নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > শুভ নববর্ষ

শুভ নববর্ষ

Tuesday 1 January 2013, by কাদের সিদ্দিকী
Updated: Friday 10 July 2020

শুভ নববর্ষ। লাখ লাখ প্রিয় পাঠককে জানাই ইংরেজি নববর্ষের শুভ কামনা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা। কেন, কীভাবে যে ইংরেজি শুভ নববর্ষের প্রথম দিন আমার পালা পড়ল বুঝতে পারলাম না। দুই-তিন দিন আগেও খেয়াল করিনি ২০১৩ সালের প্রথম দিন আমার হবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনে লেখা শুরু করেছিলাম দুই বছর আগে। সবচেয়ে আলোচিত বছরের প্রথম দিন যে আমার হবে তা তো স্বপ্নেও ভাবিনি। সবচেয়ে কঠিন আলোচিত মনে রাখার মতো বছর হবে ২০১৩। কারণ এটা নির্বাচনের বছর। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে অবশ্যই প্রার্থনা করব, আল্লাহ যেন দেশবাসীকে নিরাপদ শান্তিময় বছর দান করেন। কিন্তু তবু কড়কড়ে বাস্তবতার কারণে খুব স্বস্তিতে আমরা থাকব এ কথা যে জোর দিয়ে বলতে পারছি না। আল্লাহ, রাসূল, বাবা-মা’র পরই আমার হৃদয়ে দেশবাসীর স্থান, তাদের মর্যাদা। নিজে কখনো মর্যাদাবান হতে চাইনি। যখন যেটুকু পেয়েছি তাতেই খুশি হয়েছি। এখনো যা পাচ্ছি তাতেই খুশি। আরও বুক ভরে যায় তখন, যখন অচেনা অতি সাধারণ মানুষ বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়।

কষ্টের মধ্যেও তাদের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে ভীষণ আশা করেছিলাম, বেঁচে থাকি বা না থাকি, স্বাধীনতার করোজ্জ্বল সূর্য দেখার সৌভাগ্য হোক বা না হোক_ আমার দেশ হবে মানবের, দানবের নয়। পরিশ্রমী হতদরিদ্র সাধারণ মানুষের অধিকার হবে রাজরাজড়াদের হিংসার বিষয়। কেউ সাধারণ জনসাধারণের দিকে চোখ রাঙাতে পারবে না। কৃষক শ্রমিক অনাদৃত অবহেলিত হবে না। স্বাধীন দেশে কোনো মালিক শ্রমিকের ঘাম চুরি করবে না বা করতে পারবে না। শ্রমজীবী মানুষের ঘামের মূল্য হবে মূল্যবান সুবাসি আতরের চেয়ে বেশি। কেউ তাদের নাক সিটকাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক পিতার আকস্মিক মৃত্যু সব উলট পালট করে দিয়েছে। পাকিস্তানি ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীন বাংলাদেশে ২২ হাজার বা তারও বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন লুটেরা পরিবার সৃষ্টি করেছি। যারা সৎভাবে মেধা খাটিয়ে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চান, তারা অনেক পেছনে। যারা চুরি করে, অন্যকে চুরির ভাগ দেয় তারা রাতারাতি প্রায় স্বর্গের কাছে পেঁৗছে গেছে। এদের ধরার তেমন পথ নেই।

রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হয়_ এ সহজ কথাটিকে না বুঝে কতিপয় স্বার্থান্বেষী জরুরি অবস্থার নামে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে দেশের বারোটা বাজিয়েছে, সেনাবাহিনীরও বারোটা বাজিয়েছে। আজ বছরের প্রথম দিন তাই এসবের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে খুব একটা যাব না। যদি বেঁচে থাকি, লেখালেখি যখন করছি যতক্ষণ কলম আর মাথা একসঙ্গে চলবে ততক্ষণ কাজটি করে যাব। মনের কথা বললে মানুষ যে এত খুশি হয়, এত সাহস পায় আগে কেন বুঝলাম না। তাহলে অত রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পণ্ডশ্রম করার কী দরকার ছিল। কাপড় ময়লা হলে তা সাবান-সোডা দিয়ে ধুতে হয়। রাজনৈতিক নেতানেত্রী ময়লা বা অপ্রিয় হলে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য জেল-জুলুম খাটতে হয়। ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকার আমার দেশের অনেক কলুষিত নেতা-নেত্রীকে জেলে নিয়ে নির্যাতন করে পাক-সাফ করে জনপ্রিয় করে দিয়েছেন। আজ আর ওদিকে যেতে চাই না।

গত বছর ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৯তম বার্ষিক সম্মেলন হয়েছে। যেই লাউ সেই কদু, সাবেক বহাল। বর্তমান সভাপতি জননেত্রী হাসিনা, ভবিষ্যৎ সভাপতি জননেত্রী হাসিনা। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি প্রধান হাসিনা, বিদায়ী কমিটি প্রধান নেত্রী হাসিনা। কত প্রাচীন গণতান্ত্রিক দলের এমন নেতা যে, নিয়ম রক্ষার জন্য নাম প্রস্তাবের কোনো লোকও নেই। হতে পারে এত জনপ্রিয় যে প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আবার নিন্দুকেরা এও বলতে পারে কেউ চায় না, তাই তার নাম প্রস্তাব হয়নি। পরে চাপে পড়ে ওমেদাররা প্রস্তাব করেছে! এত হাজার হাজার লোক এলো কেউ টুঁ-শব্দও করল না। জমিদারের নায়েব তহসিলদাররাও জমিদারি চালাতে দু’এক কথা বলে_ এখানে তাও নেই। শোনলাম নেত্রী নাকি এরপর আর প্রার্থী হবেন না বা থাকবেন না। আর কী থাকবেন! ৩০-৩১ বছর টানা কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সভাপতির পদে থাকার ইতিহাস নেই। পৃথিবীর বহু গণতান্ত্রিক দেশে পরপর দুইবারের বেশি সভাপতির পদ অলঙ্কারের রীতি খুব একটা নেই। আদু ভাইয়ের মতো কেউ তেমন পদ আগলে থাকেনও না। মাননীয় নেত্রীর বাবা অতবড় নেতা তিনিও আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ত্যাগ করে এএইচএম কামরুজ্জামানের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

এ ব্যাপারে জননেত্রী অসাধারণ। তার নাম গিনেস বুকে অবশ্য অবশ্যই উঠবে। জমিদারি রক্ষা করতেও খাজনা-ট্যাঙ্ দিতে হয়। ব্রিটিশ আমলে কত জমিদার সময়মতো খাজনা দিতে না পারায় জমিদারি খুইয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর তেমন ভয় নেই। না দেশের জনগণকে, না তার দলের নেতা-কর্মীকে। পৃথিবীতে দায়িত্বহীন এমন একক নেতৃত্ব আর কেউ পেয়েছে কিনা জানি না। সর্বগুণে গুণী নেতৃত্ব হলে দেশ আরও অনেক এগিয়ে যেত। কিন্তু অনেকেরই আওয়ামী লীগ নেত্রীর গুণাগুণ নিয়ে ভরসা নেই। তার কথাবার্তা নিয়ে তো নেই-ই। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর কথাবার্তা আচার-আচরণ লাখ লাখ মানুষের অনুসরণ-অনুকরণীয় হয়। সেখানে যদি কোনো প্রবীণ মানুষকে বলতে হয় ’মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আর ওসব ভাষা ব্যবহার করবেন না। বাচ্চারা শুনলে নষ্ট হয়ে যাবে। একজন পিতার জন্য এ যে কত বেদনার উক্তি কেউ হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি না করলে তাকে মুগুর দিয়ে বুঝাব কী করে?

আওয়ামী লীগের এক নবীন সংসদ সদস্য কথাবার্তায় চোস্ত, লেখেও ভালো। আমি তার লেখার এক কদরদার। গত বছর ২৯ ডিসেম্বর ’আওয়ামী লীগের সৌভাগ্য বনাম দুর্ভাগ্য’ শিরোনামে লিখেছেন।

তাতে আমাদের স্বাধীনতা, স্বাধীনতায় নেতৃবৃন্দের ভূমিকার যে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন, আর একটু সময় ও শ্রদ্ধা নিয়ে করলে ভালো করতেন। আওয়ামী লীগের নাক দিয়ে দুধপড়া কর্মীরাই যদি তাদের দাদার বয়সী নেতাদের কলমের ডগায় অমন নাচান তাহলে বাইরের লোকেরা কী করবেন! নেত্রীর গুণ গাইতে গিয়ে এমন গাওয়া গেয়েছেন মনে হয় গাওয়া ঘি-কেও হার মানিয়েছেন। আমার চোখে লেগেছে তাই আলোকপাত করছি। মরে যাওয়ার পর যখন সাক্ষী থাকবে না, তখন যার যার ইচ্ছামতো অনেক ইতিহাস রচিত হবে। জাতির প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য চোখের সামনে দেখা অসঙ্গতি তুলে না ধরে থাকতে পারি না। প্রধানমন্ত্রীর দিলি্ল বাস সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ’দিলি্লতে তাদের আর্থিক দৈন্যতা ছিল চরমে। নিজে ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরতেন। বাসায় দুই ধরনের চাল রান্না হতো। স্বামী ড. ওয়াজেদ মোটা চালের ভাত খেতে পারতেন না। তাই কেবল তার জন্য চিকন চালের ভাত। বাকিরা খেতেন নিম্নমানের মোটা চালের ভাত। পরিবারের একমাত্র আয় ভারত সরকারের প্রদেয় যৎসামান্য ভাতা। সেই ভাতা থেকে টাকা বাঁচাতেন শেখ হাসিনা।

নিজ পরিবারের মুখে উপাদেয় অন্ন তুলে না দিয়ে যে টাকার সাশ্রয় হতো তা-ই মাস শেষে আবদুর রাজ্জাকের কাছে পাঠাতেন দল চালানোর জন্য।’ আচ্ছা ভাই নবীন সদস্য, কার কাছে আপনি শুনলেন দিলি্লতে জননেত্রী শেখ হাসিনা ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরতেন? তাহলে ভারত সরকার এত বড় একজন নেতার সন্তানকে কোনো মর্যাদা দেয়নি? এ জমানার কাজের বুয়ারাও ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরে না। আর জননেত্রী শেখ হাসিনা তো সুইয়ে সুতা লাগাতেই জানেন না, ছেঁড়া কাপড় সেলাই করবেন কী? আপনি এমন ডাহা অসত্য কথাটা কী কারণে তুলে ধরলেন? প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে জননেত্রী শেখ হাসিনা সুন্দর পরিচ্ছন্ন সাধারণ পোশাক-আশাকে থাকতেন। আমার বউয়ের মতো খুবই সাধারণ কাপড় পরতেন। কোনো দামি কাপড়ের প্রতি তার আগ্রহ দেখিনি। সব সময় পয়-পরিষ্কার ঝকঝকে কাপড় পরতেন। চরম দুঃসময়ে সব সময় আমি তো তার কাছাকাছিই ছিলাম। নিজে হাতে রান্না করে পাশে বসিয়ে আমাকে যতবার খাইয়েছেন, ততবার আপনি আপনার বউয়ের হাতে খেয়েছেন কিনা সন্দেহ।

আরেকটা ডাহা অসত্য কী করে লিখলেন? বাসায় দুই ধরনের চাল রান্না হতো। স্বামী ড. ওয়াজেদ মোটা চালের ভাত খেতে পারতেন না বলে তার জন্য চিকন চাল আর অন্যদের জন্য মোটা চাল। অত স্বামীভক্ত স্ত্রী কিন্তু জননেত্রী কোনো দিনই ছিলেন না। আর কয় টন চালই বা লাগত জননেত্রী শেখ হাসিনার উ ওও ১৬ পান্ডারা রোডের বাড়িতে? সভানেত্রীর সঙ্গে তখন শত শত হাজার মানুষ ছিল না। তারা স্বামী-স্ত্রী, জয়-পুতুল আর কাজের ছেলে রমা। কখনো সখনো দিলি্লর কোনো গৃহপরিচারিকা। পাঁচ অথবা ছয় সদস্যের কত মণ বা টন চালের দরকার হতো? দুলাভাই ড. ওয়াজেদ মিয়াকে আমি খুব ভালো করে জানি। দিলি্লতে তাকে একেবারে অসহায় হিসেবে দেখেছি, দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বামী হিসেবে দেখেছি। আণবিক শক্তি কমিশনের সফল চেয়ারম্যান হিসেবে দেখেছি। তিনি স্বল্পাহারী ছিলেন। আমি যখন ছেলেবেলায় মির্জাপুরের বরাটি স্কুলে পড়তাম, হোস্টেলে থাকতে প্রতি মাসে ১৬ সের চাল লাগত।

এখন আমার জন্য প্রতি মাসে বড়জোর সাত সের চাল, তিন সাড়ে তিন সের আটার দরকার হয়। ’৭৫ থেকে ’৮০-র দিকে দুলাভাইয়ের জন্যও ১০-১২ সের চাল-আটার বেশি প্রয়োজন হতো না। এখন ভালো চালের দাম ৭০-৮০ টাকা। তখন দিলি্লতে সব থেকে ভালো চাল প্রতি কেজি ছিল আড়াই-তিন টাকা। সাধারণ চালের দাম ছিল বড়জোর ২ টাকা। সভানেত্রীর বাড়িতে প্রতি মাসে খুব বেশি হলে ৪০-৪৫ কেজি চাল লাগত। দু’এক মাস পরপর আমি গেলে ৫-১০ কেজি বেশি লাগত। কারণ আমি একা যেতাম না। সঙ্গে দুলাল থাকত কিংবা লুৎফর অথবা দীপঙ্কর, আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক কিংবা হালুয়াঘাটের সালাম। গাড়ির ড্রাইভার তো থাকতই। বাইরেরও কেউ কখনো সখনো যেত। কি মারাত্দক ইতিহাসের বিকৃতি! ’নিজ পরিবারের মুখে অন্ন তুলে না দিয়ে যে টাকা সাশ্রয় হতো তাই মাস শেষে আবদুর রাজ্জাকের কাছে পাঠাতেন দল চালানোর জন্য।’ এও কি সম্ভব! আজ থেকে ২০ বছর আগেও একটা পরিবারে খাওয়া খরচ ছিল উপার্জনের চার ভাগের এক ভাগ। বড়জোর তিন ভাগের এক ভাগ। ভারতীয় সরকার তখন মাননীয় নেত্রীকে নগদ যে টাকা দিত তাতে ভালোভাবেই বাসা খরচ চলত।

আমার বাড়িতে খাওয়ার মানুষের অভাব ছিল না। তাও ৬-৭ হাজারের বেশি খরচ হতো না। ’৭৬-’৭৭ সালে যখন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, ডা. এস এ মালেক, আরও নেতারা প্রতিরোধ সংগ্রামীদের শিবিরে যেতে শিলিগুড়িতে আমার মা-বাবার কাছে থাকতেন, তখন প্রতিদিন বাইরের ৩০-৪০-৫০ জনকে খাইয়েও চার-পাঁচ হাজারের বেশি টাকা খরচ করা যেত না। জয়-পুতুলের মুখে ভালো খাবার তুলে না দিয়ে নেত্রী কত আর বাঁচাতে পারতেন? আর সেই টাকা জননেত্রী আবদুর রাজ্জাককে দল চালাতে দিতেন? ছিঃ! ছিঃ! মানুষকে ছোট করারও একটা মাত্রা থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদারদের দালালরাও এমন নিকৃষ্ট দালালি করেনি, যেমনটা লেখাটায় ফুটে উঠেছে। ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরার কথা বলে জননেত্রীর সম্মান বৃদ্ধি করেননি। ভারত থেকে টাকা আসত আর আবদুর রাজ্জাক দল চালাতেন_ এমন লিখেও নবীন লেখক প্রবীণের প্রতি খুব একটা সম্মান দেখাননি।

লেখক রাজনৈতিক কর্মী না হয়ে শুধু লেখক হলে জননেতা আবদুর রাজ্জাককে আবদুর রাজ্জাক বলতেন, রাজ্জাক বলতেন, কিছুই আসত যেত না। বয়স তো খুব একটা কম হয়নি। এখনো তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, জননেতা আবদুর রাজ্জাক অথবা আবদুল জলিলদের নাম লিখতে যাই, বার বার পুরো নাম লিখলে লেখার গতি কমে বা বলতে গেলে থেমেই যায়। তবুও তোফায়েল আহমেদকে তোফায়েল বলতে পারি না, আমির হোসেন আমুকে আমু বলতে পারি না, এম এ জলিলকে জলিল বলতে পারি না, রুচিতে বাধে। কোথায় যেন শুধু লেখার স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকে শেখ মুজিব লিখেছিলাম। আগে পিছে কত জায়গায় বঙ্গবন্ধু ছিল, জাতির পিতা ছিল, আমার পিতা বলে উল্লেখ ছিল, তারপরও পিতৃসম বড়ভাই আমাকে উলঙ্গ ভাষায় গালাগাল করেছিলেন, আমি জাতির পিতাকে শেখ মুজিব বলেছি কেন? যাক এখন আওয়ামী লীগের রাজত্ব। আওয়ামী লীগ ও তার লোকেরা যখন যা করবেন তা-ই নব সৃষ্টি। আজকালের নেতারা কার সাহসে প্রবীণ নেতাদের রাজ্জাক, তোফায়েল, সুরঞ্জিত, জলিল বলে সম্বোধন করে, সামান্য সম্মানটুকু দিতে চায় না_ এ সাহস কোথায় পায়? এর রহস্য কী? কিছুই জানি না।

আচ্ছা আমার মনেও তো প্রশ্ন জাগতে পারে, প্রিয় বোনের জন্য আমিও তো কলকাতা থেকে কতবার টাঙ্গাইল শাড়ি, গান শোনার জন্য সোনোডাইন রেকর্ড প্লেয়ার নিয়ে গেছি। আমার বাল্যবন্ধু লাঙ্গুলিয়ার সদু সিকদারের ছেলে হায়দার সিকদার আর লতিফ পাগলের হাতে দিলি্লর পান্ডারা রোডে টেপ রেকর্ডার পাঠিয়েছি। যে কথা হায়দার সিকদার এখনো দেখা হলেই বলে। তরুণ নেতা এবং লেখক এখনকার জমানা দেখে দিলি্ল থেকে টাকা ঢাকায় আনছেন, তখনকার জমানা দেখলে তিনি কি এমন বলতেন না, যে জননেতা আবদুুর রাজ্জাক প্রতি মাসে দিলি্লতে টাকা পাঠাতেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে যে যাই বলুন আমি এক অধম আর বঙ্গতাজ তাজউদ্দীনের স্ত্রী বেগম জোহরা তাজউদ্দীন এবং জননেতা আবদুর রাজ্জাকরাই বঙ্গবন্ধুর নাম জাগিয়ে রেখেছিলাম। তরুণ লেখক যেভাবে লিখছেন, তার অনেক কিছুই সত্য নয়। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তখন জননেতা আবদুর রাজ্জাক ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

আর তার তো এটা জানার কথা ’৮১ সালে সভানেত্রী শেখ হাসিনা দিলি্ল থেকে যখন দেশে ফেরেন তখন জননেতা আবদুর রাজ্জাকের চেয়ে জনপ্রিয় কেউ আওয়ামী লীগে ছিলেন না। কাকের মাংস কাকে না খেলেও আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগকে খায়। এটা দিবালোকের মতো সত্য। ’৭৫ সালে মরার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগকে কবর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের জন্য ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগ সেকেলে হয়ে গেছে। তাই আমি তাকে কবর দিলাম। বিরোধীরা যাই বলুক বঙ্গবন্ধু কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের জন্ম দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জন্ম দেওয়া রাজনৈতিক সন্তান কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগকে তার কন্যা এবং কন্যার পারিষদ দল গলাটিপে হত্যা করে কবর থেকে আওয়ামী লীগের লাশ তুলে বঙ্গবন্ধুর নামে তার রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা রাজনীতি করছেন।

গত বছরের সংক্ষিপ্ত কিছু অসঙ্গতি :

১। ক’দিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বামদের কাছে হরতাল শিখতে বলেছিলেন। তার পুলিশ যে কী চিজ এবং মন্ত্রীর ধন্যবাদে কী মজা পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে তা বুঝিয়ে দিলেন বছরের শেষে।

২। এক মেডিকেল ছাত্রীর বাসে ধর্ষণে মৃত্যু নিয়ে সারা ভারত জেগে গেছে। কিন্তু ক’দিন আগে আমাদের এক ডাক্তার ইভা নিম্ন কর্মচারীর ধর্ষণের চেষ্টায় জীবন দিয়েছে তাতে আমাদের ঘুম ভাঙেনি।

৩। মো. জিল্লুর রহমান আঙ্কেল, মহামান্য রাষ্ট্রপতি নন। যদি হতেন তাহলে অবশ্যই চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলে সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিমানবন্দরে সম্মান জানাতে যেতেন। তিনি তা না জানিয়ে রাষ্ট্রকে যেমন অবমাননা করেছেন, তেমনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। ২৯ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগেরও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছে। সেখানে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলেন দেশবরেণ্য প্রবীণ আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক আ স ম আবদুর রব, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ, জেপির মহাসচিব শেখ শহীদ, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান।

বস্তির ভাড়া ছাড়া বিপুল গামছার নেতা-কর্মী দেখে সব হৃদয় মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত তরুণ-তাজা ছাত্র কারখানার প্রকৃত শ্রমিক দেখে ১৩ বছর আগে জন্ম দেওয়া দলের কিছুটা হলেও সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটশনে অনুষ্ঠিত হবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের চতুর্থ ত্রিবার্ষিক সম্মেলন। যে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটশনের আঙ্গিনায় ’৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী সরকারের বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ১০৪ জন কর্মীর রক্তে জন্ম নিয়েছিল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। জন্মের দিন অভিভাবক হিসেবে ড. কামাল হোসেন ছিলেন প্রধান অতিথি, ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীরও প্রধান অতিথি ছিলেন ড. কামাল হোসেন। ২০১৩ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য শুভ শুভ শুভ হোক। শুভ ইংরেজি নববর্ষ। লেখক : রাজনীতিক

(বাংলাদেশ প্রতিদিন, ০১/০১/২০১৩)