্তরটা এখন দেব না। তবে একটা গল্প বলছি। গ্রামের এক দুর্ধর্ষ আওয়ামী মাস্তানকে দেখে জনৈক হুজুর জানতে চাইলেন, কেমন আছিস? তুই কি এখন চাপাতি ছাত্রলীগ করছিস?

মাস্তান উত্তর দিল, হুজুর ভালো আছি। এখন আমি দিনের পথে আছি।

এটা কোন দিনের কথা বলছিস? দ্বীন, নাকি দিন? হুজুর আবার জানতে চাইলেন।

হুজুর, দ্বীন নয়Ñ দিন।

তার মানে?

তার মানে আগে রাতে যে দুষ্কর্মগুলো করতাম এখন সেটা দিনে করি। তবে আপনি যদি দিনের বদলে দ্বীন বলতে চান তাহলে আমার আপত্তি নেই।

বেয়াদব। তোর চরিত্র কখনোই বদলাবে না। হুজুর খেদোক্তি করলেন।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন মীমভাই, রাতের পর দিন, নাকি রাতের পর রাত চলতেই থাকবে সেটা এখন নির্ভর করছে আওয়ামী চরিত্রের ওপর। মেরি হেসে বলল।

বিশটি তথ্য : সাপ

০১. সব মহাদেশেই সাপ আছে- একমাত্র ব্যতিক্রম অ্যান্টার্কটিকা। প্রায় সব দেশেই সাপ আছে- ব্যতিক্রম তিনটি বড় দ্বীপ আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও নিউ জিল্যান্ড। এছাড়া আটলান্টিক ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে কিছু দ্বীপে সাপ নেই।

বিখ্যাত ইংরেজ থৃলার লেখক ফ্রেডারিক ফরসাইথ-এর একটি বিখ্যাত গল্পের নাম দেয়ার আর নো স্নেইকস ইন আয়ারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডে কোনো সাপ নেই।

০২. প্রায় ৩,৪০০ প্রজাতির সাপ আছে। সাপের আয়ু হতে পারে ৪০ বছর। আমেরিকায় ফিলাডেলফিয়া চিড়িয়াখানাতে পপাই নামে একটি অজগর পুরুষ সাপ ৪০ বছর ৩ মাস ১৪ দিন বেচে থাকার পর ১৫ এপৃল ১৯৭৭-এ মারা যায়। গিনেস বুকের মতে পপাই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘজীবী সাপ।

০৩. সাপ মাংসাশী। সাপের পা নেই। সাপের চোখে পাতা নেই। সাপের খুলি ও চোয়াল খুব শক্ত হয় যার ফলে কিছু সাপ তাদের চাইতে বড় প্রাণীকে গিলে খেতে পারে।

০৪ . সাপ ডিম পাড়ে তবে অধিকাংশ সাপই ডিম ছেড়ে চলে যায়।

০৫. সাপের দেহের বাইরে কান নেই। কিন্তু দেহের ভেতরে আছে।

সাপুড়েদের বাশির সুরে সাপ নাচে না। বাশির শব্দ নয়, বাশির মুভমেন্টে (এক দিক থেকে আরেক দিকে যাওয়া দেখে) সাপ আকৃষ্ট হয় এবং সেই তালে মাথা দোলায়।

০৬. ২০ নভেম্বর ১৯৯৮-এ বেবি নামে বর্মার একটি পাইথনের ওজন ছিল ১৮২.৭৬ কেজি বা ৪০৩ পাউন্ড। এই নারী সাপটির দৈর্ঘ ৮.২২ মিটার (২৭ ফিট) এবং ঘের ৭১.২২ সেন্টিমিটার (২৮ ইঞ্চি)। একে তুলতে নয় জন লাগে। এটি প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর চার থেকে পাচটি মুরগি খায়। বেবি এখন থাকে আমেরিকায় গার্নি (ইলিনয়)-র সার্পেন্ট সাফারি পার্কে।

০৭. বেশির ভাগ সাপ বিষধর নয়। তবে যেসব বিষধর তারা সেটা আত্মরক্ষার জন্য নয়Ñ তাদের শিকারকে বিষ প্রয়োগে হত্যার জন্য ব্যবহার করে। কিছু সাপ যাদের বিষ নেই তারা তাদের শিকারকে পেচিয়ে হত্যা করে।

সবচেয়ে ভারী বিষধর সাপ হচ্ছে ইস্টার্ন ডায়মন্ডব্যাক র‌্যাটলস্নেইক। দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকায় এই সাপ পাওয়া যায়। সাধারণত এদের ওজন হয় ৫.৫ কেজি থেকে ৬.৮ কেজি এবং লম্বায় হয় ৫ থেকে ৬ ফিট।

সবচেয়ে মারাত্মক বিষধর সাপ কার্পেট ভাইপার দেখা যায় পশ্চিম আফৃকা ও ইনডিয়ায়। অন্য যে কোনো সাপের চাইতে এই ধরনের সাপের ছোবলে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। এদের ছোবলের ফলে সে রক্তপাত বা হেমরেজ শুরু হয় সেটা বন্ধ করা যায় না। ট্রপিকাল আফৃকায় গ্যাবুন ভাইপার সাপের বিষদাত সবচেয়ে লম্বাÑ প্রায় দুই ইঞ্চি।

০৮. রেটিকুলেটেড পাইথন সবচেয়ে লম্বা সাপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্স-এ এই সাপ দেখা যায়। এই সাপ সাধারণত ৬.২৫ মিটার (বিশ ফিট ৬ ইঞ্চি)-এর বেশি হয়। ১৯৯২-তে ইন্দোনেশিয়াতে গুলিতে নিহত এই ধরনের একটি সাপের দৈর্ঘ ছিল ১০ মিটার (৩২ ফিট ৯.৫ ইঞ্চি)।

০৯. অনেকে বিশ্বাস করে দক্ষিণ আমেরিকার অ্যানাকনডা সাপই সবচেয়ে লম্বা। ৩৬.৫ মিটার লম্বা অ্যানাকনডার কথা শোনা গেলেও তা কখনো দেখা যায়নি।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট একবার ঘোষণা দিয়েছিলেন কেউ যদি ৯ মিটারের বেশি লম্বা অ্যানাকনডার চামড়া এনে দেখাতে পারে তাহলে তাকে তিনি ৫,০০০ ডলার পুরস্কার দেবেন। পরবর্তীকালে আমেরিকার ওয়াইল্ড লাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটি এই পুরস্কার ৫০,০০০ ডলারে উন্নীত করে। কিন্তু কেউ সে পুরস্কার নিতে আসেনি।

থ্রেড সাপ সবচেয়ে ছোট সাপ। এরা বড়জোর ১০৮ মিলিমিটার হয়।

সবচেয়ে দ্রুতগামী সাপ ব্ল্যাক ম্যামবা দেখা যায় ট্রপিকাল আফৃকাতে। সমতল ভূমিতে এই সাপ প্রতি ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২ মাইল (১৬ থেকে ১৯ কিলোমিটার) চলতে পারে।

১০. সাপের ছোবলে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় ইনডিয়া ও শ্রীলংকাতে। প্রতি বছর ইনডিয়াতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ সর্পাঘাতে আহত হয় এবং প্রায় ৫০,০০০ মানুষের মৃত্যু হতো। তবে অ্যান্টিভেনিন (Antivenin) ওষুধ আবিষ্কারের পর সর্পাঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা এখন কমে গেছে।

এশিয়ার চায়না, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও কামবোডিয়াতে এবং মধ্য-পশ্চিম আমেরিকার কিছু স্থানে মানুষ সাপ রান্না করে খায়। এশিয়ার এসব দেশের কিছু মানুষ মনে করে সাপের রক্ত, বিশেষত গোখরা সাপের রক্ত পুরুষের যৌন ক্ষমতা বাড়ায়। এরা সম্ভব হলে জীবন্ত সাপের রক্ত এক ধরনের লিকিওর (মদ)-এর সঙ্গে মিক্স করে কিছুদিন রাখার পর সেটা খায়। সাপের রক্ত মেশানো এই ধরনের একটি দামী লিকিওর হাবু সাকে।

১১. আমেরিকার আর্মি স্পেশাল ফোর্সের সৈন্যদের তাদের ট্রেইনিংয়ের সময়ে শেখানো হয় বেচে থাকার প্রয়োজনে কিভাবে সাপ ধরতে, মারতে এবং খেতে হয়। এজন্য তাদের নাম হয়েছে স্নেইক ইটার্স। ভিডিও গেইম মেটাল গিয়ার সলিড ৩ : স্নেইক ইটার-এর নামও সম্ভবত এখান থেকে এসেছে।

১২. পশ্চিমে কেউ কেউ সাপ পোষেন। এসব সাপ হতে পারে বল পাইথন ও কর্ন স্নেইক প্রজাতির। সাপ পুষতে খরচ কম হয়। জায়গা কম লাগে। ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে একবার তাদের খাওয়ালে চলে। বাংলাদেশে ঢাকার পুলিশ অফিসার আরমান একটি দক্ষিণ আমেরিকান সাপ পোষার বর্ণনা লাল গোলাপ টিভি অনুষ্ঠানে দিয়েছিলেন।

১৩. চায়নিজ ক্যালেন্ডারে যে রাশিচক্র আছে তার বারোটি পশু-প্রাণীর মধ্যে একটি সাপ।

১৪. ইনডিয়াতে একটি ধারণা আছে, কিছু সাপের মনি আছে যা হীরার চাইতেও উজ্জ্বল। তাদের এই ধারণা ভুল। সাপের মনির লোভে ইনডিয়াতে অনেকের মৃত্যু হয়।

১৫. হিন্দু ধর্ম ও পূজার একটি বিশেষ অংশ জুড়ে আছে সাপ। প্রতি বছর নাগ পঞ্চমী-তে সাপের মূর্তি অথবা জীবন্ত সাপ পূজা করা হয়। শিবের অনেক মূর্তিতে তার গলায় সাপ পেচানো দেখা যায়।

১৬. প্রাচীন গৃসে সাপকে নিরাময়কারী প্রাণী রূপে দেখা হতো। এসলিপিয়াস তার লাঠিতে সাপ পেচিয়ে রাখতেন যেটা এখনো পশ্চিমের কিছু ফার্মাসি ও অ্যাম্বুলেন্সে আকা থাকে।

১৭. কৃশ্চিয়ান ধর্মে সাপকে মন্দ এবং চক্রান্তকারীরূপে দেখা হয়েছে। এই ধর্মের মতে গার্ডেন অফ ইডেন বা স্বর্গোদ্যানে বিশ্বের প্রথম যুগল, আদম ও ইভ-কে সাপই প্ররোচিত করেছিল টৃ অফ নলেজ বা জ্ঞানবৃক্ষ থেকে ফরবিডেন ফ্রুট বা নিষিদ্ধ ফল পেড়ে খেতে।

১৮. ইজিপ্টের ইতিহাসে জানা যায়, প্রাচীন সময়ে ফেরাউনরা তাদের মুকুটে নীল নদের গোখরা সাপ রাখতেন। সাপকে তারা অন্যতম দেবী মনে করতেন। ইজিপ্টের বিখ্যাত রানী ও সুন্দরী কিওপাট্রা এ রকমই একটি গোখরা সাপের ছোবলে আত্মহত্যা করেছিলেন।

১৯. সারা বিশ্বের জনপ্রিয় বোর্ড গেইম স্নেইকস অ্যান্ড ল্যাডার্স বা সাপ লুডো আবিষ্কৃত হয়েছিল প্রাচীন ইনডিয়াতে। বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ১৮৯২ সালে এটি চালু করে ইংল্যান্ডে এবং পরে এটি চালু হয় গোটা ইওরোপ ও আমেরিকায়। ইনডিয়াতে মনে করা হতো মানুষের জীবনের চলার পথের প্রতীকী রূপ ধারণ করে এই খেলার বোর্ড যেখানে জীবনের উত্থান ও পতন নির্ধারিত হয় মানুষের গুণাবলি (মই) এবং দোষ (সাপ) দ্বারা।

২০. ত্রয়োদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দির মধ্যে বাংলা ভাষায় যেসব মনসামঙ্গল উপকথা লেখা হয়েছিল তাতে হিন্দু দেবী মনসা বা সাপ দেবীর ব্যাপক উল্লেখ আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনী বেহুলা। চম্পকনগরের চাদ সওদাগরের ছেলে লক্ষ্মীন্দরের সঙ্গে বেহুলার বিয়ে এবং ভালোবাসার বিষয়ে এই ইউনিক স্টোরির ঘটনাস্থল বগুড়া শহরের উপকণ্ঠে। বিয়ের রাতে লক্ষ্মীন্দরের মৃত্যু হয়েছিল কালনাগিনীর ছোবলে। কিন্তু বেহুলার ভালোবাসা ও সাধনার ফলে লক্ষ্মীন্দর প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন।

(নয়া দিগন্ত, ০১/০১/২০১৩)

Keywords: