নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > জননেতা রাজ্জাকের প্রতি মন্ত্রীর এত আক্রোশ কেন?

জননেতা রাজ্জাকের প্রতি মন্ত্রীর এত আক্রোশ কেন?

Saturday 5 November 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
বেশ কয়েক মাস ধরে পত্রিকাটি নিয়মিত লেখার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কথা দিয়েছিলাম ঈদের পরে সপ্তাহে না হলেও অন্তত পনেরো দিনে একটি লেখা দেবো। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় তার আগেই এ লেখাটি লিখছি। চারিদিকে অশান্তি। কেমন যেন অস্থিরতা। একটু যত্ন নিয়ে ভালোভাবে বললেই যেখানে অনেক বিতর্কের অবসান হতে পারে, সেখানে কেন এত লাগামহীন কথাবার্তা বলে নিজেদের যেমন, অন্যদেরও তেমন ক্ষতবিক্ষত করি। কেউ ভাবে না কারো ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সেই ’৬৯ সালে লিবিয়ার গাদ্দাফি ক্ষমতা দখল করেছিলেন। একসময় জনপ্রিয়ও হয়েছিলেন। ক্ষমতার দম্ভে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কোলে নিয়ে এত দিন লালন-পালন করেছিলেন। কিন্তু এই সে দিন বিরোধীদের হাতে তাকে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে। অন্যায় করলে এমনিই হয়। ৪২ বছর ক্ষমতায় থেকেও তার ক্ষমতার স্বাদ মেটেনি। দু-এক বছর আগে ক্ষমতা ছেড়ে দিলে হয়তো শেষ জীবনটা সম্মানেই কাটত। মিসরের হোসেনি মোবারক ছয় মাস আগেও নির্বাচন দিয়ে দিলে এমন নাজেহাল হতেন না। এটা বোধ হয় গদিরই ধর্ম। কেউ ছাড়তে চায় না। সেই গদির গরমেই বোধ হয় পতিত বামপন্থী নেতা বাংলাদেশের এক মহান প্রবীণ রাজনীতিক নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান, মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে বিদেশ বিভূঁইয়ে মারাত্মক অশোভন বেদনাদায়ক উক্তি করেছেন। দেশে আজ বিচার-আচার নেই। থাকলে তিনি যে কী কঠিন শাস্তি বা বিচারের সম্মুখীন হতেন, ভেবে পাই না।

কয়েক শ’ বছর আগে কাশ্মিরের রাজপ্রাসাদে রাজার অনুপস্থিতিতে তার বিছানা ঝাড়পোঁছ করার সময় কেমন আরাম পরখ করতে গড়াগড়ি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া এক দাসীকে কষে বেত মারছিলেন। বেত খেয়ে কান্নার বদলে খিলখিল করে হাসার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল, ‘পরখ করতে গিয়ে একটুক্ষণ ঘুমানোয় আমাকে বেত মারছেন? আপনি কতকাল এমন আরামদায়ক বিছানায় ঘুমাচ্ছেন, আল্লাহ আপনাকে যে কত বেত মারবেন তাই ভেবে হাসছি।’ দাসীর কথা শুনে সে দিনই রাজা প্রাসাদ ছেড়ে ফকির সেজেছিলেন। কী বলব, সত্যিই যদি দেশে ন্যায়নীতি, আচার-বিচার থাকত, তাহলে মন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ বর্ষীয়ান নেতা আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে ফ্রান্সের মাটিতে অমন অশোভন হৃদয়হীন উক্তি করতে পারতেন না। যখন তিনি প্রবাসে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন, শুধু একজন হৃদয়হীন অমানুষের পক্ষেই অমনটা বলা সম্ভব। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ক’জন লোকের সাধ্য আছে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার? রাজ্জাক সাহেবের সে রকম সামর্থ্য রয়েছে বলেই তিনি লন্ডনে চিকিৎসা করাচ্ছেন। আমি দেশে গিয়ে তার বিষয়ে খোঁজখবর নেবো।’ তার এ উক্তিতে বোঝা যায়, রাজ্জাক সাহেবের ব্যাপারে তিনি তেমন কিছুই জানেন না। ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরে খোঁজখবর নেবেন। দু-একজন মানুষ লন্ডনে চিকিৎসা করতে পারে? রাজ্জাক সাহেবের সামর্থ্য আছে তাই করছে।

এমন নির্মম ব্যঙ্গোক্তি এর আগে অত বড়মাপের কোনো নেতা সম্পর্কে কেউ করেছে কি না আমার জানা নেই। একসময় যারা জনাব আবদুর রাজ্জাকের জুতা-খড়ম-বোঁচকা টেনে ধন্য হতেন, তারা এখন পৃথিবীময়। আজ প্রায় আট-দশ মাস রাজ্জাক সাহেবের চিকিৎসার জন্য তার পরিবার-পরিজন কিভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরে পেরেশান হচ্ছেন, মন্ত্রীর গদির তাপে তিনি এখনো তা জানেন না। কী নিষ্ঠুর পরিহাস! ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হলে ঘর ছেড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলাম। হাজার হাজার বঙ্গ সন্তান আমার সাথে যোগ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে সেই সময় সরকারের হাতে শতাধিক লোক নিহত হয়। কয়েক হাজার কারা নির্যাতন ভোগ করে। জনাব আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, আবদুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান আরো অনেকেই কারা নির্যাতন ভোগ করেন। জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামানকে জেলের অভ্যন্তরে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই সময় জনাব নাহিদের মতো এসব নেতা জনাব জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচিতে কোদাল হাতে অংশ নিয়েছিলেন। আসলেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। বঙ্গবন্ধুর খুনের সহযোগীরা তারই কন্যার মন্ত্রিসভায় এমন দাপট দেখাচ্ছেন, যা দেখে তাজ্জব হতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের পক্ষে থাকলে যদি দালাল, আলবদর, রাজাকার হতে হয়, তাহলে যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, হত্যায় সহযোগিতা করেছে- আওয়ামী লীগের বিচারে তারা কী হয়? এখন তো দেখছি বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে বা হত্যায় সহযোগিতা করেছে, আকারে-ইঙ্গিতে তারাই সব। আর যারা প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ করেছে, জেলজুলুম সহ্য করেছে, আজ তারাই বর্তমান সরকারের বা নেতৃত্বের কাছে প্রধান শত্রু। তা না হলে যেখানে আওয়ামী লীগের বিচারে নুরুল ইসলাম নাহিদের অপরাধী হওয়া উচিত, সেখানে তিনি পুরস্কার পান কী করে? আসে-ধীরে তিনি সাধু ভাষায় কথা বলার কারণে যদি এমন হয়, সেটা ভিন্ন কথা। সারা জীবন দেখে এলাম, যারা খুবই বিনয়ী তাদের বেশির ভাগ ভালো হয় না। অন্তরটা বড় বেশি কালো হয়। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত।

রাস্তাঘাটে জনশ্রুতি- দারোগা, পুলিশ, ইঞ্জিনিয়াররা দুর্নীতিপরায়ণ। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে কোনো অংশে কম নয়। রাত-দিন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে- ওই মন্ত্রণালয়ের অধিদফতরগুলোর লোকজন তো বটেই, সেখানকার আলমারি-টেবিল-চেয়ার এমনকি দরজার সামনে পিয়নের টুলগুলোও যে পরিমাণ ঘুষ খায়, অন্যান্য বিভাগ নাকি তার ধারে-কাছেও নয়। পিতৃতুল্য শিক্ষকেরা শিক্ষা ভবনে গিয়ে সে যে কী অবহেলা, অনাদর ও অপমানিত হন, তা বলার নয়। বছরের পর বছর যারা অন্যের সন্তানকে মানুষ করেন, তারা অবসরে গিয়ে যে কী বিড়ম্বনার শিকার হন, তা কহতব্য নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্মাণ বিভাগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের কাজ নির্মাণ জগতে সবচেয়ে নিম্নমানের। সেখানে নাকি একেবারে টপ টু বটম অনিয়মে ভরা। নৈতিকতার দিক থেকেও বর্তমান মন্ত্রীর নেতৃত্বের শিক্ষা জগতের তেমন কোনো উন্নতি ঘটেনি। পরীক্ষায় নকল প্রবণতা আগের চেয়ে কমলেও এ ক্ষেত্রে বর্তমান মন্ত্রীর তেমন কোনো ভূমিকা নেই। যে যা-ই বলুন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের ভূমিকা এখন পর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রীর চেয়ে বেশি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু কুলাঙ্গার পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে আমাদের মা-বোনদের তুলে দিয়েছে। এখনো সেই ধরনের কথা যখন শুনি, লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে। আগে ছাত্রনেতারা রাজনীতি করত, তাদের অনুগত শত শত হাজার হাজার মেয়েকর্মী থাকত। তারা অনেকে প্রেম করে বিয়েও করেছে। কিন্তু কেউ কাউকে উপহার দেয়ার চেষ্টা করেনি। ’৯০-এর গণ-আন্দোলনে দেশে ফিরে ছাত্রনেতা হিসেবে ইসহাক আলী পান্নাকে বিয়ানীবাজারের এক কলেজে নবীনবরণে দেখেছিলাম। ছোটখাটো সুন্দর ছেলে, একসময় ঢাকা কলেজের জিএস বীর মুক্তিযোদ্ধা আমার ছেলেবেলার বন্ধু দাউদকান্দির নজরুলের মতো দেখতে, চরফ্যাশনে অধ্যাপক নজরুলের আকস্মিক মৃত্যুতে সেখানকার উপনির্বাচনে পান্না আমার সাথে ছয়-সাত দিন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাছ ব্যবসায়ী জাফরউল্যাহ চৌধুরীর পক্ষে প্রচার করেছিল। সে প্রেম করে বিয়ে করেছে। আমার মেয়ের মতো টাঙ্গাইলের লাভলী বিয়ে করেছে সুভাষ সিংহ রায়কে। ওরকম আরো অনেক আছে। কিন্তু এখনকার মতো মেয়েদের সম্মান সম্ভ্রম কোনো ছাত্র নেতা-নেত্রীরা নষ্ট করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা, ভদ্রলোক ভাইস চ্যান্সেলর থাকতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের সম্মানহানির নাকি সেঞ্চুরি পালিত হয়েছে। কিভাবে যে সর্বত্র এসব লোক জেঁকে বসেছেন তার কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাই না।

’৯০-এর সাধারণ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা নিয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদ বিয়ানীবাজার থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। আউল বাউল শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ গুরুদেব জনাব শেখ ওয়াহিদকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। তিনি প্রচারণাও শুরু করেছিলেন, তার হাজার হাজার পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছিল। সেই মানুষটাকে রাজনৈতিকভাবে হত্যা করে একেবারে শেষ মুহূর্তে নুরুল ইসলাম নাহিদকে কী কারণে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল তা যারা দিয়েছিলেন তারাই জানেন। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বঙ্গবন্ধুর বড় আদরের শেখ ওয়াহিদ আমার সাথে বেশ কয়েকবার তার আউল বাউল শিল্পীগোষ্ঠী নিয়ে টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর মাজারে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্য ভদ্রলোক দিওয়ানা। তাকে কোরবানি করে এসব বসন্তের কোকিলকে কেন যে ঘরে ঠাঁই দিয়েছে জানি না। এসব কথা আগে কখনো বলতাম না, ভাবতামও না। এখন কেন যেন এসব অসঙ্গতি দেখে আপনা-আপনি ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। বারবার মনে হয় ’৭৫-এ এদের মতো লোকজন নিয়ে বঙ্গবন্ধু বাকশাল না করলে হয়তো ওই সময় তিনি এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতেন না। বাংলাদেশেরও এ দুরবস্থা হতো না। তাই বড় বেশি ভয় হয়।

অসঙ্গতি শুধু এখানে নয়। অসঙ্গতি সবখানে। এই সেদিন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হলো। সেলিনা হায়াত আইভী নামে একজন অতি সাধারণ সাদামাটা মহিলা শুধু দৃঢ়তার জোরে সবাইকে তাক লাগিয়ে জয়ী হয়েছেন। তার এ বিজয় অনেকের কাছে সাধারণ মানুষের ইচ্ছা ও অভিব্যক্তির বিজয়। হতেও পারে। আবার সম্পূর্ণ উল্টোও হতে পারে। আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে শামীম ওসমানকে সমর্থন করেছিল। যদি শামীম ওসমানকে সমর্থন না করে সেলিনা হায়াত আইভীকে সমর্থন করত, তাহলে কী হতো? তখন কি আইভী জয়ী হতেন? নাকি বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার হতেন? নাকি অন্য কেউ? সাধারণ মানুষ আইভীকে তাদের প্রতীক হিসেবে ভোট দিয়েছে। মানুষ এই দুই বলয়ের বাইরে আসতে চায়। সে জন্যই ভোট দিয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো- নির্বাচনের আগে শামীম ওসমানকে সন্ত্রাসী-গডফাদার বলে জয়ী হয়ে পরের দিন এক সাথে কাজ করার অঙ্গীকার করলে মানুষ সেটাকে কিভাবে নেবে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষ সেলিনা হায়াত আইভীকে তাদের কোলে তুলে নিয়েছে। এখন তাকেই ঠিক করতে হবে- সে মানুষের কোলে থাকবে, নাকি আবার আওয়ামী লীগের কোলে উঠবে। এক সাথে কোনোভাবেই দুই কোলে চড়তে পারবে না। একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছে এটা খুবই ভালো কথা। এটাই রীতি হওয়া উচিত। কিন্তু দু’জন একই সাথে সাক্ষাৎ করা এবং প্রধানমন্ত্রী তাদের মিলেমিশে কাজ করার নির্দেশ দেয়ায় বিষয়টিকে একেবারে নাটকের মতো মনে হয়।

আজ শামীম ওসমানকে নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা অথচ শামীমরা একেবারে রাস্তার মানুষ না। এই দেশের জন্য ওদের পরিবারের বহু অবদান আছে। একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবার। ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান সৃষ্টি, আওয়ামী লীগ গঠন আজকের এই অবস্থায় আসায় শামীম ওসমানদের বাপ-দাদাদের ভূমিকা একেবারে ফেলনা নয়। শামীম যদি আজ সন্ত্রাসীর খেতাব পেয়ে থাকে সেটাও দলীয় কারণে। কয়েক বছর আগে বর্তমান বিরোধী দলের নেত্রীর রোডমার্চে যদি বাধা দিয়ে থাকে, সেটা মোটেই কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়া যে দেয়নি, তা বোবার ভাই অন্ধও বোঝে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক যুদ্ধে কয়েকজন হানাদার আহত হয়ে কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তারা খাবার ও ওষুধ খাচ্ছিল না।

কাফেরদের হাতে তারা কিছু খাবে না। গভীর রাতে আমি গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমাদের হাতে মুক্তিবাহিনী ধরা পড়লে তাদেরকে মেরে ফেলতে। তোমরা রাস্তাঘাটে খুন করো, আবার আমাদের কাফের বলে ওষুধ খাচ্ছ না?’ আমি গেলে যোদ্ধারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ায় এবং সবাই স্যালুট করায়, যেহেতু তারা সৈনিক তাই সহজেই বুঝেছিল আমি কোনো কমান্ডার-টমান্ডার হবো। তাই ওই অবস্থায়ও রাগত স্বরে এক পাঠান হানাদার বলে উঠেছিল, ‘নেহি, হামলাগ কাভি কিসিকো খুন নেহি কিয়া।’ যেই আমি বললাম, ‘কালই তোমরা পাশের গ্রাম বরদাম জ্বালিয়েছ, গুলি করে মানুষ মেরেছ। তবুও বলছ খুন করোনি?’ সে আরো রেগে গিয়ে বলল, ‘নেহি, আপকো তো কমান্ডার মাফিকই লাগতা হ্যায়। হামকো কিউ পুছতে হো? কমান্ডারকো পুছো। কমান্ডারকা কমান্ডারকো পুছো। জো হুকুম মিলা হামলোগ ওহি কিয়া।’ চল্লিশ বছর পর শামীমের কর্মকাণ্ড নিয়েও আমার তেমনই মনে হয়। হাইকমান্ড থেকে নির্দেশ দিলে একজন নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মীর কী করার থাকে? কর্তার ইচ্ছা কর্ম। বান্ বেটা বান্, খসা বেটা খসা। ’৯৯-এর ১৫ নভেম্বর সখীপুর-বাসাইলের উপনির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটেছিল। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী এখনো আমাকে পিতার মতো শ্রদ্ধা করে, পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, কেন্দ্রের নির্দেশে তারাও সেদিন ভোট ডাকাতি বা চুরি করতে গিয়েছিল। জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু, অজয় কর খোকন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, শামীম ওসমান- কে যায়নি বাসাইল-সখীপুরের উপনির্বাচনে ভোট ডাকাতি করতে? মিরপুর বাঙলা কলেজের ভিপি বহেরাতলীর কালিয়ান ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দিতে গেলে মানুষ ক্ষেপে গিয়ে তাকে গান্দিনা পর্যন্ত ধাওয়া করে নিয়ে গিয়েছিল।

’৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কনভেনশনে যারা গোলাগুলি করেছিল, তারা কি ডাকাত, তস্কর, কিংবা লাঠিয়াল? নাকি হাইকমান্ডের নির্দেশে ওসব করেছিল? এসব করে কোনো দল কখনো সখনো পার পায় না। একের পর এক ওসব করে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ পার পেয়েছে। কিন্তু যাদেরকে দিয়ে করিয়েছে তারা পার পায়নি, তারা বলির পাঁঠা হয়েছে। শুধু শামীম ওসমানের কথা বলি কেন, নাসিম ওসমান ছিল শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, হরিহর আত্মা। ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ নাসিম ওসমানের বিয়ে অথবা বৌভাতে গভীর রাত পর্যন্ত কামাল ছিল। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হলে সেই নববিবাহিত স্ত্রী ফেলে নাসিম ওসমান প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নেয়। মেঘালয়ের পাহাড়ে পাহাড়ে কী যে অমানুষিক কষ্ট করেছে! আজকে যারা ক্ষমতায় তারা কি এর মূল্যায়ন করেন? নাসিম আর নারায়ণগঞ্জের মঞ্জু মোটা কাচের চশমা পরত। তখন পর্যন্ত আমার চোখে চশমা ছিল না। তাই চশমার মাহাত্ম্য বুঝতাম না। এমনিই নাসিমের চোখ বড় বড়। মঞ্জুর চোখও বড়। হঠাৎ ওদের চশমা ভেঙে গেলে দু’জনেরই চোখ জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গিয়েছিল। পরে তুরা থেকে চশমা ঠিক করে আনলে তবেই রক্ষা। আজ প্রায় ৩৫ বছর চশমা ছাড়া চলে না। এখন বুঝি, চশমা না থাকলে চশমাওয়ালাদের কী কষ্ট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার চশমা খুলে গেলে পথ চলতে পারবেন কি না সন্দেহ। এক-দুই দিন চশমা না থাকলে তার চোখ বেরিয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়। এ ধরনের বিড়ম্বনাও কিন্তু সে দিন ওরা সহ্য করেছে। নাসিমের ছেলে আজমেরী, ওকে কোলে দেখেছি। নাসিম আমার ছোট বোনজামাই দুলালের উকিলশ্বশুর। সে জন্য ওরা আমার আত্মীয়। তাই ওদের সবই যে খারাপ তা বলি কী করে? ক্ষমতাধরেরা কৌশলে কাউকে খারাপ করলে নলখাগড়ার উপায় কী? বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কতজন তার জীবন নষ্ট বা বিসর্জন দিয়েছে? আওয়ামী লীগ সরকার তার সব কিছু ভুলে গিয়ে যারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় সহযোগিতা করেছে, সমর্থন জুগিয়েছে, তাদের নিয়ে আজকাল মাতোয়ারা। এর পরিণতি মোটেই শুভ হবে না। কোনোমতেই শুভ হতে পারে না।
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০৫/১১/১১]

Keywords: