নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > ধাপ্পাবাজির নদী রক্ষা কমিশন

ধাপ্পাবাজির নদী রক্ষা কমিশন

Thursday 10 January 2013, বদরুদ্দীন উমর Print

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন অ্যাক্ট, ২০১৩ গঠনের জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিসভার ৭ জানুয়ারির এক বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী চার নদীসহ দেশের শত শত নদী ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা ও দখলমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা যারা বোধ করেন তাদের মনে এই ধরনের একটি সরকারি কমিশন গঠনের কথা শোনার পর যে আশার সঞ্চার হয়েছিল সরকারি প্রস্তাবটির বিবরণ প্রকাশিত হওয়ার পর সে আশা ভঙ্গ হয়েছে। যা আশা করা বোকামি সেটা আশা করলে এই ধরনের আশা ভঙ্গ হওয়া স্বাভাবিক। নদী রক্ষা চেষ্টার নামে সরকার যে কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে এবং যে কমিশন তাদের দ্বারা গঠিত হতে যাচ্ছে সেটা যে এক মহাধাপ্পাবাজি এটা এখন স্পষ্ট।

দেখা যাচ্ছে যে, এই কমিশনের হাতে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষমতা থাকছে না! এরা হবে শুধু সুপারিশ করার মালিক!! নদী রক্ষার জন্য সরকারের দায়িত্ব নির্দেশ করে ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই হাইকোর্ট এমন একটি নদী কমিশন গঠনের আদেশ দিয়েছিল যার হাতে নদী রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিহিত থাকবে। যেভাবে এখন মন্ত্রিসভা তাদের প্রস্তাবিত নদী রক্ষা কমিশনকে শুধু একটি সুপারিশকারী সংস্থা হিসেবে গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা উপরোক্ত হাইকোর্ট আদেশের সম্পূর্ণ বরখেলাপ। এই কমিশনের কাজ হবে শুধু সরকারকে পরামর্শ দেয়া এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিসভার কাজের মধ্যে সমন্বয় করা! (Daily Star, 8.1.2013)
মোটা দাগে এই জাতীয় কমিশনের কাজ হবে নদী দখল, নদীর পানি দূষিতকরণ এবং নদীর দায়িত্বহীন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের আইনি পদক্ষেপের ব্যাপারে সহায়তা প্রদান করা।

নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনার জন্য এরই মধ্যে দফায় দফায় ১৪টি কর্তৃপক্ষ ও এজেন্সি গঠিত হয়েছে এবং সেগুলো বিদ্যমান আছে। এগুলোর হাতে সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কোনো ক্ষমতা না থাকায় এবং এগুলোর ভূমিকা শুধু পরামর্শ দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় এগুলোর দ্বারা নদী দখল, নদীর পানি দূষিতকরণ এবং নানাভাবে নদীর অপব্যবহার রোধের ক্ষেত্রে কিছুই হয়নি। দখলকারী ভূমিদস্যুরা দেশের অন্য অঞ্চলে তো দূরের কথা, ঢাকার পার্শ্ববর্তী চার নদী অবাধে দখল করে চলেছে এবং শিল্প মালিকরা এই নদীগুলোতে নিয়মিত বেপরোয়াভাবে বর্জ্য পদার্থ নিক্ষেপ করে নদী এমনভাবে দূষিত করছে যা ঢাকাবাসীর জন্য পরিণত হয়েছে সবদিক দিয়ে এক বিপজ্জনক ব্যাপারে। বাংলাদেশের নদীগুলো যে শুধু উত্তরোত্তরভাবে অব্যবহার্য হচ্ছে তাই নয়, ৯৭টি এরই মধ্যে পরিণত হয়েছে মৃত নদীতে।

২০০৯ সালে দস্যুদের দ্বারা নদী দখল হতে থাকার মুখে হাইকোর্ট সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল নদীগুলোর সীমানা ঠিক করে সেই সীমানা বরাবর খুঁটি পুঁতে সীমানা চিহ্নিত করতে। কিন্তু সরকারি লোকদের দুর্নীতির কারণে তারা দস্যুদের থেকে টাকা খেয়ে এমনভাবে নদীর সীমানা চিহ্নিত করেছিল যাতে দস্যুদের জবরদখল রক্ষিত হয়। ঢাকার পার্শ্ববর্তী নদীগুলোর ক্ষেত্রে এইভাবে জরিপ কাজ চালিয়ে দস্যুদের স্বার্থই সরকারিভাবে রক্ষার ব্যবস্থা হয়েছিল। এ কারণেই দেখা যায় যে, হাইকোর্ট এ ব্যাপারে যত আদেশই দিয়ে যাক, সেগুলো কাগুজে ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই দাঁড়ায় না। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যেভাবে নতুন একটি নদী রক্ষা কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেছে এবং তা গঠন করতে যাচ্ছে সেটা জনগণকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে একটা ধাপ্পাবাজির কমিশন ছাড়া আর কিছুই নয়। এর দ্বারা পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনাই নেই।

এটা বোঝার অসুবিধা নেই যে, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোসহ বাংলাদেশের কয়েকশ’ নদী ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকার কর্তৃক দৃঢ় এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ কিছু হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু এটা আবার বোঝার কোনো অসুবিধা নেই যে, সরকার এই ধরনের কোনো কাজে মোটেই আগ্রহী নয়। উপরন্তু যেভাবে নদীগুলো দখল হয়ে সারাদেশ ও জনগণের জন্য সঙ্কট সৃষ্টি করছে সে সঙ্কট আরও ব্যাপক ও গভীর করতেই সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিদস্যুদের সহায়তা করছে। এটা শুধু আওয়ামী লীগেরই বিশেষত্ব নয়। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর লুণ্ঠনজীবী চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই শ্রেণী কাঠামোর অন্তর্গত হয়ে লুণ্ঠনজীবী চরিত্র সম্পন্ন হওয়ার কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার এখন জনগণ ও পরিবেশবাদীদের ধাপ্পা দেয়ার জন্য নতুন করে এই নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেছে। নদী দখল ক্ষেত্রে দস্যুদের সহায়তা বিএনপিসহ শাসক শ্রেণীর সব দলই ক্ষমতায় থাকার সময় করেছে, যেভাবে এখন আওয়ামী লীগ সরকার করছে।

ভারতের বৈরী আচরণের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো পানির অভাবে এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার ওপর এখানকার ভূমিদস্যুরা সরকারের সহায়তায় যেভাবে নদীগুলো দখল করে তাদের প্রস্থ কমিয়ে এনে সঙ্কীর্ণ করছে, যেভাবে নদীর পানি শিল্প মালিকরা বর্জ্য নিক্ষেপ করে দূষিত করছে, তাতে দেশের কৃষি ও পানীয়জলের ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতেই এমন সঙ্কট সৃষ্টি হতে যাচ্ছে যার সমাধানের কূলকিনারা পাওয়ার উপায় থাকবে না। হাজার রকম সমস্যায় জর্জরিত জনগণের জীবন এই সঙ্কটের দ্বারা কোথায় দাঁড়াবে এটা এক মহা ভাবনার বিষয়। কিন্তু এই ভাবনার সময় শাসক শ্রেণীর লুণ্ঠনজীবীদের নেই।

লুণ্ঠনমত্ত অবস্থায় এরা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। বলাই বাহুল্য যে, এই দস্যুরা শুধু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত তাই নয়, এরা সরকারেরই লোক। তাদেরই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব। সেটা না হলে সরকার এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে কোনো অর্থপূর্ণ ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে তাদের দখল ও লুণ্ঠন কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নদী রক্ষা কমিশন গঠনের কথা বলে জনগণকে ধাপ্পা দেয়ার ব্যবস্থা করত না। একদিকে তারা জনগণের চাপের মুখে এক্ষেত্রে একটা কিছু করা দরকার মনে করছে, কিন্তু যেহেতু তারা নিজেরাই এই লুণ্ঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত ও এই কাজের সহায়ক এজন্য তারা কোনো প্রকৃত পদক্ষেপও এক্ষেত্রে নিতে অনিচ্ছুক। এই অবস্থায় তারা যা করেছে এটাই স্বাভাবিক। জনগণকে ধাপ্পা দেয়ার একটা উপায় হিসেবেই তারা গঠন করতে যাচ্ছে একটি নতুন নদী রক্ষা কমিশন। এই নখদন্তহীন কমিশন দিয়ে যে কার্যক্ষেত্রে কিছুই হবে না এটা বোঝার অসুবিধা কারও নেই।

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর সব থেকে পুরনো, অভিজ্ঞ ও ধূর্ত দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তার শাসন পরিচালনা করছে। একাজ করতে গিয়ে সাধারণ বুর্জোয়া নৈতিকতার কোনো স্বাক্ষরও তারা কোথাও রাখছে না।

যেভাবে তারা নানা মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে, বেপরোয়া কথাবার্তা বলে যাচ্ছে, তা এমন ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার পরিচায়ক, যে স্বেচ্ছাচারিতা পরিপকস্ফ বুর্জোয়া সমাজে সম্ভব নয়। এর সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে নিকৃষ্ট, সামন্ততান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতারই সাদৃশ্য। বাংলাদেশে এখন এই সংস্কৃতি ও এই স্বেচ্ছাচারিতাই চলছে। এই স্বেচ্ছাচারিতা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের নানা স্বৈরতান্ত্রিক কার্যকলাপের মধ্যে স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে তাদের সর্বশেষ নদী রক্ষা কমিশন যেভাবে গঠিত হয়েছে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশের সব প্রশাসনিক কার্যকলাপ এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।

লেখক : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

(আমার দেশ, ১০/০১/২০১৩)

Keywords: