নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > সরকারের একলা চলো নীতি প্রায় সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ

সরকারের একলা চলো নীতি প্রায় সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ

Saturday 24 September 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

সাক্ষাৎকার : বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের জন্ম ১৯৪৭ সালে টাঙ্গাইল জেলার ছাতিহাটি গ্রামে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি বিখ্যাত। মুক্তিযুদ্ধে ১৮ হাজার সশস্ত্র ও ৭২ হাজার সহযোগী যোদ্ধার এক বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থেকে ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, পাবনা ও মানিকগঞ্জের এক বিশাল অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করেন। অসংখ্য সশস্ত্র অভিযানে তিনি সাফল্যজনক নেতৃত্ব দেন। ভূঞাপুরের মাটিকাটায় এসইউসি ইঞ্জিনিয়ার এবং এসটি রাজন নামের অস্ত্র বোঝাই দু’টি জাহাজ দখল করে বিপুল অস্ত্র হস্তগত করেন। অসম সাহসিকতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময়ই বাঘা সিদ্দিকী ও বঙ্গবীর বলে তার এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাকেই একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার জীবিতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব বীর উত্তমে ভূষিত করে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে একমাত্র তিনিই সশস্ত্র প্রতিবাদ করেন। এ জন্য তাকে দীর্ঘ ১৬ বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হয়। ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে টাঙ্গাইল-৮ সখিপুর-বাসাইল নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অল্প দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাথে নীতিগত পার্থক্য দেখা দিলে ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। গামছা প্রতীক নিয়ে ২০০১ সালে সাধারণ নির্বাচনে নিজ দলের পক্ষ থেকে একই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্খা ও বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে তিনি কথা বলেছেন : সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন

নয়া দিগন্ত : দেশের বর্তমান অবস্খাকে কিভাবে দেখেন?

কাদের সিদ্দিকী : সব দেশেরই সব সময় বর্তমান অবস্খা থাকবে। কখনো ভালো কখনো খারাপ। সারা পৃথিবীরই বর্তমান অবস্খা মোটেই ভালো নয়, স্খিতিশীল নয়, শান্তিপূর্ণও নয়। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্খা অনেক উন্নত দেশের চেয়ে খারাপ, তবে সবচেয়ে খারাপ দেশের চেয়ে অবশ্যই খারাপ নয়। সারা বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ না হওয়ার জন্য সরকারের তেমন কৃতিত্ব নেই। এটা আমাদের সাধারণ মানুষেরই কৃতিত্ব।

নয়া দিগন্ত : এ সরকারের সময় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনমান কোন পর্যায়ে রয়েছে?

কাদের সিদ্দিকী : মানুষের দুর্দিন দিনে দিনে বাড়ছে। গরিব মানুষ শুধু ভোট দিয়ে সরকারে বসায়। গার্মেন্টসহ কিছু কিছু সেক্টর ভালো করছে। এসব কারখানায় যেসব খেটেখাওয়া মানুষ কাজ করছেন তাদের কোনো আত্মিক প্রশান্তি নেই। ১০ বছর কাজ করেও তারা বাড়িতে একটা টিনের ঘর দিতে পারে না। কিন্তু যার করাখানা সে একটি কারখানার জায়গায় চারটি কারখানা করে। তার পরও সব সময় বলা হয় মালিকের লাভ হয় না। এখানে দারুণ বৈষম্য বিরাজ করছে। মূলত এ কারণেই অর্থনীতিতে ব্যাপক অসামঞ্জস্য। আয়-ব্যয়ের এখন আসমান-জমিন ব্যবধান।

শুধু এ সরকারের সময় নয়, সব সরকারের সময়ই মানুষের দৈনন্দিন জীবনমান কাঙ্ক্ষিত নয়। ইদানীং সাধারণ মানুষের কথা অসাধারণ মানুষেরা মোটেই চিন্তা করেন না। আমাদের নেতারা উন্নত বিশ্ব ঘুরে তাদের জীবনব্যবস্খা দেখেন। কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের দু:খবেদনা সেভাবে উপলব্ধি করেন না। দুর্ভাগ্য হলো, এখন কর্তৃত্ব যাদের হাতে তাদের দরদ নেই। এখন আমাদের দরদি নেতা নেই। দরদি সরকার নেই। সত্য আর অসত্য নিরূপণ করার তাগিদ কারো মধ্যে নেই।

নয়া দিগন্ত : আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা আপনার সাথে দেখা করেছেন, আপনি এ নিয়ে কী ভাবছেন?

কাদের সিদ্দিকী : এখন জোটের রাজনীতি চলছে। সরকার ও বিরোধীরা আমাদের খোঁজখবর করছেন। কারণ যারা সরকারে আছেন তারা ২৫ বা ৫০ বছর সরকারে থাকতে চান। আর যারা প্রধান বিরোধী দলে আছেন তারা এখনই ক্ষমতায় যেতে চান। এ কাজে যাদের যখন দরকার তাদের কাছেই উভয় পক্ষ ছুটবেন এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতিতে চিরশত্রু, চিরবন্ধু কেউ নেই। উভয় পক্ষ আমাদের সাথে কথা বলেছেন, প্রয়োজনে আমরাও কথা বলব। সবার প্রয়োজন যিনি সফলভাবে কাজে লাগাতে পারবেন তিনি জয়ী হবেন। তবে আমি জনগণের ইচ্ছের সাথে থাকব।

নয়া দিগন্ত : জোট ও মহাজোটের পক্ষ থেকে আপনার কাছে প্রত্যাশাটা কী ছিল?

কাদের সিদ্দিকী : ক্ষমতাসীনেরা বলেছেন, তারা সফলভাবে সরকার পরিচালনা করছেন। তারা দেশটা সুন্দর করে গড়ে তুলতে চান। এ কাজে আপনি আমাদের সহযোগিতা করুন। একইভাবে বিরোধীপক্ষ সরকারের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সরকার পতনে সহযোগিতা চেয়েছেন। উভয় পক্ষ বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন।

নয়া দিগন্ত : আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি ও বিচার নিয়ে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযোগ। এ ব্যাপারে আপনার ধারণা কী?

কাদের সিদ্দিকী : ক’দিন আগে লিমন নামে এক ছেলেকে পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করেছে র‌্যাব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তথ্যটি ঠিক নয়। যেখানে সবাই বলছেন র‌্যাব ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এটি যদি জনতার সরকার হতো, তাহলে র‌্যাবের ভুলকে ভুল হিসেবেই নেয়া হতো। দায়ী ব্যক্তির বিচার করা হতো। একজন র‌্যাব সদস্যের বেআইনি কাজকে আইনি করার জন্য পুরো র‌্যাবই মিথ্যা বলত না। একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্খা যদি নিজেই মিথ্যাবাদী হয়, আইন অমান্য বা ভঙ্গ করে, তাহলে সেই সংস্খার আর আইনপ্রয়োগ করার কি নৈতিক অধিকার থাকে?

একজন দারোগা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের পায়ে কোপ দিয়ে তার দায়ের ধার পরখ করেছে। ঘটনাটি সত্য প্রমাণিত হওয়ার পরও সে দারোগা চাকরিতে আছেন। এ অনৈতিক কাজ করার পর তার চাকরিতে থাকার সুযোগ কোথায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পায়ে কোপ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য তার স্বস্খানে থাকেন এটা কল্পনাও করা যায় না। কোনো সরকার কেন, পাকিস্তান আমলেও এমনটি কেউ পারেনি। এতে পরিষ্কার বোঝা যায় আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের সামনে ডাকাত বলে ছয়টি ছেলেকে মেরেছে। তাহলে এখন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়। চার-পাঁচজনে মিলে একজনকে ডাকাত বা হাইজ্যাকার বলে আওয়াজ তুললাম, মানুষ এসে আপনাকে মেরে ফেলল। সভ্য রাষ্ট্র হলে যেকোনো অপরাধীর জীবনেরও নিরাপত্তা দিতে হবে। আগে জীবন তারপর বিচার। এদিক থেকে দেশ পরিচালনায় সরকারের ব্যর্থতা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি ভালো নয়। নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও নেই। ১৬ কোটি মানুষের জন্য কোনো প্রশাসন নেই। এ ধরনের পরিস্খিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি ভালো; পুলিশের মহাপরিদর্শক যিনি টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলে পড়েছেন তিনি বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি খুবই উন্নত। এ ধরনের মানবিক চেতনাহীনদের চেতনা তো জাগ্রত করা যাবে না। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতি যেটুকু আছে তা আল্লাহর রহমত, সরকারের কোনো দক্ষতায় নয়।

নয়া দিগন্ত : বিচার বিভাগ বিরোধীপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগকে কিভাবে দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্খা কমে যাচ্ছে। আস্খার যদি আরো অভাব হয় বিচার বিভাগ চলবে না। এ জন্য বিরোধীপক্ষ যারা দলীয়করণের অভিযোগ করছেন তারা যেমন দায়ী, যারা সরকারি দলে আছেন তারাও দায়ী। সরকারপক্ষ বিরোধী দলে গেলে একই দাবি করবেন। দক্ষতা, যোগ্যতা ও নীতিবোধসম্পন্ন যথার্থ উপযুক্ত মানুষের উচ্চ আদালতে নিয়োগ পাওয়া দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনা ও সুপারিশ এ ক্ষেত্রে একেবারেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিচার বিভাগ মানুষের রক্ষাকবচ, ওখানে অত বেশি হস্তক্ষেপ হলে ভালো থাকে না। পাকিস্তান আমলেও দেখেছি, বঙ্গবন্ধু ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে জামিন না পেলেও জজ কোর্টে ঠিকই পেয়েছেন। সেই সময় বিচারক তাদের স্বাধীন বিচারক্ষমতা প্রয়োগ করতেন, আইনের দ্বারা পরিচালিত হতেন। সেই সময় টিক্কা খানের মতো জল্লাদকে বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী শপথবাক্য পাঠ করাতে অস্বীকার করেছিলেন।

নয়া দিগন্ত : সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়ে বিতর্ক উঠেছে, আপনি কী বলবেন?

কাদের সিদ্দিকী : আমি বলব, হাইকোর্টের বিচারপতি থাকাকালীন তিনি একজন উদাহরণ দেয়ার মতো বিচারক ছিলেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি খুব কম সময় ছিলেন। তাই শুধু শুধু এই সময়টা নিয়ে তাকে বিচার করলে তার বিচারিক জীবনের প্রতি সুবিচার হবে না। এই স্বল্প সময়ের কর্মকাণ্ড মানুষের অনেক কিছু সন্দেহ করার মতো আছে। মানুষ বলতেই পারেন তিনি অতীতের স্ট্যান্ডার্ডটা রক্ষা করতে পারেননি। প্রধান বিরোধী নেত্রী সদ্যসাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছেন সেটি কি মিথ্যা? বিচারপতি থাকা অবস্খায় তিনি কেন প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে অনুদান নিলেন? জাতি এখন যে রকম সন্দেহপ্রবণ তাতে এটা তার নেয়া কি শোভা পেয়েছে? একজনের কাছ থেকে যখন কিছু নেবেন তার প্রতি তো কিছু দুর্বল থাকবেনই। উপরন্তু ঘুষখোর, দুর্নীতিপরায়ণ বিচারকদের বিচার তিনি করেননি। প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর জজদের এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি, কোন কোন জজ ঘুষ খান।’

নয়া দিগন্ত : এ থেকে বের হওয়ার উপায় কী?

কাদের সিদ্দিকী : এর জন্য প্রথমে পরিস্খিতি যে খারাপ সেটা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। সোজা কথা বোধোদয় দরকার। যদি সংশ্লিষ্টরা মনেপ্রাণে মনে করেন পরিস্খিতি ভালো তাহলে এ থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। সমস্যা হচ্ছে অনুশোচনা বা উপলব্ধি আসার জন্য সামনে ভালো উদাহরণও নেই।

নয়া দিগন্ত : তত্ত্বাবধায়কব্যবস্খা বিলুপ্ত হওয়ায় আগামী সাধারণ নির্বাচনের ভবিষ্যৎ কী?

কাদের সিদ্দিকী : রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনগণের বিশ্বাস ও আস্খা নেই। এ পরিস্খিতিতে রাজনৈতিক দল দিয়ে নির্বাচন অসম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং এর দ্বারা নির্বাচন রাজনীতির জন্য সবচেয়ে অপমানজনক। কী পরিমাণ অযোগ্য, অদক্ষ ও অবিশ্বস্ত হয়েছি, যে কারণে আমরা নির্বাচনটাও করতে পারি না। তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে কোনো রাজনৈতিক দলের অধীনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় নির্বাচন অসম্ভব এবং মানুষ এটিকে বিশ্বাস করবে না।

নয়া দিগন্ত : কিভাবে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্খা করা যেতে পারে?

কাদের সিদ্দিকী : সরকার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারবে কি না সে চিন্তা করতে চায় না। এ ধরনের চিন্তা ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যারা ভবিষ্যতে ক্ষমতার সম্ভাব্য দাবিদার তাদের সাথে আলোচনা করতে হয়, যাতে ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের প্রবর্তিত পরিকল্পনা এগিয়ে যায়। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা বিরোধীদের অমতে এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা নেয়। তাই সেটা সরকার পরিবর্তনের পর বাতিল হয়ে যায়। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্যও আমি বলব প্রথমেই নিজেদের মধ্যে আস্খা অর্জন করতে হবে।

নয়া দিগন্ত : ভিন্নমত ও মিডিয়া দলনের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এ সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ইতোমধ্যে। বিতর্কিত সম্প্রচার নীতিমালার কথা বলা হচ্ছে। অনেকে ১৯৭৫ সালে অনেক পত্রিকা বন্ধ করার সাথে বিষয়টি মিলিয়ে দেখছেন।

কাদের সিদ্দিকী : সব সময় সব সরকারই মিডিয়ার ওপর নাখোশ থাকে। যে সরকার মিডিয়ার ওপর যত বেশি নাখোশ হয় সে সরকার তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংবাদমাধ্যমকে জানি দুশমন ভাবা ঠিক নয়। সুতরাং অন্যায়ভাবে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নেয়া হলে তা সঠিক হবে না। এই সময়ে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে মুখ বন্ধ করে দেয়া সম্ভব নয়।

একটি কথা মিডিয়া ও এর মালিকদের বিবেচনায় নেয়া উচিত, দেশ স্বাধীন না হলে তারা এভাবে সংবাদমাধ্যম চালানোর সুযোগ পেতেন না। যারা দেশ স্বাধীন করেছেন মিডিয়া তাদের সম্মান করে না। মুখে হয়তো তারা বলে কিন্তু মিন (প্রকৃতপক্ষে সম্মান) করে না। সব সময় মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টানা হয়। তখনকার পরিস্খিতিটা বিবেচনা করা হয় না। কোনো ধরনের অভিযোগের আঙুল তোলার আগে আমাদের সময়টা নিয়ে ভাবা দরকার।

নয়া দিগন্ত : সরকার দাবি করছে ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক উচ্চমাত্রায় উপনীত হয়েছে। মনমোহনের সফরের পর এ সম্পর্ককে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

কাদের সিদ্দিকী : এ দুটো দেশের আন্ত:সরকার সম্পর্ক সর্বোচ্চ মাত্রায় আছে। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক সে মাত্রায় নেই। বাংলাদেশ সরকারের মনে করা উচিত, ভারত সরকারের সাথে যে সম্পর্কটা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে ভারতের (জনগণের) সাথে যেন হয়। দেশটিতে সরকার পরিবর্তন হলে তাদের সাথে সম্পর্ক বর্তমান সময়ের মতো ১০০ ভাগ না হোক অন্ততপক্ষে ৭০ ভাগ যাতে টিকে থাকে। একইভাবে ভারতেরও চিন্তা করা উচিত, যাতে বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনে সম্পর্কটা ছেদ না পড়ে। এভাবে চিন্তা না করে সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশটির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে বলব বাস্তব সমস্যার চেয়ে সন্দেহের সমস্যা অনেক বেশি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। আমাদের যারা মানুষই মনে করেনি, কুকুর-বিড়ালও ভাবেনি, পিষে মারতে চেয়েছিল; আন্তর্জাতিক ফোরামে এখন যদি কোনো সমর্থনের প্রয়োজন হয় তাহলে আমরা সেই পাকিস্তানের প্রতি যতটা সহানুভূতিশীল হবো ভারতের প্রতি অতখানি আগ্রহ দেখাব না। এমন হলে তো ভারতের রাগ হওয়ারই কথা। সুন্দরবনের বাঘের জন্য কত মায়া, তার জন্য একটা চুক্তি করা হলো। বাঘ একটা হিংস্র প্রাণী, মাঝে মধ্যে মানুষ খায়; তাকে রক্ষা করার জন্য আমরা কত দরদি। কিন্তু মানুষ পানি পাচ্ছে না; তার জন্য আমাদের দরদ হলো না। মনমোহন সিং বাংলাদেশের মানুষের মনে যে উৎসাহ জাগাতে পেরেছেন অতি সম্প্রতি তা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ সফর সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা ঠিক হবে না। যে পরিমাণ শুভ আশা জন্মেছিল সেখানে একেবারে সব কিছুতে পানি ঢেলে দেয়া হয়েছে। এতে উভয় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতটা উচ্চাশার জন্ম না দিয়ে এ সফরটা যদি করতেন তাহলে তাকে ব্যর্থ বলা হতো না।

নয়া দিগন্ত : এত হাঁকডাকের পর এ সফরের ব্যর্থতার কারণ কী বলে মনে করেন?

কাদের সিদ্দিকী : ধান মাড়াতে গরুর দরকার হয়। সেখানে আবার একটা বুড়ো গরুর দরকার হয়, যেটি মূলত মলনের নিয়ন্ত্রণ করবে। এ কাজটি ছাগল দিয়ে হবে না। এমনকি সেখানে অনেক বেশি ছাগলের ব্যবস্খা করা হলেও হবে না। যাদের দিয়ে এ কূটনীতি সম্ভব ছিল তাদের কাজে লাগানো হয়নি। দুটো দেশের এ ধরনের সমঝোতার ৯০ শতাংশ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যত স্কলারই হোন রাজনৈতিক স্কলার আলাদা। এ কাজ ওই সব কূটনীতিক দিয়ে হবে না। যারা বিষয়টি সমন্বয় করেছেন, তারা কেউ কূটনীতিকও না, রাজনীতিকও না। আমাদের দেশে অনেক কূটনীতিক আছেন। রাজনৈতিক সমঝোতাকারীদের সংশ্লিষ্ট করার পাশাপাশি দলীয় বৃত্তের বাইরে গিয়েও অনেককে কাজে লাগানো যেত।

নয়া দিগন্ত : মহাজোটের সরকার পরিচালনায় সাফল্য দাবিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : যে সরকার চালাবে সে নিজেই যদি ব্যর্থ বলে তাহলে চলবে না। প্রত্যেকে নিজেকে নিজে সফল দাবি করে। এ সরকারও করছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনেক ক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা করেছেন এটা খুবই ভালো। কিন্তু উনার দুর্ভাগ্য টিমটা ভালো হয়নি।

নয়া দিগন্ত : বিরোধী দল কি জাতীয় স্বার্থে যথার্থ ভূমিকা পালন করতে পারছে?

কাদের সিদ্দিকী : বিরোধী দল জাতীয় স্বার্থে তেমন কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারছে না। সরকারের ছিটেফোঁটা সফলতা থাকলেও বিরোধী দল জনস্বার্থে সঠিক সরকারবিরোধিতায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সফল বিরোধী দল হিসেবে পাকিস্তান আমলের বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে স্মরণ করা যেতে পারে। সরকারে না থেকেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকারের পাহারা দিতে পেরেছিল। এখন বিরোধী দল মানুষের কাছে নেই, অন্তরে নেই।

নয়া দিগন্ত : এ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের যৌক্তিতা কতটুকু?

কাদের সিদ্দিকী : এখন সৎ পথে কারো সংসার চলছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। আয়-ব্যয়ের সঙ্গতি নেই। বাধ্য হয়ে মানুষকে অসৎ হতে হচ্ছে। মানবাধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে। বিচার বিভাগ অস্খির। সরকারের একলা চলো নীতি আজ প্রায় সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ।

নয়া দিগন্ত : মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতা ও নৈপুণ্যের জন্য সারা জাতি আপনাকে আলাদা করে চেনে। দীর্ঘ দিন রাজনীতি করছেন। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর ভবিষ্যতের পানে দাঁড়িয়ে কেমন বাংলাদেশ দেখছেন?

কাদের সিদ্দিকী : যেভাবে চলছে তাতে সামনে অন্ধকার দেখছি। এর চেয়ে অন্ধকার দেখেছিলাম সেখানেও আলো ফুটেছে। জাতিকে চেতনাহীন করা হয়েছে, সব সময় এভাবে চলবে তা সঙ্গত নয়। আমাদের দেশেও ইনশাআল্লাহ কোনো শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানী কিংবা কোনো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিশ্চয়ই আসবেন। তাই কোনো জাতি সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করা একেবারেই গুনাহের কাজ। শৌর্য-বীর্যে শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতি সম্পর্কে তাই বলব­ অচিরেই ঊষার আলো ফুটবে।
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৪/০৯/১১]

Keywords: