নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > প্রধানমন্ত্রী হত্যার ষড়যন্ত্র-২

প্রধানমন্ত্রী হত্যার ষড়যন্ত্র-২

Tuesday 27 September 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তান থেকে পদোন্নতি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে জনাব কর্নেল জামিল ডিজিএফআইয়ের প্রধান হন। শুধু তিনি নন, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময় পাকিস্তান ফেরত আবদুর রহিম ছিলেন হোম সেক্রেটারি, জনাব আবদুস সাত্তার ছিলেন মুখ্য সচিব। এক্ষেত্রে এইচ টি ইমাম খুবই ভাগ্যবান। মুজিবনগর সরকারে যেমন মুখ্য সচিব ছিলেন, স্বাধীনতার পর মুখ্য সচিব ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে খুন করে মোস্তাক আহমেদ গদিনসীন হলে তারও মুখ্য সচিব ছিলেন, এখন আবার আমার বোনের আমলে সব সচিবের সচিব, মন্ত্রীর মন্ত্রী, সবকিছুর কর্ণধার। প্রধান না মহাপ্রধান, মুখ্য না মহামুখ্য উপদেষ্টা, নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে সবকিছুতেই তিনি রান্নার হলুদের মতো। তার কথায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চলেন, নাকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় তিনি চলেন—অনেক দূরে আছি বলে জানি না। তবে লোকে বলে সবকিছু নাকি তার কথায় চলে। এই ভাগ্যবানদের দলেরই একজন জনাব কর্নেল জামিল। খুব সম্ভবত তিনি ১৯৭৫-এর জুন অথবা জুলাই মাসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল অথবা কর্নেল থেকে ব্রিগেডিয়ার পদোন্নতি পেয়ে ডিজিএফআইয়ের প্রধান হন। এখন মহামান্য রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্ট পিজিআর এবং এসএসএফ সরকারিভাবে ডিজিএফআইয়ের নিয়ন্ত্রণে কিনা জানি না। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন ডিজিএফআইয়ের কমান্ডে পুরো একটি ব্রিগেড দিয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য ডিজিএফআই প্রধান কর্নেল জামিলের ব্রিগেডের এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য গণভবনেই ছিল। যেখানে এক ব্রিগেড উচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্য দিয়ে কর্নেল জামিলকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা বা হেফাজতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, সেখানে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ না করে একটি গুলিও না ফুটিয়ে হাফহাতা হলুদ জামা গায়ে ছোট্ট একটা লাল কারে এসে গুলি খেয়ে অঘোরে প্রাণ হারিয়ে বীর বনে গেলেন, আজ বঙ্গবন্ধুর ছবির পাশে জ্বলজ্বল করছে তার ছবি—এটা সহ্য করতে বড় কষ্ট হয়।

বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে কর্নেল জামিল যখন ধাই ধাই করে বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন তখন তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কোথায় যাও?’ তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেনাবাহিনীর লোকরা আক্রমণ করেছে। আমি ধানমন্ডি যাচ্ছি।’ তার স্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই বলেছিলেন, ‘তোমার সৈন্যরা কোথায়? তুমি একা গিয়ে কী করবে?’ জামিল বলেছিলেন, ‘তারপরও যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু বিপদে পড়েছেন।’ তার নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব যার সেই কর্নেল জামিলকে ফোন করায় ওরকমভাবে বিদ্যুতের মতো ছুটে আসায় নিশ্চয়ই তাকে ধন্যবাদ দিতাম। কিন্তু সৈন্যসামন্ত ছাড়া এমনকি নিজের ব্যক্তিগত অস্ত্রটিও ফেলে ওভাবে ছুটে যাওয়া অদক্ষতা ও ব্যর্থতা নয় কি? রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করতে যাকে তিন ব্যাটালিয়ন সৈন্য দেয়া হলো, তার সৈন্যরা ঘুমিয়ে রইল, কেউ কোনো দায়িত্ব পালন করল না। কয়েকজন বিপথগামী এসে বাঙালি জাতির অমন সর্বনাশ করে গেল, তিনি কয়েকটা গুলি খেয়ে মরেছেন বলেই তার সব ব্যর্থতা ধুয়ে-মুছে যাবে এটা এই বয়সে মেনে নিতে পারছি না। তাহলে কি বেঁচে থাকাই পাপ? আর যে কোনোভাবে মরে গেলেই পুণ্য? বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য আমার হাতে ল্যাংড়া-লুলা এক ব্যাটালিয়ন সৈন্যও যদি দেয়া হতো, আমি যদি ওইসব ট্যাংক-কামানের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে না পারতাম, জাতি আমাকে ফাঁসি দিত, ফায়ারিং স্কোয়াডে দিত—মাথা পেতে নিতাম; কিন্তু আর না। আর ক’দিনইবা বাঁচব? তাই সত্য বলতেই হবে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই বঙ্গবন্ধুর খুনি বা সে সময় যারা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের ইচ্ছেমতো পুরস্কৃত করতে পারেন না। সে রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাহারাও যার নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেই জনাব জামিল দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েও বঙ্গবন্ধুর শহীদ পরিবারের ছবির পাশে ঠাঁই পায় আর বঙ্গবন্ধুর পাশে আমার ছবি জাদুঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, এ আর সহ্য করা যায় না। সেনাপ্রধান হিসেবে শফিউল্যাহ ব্যর্থ হলো, তার বিচার হলো না। বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার মোস্তাককে সমর্থন করল, তাকে মহাজোটে মন্ত্রী বানানো হলো। রক্ষীবাহিনীর পরিচালক হিসেবে আনোয়ারুল আলম শহীদ সর্বপ্রথম খুনি মোস্তাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল, শোনা যাচ্ছে তাকেও সরকারি অনুদানে কী কাজ দেয়া হয়েছে। তাই এভাবে আর চলতে পারে না। শুধু শুধু আমাকে ধ্বংস করার জন্য বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতিষ্ঠিত করা হবে, এটা মেনে নেয়া হবে না।

আমি না হয় জীবিত থেকে দোষ করেছি, আমার ছবি না হয় বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের ছবির পাশে না থাকল। ’৭৫-এর প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ চট্টগ্রামের মৌলভী সৈয়দ, গাইবান্ধার মুন্না, দুলাল দে বিপ্লব, আবদুল খালেক খসরু, সাখাওয়াত হোসেন মান্নান, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, আলী আজম আলমগীর, নজীবর রহমান নীহার, রেজাউল করিম, ফনেস সাংমা, এ্যালসিন মারাক, সুধীন মারাক, প্রতিরোধ যুদ্ধে আহত শাহ মুস্তাইন বিল্লাহ, ফারুক আহমদ, মো. আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক, গৌরাঙ্গ চন্দ্র পাল, ইসাহাক মারাক, মার্তুস সাংমা, অতুল সাংমা এদের ছবি কোথায়? বিশ্বজিত্ নন্দীর ছবি কোথায়? আমাদের সবার শ্রম ঘাম আর শহীদ যোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে মহাজোট আজ সরকারে। তাই যা খুশি তাই করা যাবে না। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নেত্রীর সভায় গ্রেনেড হামলায় এখন আইজি ডিআইজি সবাইকে আণ্ডা-বাচ্চাসহ ধরা হচ্ছে—খুব ভালো কথা। বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের ধরুন, যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদের ধরুন। ধরে ধরে বিচার করুন। শুধু শুধু আমি বলি হব, জনাব তোফায়েল আহমেদ কিংবা আবদুর রাজ্জাক বা রাজনৈতিক নেতারাই বলি হবে কেন? তোফায়েল আহমেদ রক্ষীবাহিনীকে হুকুম দেয়নি, তাই তারা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে এগিয়ে যায়নি। তাহলে খুনি মোস্তাককে কি সমর্থন করতে তখনকার রক্ষীবাহিনীর প্রধান শহীদকে তোফায়েল আহমেদ বলেছিল? সে তো খুনিকে সমর্থন জানাতে পেরেছে, সেখানে হুকুম লাগে না? হুকুম লাগে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে। যতসব বাজে কথা। রাজ্জাক সাহেব তার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়ে প্রতিরোধ না করে অন্যায় করেছে। বেশ ভালো কথা। মূল সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনীই প্রতিরোধ করেনি, ঢাল-তলোয়ার ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকরা কী করবে? তাই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কেন শফিউল্যাহ অমন করেছে, এ কে খন্দকার করেছে, কেন শহীদ অমন করেছে তা জানার জন্য বিজয় দিবসের আগেই আটক করে রিমান্ডে নিয়ে ছালছুল তুলে জেনে নিন। যদি তারা নির্দোষ এবং কর্তব্যে অবহেলা না করে থাকে মন্ত্রী বানিয়ে দেবেন। কিন্তু এখন তাদের গ্রেফতার করুন।

১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত যারা ঢাকায় থেকে পাকিস্তানিদের সেবাযত্ন করে ১৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হানাদারদের হাতে জীবন দিয়ে সবাই শহীদ বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছেন, এটাও তো তেমন ব্যাপার। শহীদ বুদ্ধিজীবী তাদের এত বুদ্ধিই যদি থাকত তাহলে ঢাকায় থাকলেন কেন? পাকিস্তানিদের বেতন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেন কেন? শহীদ বুদ্ধিজীবীরা ডিসেম্বর মাসেও পাকিস্তান সরকারের বেতন নিলেন কেন? তাই ১৪ ডিসেম্বর হানাদারদের হাতে নিহত বুদ্ধিজীবী আর হানাদারদের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদারদের হাতে জীবন দেয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আমি অন্তত একই রকম সম্মান করতে পারি না। ২৫ মার্চ হানাদারদের আক্রমণে যারা শহীদ হয়েছেন অথবা পরে দেশের নানা স্থানে প্রতিরোধ করতে গিয়ে হানাদারদের হাতে যারা নিহত হয়েছেন তারা আমার হৃদয়ে দেশপ্রেমিক শহীদ বুদ্ধিজীবী। আর ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর রাজাকার, আলবদর এবং পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ঢাকায় যারা নিহত হয়েছেন তারা দালাল বুদ্ধিজীবী। তারা নিহত হওয়ায় তাদের প্রতি আমার গভীর সহানুভূতি আছে, তাদের পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততিদের প্রতিও গভীর মমতা আছে। কিন্তু যারা পাকিস্তানের বিরোধিতা করে হানাদারদের হাতে নিহত হয়েছিলেন তারা আর যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছে, পরাজিত হওয়ার মুহূর্তে হানাদাররা হত্যা করে ফেলে গেছে উভয়কেই এক মর্যাদায় বিচার করতে পারি না। ১৪ ডিসেম্বর নিহত জ্ঞানী-গুণীরা বেঁচে থাকলে আমরা এবং আমাদের সন্তানরা তাদের কাছ থেকে অবশ্যই আরও অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারত। সেটা নিশ্চয়ই দেশের জন্য কল্যাণকর হতো। একজন সাহিত্যিক, একজন শিক্ষক তাদের কাজ সাহিত্য রচনা, শিক্ষা দেয়া। পাকিস্তান ছিল, তারা পাকিস্তানে ছিলেন। চাকরি-বাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তারা পাকিস্তানের হয়ে নিশ্চয়ই কোনো খুন-খারাবি করেননি। তাই তাদের গালাগাল করব কেন? তারা পাকিস্তানে থেকে পাকিস্তান রক্ষা করতে চেয়েছেন। এটা তাদের ঈমানী দায়িত্ব। কিন্তু তাদেরই মতো কেউ কেউ যখন আরাম আয়েশের সরকারি চাকরি ছেড়ে গ্রামে-গঞ্জে অথবা নির্বাসনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে হানাদারদের পরাজিত করে বাংলাদেশ বানিয়েছেন, উভয়কে এক করে বিচার করি কী করে? সত্য কথা হলো, চোখে যা দেখেছি তা এড়িয়ে যেতে পারি না। এড়িয়ে গেলে পেটের ভেতর কুরকুর করে, ভাত হজম হয় না। তাই স্বাধীনতা-পরবর্তী ছোট্ট একটি ঘটনা তুলে ধরছি।

শবনম মুশতারীর বাবা কবি তালিম হোসেন স্বাধীনতার পর কোলাবরেটর অ্যাক্টে ঢাকা জেলে ছিলেন। আমরা মফস্বল শহরের মানুষ। তাই ঢাকা-ঢুকা অত ভালো জানতাম না। যদিও অনেক বড় বড় আত্মীয়স্বজন ঢাকাতে ছিল। দাদু আলাউদ্দিন সিদ্দিকী অসময়ে মারা গেলে আমাদের পরিবার অথৈ পানিতে পড়ে যায়। বাবা মৌলভী মুহাম্মদ আবদুল আলী সিদ্দিকী তেমন সামাল দিতে পারছিলেন না। স্বাধীনতার পর আকস্মিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ায় আমি যেমন পড়েছি ঠিক তেমনি। এখন যেমন অনেকেই চিনতে চায় না, তখনও অনেক আত্মীয়স্বজন আমাদের অবস্থা আকাশের কাছাকাছি ছিল না বলে খুব একটা গুরুত্ব দিত না। ১৯৬৭-৬৮ থেকে আমাদের অবস্থা ফিরতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় প্রায় সবাই সিদ্দিকী নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করত। সিদ্দিকী পদবিটাই ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তানে অভিশাপ। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে একজনের নাম ছিল লতিফ সিদ্দিকী। পাকিস্তানি হানাদাররা আমার বড় ভাই মনে করে তাকে সে যে কী নির্যাতনই না করেছিল। আল্লাহর দয়ায় প্রাণে বেঁচেছিল। দেখতে-শুনতে উঁচা-লম্বায়, গায়ে-গড়নে, রঙে-ঢঙে সে আমাদের কারও ধারে-কাছে ছিল না। কেন যে তার বাপ-মা কোন শখে নাম রেখেছিল লতিফ সিদ্দিকী। হানাদারদের নির্যাতনে তার নাম রাখার শখ মিটে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সিদ্দিকী পদবি ছিল অভিশাপ, যুদ্ধ শেষে রাতারাতি তা আশীর্বাদ হয়ে গেল। কত অলিতে-গলিতে যে সিদ্দিকী তার হিসাব-কিতাব নেই। এখনও প্রতি বছর নতুন নতুন সিদ্দিকীর জন্ম হচ্ছে।

ষাটের দশকে টাঙ্গাইল ছিল লেখাপড়ায় খুবই উন্নত। সারাদেশে একমাত্র কুমুদিনী মহিলা কলেজ। সেই সময় টাঙ্গাইল কুমুদিনী মহিলা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল নার্গিস হামিদ কোরায়েশীর নাম শুনেনি পূর্ব পাকিস্তানে তেমন সম্ভ্রান্ত হিন্দু মুসলিম কোনো পরিবার ছিল না। অন্যদিকে ছেলেদের করটিয়া সাদত্ কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজ, এরপরই করটিয়া সাদত্ কলেজ। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজেরও একটা নাম ছিল। কিন্তু করটিয়া সাদত্ কলেজের মতো নয়। তখন সাদত্ কলেজকে বলা হতো বঙ্গের আলীগড়। ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে স্যার সৈয়দ আহমদ খান পাহলভী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রথম আলীগড় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। করটিয়াতেও তেমনি আটিয়ার চাঁদ ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর অর্থানুকুল্যে তত্সময়ে পূর্ববঙ্গের মুসলিম শিক্ষার অগ্রদূত প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খানের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল প্রাচ্যের এই দ্বিতীয় আলীগড়। করটিয়া সাদত্ কলেজে সারাদেশের বহু নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাষ্ট্রনায়ক, মন্ত্রী লেখাপড়া করেছেন। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, সেলিম আল দীন আরও অনেকের মতো আমি অভাগাও ওই কলেজে অনেক দৌড়ঝাপ করেছি। ফরিদপুরের মোল্লা জালাল উদ্দিন, পাকিস্তানের মন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামানও একসময় করটিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। সেই কলেজে নওগাঁর বদলগাছির চাকরাইলের সুসাহিত্যিক তালিম হোসেনের ভাতিজা রঞ্জু চৌধুরী আমাদের বাড়িতে জায়গির থেকে পড়তেন।

নওগাঁর মানুষের ভাষা আমাদের চাইতে আলাদা। তাই স্বাভাবিক কারণেই মিষ্টি। দেখতে-শুনতে রঞ্জু চৌধুরী খুবই সুন্দর ছিলেন, ব্যবহার ছিল অমায়িক। আমার থেকে দু’চার বছরের বড়। তিনি বাড়ির ছেলের মতোই থাকতেন। জায়গিররা যেমন নিজের খরচে খায়, বিছানাপত্র নিয়ে থাকে তার তেমন ছিল না। নিজের জিনিসপত্র রাখার জন্য একটা ট্রাংক আর সুটকেস ছিল তার সম্বল। বিছানাপত্র, চকি-চৌকাঠ, চেয়ার-টেবিল, খানা-দানা সব আমাদের। চার-পাঁচ বছরে খুবই আপন হয়ে গিয়েছিলেন। জানতাম না তিনি অতবড় সাহিত্যিক কবি তালিম হোসেনের ভাতিজা। কোনো একসময় আমাকে তালিম হোসেনের ঢাকার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। অফিসার্স কলোনিতে তারা থাকতেন। সন্ধ্যার দিকে তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। খুবই ছোট্ট বাড়ি। শবনম মুশতারী এবং তার বোন তখন খুবই ছোট্ট। কোনো কথাবার্তা হয়েছিল কিনা মনে নেই। ছোট্ট বেলায় আমি গোবদা-গাবদা, হাবা-গোবা, হগদমা ধরনের ছিলাম। রাতে খাবার খাইয়েছিলেন শবনম মুশতারীর মা। খুবই সাধারণ খাবার। অপূর্ব সুস্বাদু সে খাবার। এরপর অনেকবার সে বাসায় গিয়েছি এবং খেয়েছি।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ২৭/০৯/১১]

Keywords: