নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প প্রসঙ্গে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প প্রসঙ্গে

Wednesday 16 January 2013, বদরুদ্দীন উমর Print

জাপানের ফুকুশিয়ায় পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে দুনিয়াজুড়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে। এ ভাবনা-চিন্তা প্রকৃতপক্ষে নতুন না হলেও এই দুর্ঘটনার পর এর গুরুত্ব এখন আগের যে কোন সময়ের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ, পারমাণবিক দুর্ঘটনা মানুষ ও প্রকৃতিকে যে আকারে ও যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অন্য কোন মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনাই সেটা করে না। এর দৃষ্টান্ত ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ২০১১ সালে জাপানের পারমাণবিক দুর্ঘটনার সময় দেখা গেছে।

২০১১ সালে ফুকুশিয়ায় পারমাণবিক দুর্ঘটনার পরে জাপান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে সংকুচিত করে তা পরিশেষে একেবার বন্ধ করার চিন্তা এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। জার্মানি এ ক্ষেত্রে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত গুটিয়ে নিয়ে যথাসম্ভব শিগগির বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এর জন্য বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা তারা নির্ধারণ করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ এ বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত না নিলেও সেখানে সচেতন জনগণ এবং অনেক বিশেষজ্ঞ পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার পক্ষে চিন্তাভাবনা করছেন, কথাবার্তা বলছেন। এ নিয়ে লেখালেখিও হচ্ছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে এখনও পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার শুরু হয়নি, সেখানে তা শুরু করতে যাওয়া যে এক বিপজ্জনক এবং উদ্ভট সিদ্ধান্ত, এ বিষয়ে দ্বিমত থাকার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এর অর্থ, যে বিপদ এখানে নেই, সেই বিপদকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় সম্পদ ব্যয় করে দেশের মাটিতে হাজির করা। এই কাজ করার প্রতিশ্র“তি আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়েছিল। এটাই তাদের একমাত্র প্রতিশ্র“তি ছিল না। তাদের প্রতিশ্র“তি অসংখ্য ছিল। যেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রতিশ্র“তি কার্যকর করার ধারেকাছেও বর্তমান সরকার এদের মেয়াদকালের চার বছরে যায়নি। কিন্তু এই সরকারের মেয়াদ আর মাত্র এক বছর থাকার সময় তারা পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কর্মসূচি কার্যকর করার জন্য বড়ই ব্যস্ত হয়েছে। এ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি কিছুদিন থেকে আলোচনা করার পর এখন তা চূড়ান্ত করা এবং তাতে স্বাক্ষর করার জন্য প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া যাচ্ছেন। ইতিপূর্বে সরকার রাশিয়ার মাধ্যমে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ভবধংরনরষরঃু ংঃঁফু) জন্য। এই রিপোর্ট তৈরির কাজ এখনও শেষ হয়নি। তার আগেই তাড়াহুড়ো করে বিশাল ব্যয়সাপেক্ষ রূপপুর পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে যত বড় বড় প্রকল্পের কাজ হয় তার প্রত্যেকটির সঙ্গেই দুর্নীতি জড়িত থাকে। পদ্মা সেতুসংক্রান্ত দুর্নীতি এর একটা বড় প্রমাণ। এখন রূপপুরে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের জন্য যে প্রকল্প সরকার গ্রহণ করেছে, এর সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক আছে কি-না, এটা দেখার প্রশ্ন অযৌক্তিক অথবা অবহেলার বিষয় নয়। এখানে আরও যে প্রাসঙ্গিক ব্যাপারটি বিবেচনার দরকার তা হল, কোন কারণে যদি শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প কার্যকর না হয়, তাহলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য যে ৫০ কোটি ডলার ইতিমধ্যেই ঋণ নেয়া এবং ব্যয় করা হয়েছে সেটা পরিশোধের ব্যবস্থা কিভাবে হবে? চুক্তির আগেই তড়িঘড়ি করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য খুব উচ্চ হারে এই বিপুল ঋণ এবং এই ব্যয়ও এক সন্দেহজনক ব্যাপার। (Nuclear Power : Think before we leap, Abdul Matin, Former Chief Engineer, Bangladesh Atomic Energy Commission, Daily Star, 13.1.2013)|

আমরা রূপপুরের মতো ঘন বসতিপূর্ণ এবং নদীর একেবারে পার্শ্ববর্তী এলাকায় পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করে লেখালেখি করেছি। এ দুই কারণেই নয়, ফুকুশিয়ায় পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর এ বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে আমরা বাংলাদেশের যে কোন জায়গায় পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের বিরোধিতা করেছি। কারণ, আগেই বলেছি, যে বিপদের মধ্যে এখনও আমরা বাস করি না, সে বিপদ নতুন করে ডেকে আনা এক অতি অযৌক্তিক ব্যাপার। এ ধরনের কাজ মোটেই অনুমোদনযোগ্য নয়। কিন্তু যুক্তির অনুমোদিত কাজ করার জন্য বর্তমান সরকার বিখ্যাত নয়। উপরন্তু তার উল্টো নানা ধরনের কাজ করতেই এরা অভ্যস্ত। যুক্তির মাথার ওপর দিয়ে কেন এরা এভাবে কাজ করে, এটাও কোন গবেষণার বিষয় নয়। এর কারণও সবার জানা।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, রূপপুরে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য একাধিক জরিপ কাজ রূপপুর-ঈশ্বরদী অঞ্চলে হয়েছে। দেখা গেছে, সেখানকার বিপুল অধিকাংশ মানুষ এ প্রকল্পের বিরোধী। এই বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার তাদের পারমাণবিক প্রকল্প রূপপুরে স্থাপন করতে বদ্ধপরিকর। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ঈশ্বরদী-রূপপুর অঞ্চলে যে কোন সভা-সমিতি, মিছিল ও বিক্ষোভ দমন করার জন্য সরকার পুলিশ ব্যবহার করছে। পুলিশ এসব নিষিদ্ধ করছে এবং তাদের নিষেধ সত্ত্বেও কোন সংগঠন থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে দাঁড়ালেই পুলিশ নিজের শক্তি প্রয়োগ করে তা ছত্রভঙ্গ করছে। বাংলাদেশ সরকার জনগণের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তাদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্র“তিগুলো পালন করা থেকে বিরত থাকলেও জনগণের প্রতিরোধের মুখে রূপপুরে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র স্থাপনের জন্য এত ব্যগ্র ও ব্যস্ত কেন, এটাই ভেবে দেখার বিষয়। তবে বাংলাদেশে দুর্নীতি যেভাবে সরকারের প্রত্যেক কাজের ক্ষেত্রে একটা নির্ধারণী ভূমিকা পালন করে, সেখানে এ ক্ষেত্রেও তার সম্ভাবনা বাতিল করার উপায় নেই।
১৩.১.২০১৩
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

(যুগান্তর, ১৬/০১/২০১৩)

Keywords: ,