নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > জননেতা রাজ্জাকের প্রতি মন্ত্রীর এত আক্রোশ কেন?-২

জননেতা রাজ্জাকের প্রতি মন্ত্রীর এত আক্রোশ কেন?-২

Saturday 19 November 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
বাংলাদেশের যুব আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ভাই শেখ মারুফ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। ছোট্ট মানুষ, রাজপরিবার। মাত্র কয়েক মাস ছিল। যতটা পেরেছি ছায়ার মতো আগলে রেখেছি। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি চিঠি দিয়েছিলেন, ‘বাবা কাদের, মারুফকে দেখো।’ চিঠি না দিলেও দেখতাম। শেখ ফজলুল করিম সেলিমও কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি লতিফ সিদ্দিকীকে লিখেছিলেন, মারুফ আপনাদের ওখানে গেছে, ওকে একটু দেখবেন। দিন যায় কথা থাকে; একসময় সেই দুঃসহ সময়েরও শেষ হয়েছিল। আমি ’৯০-এ দেশে ফিরি। তার আগেই সবাই দেশে ফিরেছিল। তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে একসময় আওয়ামী লীগ ছেড়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করি। নিয়মিত গলায় গামছা নিয়ে সংসদে যেতাম। ২০০১ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে।

২০০২ সালে অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমনে ‘ক্লিনহার্ট’ নামে এক যৌথ অভিযান চালায়। গণতান্ত্রিক দেশ, রাজনৈতিক সরকার। রাজনীতিকদের সে যে কী নাজেহাল-অপমান-অপদস্থ করে তার কোনো কূলকিনারা ছিল না। অনেকের কথা বাদই দিলাম। বিএনপির প্রতাপশালী প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমানের গাড়ি আটকে তার সরকারি গানম্যানকে মারধর করে। বিরোধী দলের তো কথাই নেই। সরকারি দলেও ত্রাহি ত্রাহি ভাবের সৃষ্টি হয়। সংসদ সদস্য হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গ ও শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে চোখ বেঁধে নির্মাণাধীন ন্যাম ফ্ল্যাটে নিয়ে আটকে রাখে। আওরঙ্গ ভারতে থাকতে আমার কত যে বিরোধিতা করেছে তা বলেকয়ে শেষ করা যাবে না। আওরঙ্গের বড় ভাই ছুটে এসেছিলেন। আওরঙ্গকে মেরে ফেলবে, ওর হাত-পা-চোখ বেঁধে ফেলে রেখেছে, ওকে বাঁচান। খবর শুনে স্পিকারের কাছে গিয়েছিলাম। স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার সে দিন যথার্থ অভিভাবকের মতোই কাজ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি একজন সাহসী মানুষ, আপনি তো মনে করেন সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে স্পিকারই সব, আসলে বর্তমানে তা নয়। আমাকে যা বললেন তা-ই ম্যাডামকে গিয়ে বলুন।’ ওখান থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। সংসদনেতাকে বলেছিলাম, ‘সংসদ সচল থাকতে কোনো সদস্যকে এভাবে গ্রেফতার করা যায় না। ওভাবে চোখ-মুখ বেঁধে ফেলে রাখা সভ্যতার অপমান, গণতন্ত্রের অপমান। আপনি সংসদের নেতা, আপনার সংসদ সদস্যের অপমান মানে আপনারও অসম্মান। এগুলো বন্ধ করুন।’ কেন জানি না সে দিন বেগম খালেদা জিয়া সভ্যতা-ভব্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। আওরঙ্গকে হত্যা তো দূরের কথা তাদের ওপর আর জুলুম হয়নি।

নিয়মমাফিক তারা মুক্তি পায়। ’৭৫-এ শেখ মারুফকে ছায়া দিয়ে আগলে রাখলেও পরে সে আর কখনো আমার তেমন খোঁজখবর নেয়নি। খুব একটা কৃতজ্ঞতার স্পর্শও পাওয়া যায়নি। শেখ ফজলুল করিম সেলিম সাহেবের গ্রেফতার নিয়ে অত কিছু হওয়ার পর একবারের জন্য কোনো ধন্যবাদ দেননি। কিন্তু যাকে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ-গুণ্ডা বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গের কৃতজ্ঞতাবোধে কোনো ঘাটতি দেখিনি। যতটা সম্ভব সব সময়ই সে তার সেই দুঃসময়ের কথা মনে রাখার চেষ্টা করেছে। এমনকি যখন মহিলা আসনে নির্বাচনের প্রশ্ন আসে তখন নিজে থেকে আমার স্ত্রী নাসরীন সিদ্দিকীকে মহিলা সদস্য করার প্রস্তাব করে। সে প্রস্তাবে মৌলভীবাজারের স্বতন্ত্র সদস্য এম এম শাহীন সানন্দে সমর্থন জানায়।

হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গের উৎসাহে একদিন ইত্তেফাক অফিসে যাই এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে বিষয়টি খুলে বললে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উপযুক্ত সন্তানের মতোই গর্বসহকারে মহিলা সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নাসরীন কাদের সিদ্দিকীর নাম সমর্থন করেন এবং বলেন, ‘আপনার স্ত্রীর নাম আমাদের দলের পক্ষ থেকে সমর্থন করতে পারায় আমি গর্ব বোধ করছি।’ এরপর সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি. চৌধুরী মুন্সীগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়ে এলে তাকে বলার সাথে সাথে তার বাবার সাথে কথা বলে পরদিনই নাসরীন কাদের সিদ্দিকীর মহিলা সংসদ সদস্যপদের প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। মহিলা সংসদ সদস্য নির্বাচনে অনেক বিলম্ব হয়। পরে এ নিয়ে অনেক মাদারীর খেল হয়। একজন মহিলা সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ৪.৬৬ সদস্যের সমর্থনের দরকার হতো। সে ক্ষেত্রে আওরঙ্গ, মাহী, শাহীন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও আমি মোট পাঁচ সদস্যের সমর্থন নাসরীন কাদের সিদ্দিকীর মহিলা এমপি হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বড় মানুষের যে অত ছোট লোভ থাকে তা আমরা গ্রামের লোকেরা রপ্ত করতে পারিনি। এমনিতেই বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তাদের নাকি আরো চাই। বিএনপিকে ডুবানোর নাটের গুরু হারিছ চৌধুরী এম এম শাহীনকে সমর্থন প্রত্যাহার করতে বললে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন। অন্য দিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে তার স্ত্রীকে এমপি বানানোর লোভ দেখিয়ে তার সমর্থন প্রত্যাহার করতে বলেন। এসবের কিছুই আমি জানতাম না। যখন নির্বাচনের সময় আসে সংসদ সদস্যদের সমর্থন করা চিঠি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দিই। সেখানে যাচাই করতে গিয়ে এসব খবর বেরিয়ে আসে। এম এম শাহীন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করলেও যার এত বদনাম ভদ্রসমাজে, যে মানুষের মধ্যেই পড়ে না, সেই হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গকে হারিছ চৌধুরী ও অন্যরা শত লোভ ও চাপ দিয়েও কিন্তু তার সমর্থন প্রত্যাহার করাতে পারেনি। আর মাহী বি. চৌধুরীর সমর্থন প্রত্যাহারের তো কোনো প্রশ্নই আসে না। সে একটি সম্ভ্রান- মর্যাদাশীল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। সে তার পারিবারিক ঐতিহ্য ও মর্যাদা এ ক্ষেত্রে অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছে।

আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব কখনো-সখনো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আওয়ামী লীগের মূল নেতা বানাতে চেয়েছেন। আসলে হুজুর মওলানা ভাসানী থাকাকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগ বা আওয়ামী লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মূল নেতা ছিলেন না। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে মূল নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী। আর উপলক্ষটা ছিল টাঙ্গাইল দক্ষিণ উপনির্বাচনে শামসুল হকের বিজয়। কোটারি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ১৫০ মোগলটুলী নামে মুসলিম লীগের একটি উপদল বা বিদ্রোহী গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছিল এবং তখন এর মূল নেতৃত্বে ছিলেন বর্ধমানের আবুল হাসেম। তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমাদের বঙ্গবন্ধু তখনকার শেখ মুজিব এই আবুল হাসেমের ভাবশিষ্য ছিলেন। অন্য দিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেই স্কুলজীবন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে চিনতেন। যে কারণে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতায় ভর্তি হলে অবিভক্ত বাংলায় সবচেয়ে আলোচিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতা ও স্নেহাশিস পেয়েছেন। কিন্তু ’৪৯ সালে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় ছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের দিন স্টিমারযোগে কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জেও এসেছিলেন; কিন্তু তখনকার পূর্ববাংলা সরকার তাকে জাহাজঘাটে নামতে দেয়নি। ভারতের দালাল, তাদের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে গালাগাল করে সেই জাহাজেই ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এরপর ১৯৫১ সালে প্রথমে করাচি এবং তারপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় আসেন ও আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত হন। হুজুর মওলানা ভাসানী আলাদা দল গঠন করলে সোহরাওয়ার্দী সাহেবই হন আওয়ামী লীগের কর্ণধার। কিন্তু আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে মার্শাল ল জারি করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

আইয়ুবের অধীনে ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে দলবিহীন গণতন্ত্রের নামে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট এনডিএফ গঠন করা হয়। এনডিএফের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী সাহেব সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে এক নতুন আশার আলো জ্বালান। কিন্তু ’৬৩ সালের শেষে অসুস্থ হয়ে প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তান এবং সেখান থেকে বিলেত যান। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফেরার পথে হঠাৎই বৈরুতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক- এ প্রশ্নের মীমাংসা আজো হয়নি। এরপর আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। অস্থায়ী সভাপতি হন আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ছয় দফা আন্দোলনের সূচনায় তেজগাঁও শিল্প এলাকায় মনু মিয়া জীবন দেন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতা কারাবন্দী হন। সেই সময় আমেনা বেগম এবং ময়মনসিংহের সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হতে থাকে। ’৬৬, ’৬৭ ও ’৬৮ সাল বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য বছর। এ সময় চাঁদপুরের মিজানুর রহমান চৌধুরীও আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। ’৬৮তে শেখ মুজিবের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু করা হলে দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। এসব আন্দোলনের মোটামুটি সূচনা হয়েছিল ’৬২ সালের সেপ্টেম্বরে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ’৬৮ সালে ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সারা দেশে ছাত্র আন্দোলন ব্যাপক রূপ পায়। বাংলাদেশে এর আগে ওরকম ব্যাপক ছাত্র গণ-আন্দোলন আর কখনো হয়নি। তাতে একসময় গণ-আন্দোলনের তোড়ে আইয়ুব-মোনায়েমের তখতে তাউস ভেসে যায় এবং তারা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়।

মজার ব্যাপার, যাকে অবলম্বন করে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম হয়েছিল সেই আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের মূল্যায়ন হয়নি। যে আমেনা বেগম একেবারে ডুবে যাওয়া আওয়ামী লীগকে টেনে তুলেছিলেন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে বিজয়ের পর তাকে সাইড লাইনে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগের সেসব নেতাও স্বাধীনতার পর খুব একটা জায়গা পাননি। মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীন আহমদের ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বাধীনতাকামী মানুষ হাজার বছর মনে রাখবে। অমন অবিচল নেতৃত্ব না থাকলে ষড়যন্ত্রের কাছে আমরা হয়তো হেরে যেতে পারতাম। শোনা যায় আমাদের প্রধান সেনাপতিও নাকি বারবার পদত্যাগ করতে চেয়েছেন। আজকে যারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গিলেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ই তারা আওয়ামী লীগ ও সরকারকে গ্রাস করতে চেয়েছিল। ৯৮ শতাংশ ভোট পাওয়া দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী সরকার বাদ দিয়ে তারা একটি মিলেঝিলে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিল। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী না থাকলে তাদের প্রস্তাবে একটি মিলঝিল সরকারও হয়ে যেতে পারত। স্বাধীনতা যুদ্ধে অমন ইস্পাত কঠিন নেতৃত্ব দানকারী তাজউদ্দীন আহমদের আওয়ামী লীগে বেশি দিন স্থান হয়নি। ষড়যন্ত্রকারীরা সব সময় ষড়যন্ত্রে সফল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ করেছিলাম। হাজার হাজার বঙ্গসন্তান আমার সাথী হয়েছিল। বেশুমার নেতা-নেত্রী সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই দুর্যোগের সময় আবার মৃত আওয়ামী রাজনীতিকে যিনি জীবিত করেছিলেন সেই জোহরা তাজউদ্দীন আজ জীবিত থেকেও মৃত। সাত-আট বছর তার কোনো খোঁজখবর নেই। কোথায় আছেন, কেমন আছেন- দেশবাসী তো দূরের কথা, আওয়ামী ঘরানার লোকেরাও তা জানে না। আজ প্রায় এক বছর বাংলাদেশের একসময়ের যুবকের হৃৎস্পন্দন প্রবীণ নেতা আবদুর রাজ্জাক অবহেলা আর অনাদরে ব্রিটেনের হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। সেই অবস্থাতেও এক বামপন্থী ঘরানার মন্ত্রী নিদারুণ অপমানজনক উক্তি করে দেশবাসীকে মর্মাহত করেছেন। এ নিয়ে খুব একটা ভাবি না।

আওয়ামী লীগ সব সময় নিজের সন্তান কোরবানি দিয়ে অন্যের মনোরঞ্জন করে। আবদুর রাজ্জাকের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। ’৮১ সালের সম্মেলনে মালেক উকিল, মিজান চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ ও জোহরা তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব নিয়ে যখন খুবই প্রতিযোগিতা চলছিল, তখন দলীয় ঐক্য অটুট রাখতে আবদুর রাজ্জাক, ড. কামাল হোসেন, আবদুল মান্নান সাহেবরা ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যারা সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে মনোনীত করেছিলেন, তাদেরই ছুড়ে ফেলা হয়েছে। টাঙ্গাইলের জননেতা আবদুল মান্নান খুবই অবহেলায় বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। যার আওয়ামী লীগে, মুক্তিযুদ্ধে কারো চেয়ে কম অবদান ছিল না। জননেতা আবদুর রাজ্জাক ব্রিটেনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার চিকিৎসা নিয়ে কত মাদারীর খেল চলছে। বাংলাদেশ না হলে যাদের নাম পত্রিকার পাতায় ছাপা হতো কি না সন্দেহ, সেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে কটূক্তি করেন, তাচ্ছিল্য করেন। এ বয়সে তা আবার আমাদের সহ্য করতে হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে যার পরিবার দিশেহারা, যারা রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন- তাদেরই অন্যতম প্রধান একজন নেতার চিকিৎসার খরচ এখনো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যবস্থা হলো না। আওয়ামী লীগের একসময়ের সফল সাধারণ সম্পাদক, ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব কর্মসূচির জেলা গভর্নর আবদুল জলিল তার বাবার মতোই বিশাল হৃদয়ের মানুষ। শত্রু-মিত্র সবার জন্যই তার দুয়ার খোলা। শুনেছিলাম তাদের ব্যাংক থেকে জননেতা আবদুর রাজ্জাকের জন্য দুই কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। সে জন্য খুবই শঙ্কিত ছিলাম ঋণের টাকা তারা শোধ করবেন কী করে। ক’দিন আগে সিংহহৃদয় আবদুল জলিলের সাথে এ প্রসঙ্গে কথা হয়। তার কথা শুনে খুবই আশান্বিত হয়েছি। নিজে একজন অসুস্থ মানুষ। সপ্তাহে নিয়মিত দু’বার ডায়ালাইসিস করেন। মানে যান্ত্রিক উপায়ে রক্ত পরিষ্কার করেন। কোথাও দুই দিনের জায়গায় তিন দিন থাকার উপায় নেই। যার এক পা দুনিয়ায়, আরেক পা কবরে। তার সতীর্থের জন্য, নেতার জন্য অমন মায়া দেখে অভিভূত না হয়ে পারিনি। তিনি বলেছেন, ‘তক্ষুনি টাকা দেয়ার আর কোনো পথ ছিল না বলে ঋণ মঞ্জুর করেছি। ওই ঋণ রাজ্জাক ভাইয়ের পরিবারের নয়, ওই ঋণ আমাদের সংস্থার। আমরা আমাদের সংস্থা থেকে ওই ঋণ শোধ করব। ব্যাংক থেকে শোধ করতে যদি অসুবিধা হয় প্রয়োজনে নিজের সম্পত্তি থেকে শোধ করব। ঘাটতি পড়লে বাপ-দাদার হিস্যা থেকে করব, রাজ্জাক ভাইয়ের পরিবারকে বিব্রত করব না।’ বহু দিন পর অমন অনুভূতির পরশে তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় মনপ্রাণ পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আর কিছুটা স্বস্তি ও পেয়েছি। আল্লাহ না করুন হঠাৎ যদি কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হই, অন্তত একজন সহৃদয় ব্যক্তি তো আছেন, যিনি বিমুখ করবেন না।
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ১৯/১১/১১]

Keywords: