নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > গরিবের টেহা মুক্তিগো দরকার আছে কি নাই?

গরিবের টেহা মুক্তিগো দরকার আছে কি নাই?

Saturday 12 January 2013, কাদের সিদ্দিকী Print

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

স্বাধীনতার এত বছর পর ভাগাড়ের শকুনির মতো স্বাধীনতা নিয়ে কেমন যেন টানাহেঁচড়া চলছে, নানাজন নানাভাবে মনের মাধুরী মিশিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছেন। এত বছর পর স্বাধীনতা নিয়ে যার যার মতো গল্প ফাঁদতে খুব বেশি অসুবিধা হবার কথা নয়। এখনো কিছু মানুষ বেঁচে থাকায় হয়তো গল্প বলিয়েদের অসুবিধা হয়। আমরা পরপারে চলে গেলে তাও আর হবে না। মুক্তিযুদ্ধ করে মানুষের কাছে যত না আমি প্রিয় হয়েছি, ‘জোৎস্না ও জননীর গল্পে’ আমাকে নিয়ে আলোচনা করে হুমায়ূন আহমেদ তার চেয়েও বেশি প্রিয় হয়েছিলেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তেমন কেউ ভাবে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ওপর ‘যীশু’ সিনেমায় উপচেপড়া ভিড়। এসব তো নিজের চোখেই দেখা।

গত পর্বের কথায় আসি। হতেয়ার সেই হত দরিদ্র মানুষটির অর্থদানের আকুতি আমাকে দারুণ নাড়া দিয়েছিল। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মকবুল হোসেন তালুকদার খোকা। মুক্তিযুদ্ধে ভীষণ ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধ করেছে, গান বেঁধেছে, সেই যুদ্ধের সময়ও স্লোগানে স্লে­াগানে জনতাকে মুখরিত করেছে। নতুন নতুন স্লে­াগান সৃষ্টির জনক মকবুল হোসেন তালুকদার খোকা। আরো কেউ কোথাও আমাকে বঙ্গবীর বলেছিল কি না, জানি না। অনেক রাজাকার আত্মসমর্পণ করায় এবং চার দিকে দারুণ সাড়া পেয়ে সহযোদ্ধারাও খুবই আলোড়িত হয়েছিল। তাই কোনো ফাঁকে মকবুল হোসেন আবিষ্কার করেছিল বঙ্গবীর। ওর আগে কখনো ‘বঙ্গবীর’ শব্দটা শুনেছিলাম কি না জানি না। যারা স্লে­াগান তুলেছিল বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী শুনে হয়তো তাদের ভালো লেগেছিল। কিন্তু কেন যেন আমার লাগেনি। ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলাম। যে কারণে আড়ালে-আবডালে ‘বঙ্গবীর’ স্লে­াগান দিলেও আমার আশপাশে আর দিত না। ওভাবেই অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত পার হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর বঙ্গবীর চেপে রাখা যায়নি। আমিও আর খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করিনি। কারণ দড়ি বেশি টানলে ছিঁড়ে যেতে পারে। তাই পরিমাণের বেশি টানতে যাইনি। যাক, গরিবের অর্থ সংগ্রহের কী হলো এবার তাই-ই বলি। হতেয়া থেকে সখিপুর এখনো সদর রাস্তায় তক্তারচালা হয়ে ২০-২২ কিলোমিটার। তখন ঘোরা পথে আরো বেশি হতো। সখিপুর থেকে মহানন্দপুর সেও প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। কোনো রাস্তা ছিল না। কিভাবে যে যেতাম নিজেই জানতাম না। হেঁটে শুধু যেতামই। জুতা পরতাম না। দাড়ি-চুল কাটতাম না, তবে গোসল করতাম নিয়মিত। যেখানেই থাকতাম ফজরের পর গোসল করেই বের হতাম। শত্র“র হাতে মারা পড়লে যেন ফরজ গোসলের প্রয়োজন না হয়। কেন যেন আল্লাহ এখনো আমায় নেননি। কবে ওপারের টিকিট পাবো, তা আল্লাহই জানেন।

সহকর্মীদেরকে নিয়ে যখন বসেছিলাম মহানন্দপুর হেড কোয়ার্টারে, তখন রাত ১২টার কম হবে না। অর্থ সমস্যা নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হলো, তখন হামিদুল হক, খোরশেদ আলম আরো ফারুক আহমেদ, আলী হোসেন, আউয়াল সিদ্দিকী, আমজাদ মাস্টার ও অনেকেই অনেক রকমের পরামর্শ দিতে লাগল। তাদের কাছেও ও ধরনের খবর ছিল। সেই বৈঠকে শওকত মোমেন শাহজাহান উপস্থিত থাকতে পারেনি। তহবিল তসরুপের অভিযোগে তাকে আগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল। অনেক আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো সবাই ইউনিয়ন পরিষদ ট্যাক্স দেবে। যাদের ট্যাক্স নেই, তারাও এক টাকা থেকে ঊর্ধ্বে যা খুশি দিতে পারে। যে যে ইউনিয়ন মুক্তাঞ্চলের ভেতরে সেখানে ইউনিয়ন পরিষদ আদায় করবে। আর যে এলাকা পুরো মুক্তাঞ্চল নয়, সেখানে যাদের দায়িত্ব দেয়া হবে তারা অর্থ সংগ্রহ করবে। পরদিনই সাইকোস্টাইল করে প্রচার করে দেয়া হলো। ওতে অসাধারণ ফল ফলেছিল। মাত্র পনেরো দিনে ৮৩ লাখ টাকা উঠেছিল। সেখানে ২৫ টাকার বেশি কারো ছিল না। বেশি সংখ্যকই ছিল দুই থেকে পাঁচ টাকা। এক টাকার পরিমাণও ছিল ৫০-৬০ হাজার। ঘোষণার বিশ দিনের মধ্যে যখন ৮৩ লাখ টাকা কাদেরিয়া বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে জমা হয়ে যায় তখন নির্দেশ দেয়া হয়, চকিদার, দফাদার ও ন্যাশনাল ডাক্তারদের বেতন দিয়ে দিতে। ১০-১৫ বছর চকিদাররা পুরো বেতন পায়নি। ন্যাশনাল ডাক্তার যাদের বেতন মাত্র ৭০-৮০ টাকা তারাও পায়নি। নির্দেশ দেয়া হলো হাল সন নাগাদ সবার বেতন শোধ করে দেয়া হোক। বিশ দিনে যে অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল ছয়-সাত দিনে ন্যাশনাল ডাক্তার, চকিদার, দফাদার, দাতব্য চিকিৎসালয়ের কর্মচারী, ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারীদের বেতন শোধ করে দেখা গেল তখনো অর্ধেক বাকি রয়ে গেছে।

পিতা, তোমাকে কী বলব, স্বাধীনতার পর গ্রামগঞ্জে গেলে চকিদার, দফাদারেরা আমাকে আয়ুব খানের চেয়েও বড় মনে করত। তারা মনে করত পাকিস্তান সরকারও তাদের বেতন একবারে দিতে পারে নাই। মুক্তিযুদ্ধ চলা অবস্থাতেও আমি তাদের ১০-১৫ বছরের বকেয়া বেতন একবারে দিয়ে দিয়েছি। তাই তাদের চোখে আমি ছিলাম আয়ুব সরকারের চেয়ে বড় সরকার। তোমাকে আরেকটি মজার ঘটনা বলিÑ জুন মাসের কোনো এক দিন ভূঞাপুর গেছি। আমার সাথে তখন ৩০০-৪০০ মুক্তিযোদ্ধা। তখনো কাদেরিয়া বাহিনী হয়ে ওঠেনি। আমরা সবাই মুক্তিবাহিনী। সেই যাত্রায় আনোয়ারুল আলম শহীদ, এনায়েত করিম, দাউদ খান, মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম আমার দলে যোগ দেয়। অ্যাডভোকেট মো: সোহরাওয়ার্দী ও সোহরাব আলী খান আরজুকে মাজায় রশি বেঁধে আনা হয়েছিল। নানা জায়গা থেকে লোকজন আসছিল। দুপুরের দিকে কমান্ডার লোকমান এক কাণ্ড ঘটায়। লোকেরপাড়ায় তার কোম্পানির দেড়-দুই শ’ যোদ্ধা নিয়ে অবস্থান করছিল। লোকমান তখনো মেজর হয়নি, হাওলদার ছিল। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে কাদেরিয়া বাহিনীর সে মেজর পদোন্নতি পায়। সেই লোকমানের কথা বলছি। ভীষণ আমুদে ও দাপুটে মানুষ। কোনো কাজে পিছু হটত না। সে ছোট লোক না বড় লোকেরপাড়ায় ঘাঁটি গেড়েছিল। মনে হয় ছোট লোকেরপাড়ায় হবে। পাঠক এমন ভাববেন না, বড় লোকেরপাড়া মানে ভালো ভালো মানুষের বাস আর ছোট লোকেরপাড়া মানে খুব বাজে লোকের বাস। এটা তেমন নয়। দু-তিন শ’ বছর আগে লোকেরপাড়ায় বড় বড় লম্বাচওড়া সুন্দর সুন্দর লোক বাস করত। তাই দূরের লোকেরা লোকেরপাড়ার সেই অংশকে বড় বড় মানুষের পাড়া বলতে বলতে সেটা বড় লোকেরপাড়া হয়ে যায়। অন্য দিকে দেখতে শুনতে একটু ছোটখাটো মাপের মানুষ যেখানে বাস করত, তাদের চিহ্নিত করতে গিয়ে মূল লোকেরপাড়া দুই ভাগ হয়ে একটা বড় বড় মানুষের পাড়া, আরেকটা ছোট ছোট মানুষের পাড়া, সেই মোগল আমল থেকে ভাগ হতে হতে বৃটিশ আমলে ছোট লোকেরপাড়া, বড় লোকেরপাড়া হয়ে গেছে। ছোট লোকেরপাড়াতেও এখন মস্তবড় বড় মানুষ বাস করে। সেখানে কয়েকটা বাড়িতে লোকমান উঠেছিল। এই এলাকার একসময়ের দুর্দান্ত ডাকাত ক’দিন আগে লোকমানের হাতে ধরা পড়ে পালিয়েছিল। সে রিপোর্ট করেছিল, ধরা পড়া ডাকাত গভীর রাতে চিকা হয়ে চিক চিক করতে করতে পালিয়ে গেছে। তার হাত-পা বাঁধা রশি ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল। সময় সময় রূপ বদল করার মতাই শুধু তার নেই গুলি করলে তার গায়ে গুলিও লাগে না। সেই পালিয়ে যাওয়া ডাকাতকে আবার ধরে আনা হয়েছে। সব শুনে যখন বললাম, ‘ঠিক আছে তুমি চিকা হয়ে পালাতে পারো, গুলি করলে লাগে না। আমি একটা গুলি করব। যদি না লাগে তোমার মুক্তি, আমরা আর কিছু বলব না।’ আমার কথা শুনে সে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ল। বললাম, ‘কাঁদছ কেন, মন্ত্র জানো, তোমার গায়ে গুলি লাগে না, কাছ থেকে নয়, পঞ্চাশ গজ দূরে দাঁড়াও অথবা এক শ’ গজ। গুলি করি, যদি না লাগে কেউ কিছু বলবে না। নতুন করে চুরি ডাকাতি না করলে কোনো অসুবিধা নেই। এখানে কান্নাকাটির কী আছে?’ সে একেবারে উন্মাদের মতো আমায় বুঝাবার চেষ্টা করল, ‘স্যার, গুলি করলে গুলি লাগে না এটাও আপনি বিশ্বাস করেন? গুলি করলে গুলি লাগবে না এটা কোন কথা? আপনি গুলি করলে আর বাচুম না।’

Ñ কেন বাঁচবে না? তোমার তো গুলি লাগে না।

Ñ না, না স্যার, রাজার বন্দুক মন্ত্র মানে না। আপনি গুলি করলে স্যার একেবারে মরে যাবো।

Ñ তাহলে পাবলিকের গুলিতে তুমি মরো না কেন?

Ñ স্যার, পাবলিকের গুলি গায়ে লাগলে তো মরমু। আমার নাম শুনে তারা ভয়ে থাকে অস্থির। তাদের হাত কাঁপতে কাঁপতে কোন দিকে গুলি যায়, গায়ে লাগে না। তাই সবাই বলে আমি মন্ত্র জানি। আসলে মন্ত্রটন্ত্র কিছু না। আমারে মাফ কইরা দেন।

Ñ তোমাকে মাফ করব, তাহলে যে চিকা হয়ে পালিয়ে ছিলে তার কী হবে? একবার তুমি আমার সামনে চিকা হও, তবে তোমায় মাফ করি।

Ñ হায় হায়! স্যার, মানুষ চিকা হইতে পারে? আপনার মতো জ্ঞানী মানুষ হইয়া এটা বিশ্বাস করতে পারেন?

Ñ তাহলে তুমি যে সেদিন লোকমানের কোম্পানি থেকে চিকা হয়ে পালিয়েছিলে তোমার হাত-পা বাঁধা রশি মেঝেতে পড়ে ছিল। কী করে সেগুলো পড়ে থাকল? মুক্তিযোদ্ধারা তো রিপোর্ট করেছে তুমি চিকা হয়ে চিক চিক করে চৌকাঠের নিচ দিয়ে পালিয়ে গেছো।

Ñ স্যার, ওসব ডাহা মিথ্যা। আমি চৌকাঠের নিচ দিয়া পালাই নাই, চৌকাঠের ওপর দিয়া পালাইছি।

Ñ তাহলে যে তোমার হাত-পা বাঁধা ছিল, তার কী হলো?

Ñ স্যার, চিকাটিকা ওসব কিছু না। দুপুর রাতে আমার গ্রামের দুই যোদ্ধার ডিউটি পড়ছিল। তাগর ডাইকা কইলাম, সকালে তো স্যারের কাছে নিয়া যাইব, যদি দয়াধর্ম কইরা স্যার জীবন ভিা দেয়, শালারা তোগো দুইডারে এক মিনিটও রাখুম না, এক কোপে ধরডা ফালাইয়া দিমু। তাই বাঁচতে চাইলে হাত-পা খুইলা দে, আমি পালাইয়া যাই। ভয়েডরে হাত-পা খুইলা দিছিল, আমি পালাইয়া গেছিলাম। চিকার গপ্প হেরাই বানাইছে।

পিতা, তোমাকে আর কী বলি! মুক্তিযুদ্ধের সময়জুড়ে এমন কত যে আজব ঘটনা ঘটেছে সারা বছর বললেও শেষ হবে না।

ভরত সমাচার। স্বাধীনতা ’৭১-এ এক জায়গায় উল্লেখ করেছি। আনোয়ারুল আলম শহীদদের মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার রাতে। কত আর হবে, রাত আট-নয়টার দিকে কেবলই ঘরে গেছি। ভরত তখন ভূঞাপুর জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কাজ করে, দেখাশোনা করে। জাতে মুচি। দিনে ডাকবাংলোর সামনে জুতা সেলাই করে। তাতে যে দু-চার পয়সা হয় এবং ডাকবাংলো দেখাশোনার জন্য যে ৭০-৮০ টাকা বেতন পায়, তা দিয়ে তার পরিবার মোটামুটি চলে। ডাকবাংলোর পেছনে সারভেন্ট কোয়ার্টার মানে চাকর নিবাসে বাস করে। একেবারে মূল শহরে খুপরি দালান ঘরে বাস করা তার উপরি পাওনা। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সেই ঐতিহাসিক ডাকবাংলোটি রা করা হয়নি। পাশে থানা হয়েছে। ডাকবাংলোটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে। বছর চারেক আগে একবার গিয়েছিলাম। আশপাশে আগাছা দেখলাম। সেখান থেকে আমি যেমন যুদ্ধ পরিচালনা করেছি, কাদেরিয়া বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের হেড কোয়ার্টার ছিল। ১২ ও ১৩ আগস্ট হানাদার সেনাপতি নিয়াজিও সেই ডাকবাংলো থেকে কাদেরিয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। এমকি বিমান হামলা করেও খুব সুবিধে করতে পারেনি। কোথাও বললে কোনো কাজ হবে না। তবু তুমি জনক। তাই বলে রাখলাম। তোমার কন্যা মুক্তিযুদ্ধের বড় ঠিকাদার সেজেছে। দু-এক জায়গায় যখন বলে, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি’, তখন এমন হাসি পায়! আর কেউ না জানলেও তুমি তো জানো, মুক্তিযুদ্ধের সময় তোমার কন্যা ছিল সন্তানসম্ভবা। তুমিই বলে গিয়েছিলে ছেলে হলে নাম জয় রাখতে। জুলাই মাসে জয়ের জন্ম। তাও বলে আমরা যুদ্ধ করেছি। তা বলুক। তোমার কন্যা তো। বললে আর কী করা যাবে? এবার ভরতের কথা শোনো। ঘরে বসেছিলাম। এদিক-ওদিক থেকে তখনো লোকজন আসছিল খবরাখবর নিয়ে। একসময় হাত কচলাতে কচলাতে সে বলল, ‘স্যার, আপনারে স্যার স্যার বইলাই মনে হয়। এর আগে আপনার মতো একটা বড় স্যার আইছিল। তা ছাড়া এই কয় বছরে যারা আইলো-গেলো তাগোর কারও স্যার মনে হয় নাই।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন? কত নেতা কত অফিসার এলো-গেলো তাদের কেন স্যার স্যার মনে হলো না?’

Ñ না স্যার, কী স্যার স্যার মনে হইব? কয় বছর আগে আপনার মতো একটা বড় স্যার আইছিল। হায় হায় কত গাড়ি, কত বন্দুক, কত দারোগা-পুলিশ-মিলিটারি। হেইডা একটা স্যার ছিল। আর আপনি একটা স্যার। কত বন্দুক দেখতাছি। আপনারে স্যার স্যার মনে হইতাছে।’ ভরত চলে গিয়েছিল। কিন্তু তার কথা আমার মাথা থেকে যাচ্ছিল না। অনেক পরে হঠাৎ মনে হলো ’৬৭-এর কোনো একদিন প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খানের দাওয়াতে গভর্নর মোনায়েম খান এসেছিলেন। তখন এলেঙ্গা-ভূঞাপুর রাস্তা পাকা ছিল না। সারা দিনে একটা বা দুইটা গাড়ি চলত। এলেঙ্গা থেকে ১২-১৩ মাইল রাস্তা প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগত। বৃষ্টি হলে দুই-তিন দিন সব বন্ধ থাকত। সেই সময় একবার মোনায়েম খান ওই বাংলোতে গিয়েছিলেন। মিলিটারি, পুলিশ, ইপিআরে ভরে গিয়েছিল। শতাধিক নানা ধরনের গাড়ি, রাখার জায়গা ছিল না ভূঞাপুরে। তাই মোনায়েম খানকে ভরতের স্যার স্যার মনে হয়েছিল। তার বছর চারি পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের কাছে নানা ধরনের অস্ত্র দেখে তাদের নেতা হিসেবে আমাকে স্যার স্যার মনে হয়েছে। কিন্তু বেসামরিক কাউকেই তার কোনো দিন স্যার স্যার মনে হয়নি। পরদিন সকালে ভরত আরেক কাণ্ড বাধিয়ে বসে। ডাকবাংলোর সামনে দরিদ্র মহিলা ও বাচ্চাদের কাপড়, শাড়ি আর নারী-পুরুষ সবাইকেই এক ঢাকি চাল দেয়া হচ্ছিল। ভরতের স্ত্রী মহিলা লাইনে দাঁড়িয়েছিল। তার হাতে দুই-তিনটা বাচ্চার কাপড় ও শাড়ি দিতেই চিলের মতো উড়ে গিয়ে এক মহিলাকে বকাঝকা করে লাইন থেকে বের করে দিচ্ছিল। আমি বারান্দা থেকে দেখছিলাম। ভরত মহিলাকে বকাঝকা করায় আমি অসন্তুষ্ট হয়ে বেশ চিৎকার করে ডেকেছিলাম, ‘এই ভরত, তুমি মহিলার সাথে খারাপ ব্যবহার করছ কেন?’ ভরত ছুটে এসে আমার পায়ের পড়ে জিভ কেটে বলছিল, ‘হায় হায় স্যার, ওটা মহিলা না।’

Ñ তুমি ভদ্র মহিলার সাথে খারাপ ব্যবহার করছ। আবার বলছ ওটা মহিলা না। বেয়াদবি করো? তোমাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। তার পরও সে বলল, ‘হায় হায় স্যার, ওটা ভদ্র মহিলা না… ওটা যে আমার বউ। ও লাইনে দাঁড়াইছে ক্যান? ও মুক্তিগোরে জিনিস নিলে গরিবে নিবো কী? আমারে স্যার আপনে মুক্তিতে নিয়া ন্যান।’ আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, একজন হতদরিদ্র মুচি ডাকবাংলোর দারোয়ান সেও সাহায্য নিতে চায় না। তার স্ত্রী নিলে অন্যেরা পাবে কী? আর এখন কত বড় বড় সরকারি কর্তা, কত নেতানেত্রী কোনো কিছু পেলে সবার আগে ভাগ বসায়। চলবে)

(নয়া দিগন্ত, ১২/০১/২০১৩)

Keywords: