নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > পুরান মাল নতুন বছর

পুরান মাল নতুন বছর

Saturday 5 January 2013, by কাদের সিদ্দিকী
Updated: Friday 10 July 2020

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

২৯শে ডিসেম্বর ছিল ২০১২-র শেষ শনিবার। আর আজ ২০১৩-র প্রথম শনিবার। তোমাকে ২০১২-র কথা জানিয়েছি। এবার নতুন বছরের কথা জানাই। সবাই নতুন বছর নতুন আঙ্গিকে এগিয়ে চলার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সুস্থভাবে এগিয়ে চলার কোনো স্বপ্নই বাস্তবায়ন হয় না। আমরা বড় অভাবে বড় কষ্টে আছি বহু দিন। আর্থিক কষ্টের চেয়ে স্বস্তির কষ্ট বেশি। তুমি ভাবতেই পারবে না ইদানীং আমাদের রাস্তাঘাট, গাড়ি-ঘোড়া, বাড়িঘরের অবস্থা। দেখলে তাজ্জব বনে যেতে। ১৯৭২ সালে বাবর রোডের যে খুপচি বাড়িতে উঠিয়ে গিয়েছিলে, কে যে বাড়িটা বানিয়েছিল। এত গোপগাপ কোনো বাড়ি দেখিনি। আগে বুঝতাম না, এখন তো বুঝি। ১২ সাড়ে ১২ শ’ স্কয়ার ফুটের বাড়ির শুধু ১০ ইঞ্চিও এদিক-ওদিক দেয়াল দিয়েই প্রায় সাড়ে চার শ’ স্কয়ার ফুট নষ্ট করেছে। বর্তমান আধুনিক বাড়িঘরে দেয়ালের জন্য বারো-তেরো শ’ স্কয়ার ফুটে এক-দেড় শ’ ফুটই যথেষ্ট। ২০০৪-০৫-এ একবার ভাঙাভাঙি করেছিলাম। তাতে চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। আবার এই কয়েক মাস হয় ভাঙচুর করে বারান্দা ও একটা ঘর ঠিক করেছি, তাতে প্রায় তিন-চার লাখ খরচ হয়েছে। জানি কোনো সময় ইনকাম ট্যাক্সের রাঘব-বোয়ালরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু তার আগেই আয়-ব্যয়ের হিসাব তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো। তাই লাফালাফির সুযোগ হবে না। পূর্ব পাশের বারান্দায় বসে যখন লেখালেখি করি, সকালে খবরের কাগজ পড়ি, তখন কবি নজরুলের ‘বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি’ মনে পড়েÑ

“তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল-লেখা,

তোমার দেহেরই মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা।

তব র্ঝি-র্ঝি র্মি-র্মি যে তারি কুন্ঠিত বাণী,

তোমার শাখায় ঝুলানো তারির শাড়ির আঁচলখানি।

তোমার পাখার হাওয়া

তারই আঙ্গুলি-পরশের মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!

ভাবিতে ভাবিতে ঢুলিয়া পড়েছি ঘুমের শ্রান্ত কোলে,

ঘুমায়ে স্বপন দেখেছি, তোমারি সুনীল ঝালর দোলে

তেমনি আমার শিথানের পাশে। দেখেছি স্বপনে, তুমি

গোপনে আসিয়া গিয়াছ আমার তপ্ত ললাট চুমি।

হয়তো স্বপনে বাড়ায়েছি হাত লইতে পরশখানি,

বাতায়নে ঠেকি, ফিরিয়া এসেছে, লইয়াছি লাজে টানি।

বন্ধু, এখন রুদ্ধ করিতে হইবে সে বাতায়ন!

ডাকে পথ, হাঁকে যাত্রীরা, ‘কর বিদায়ের আয়োজন।’ ”

আমার বারান্দা ও জানালার পাশে গুবাক তরুর সারি নেই। কিন্তু মায়ের হাতে বুনা দু’টি নারিকেলগাছ আছে। সেই নারিকেলগাছের পাতাগুলো যখন বাতাসে নাড়াচাড়া করে, তখন মনে হয় মা যেন দুই হাত বাড়িয়ে ডাকছেন। বজ্র আয়, মোর বুকে আয়, ভেবে ভেবে বুক ভারী হয়ে যায়, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মা যে কত বড় সম্পদ, বেঁচে থাকতে বুঝিনি। কেউ বোঝে না। তুমি তো জানো, অনেকেই আমায় সাহসী বলে। কিন্তু মায়ের পাগল এমন দুর্বল সন্তান কি সাহসী হয়! মা ছাড়া জীবন বড় অধুরা। যদিও কারো মা চিরকাল থাকেনা। মা-বাবার হাত ধরে সন্তানের যাত্রা। আবার সন্তানের কাঁধে চড়ে মা-বাবার পরপার গমন। সন্তানেরা আবার তার সন্তানের হাত ধরে চলতে থাকে। এটিই জগতের নিয়ম। এভাবেই সিলসিলা চলে। যত সংগ্রামই করি স্রষ্টার সৃষ্ট নিয়ম ভাঙার মতা আমাদের নেই। আমাদের সব আছে কিন্তু স্বস্তি নেই, মানবতা নেই। অন্যের প্রতি দয়া, মায়া, মমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে গেছে।

গত ২৯শে ডিসেম্বর তোমার কবর দেয়া আওয়ামী লীগের লোকদেখানো এক জাতীয় কাউন্সিল হয়েছে। যেখানে সভাপতি ছিলেন তোমার কন্যা। ৩৩ বছর ধরে তিনি মৃত আওয়ামী লীগের সভাপতি। আবার প্রস্তাব ছাড়াই সভাপতি হলেন। সে এক মজার কাউন্সিল, তুমি ভাবতেই পারবে না। কত দূর-দূরান্ত থেকে নেতাকর্মীরা আসে, কেউ কিছুই বলতে পারে না। স্রোতের বাইরে কেউ কোনো কথা বললেই হই হই করে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। সেই দিন ঢাকার কাছের এক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফোন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে আমার সহযোদ্ধা ছিল। ‘স্যার, আপনার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু নেত্রীর নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। আমরা দলের নেতাকর্মী কাউন্সিলর হয়েও কোনো কথা বলতে পারলাম না। কিসের কাউন্সিল? কোনো প্রস্তাব নেই, সমর্থন নেই, সভানেত্রী আগেও ছিলেন, আবার হলেন। গ্রামগঞ্জের কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। নেতারাই নেতা ঠিক করে ফেললেন। সেই প্রবাদের মতো, নিজেদের মধ্যে নিজেদের বিয়ে। প্রস্তাবকও তারা সমর্থকও তারা। লোক খোঁজার দরকার নেই। সব সাবেক বহাল। অন্যান্য পদের জন্যও নির্বাচনের দরকার নেই, সবই নেত্রী করবেন।’

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এ তুমি আমাকে সাধারণ সম্পাদক হতে বলেছিলে, আমি বলেছিলাম, ‘২০ জন সদস্য আমার পছন্দমতো নিতে দিতে হবে।’ তুমি বলেছিলে, ‘অত কেন? তুই সাহসী মানুষ, সারা দেশে তোর দারুণ চাহিদা। উল্কার মতো ছুটে বেড়ালে তুই দলকে দারুণ শক্তিশালী করতে পারবি। সবাই তোকে ভালোবাসবে। তোর আবার পছন্দের লোক নিতে হবে কেন?’ বলেছিলাম, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য আমি একেবারেই অচল। প্রবীণ নেতাদের বসতে দিতে দিতে আমাকে দাঁড়িয়েই থাকতে হবে। আওয়ামী লীগ অফিসে জীবনেও বসার সুযোগ পাবো না। সবার কথা শুনতে শুনতে নিজের কথা বলা হবে না। তাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। সময় সুযোগ হোক, বয়স বাড়–ক তখন দেখা যাবে।’ মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলে সাতবার। সেখানেও সাহস পাইনি। হয়তো তুমিই ঠিক ছিলে। ভীত হওয়ায় আমিই ভুল করেছিলাম। স্বাধীনতার পর থেকে মতা বা শক্তির সাথে মিলেমিশে থাকলে আজকের এই দুর্দশা হতো না। দেশ ও জাতির জন্য অবশ্যই কিছু না কিছু করতে পারতাম। যাক, যা হয়নি তা নিয়ে কথা বলে লাভ কী? এখন যতটুকু করার সেটুকু করতে পারলেই যথেষ্ট। কোনো কোনো েেত্র কখনো-সখনো একজন সাধারণ মানুষের মতো কেন যেন কিছু করতে পারি না, এত দুর্বলতা কোথা থেকে এলো, বুঝতে পারি না। কেউ কাউকে সম্মান করে না, তার পরও এখনো দু-চারজন প্রবীণ যারা আছেন তাদের সামনে আপনাআপনিই জড়সড় হয়ে পড়ি। কেন যে অমন হয়, বুঝতে পারি না।

গত ২৯ শে ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের মতো আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জায়গা না পেয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছি। তাতে অংশ নিতে এবার কেউ আপত্তি করেনি। তোমার প্রিয় প্রবীণ নাগরিক ড. কামাল হোসেন গিয়েছিলেন। আমরা দাওয়াত করিনি, তবু যাওয়ার পথে হঠাৎ করেই ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক গিয়েছিলেন। অংশ নিয়েছেন স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক আ স ম আব্দুর রব, জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, আরেক অংশের শেখ শহীদুল ইসলাম, বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর (অব:) আব্দুল মান্নান।

স্বাধীনতার পর কখনো স্বস্তিতে থাকিনি। মাত্র ১৯৭২-৭৫ মোটামুটি চলেছি। গ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের ছেলেমেয়ে রাজধানীতে পড়ালে যেমন প্রতি মাসে টাকা পাঠায়, আমার জন্যও কেন যেন শত শত মানুষ সেই সময় টাকা পাঠাত। আমিও দুই হাতে খরচ করতাম। সেই টাকা দেখাশোনা করত সখিপুর গজারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ছেলে লুৎফর। ক’বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। বড় ভালো ছেলে ছিল লুৎফর। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ছিল, ১৯৭৫-এ তোমার হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামে ছিল। তার পরও আমৃত্যু আমার প্রতি আস্থাশীল ছিল। একদিনও নয়-ছয় করেনি। যত দিন আওয়ামী লীগে ছিলাম, কতজন উপযাচক হয়ে টাকা দিত। চরিত্র খারাপ বলে অনেকের টাকা নিতাম না। কিন্তু যেই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ করলাম, পুরনো কর্মীরা কেন যেন রাতারাতি গরিব হয়ে গেল। যারা ২০ বছর আগে লাখ টাকা দিতে পারলে ধন্য হতো, তাদের কাছে লোক পাঠালে কিংবা ফোন করলে তারা হাজার টাকাও দিতে পারত না বা দিত না। লম্বা মানুষ তাই নিগূঢ় বুঝতাম না। আওয়ামী লীগ করি না, যারা আওয়ামী লীগ করে তারা আমার দলকে সহযোগিতা করবে কেন? পাঁচ-সাত বছরে ধীরে ধীরে বুঝেছি, নতুন মানুষও চিনেছি। এখন মোটামুটি দল চালাতে খুব একটা কষ্ট হয় না। আর মহাজোটের মহাআড়ম্বরে পাঁচ বছরে পদার্পণে তাদেরও অনেকের সেই আগের চই নেই। কিছুটা মাটিতে পা পড়েছে। তারা আবার এখন উপযাচক হয়েই খায়খাতিরের চেষ্টা করে। যাদের পয়সায় আওয়ামী লীগ চলে, তারা যেমন খাতির করেÑ আড়ালে-আবডালে আওয়ামী লীগাররাও খাতিরের ডালা পেতে বসে থাকে। তাই তোমার দোয়ায় সত্যিই কষ্ট কিছুটা কমেছে। দোয়া করো চেষ্টা করছি, দেখা যাক সামনের মহাসংগ্রামে কে হারে কে জেতে। দলীয় কর্মীদের সক্রিয় করতে এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেতে সব সময় চেষ্টা করছি।

মাস ছয়েক আগে বাংলাদেশ প্রতিদিনে এক লেখা পড়ে বরিশালের এক ভদ্রলোক ফরিদুর রহমান অথবা ফরিদ আহমেদ কী যে প্রশংসা করেছিলেন, বলে বোঝাতে পারব না। বরিশাল সার্কিট হাউজের সামনেই নাকি তার বাড়ি। সব রকম সাহায্য করতে উতলা হয়ে উঠেছিলেন। আমার জন্য জান কোরবান করবেন। আমি তার কোরবানি কবুল করে বলেছিলাম, যদি সম্ভব হয় দলের নামে এক শ’ টাকা পাঠিয়ে দিয়েন। এক শ’ টাকায় কষ্ট হলে দশ টাকা পাঠিয়েন, তবু কিছু পাঠিয়েন।’ মনে হয় ঠিকানার অভাবে পাঠায়নি। কিন্তু আমার দলের নাম লিখে আমার নামে পাঠালে অবশ্যই পেয়ে যেতাম। আজকাল শত শত হাজার হাজার লাখ লাখ টাকা টেলিফোনে এদিক-সেদিক হয়, কুরিয়ার সার্ভিসে হয়, পরিবহন সংস্থাগুলোতে হয়। আমাদের কর্মীদেরও বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা পয়সা পাঠাতে দেখি। তার পরও যাদের আমাদের দলের অ্যাকাউন্ট নম্বরÑ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ৭৭৫৪, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, শ্যামলী শাখা দিয়ে ছিলাম। তাদের অনেকেই সাধ্যমতো দলীয় তহবিলে অনুদান পাঠিয়েছে। কিন্তু তিনি এ পর্যন্ত পাঠাননি বা পাঠাতে পারেননি। এসব কারণে জনসভা ছাড়া এখন যেকোনো দলীয় কর্মসূচিতে নাম-ঠিকানাসহ অনুদান চাই। সাড়াও পাই। তাতে দু’টি লাভ। একটি নাম ঠিকানা অন্যটি নগদ অর্থ। নাম-ঠিকানা পাওয়া কর্মীদের চিঠি লিখলে যোগাযোগ করলে কল্পনা করা যায় না তারা কী যে খুশি হয়। ২৯ তারিখে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দারুণ সাড়া পেয়েছি। সেই দিনের অর্থ ইতোমধ্যেই ব্যাংকে জমা করেছি। আগামী সপ্তাহে সবার কাছে ব্যক্তিগত চিঠি দেবো। প্রায় সবার ফোন নম্বর থাকায় কম বয়স দেখে দেখে কয়েকজনের সাথে কথা বলায় তারা উন্মাদ হয়ে গেছে। আমি যে তাদের সাথে কথা বলতে পারি, এটি তারা কখনো ভাবেওনি। তাই ভাবছি, বিত্তশালীদের পেছনে ছোটাছুটি না করে সাধারণের কাছে যাওয়াই ভালো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রত্য ফলাফল পেয়েছি।

জুন-জুলাইয়ের ঘটনা। তখন কাদেরিয়া বাহিনী বেশ সুসংগঠিত। ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক কমান্ডাররা টাকা তুলে সদর দফতরে জমা করত। এটি প্রতিদিন চলত। খবর আসত লাইন ধরে বহু লোক সাহায্য করেছে। স্বেচ্ছাসেবক কমান্ডাররা যখন টাকা দিত, তখন দেখা যেত পাঁচ-সাত হাজার। মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দারা হয়তো রিপোর্ট করেছে, ‘লাইন ধরে অমুক ইউনিয়নে হাজার হাজার লোক সাহায্য করেছে। কিন্তু সেই ইউনিয়ন কমান্ডার যখন সদর দফতরে টাকা জমা দেয়, তখন টাকা পরিমাণ সামান্য হওয়ায় হয়তো তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করে। এখনকার মতো তখন ওপর নিচে সমান দুর্নীতি ছিল না। যদি কেউ কিছু করত তার জীবন হাতে নিয়ে করত। তাই ইউনিয়ন কমান্ডাররা ধীরে ধীরে সাবধান হচ্ছিল। বড় অঙ্কের টাকা যারা দিতো তাদের পেছনেই ছুটত বেশি। তাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছে রসিদ ছাড়া টাকা নেয়ার পথ নেই। এক টাকা দুই টাকা যারা দেয়, তাদের সংখ্যা বেশি পরিমাণ কম। তাতে আয় পড়ে না। হিসাবে ভুলের একটি মারাত্মক আশঙ্কা থাকে। কাদেরিয়া বাহিনীর হিসাবে গরমিলে লাখ টাকার যে শাস্তি এক টাকাতেও সেই শাস্তি। তাই তারা এক-দুই টাকা যারা দিতে চাইতেন তাদের সাহায্য নেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। দুই-চার-পাঁচ-দশ হাজার টাকা যারা দিত, তাদের সানন্দে গ্রহণ করে সদর দফতরে পাঠিয়ে দিত। এতে ঝুটঝামেলা কম, টাকা বেশি। হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে রসিদসহ দাতাকে সদর দফতরে হাজির করায় সুবিধা। তাই তারা বাস্তবতার নিরিখে ুদ্র দাতাদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত।

জুলাই মাসের শেষ দিকে চেয়ারম্যান আক্কেল আলী শিকদারের তৎপরতায় কালিয়াকৈরের ১৩০ জন রাজাকার অস্ত্রসহ কাদেরিয়া বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। চেয়ারম্যান আক্কেল আলী ঘোরতর মুসলিম লীগার; যে কারণে শুরুর দিকে শওকত মোমেন শাহজাহান তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে গুলি করেছিল। খালের পাড়ে সন্ধ্যার দিকে গুলি করায় সে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেঁচে যায়। তবুও তার গায়ে দু’টি গুলি লেগে মারাত্মক জখম হয়। প্রায় দুই মাস চিকিৎসার পর কাঁচা ঘা নিয়েই রাজাকারসহ হতেয়া স্কুলমাঠে গিয়েছিলেন। তিনি মুসলিম লীগপন্থী হলেও স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের সাথে থাকতে চান। এ জন্য আগে থেকে যোগাযোগ করে এসেছিলেন। আমার কাছে এলে তাকে বলেছিলাম, হয় আপনি দুনিয়ার সব চেয়ে মহৎ ব্যক্তি বা শয়তান। এভাবে আমায় কেউ গুলি করলে আমি কোনো মতেই আসতাম না। আপনি মুক্তিযুদ্ধের পে থাকতে চান, আপনার এই ইচ্ছের উপযুক্ত মর্যাদা দেয়া হবে। তিনি তার কথা রেখেছিলেন, আমরাও তার মর্যাদা দিয়েছিলাম। রাজাকারদের আত্মসমর্পণের পর একটা সাধারণ সভা হচ্ছিল। হাজারখানেক অথবা হাজার দেড়েক লোক হবে। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে চিৎকার করে কথা বলছিলাম, তখন শ্রোতাদের মাঝে একজন বলে ওঠে, ‘এই যে কাদের সিদ্দিকী…।’ তার এই যে কাদের সিদ্দিকী শুনে সভাস্থল স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। আমি থেমে গিয়েছিলাম। সবাই তার দিকে তাকাচ্ছিল। গেঞ্জি গায় লুঙ্গি পরা অতি সাধারণ একজন মানুষ। ‘এই যে কাদের সিদ্দিকী’র পরও সে দু-চার কথা বলছিল, কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। তাই তাকে আমার কাছে ডেকেছিলাম। যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা হয়তো ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, সেই সময় খুব একটা কেউ কাদের সিদ্দিকী বলে ডাকে না। তত দিনে আমি সিএনসি স্যার হয়ে গেছি। রাস্তাঘাটে ছোট-বড় প্রায় সবাই স্যার বলে ডাকে। ছোট শিশুরা তখনো কাকা বলে ডাকত, কাঁধে চড়ত, এখনো চড়ে। শ্রোতারা ভাবছিলেন পাগলের আজ জান যাবে। আমি ভাবছিলাম ভুল করলাম না তো! ওখান থেকে যা বলছিল, আমার কাছে এসে যদি তা না পারে! কিন্তু আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি ভালো মানুষ কখনো বিভ্রান্ত হয় না। জনতার মাঝে যেমন গর্জে উঠেছিল, আমার কাছে এলে যখন বললাম, ‘ওখানে যা বলছিলেন, এখন পাবলিকের দিকে মুখ করে তা বুলন।’ তিনি একজন সুবক্তার মতো চিৎকার করে বললেন, ‘এই যে কাদের সিদ্দিকী, মুক্তিগোরে কি গরিবের টাকার দরকার নাই? আপনার লোকেরা শুধু বড় বড় মানুষের টাকা নেয়, আমরা দু-এক টাকা দিলে তা নেয় না। বলে তোমরা না দিলেও চলব। কাদের সিদ্দিকী আজকে আপনে কইয়া যাবেন মুক্তিগোরে গরিবের দু-এক টাকার দরকার আছে কি নাই?’ লোকটার কথা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম। আমার চেতনার দুয়ারে দারুণ আঘাত হানল। কী বলে আমার তো গরিবের সমর্থনই বেশি দরকার। মুক্তিযোদ্ধাদের শতকরা ৯০ জনই হতদরিদ্র গরিব। লোকটিকে বুকে চেপে চিৎকার করে উঠলাম, ‘আমার গরিবের অর্থ ও সমর্থনই বেশি প্রয়োজন।’

(চলবে)

(নয়া দিগন্ত, ০৫/০১/২০১৩)