নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > সিরাজুর রহমান > তুরস্কের বিরুদ্ধে ফাঁকা শেলের তোপ দাগার পেছনে

তুরস্কের বিরুদ্ধে ফাঁকা শেলের তোপ দাগার পেছনে

Wednesday 2 January 2013, সিরাজুর রহমান Print

শুধু সরকারি খাজাঞ্চিখানাই নয়, দেশের যেখানে যেখানে এবং যার যার কাছে কিছু সম্পদ আছে, সবকিছু শুষে নিচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার আর তার আওয়ামী লীগ। ভেজা গামছা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে এবং চিপে চিপে যেমন পানিশূন্য করা হয়, দেশটাকে ঠিক সে রকম করেই শোষণ করা হচ্ছে। মনে অবশ্যই করতে হয়, উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধীরা, বিশেষ করে তাদের জাতশত্রু বিএনপি যদি কোনোমতে ক্ষমতা পায়ও, অর্থকষ্টে তাদের যেন নাকের পানি, চোখের পানিতে একাকার দশা হয়। ইতিহাসে অজস্র দৃষ্টান্ত আছে, পরাজিত বাহিনী পিছু হঠার কিংবা আত্মসমর্পণের আগে মাটি পর্যন্ত সবকিছু পুড়িয়ে দিয়ে যায়, যাতে শত্রুপক্ষ কোথাও ব্যবহারের উপযোগী কিছু না পায়।

বিস্তারিত বলার দরকার নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের এ শোষণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল শেয়ারবাজার থেকে। তারপর বিনা টেন্ডারের কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্, ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কোম্পানির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের টাকা লুট ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত না করে পারা যায় না। পদ্মা সেতু প্রকল্পে পুকুর চুরি করতে গিয়ে তারা ধরা পড়ে গেছে বিশ্বব্যাংকের কাছে। এই সরকার এখন বিশ্বচোর হিসেবে পরিচিত হচ্ছে বিশ্বময়। মহাচোর সৈয়দ আবুল হোসেন আর আবুল হাসান চৌধুরীর পিঠের চামড়া বাঁচাতে সরকারের সব মহলের কী আপ্রাণ চেষ্টা! এখন আর কারও বুঝতে বাকি নেই, এ চুরি হয়েছিল হাইকম্যান্ডের তরফে, প্রক্সিতে। এঁদের বিচার হলে কালবাউশেরা ধরা পড়ে যাবে, হাইকম্যান্ডের হাতে দড়ি পড়বে।

সে রকমই আরও একটা মারাত্মক কাজ করে এসেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে এ সরকার। তারা বিশ্বসমাজে বন্ধুহীন, অসহায় করে ফেলেছে বাংলাদেশকে। এ সরকারের আমলে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি, বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যার খুবই সোচ্চার প্রতিবাদ করেছে বিশ্বসমাজ। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে ইউরোপ-আমেরিকার সংসদে বহু বিবৃতিদান ও প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার তাতে কর্ণপাত করার মতো সৌজন্যও দেখায়নি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেটা শেখ হাসিনার সহ্য হয়নি। বদ মেজাজি শিশু যেমন নিজের বিষ্ঠার ওপর গড়াগড়ি করে, উলটি-পালটি খায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ড. ইউনূসকে ‘শাস্তি’ দিতে গিয়ে নিজেকে হাস্যাস্পদ, ছ্যাবলা সাব্যস্ত করেছেন, বিদেশি মিত্রদের অসম্মান করেছেন, অপমান করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বহুবার টেলিফোন করেছেন শেখ হাসিনাকে, সামনা-সামনি অনুরোধ করতে ঢাকা পর্যন্ত এসেছিলেন। একই রকম অনুরোধ হাসিনাকে করেছেন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নেতারা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতর-বাইরের পশ্চিমা নেতারা।

তাদের ‘শান্তির ললিত বাণী’ বাংলাদেশের একগুঁয়ে প্রধানমন্ত্রীর কানে ‘ব্যর্থ পরিহাসে’ পরিণত হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে পোড়ামাটি নীতি
দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সাহায্যের প্রয়োজন ছোট-বড় সব দেশেরই হতে পারে। তার ওপরও বিশ্বসমাজে উচ্চ আসন পেতে হলে যত বেশি সম্ভব দেশের বন্ধুত্ব এবং সাহায্য-সহযোগিতা পেতেই হয়। মোটকথা, অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক আধুনিক বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যথায় ক্ষুদ্রতম এবং দরিদ্রতম দেশগুলোও বিপুল অর্থ ব্যয় করে ভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করত না।
বাংলাদেশের জন্য এ সম্পর্ক জীবন-মরণের ব্যাপার অর্থনৈতিক কারণে। বাংলাদেশের তিন-চার কোটি মানুষ বিদেশে কর্মরত আছেন। তারা সবাই ফিরে এলে সবার দাঁড়ানোর স্থান নিয়েও সমস্যা হবে, চাকরি-বাকরির অভাবে বেকাররা সরকারের গায়ের মাংস ছিঁড়ে খাবে। তার ওপর সম্পদের অভাব। দেশের অর্থনীতি কোনোমতে পানির ওপর নাক ভাসিয়ে রেখেছে এবং প্রধানমন্ত্রী ও তার মাকাল ফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘন ঘন ফুটানির বিদেশ ভ্রমণ করতে পারছেন প্রবাসী শ্রমিকদের হাড় পানি এবং জীবন বিপন্ন করা শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অর্থের ‘রেমিট্যান্সের’ কল্যাণে।

পৃথিবীর ৭৮টি দেশে এখন কর্মরত আছেন বাংলাদেশী শ্রমিকরা। সেসব দেশের সঙ্গে স্বদেশের সুসম্পর্ক তাদের মঙ্গলামঙ্গলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশী শ্রমিকদের একটা বড় অংশ কাজ করেন মধ্যপ্রাচ্যে এবং অন্যত্র মুসলিম দেশগুলোতে। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় সিকি ভাগ মুসলমান এবং আধুনিক বিশ্বে প্রভাব ও মর্যাদা পেতে হলে দল ও গোষ্ঠী গঠন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম মুসলিম দেশগুলোকে একটা স্বাভাবিক সুবিধা করে দিয়েছে। মুসলিম দেশগুলো সে কারণেই ওআইসি ও ডি-এইটের মতো সংগঠনগুলোকে এত গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

দুর্ভাগ্যবশত ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেরও গুরুতর ক্ষতি করেছে বর্তমান সরকার। ভারত ও ইসরাইলের সঙ্গে মাখামাখির ভ্রান্ত আশায় শেখ হাসিনার সরকার ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ ধুয়া ধরেছে, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা দূরত্ব গড়ে তুলেছে। সে লক্ষ্যে এবং সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার আশায় একের পর এক ইসলামবিরোধী নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, ভুয়া অজুহাত সৃষ্টি করে বহু হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে এসব নিপীড়নকে ইসলাম নির্যাতন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তার প্রতিক্রিয়া এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার ভয়াবহ প্রভাব এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কুয়েত এবং সৌদি আরবের পর সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতও বাংলাদেশীদের চাকরি এবং ভিসা না দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। দুই থেকে তিন কোটি বাংলাদেশী এই দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অচিন্তনীয়।

সাধারণভাবেই মুসলিম দেশগুলোর সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে একটা শৈত্য, একটা দূরত্ব গড়ে উঠছে বলে মনে হয়। সাম্প্রতিক ডি-এইট শীর্ষ সম্মেলনের ব্যাপারে সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত বাজে একটা অজুহাত দেখিয়ে শীর্ষ সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বলা হয়েছিল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি যাবেন তার স্থলে। দীপু মনিও কিনা কী বাহানা দিলেন, শেষে বেড়াতে গেলেন মস্কোতে। ইসলামী সংগঠনগুলোতে এ অনুপস্থিতির প্রতিকূল প্রভাব দেখা দিতে বাধ্য।

কামাল আতাতুর্ক প্রতিষ্ঠিত আধুনিক তুরস্ক মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী বলে বিবেচিত। তুরস্কের এক পা এশিয়ায়, অন্য পা ইউরোপে। শিল্পবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে তার অগ্রগতি বিস্ময়কর। তুরস্ক উত্তর অতলান্তিক চুক্তি সংস্থা ন্যাটোর সদস্য এবং সমানে সমানে ইওরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার আশা পোষণ করে। বিগত কয়েক বছর ধরে সে ইইউর সঙ্গে আইনকানুনের সমতা বিধানের চেষ্টা করছে। বিগত ক’দিনে ঢাকা থেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে যেভাবে তোপ দাগা হচ্ছে, তাতে দু’দেশের কূটনীতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়া বিচিত্র নয়।

ঘটনাটির আলামত প্রথম প্রকাশ পায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির এক বিবৃতিতে। ২০ থেকে ২৪ ডিসেম্বর তুরস্কের একটি হাই-পাওয়ার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী, পার্লামেন্ট সদস্য, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রমুখ। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘অন অ্যারাইভ্যাল’ ভিসা ব্যবস্থা চালু আছে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সে সুযোগ ব্যবহার করে ঢাকা বিমানবন্দরে ভিসা নিয়েছিলেন। দীপু মনির অভিযোগ, প্রতিনিধিদল তাদের ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন, কেননা তারা আগাম অনুমতি না নিয়ে সরকারের ‘আন্তর্জাতিক’ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার দেখতে গিয়েছিলেন; আইনমন্ত্রী এবং বিশিষ্ট আইনবেত্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

ট্রাইব্যুনালের বিচারে গোপনীয়তা কেন
বহু বিতর্কিত ট্রাইব্যুনালটির গঠনপদ্ধতি থেকে শুরু করে তার কার্যপরিচালনা পদ্ধতি পর্যন্ত সবদিকেরই বহু সমালোচনা হয়েছে দেশের ভেতরে এবং বাইরে। কিন্তু লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট পত্রিকা এবং সামাজিক মিডিয়াগুলোতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম এবং ব্রাসেলসের অধিবাসী জনৈক আহমেদ জিয়াউদ্দিনের ১৭ ঘণ্টাব্যাপী স্কাইপ কথোপকথনের বিবরণ থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়, ন্যায় ও নিরপেক্ষ বিচার পদ্ধতি বলতে যা বোঝায়, এ ট্রাইব্যুনালে এতকাল সেটা হয়নি।

স্বাভাবিক বৈচারিক পদ্ধতি লঙ্ঘন করে বিচারপতি নাসিম মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে বাইরের একজন লোকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তার পরামর্শ ও নির্দেশ গ্রহণ করেছেন, এমনকি মামলার শুনানি মাঝপথে থাকা অবস্থায় কী রায় দেয়া হবে এবং রায় লেখার কনট্রাক্ট কাকে দেয়া হবে ইত্যাদি নিয়েও তারা আলোচনা করেছেন। বিচারপতি নাসিমের উক্তি থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী রায় দেয়ার জন্য তার ওপর চাপ ছিল। তিনি বলেছেন, ‘সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তারা কেবল রায় চায়।’ বিচারপতি নাসিম আরও আভাস দিয়েছেন, সরকারের মনোবাঞ্ছা পূরণ করলে তার পদোন্নতির আশা আছে।

‘ডালের মধ্যে কালো’ কিছু থাকলেই সন্দেহের উদ্রেক হয়। অন্যথায় কোনো বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন কিংবা বিচারব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে এলে বরং খুশি হওয়ারই কথা। পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতে সম্মানিত বিদেশি অতিথি এলে তারা সাদরে তাদের পার্লামেন্টের কার্যপদ্ধতি এবং আদালতে চলমান কোনো বিচার প্রক্রিয়া দেখাতে চায়। দেশে আইন, আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা যে আছে, বিদেশিদের সেটা দেখানো গেলে দেশের সুনাম বৃদ্ধি হয়। বর্তমান ক্ষেত্রে সরকার অবশ্যই জানে, তাদের আমলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারকে হত্যা করা হয়েছে। সেজন্যই একটি ‘আন্তর্জাতিক‘ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে কেলেঙ্কারি বিদেশিদের কাছ থেকে আড়াল করার এমন করুণ প্রয়াস। শেখ হাসিনার সরকার বিচারব্যবস্থা থেকেও স্বচ্ছতাকে নির্বাসন দিয়েছে।

মাছি মারতে কামানের কেন প্রয়োজন হলো
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির পরপরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মেহমেত ভারকুল ইরকুলকে তলব করে প্রতিবাদ জানায়। এ ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন প্রয়োজন। কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে কূটনেতিক সম্পর্ক নিম্নতর পর্যায়ে নামিয়ে আনার ঠিক পূর্ববর্তী ব্যবস্থা হচ্ছে রাষ্ট্রদূতকে ‘তলব’ করা। একটি প্রতিনিধিদলের ভিসার ‘স্মল প্রিন্ট’ লঙ্ঘনকে নিয়ে এই ‘মাছি মারতে কামান দাগা’র প্রয়োজন কেন হলো ভাবছিলাম। তার পরই শুরু হলো তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত কূটনীতিক আবদুল্লা গুলের বিরুদ্ধে ঢিলবৃষ্টি এবং তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে শাহরিয়ার কবিরের ‘ঘাদানি কমিটি’। (উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনালের পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নাসিম এবং ব্রাসেলসের সেই আহমেদ জিয়াউদ্দিন অতীতে ঘাদানি কমিটিতে সক্রিয় ছিলেন)।

তার পরেই জানা গেল, তুর্কি প্রেসিডেন্ট খুব সম্ভবত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন, গোলাম আযমকে যেন ফাঁসি দেয়া না হয়। পূর্ণ বিবরণ বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ করেনি। তবু মনে হচ্ছে, সে অনুরোধই বাংলাদেশ সরকারের কৃত্রিম উষ্মা, তোপের ‘ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার’ এবং ঘাদানি কমিটির ঢিলবৃষ্টির সূচনা। কোনো দেশের সরকারপ্রধান অন্য কোনো দেশের সরকারপ্রধানকে অথবা কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখতে কিংবা অনুরোধ করতেই পারেন। সেগুলো কূটনৈতিক সৌজন্যের আওতায় পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ মুজিব হত্যার দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যর্পণের জন্য মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারকে বহু অনুরোধ করেছিলেন, বহু অর্থ ব্যয় করে লবিস্ট নিয়োগ করেছিলেন। সেগুলো লন্ডন কিংবা ওয়াশিংটনে ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ’ বলে বিবেচিত হয়নি। প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা গুলের ব্যাপারে ব্যতিক্রম কেন হবে, সহজবোধ্য নয়।

ব্রিটেনে প্রাণদণ্ড বহু আগেই উচ্ছেদ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রাণদণ্ডের প্রবল বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যই প্রাণদণ্ড উচ্ছেদ করেছে। বস্তুত এ কারণেই আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডা ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য শেখ হাসিনার কাঙ্ক্ষিত আসামিদের ফেরত পাঠায়নি। তুরস্কও বেশকিছু বছর আগে প্রাণদণ্ড রহিত করেছে। আবদুল্লা গুলের অনুরোধ (বিস্তারিত বিবরণ এখনও অজ্ঞাত) সে কারণেই কোনো আন্তর্জাতিক আইন কিংবা রীতি লঙ্ঘন করেনি। তাছাড়া ৯০ বছরের এক বৃদ্ধকে ফাঁসিতে লটকানোয় পৈশাচিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যসাধন হবে বলে কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষ মনে করতে পারে না।
আমার বিবেচনায় ফাঁকা তোপের যুদ্ধের পেছনের কারণটা ভিন্ন রকম। সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর বাকি। শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর একটাও পূরণ করতে পারেননি। সরকার ও আওয়ামী লীগ আশা করেছিল, বিশ্ব ব্যাংকের টাকায় পদ্মার ওপর সেতু তৈরি করে তারা বাহবা নেবে, জনসাধারণের চোখে ধুলো দিয়ে আরও একবার গদি পেতে চাইবে। কিন্তু বিশ্ব ব্যাংক বিশ্বব্যাপী ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাচোরদের দুর্নীতি ফাঁস করে দিল, বলে দিল বিশ্বচোরদের বিচার ও শাস্তি না হলে তারা সেতুর টাকা দেবে না। সেটা সম্ভব নয় এজন্যে যে ‘কান টানলে মাথা’ আসবেই। রাজনৈতিক আত্মহত্যা কে করতে চায় বলুন?
হাসিনার প্রতিশোধ

সাধারণ মানুষের মনোযোগ ভিন্নমুখী করার জন্য ‘যুদ্ধাপরাধের বিচারের’ ওপর নিবদ্ধ হলো সরকারের সব প্রচারযন্ত্র। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। ইকোনমিস্ট স্কাইপ কথোপকথনগুলো ফাঁস করে দেয়ায় ধরা পড়ে গেল, তথাকথিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিচার (একটি বিদেশি বন্ধু রাষ্ট্রের কয়েকজন প্রতিনিধি যে বিচার দেখে ফেললে সরকারের মাথা আরো খারাপ হয়ে যায়) একটি পরিহাস ও সাজানো ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়। সরকারি গোয়েবলসদের তুণে নতুন অস্ত্রের নিতান্ত অভাব। বিচার শেষ হোক কিংবা নাই হোক, ফাঁসির হুকুম হোক কিংবা নাই হোক, অভিযুক্ত সবাইকে ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানোর সংকল্প ঘোষণা করে মন্ত্রীরা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন, বিচারের তোয়াক্কা তারা করেন না, কয়েকজন বৃদ্ধকে ফাঁসি দিয়ে তারা নিজেদের পাশবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে চান।

আবদুল্লা গুলের চিঠি (রাষ্ট্রপতির কাছে?) গোয়েবলসদের হাতে নতুন হাতিয়ার তুলে দিল। তুরস্কের ‘চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার’ করে এবং ভুয়া দেশপ্রেমকে সুড়সুড়ি দিয়ে তারা সরকারের জন্য কিছু সমর্থন সংগ্রহ করতে চান। কিন্তু তারা শুধু ‘ঘুঘুই দেখছেন’ ফাঁদ এখনও তাদের চোখে পড়ছে না। আবদুল্লা গুলের আন্তর্জাতিক মর্যাদা এতই উঁচু যে তার নিন্দার অভিযান আকাশে থুথু ফেলার শামিল হতে বাধ্য। তাতে তথাকথিত আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারের খুঁতগুলোর প্রতি বিশ্বসমাজের মনোযোগ আরও বেশি আকৃষ্ট হবে। তাছাড়া তুরস্ক যদি কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা বাংলাদেশের জন্য কেমন মারাত্মক হবে বুঝে ওঠার মতো প্রজ্ঞা এ সরকারে কারও নেই।

বিগত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে জনৈক অ্যাডলফ হিটলার প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছিলেন জার্মান জাতিকে ক্রোধান্ধ করে নিজের উদ্দেশ্য সাধনের কুমতলবে। চেকোশ্লোভাকিয়া জার্মান জাতিকে মুখ ভেংচেছে, পোল্যান্ড জার্মান ভূমিতে থুথু ফেলেছে—এজাতীয় প্রচারণা দিয়ে তিনি জার্মান জাতির রক্তে বিশ্বযুদ্ধের বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের খুদে হিটলাররা সে পথেই চলতে যাচ্ছেন বলে মনে হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার দূরদৃষ্টি তাদের নেই।
বহু বছর আগে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের কিছুকাল পরে, লন্ডনে বিবিসির স্টুডিয়োতে শেখ হাসিনা আমাদের বলেছিলেন, তার বাবা-মায়ের হত্যার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন।

পদে পদে তিনি প্রমাণ করছেন, সে প্রতিশোধ বাসনাই তার রাজনীতি করার একমাত্র উদ্দেশ্য। (লন্ডন, ৩০.১২.১২)

(আমার দেশ, ০২/০১/২০১৩)

Keywords: