নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় গণতন্ত্রের সংকট

আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় গণতন্ত্রের সংকট

Tuesday 1 January 2013, বদরুদ্দীন উমর Print

অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মিটিং শেষ হলো। যেসব শব্দ এখন শাসকশ্রেণীর খাতায় তোলা হয়েছে সেই অনুযায়ী এই কাউন্সিলের কয়েকদিন আগে থেকেই তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল যে, এবারকার কাউন্সিল মিটিংয়ে অনেক ’চমক’ সৃষ্টি হবে! কিন্তু বাস্তবত কোনো ’চমক’ দেখা গেল না। উপরন্তু যা দেখা গেল সেটা শুধু দেশের শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই নয়, আওয়ামী লীগের নিজস্ব দলীয় স্বার্থের ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় কোথাও যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে কিছু নেই এটা কাউকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। যে কোনো সাধারণ বুদ্ধি ও চেতনাসম্পন্ন লোকই দেশের অবস্থা ও দেশ পরিচালনা পদ্ধতির দিকে তাকালেই এটা বোঝার কোনো অসুবিধা হবে না। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মিটিংয়েও এটা ভালোভাবেই প্রমাণিত হলো।

শাসকশ্রেণীর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগে যে কোনো অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই, এটা তাদের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় বেশ স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়েছে।

যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করতে অপারগ বা পরান্মুখ তাদের অধীনে দেশের শাসন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত হবে, এটা মনে করা অবাস্তব। কাজেই বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই যে, স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও এ দেশে গণতন্ত্র নয়, স্বৈরতন্ত্রই বিরাজ করছে।

এসব কথা বলার কারণ এই যে, সদ্য সমাপ্ত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভায় কিছু বস্তাপচা কথাবার্তা, বিরোধী দলের প্রতি রুটিন কায়দায় বিষোদ্গার এবং দেশ দুধ-মধুতে ভেসে যাচ্ছে, জনগণ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন, এই ধরনের কিছু বাগাড়ম্বর ছাড়া দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও সংকটজনক পরিস্থিতির ওপর কোনো আলোচনাই হয়নি। এদের অবস্থা দেখে মনে হয়, এরা এ ধরনের কোনো আলোচনা-পর্যালোচনার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে।

২৯ ডিসেম্বরের অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা ছিল নির্বাচন। শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী এবং তিনি তার পছন্দমতো সাধারণ সম্পাদক ঠিক করে তার নাম প্রস্তাবের ব্যবস্থা করেছেন। তার মনোনীত প্রার্থী যথারীতি কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। বাত কি বাত হিসেবে হাসিনা বলেছেন, তিনি সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ করে সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা ও সাংগঠনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন! এসব বিষয়ে তিনি আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে কী আলোচনা ও পরামর্শ করবেন তিনিই জানেন। যারা হুকুম তামিল করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের কথা যে একটা ভুয়া ব্যাপার এতে সন্দেহ নেই।

আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভার যে বিষয়টি সব থেকে উল্লেখযোগ্য তা হলো, উপরোক্ত দুই পদ ব্যতীত অন্য কোনো পদে নির্বাচন না হওয়া। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নয়, অনেক পদেই নির্বাচনের নির্দেশ আছে। এ দু’জন ছাড়া কোষাধ্যক্ষ, সভাপতিমণ্ডলীর ১৩ জন সদস্য, ৩ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ ৩১ জন সম্পাদক, ৭ জন সাংগঠনিক সম্পাদকও কাউন্সিল সভায় নির্বাচিত হওয়ার কথা।

কেন্দ্রীয় কমিটির ২৬ জন সদস্য সভাপতি কর্তৃক মনোনীত হওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও বাকি সদস্যদের কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার কথা। এই পদগুলোর কোনোটিতেই নির্বাচন হয়নি! যে খণ্ড নির্বাচন কাউন্সিলে অনুষ্ঠিত হয়েছে তার আগে সভাপতি শেখ হাসিনা পুরাতন কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়েছিলেন নিয়ম অনুযায়ী। কিন্তু তারপর নিয়ম অনুযায়ী কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হয়েই নির্বাচন পর্ব সমাপ্ত করা হয়েছে। সমাপ্তি টানার আগে কাউন্সিল নির্বাচনের প্রধান কমিশনার উপস্থিত কাউন্সিলদের জিজ্ঞেস করেন, তারা বাকি সব পদের জন্য নির্বাচন করতে চান, না এগুলো পূরণ করার জন্য সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা দিতে চান! এর জবাবে কাউন্সিলররা শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে ক্ষমতা প্রদান করার পক্ষে রায় দেন!

বলাবাহুল্য, কাউন্সিলরদের উপরোক্ত বিষয়ে এভাবে জিজ্ঞেস করার প্রেরণা ও নির্দেশ সভাপতির কাছ থেকে লাভ করেই তিনি এই সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্য পদগুলো পূরণ করার সম্মতি কাউন্সিলরদের থেকে আদায় করেন। এই প্রক্রিয়া শুধু অগণতান্ত্রিক নয় খোদ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রবিরোধীও বটে। কারণ তাদের গঠনতন্ত্রে নির্বাচনের কথা আছে, এভাবে কাউন্সিলরদের দ্বারা সভাপতিকে ক্ষমতা প্রদানের কোনো ব্যবস্থা তাতে নেই। এখানে বলা দরকার, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় ঠিক এ কাজই করা হয়েছিল। এবার তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে মাত্র। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা দরকার, শাসকশ্রেণীর অন্যতম প্রধান দল হিসেবে এটা শুধু আওয়ামী লীগেরই বিশেষত্ব নয়। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলেও এই একই কাজ করা হয়েছিল। খালেদা জিয়া সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার ওপরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অন্য পদগুলো পূরণের!

আপাতদৃষ্টিতে এ দুই দলের কাউন্সিল সভাতে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিভিন্ন পদ পূরণ না করে সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সভাপতির হাতে এই ক্ষমতা অর্পণ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। কারণ, তারা এ পদগুলোর জন্য প্যানেল তৈরি করে সেটা ভোটে দিলে তা সহজেই পাস হয়ে যেত। যে কাউন্সিল কোনো উচ্চবাচ্য না করে সভাপতির হাতে অন্য সব পদ পূরণ করার একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে, তাদের থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য বা গ্রাহ্য বিরোধিতা এ ক্ষেত্রে আসার সম্ভাবনা নেই। দু’একজন হয়তো কোনো কোনো প্রার্থী সম্পর্কে আপত্তি জানাতে পারে। কিন্তু সে আপত্তির নিষ্পত্তি যে উপায়েই হোক, সভাপতির পক্ষে নিষ্পত্তি করা কোনো অসুবিধার ব্যাপার নয়। কিন্তু সেভাবে নিষ্পত্তি অসুবিধার ব্যাপার না হলেও দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া কেউই কোনো ধরনের অন্য মত শোনার মতো অবস্থায় নেই। তাদের অহমিকা তুঙ্গে। পরমতসহিষ্ণুতার মানসিকতা তাদের নেই।

কিন্তু এখানেই ব্যাপারটির শেষ নয়। এটা যদি শুধু দুই দলের শীর্ষ নেতার মানসিকতা হতো তাহলে সেটা সহজেই চুকে যেত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংকট অনেক গভীরে। কারণ দুই নেত্রীর মানসিকতা যাই হোক, সমাজে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা, গণতন্ত্রের সত্যিকার চর্চা যদি শিকেয় না উঠত তা হলে তাদের নিজেদের মানসিকতা এরকম হলেও সেটা হালে পানি পেত না। তার কোনো সখ্য ও মান্যতা থাকত না। কাজেই এ ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ নেতার সর্বময় কর্তৃত্বের মানসিকতার ভিত্তি রচিত হয়েছে অন্যদের হুকুমবরদারির মানসিকতা থেকে। এই হুকুমবরদারির মানসিকতা তৈরি হয়েছে হীন স্বার্থ চিন্তা দ্বারা। যারা এই দুই দলের কাউন্সিলর হিসেবে এসে সভাপতিকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করে যথেচ্ছ কর্তৃত্বের অধিকারী করেন তাদের প্রশংসার কিছু নেই। তারা নিজেদের প্রাপ্তির হিসাব কষেই এভাবে দলে গণতন্ত্র চর্চা থেকে বিরত থাকে। তারাই শাসকশ্রেণীর বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি।

নিঃসন্দেহে যে কোনো সমাজ ও দেশে এই পরিস্থিতি সংকটজনক। কিন্তু শুধু শাসকশ্রেণীর বিন্যস্ত ক্ষমতার মধ্যেই যে এই সংকট সীমাবদ্ধ আছে তা নয়। এই সংকট সমাজের আরও গভীর দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এখন সরকারের নানা গণবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কিছু বিক্ষিপ্ত ও খণ্ড খণ্ড প্রতিরোধ দেখা গেলেও সমাজের ব্যাপক ক্ষেত্রে আত্মস্বার্থ সম্পন্ন প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনীতির ক্ষেত্রেও এক প্রবল প্রতিবন্ধক।
৩১.১২.২০১২

বদরুদ্দীন উমর :সভাপতি
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

(সমকাল, ০১/০১/২০১৩)

Keywords: