নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > এ যেন পাড়ে এসে ভরাডুবি

এ যেন পাড়ে এসে ভরাডুবি

Tuesday 13 September 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমার চরম ভাগ্যবিপর্যয়ের একপর্যায়ে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলাম। মেঘালয়, শিলিগুড়ি, বর্ধমান, কলকাতা, দিল্লি মিলে ১৬ বছর মহান ভারতে কাটিয়েছি। যে কারণে ইচ্ছে না থাকলেও স্বাভাবিক কারণেই ভারতীয় বহু নেতা, অভিনেতা, গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকাকে কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ’৭০-এর দশকে আমাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যাতে দেশের প্রায় সবার কাছেই আলোচিত আদরনীয় ছিলাম। ’৭২-এর এপ্রিলে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার এক লটবহর নিয়ে মেঘালয়, আসাম, কুচবিহার, শিলিগুড়ি, মালদা, মুর্শিদাবাদ হয়ে যখন কলকাতা গিয়েছিলাম, কলকাতার ঘরে ঘরে তখন বাঘা সিদ্দিকীর নাম। এরপর আবার বঙ্গবন্ধু নিহত হলে ১৯৭৭-৭৮-এর দিকে কলকাতা যাই। সে সময়ও নামধাম কমেনি বরং বাড়ন্তই ছিল। কিন্তু নিজের ঘরবাড়ি অস্তিত্ব ছাড়া মানুষের যেমন হয়, আমারও তেমন ছিল। তখনও প্রণবদা কংগ্রেস রাজনীতিতে এখনকার মতো অত বড়সড় নক্ষত্র হয়ে উঠেননি। ’৭০-এর দশকে কংগ্রেসে বাঙালি উদীয়মান নক্ষত্রদের মধ্যে শ্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়, অশোক সেন, ফুলরেণু গুহ, যুব কংগ্রেসের সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সী, সুব্রত মুখার্জি, সৌগত রায় তখন ভারত কাঁপানো নেতা। যুব কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে একসময় প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সী কলকাতায় নাস্তা করলে, বোম্বেতে লাঞ্চ করতেন এবং ডিনার করতেন আসামের গোয়াহাটিতে। এমনই ছিল তার কর্মব্যস্ততা। ’৭৫-এর পর কলকাতায় নেতাজী সুভাষ বোসের এলগিন রোডের বাড়ির পাশে প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সীর প্রিয় শ্রী সুবীর ঘোষের ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। বহুদিন পর কেন্দ্রে কেবলই কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। শ্রী মোরারজী দেশাইর জনতা সরকার।

বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির নেতাকর্মীদের যেমন দুরবস্থা হয়, বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগারদের যেমন হয়, সে সময় কংগ্রেসীদের ঠিক তেমন হয়েছিল। আমাদের দেশে রাজনৈতিক অদলবদল হতে হতে ধাক্কা পাড় খেতে খেতে তবুও তো কিছুটা উভয় দলই ধাতস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই প্রথম কংগ্রেস ক্ষমতা হারানোয় কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল সবার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যদিও বামফ্রন্ট সরকার থাকায় রাজ্যস্তরে কিছুটা বিরোধিতা করে কংগ্রেস কর্মীদের একটা সহনশীল অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অন্যান্য রাজ্যে কোনোদিনই কংগ্রেসীরা বিরোধী রাজনীতি করেনি। তাই তারা প্রায় সবাই ছিল দিশেহারা। এ অবস্থার মধ্যেও কংগ্রেসী নেতারা যতটা সম্ভব আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট নেতারাও অনেকেই সাহায্য করেছেন। বিশেষ করে শ্রী জ্যোতি বসু, ফরোয়ার্ড ব্লকের শ্রী যতীন চক্রবর্তী, জনতা পার্টির শ্রী সমর গুহ এমপি, শ্রী সুরেন্দ্র মোহন এমপি, ইটনার শ্রী ভূপেশ গুপ্ত এমপি, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার বিদ্রোহের শ্রী গণেশ ঘোষসহ আরও অনেক নেতা আমাকে তাদের আত্মার আত্মীয় আপনজন হিসেবে সবসময় বিবেচনা করতেন। এরপরের স্তরে ছিলেন কংগ্রেসের সোমেন মিত্র, বর্ধমানের নুরুল ইসলাম, এরও পরে আসে আবদুল মান্নান, তারও পরে প্রদ্যুত্ গুহ। ঠিক আবদুল মান্নান এবং প্রদ্যুত্ গুহদের সঙ্গে সঙ্গে কিংবা সামান্য আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জির আবির্ভাব। কলকাতায় থাকার সময় সুব্রত মুখার্জি, সোমেন মিত্র, অজিত পাজা ও অন্যান্য নেতার বাড়িতে কতবার মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা হয়েছে তা লেখাজোখা নেই। কলকাতার দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সিলেটের শ্রী অমিতাভ চৌধুরীর রানীকুঠির বাড়িতে কতবার গেছি হিসাব করে বলতে পারব না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর একসময় অমিতদার বাড়িতেও কিছুদিন ছিল। সেখানে মমতা ব্যানার্জি আসতেন। কারণ টালিগঞ্জ আর রানীকুঠি বড়জোর এক-দেড় কিলোমিটার পথ। তাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে বহু সময় বহুভাবে দেখা-সাক্ষাত্ হয়েছে। কোনোকিছুর ওপর কারও গভীর নিষ্ঠা যদি তাকে সফলতা দেয় তাহলে সেই সফলতাই তিনি পেয়েছেন। ভারতীয় কংগ্রেসের মতো সিপিএমের সঙ্গে কখনও কোনো দর কষাকষি করেননি। সিপিএমের খারাপকে তো খারাপ বলেছেনই কোনো ভালোকেও তিনি ভালো চোখে দেখেননি। সিপিএমের সব কাজকেই তিনি খারাপ বলেছেন। সেখানে কোনো বিচার-বিবেচনা করেননি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তার বামফ্রন্ট বিরোধিতা গ্রহণ করেছে তাই ৩৪ বছর পর তিনি বামফ্রন্টকে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নেতৃত্ব অর্জন করেছেন। তার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া এবং তার জোটের জয়লাভও এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় বামফ্রন্ট ২২৬টিতে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট ২২৭টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। এজন্য বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির তিনি এক জাদুকরী নেত্রী। তাই তার কথার এবং মতামতের ওজন অনেক বেশি। কানার ভাই অন্ধও বিশ্বাস করবে না যে, মহান ভারতের মহান প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিংয়ের বর্তমান বাংলাদেশ সফরের কার্যক্রম মমতা ব্যানার্জিকে না জানিয়ে, তার মতামত না নিয়ে তাকে সফরসঙ্গী করেছিলেন। এখন তো প্রায় সবকিছুই দিবালোকের মতো পরিষ্কার। মমতা ব্যানার্জি যাই বলুন, তিস্তার পানি চুক্তিসহ অন্য অনেক বিষয়ই মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই স্থির করা হয়েছিল।

শ্রী মনমোহন সিং একজন ধীরস্থির শান্ত স্বভাবের শিক্ষক মানুষ। তিনি সাধারণ রাজনীতিকদের মতো রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফানে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেননি। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সরকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যখন ভারতের প্ল্যানিং কমিশনের উপপ্রধান তখন কতবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। তার অমায়িক আচরণে প্রতিবারই মুগ্ধ হয়েছি। বর্তমান ভারতের অর্থমন্ত্রী শ্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে তিনি প্রায় এক দশক কাজ করেছেন। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেও তিনি প্রণবদাকে অত্যন্ত সম্মান করেন এবং স্যার বলে সম্বোধন করেন। আসলে ভারতীয় প্রবীণ নেতাদের একজনের আরেকজনকে সম্মান প্রদর্শন সে এক ঈর্ষনীয় ব্যাপার। একজনের আরেকজনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ থাকার পরও তারা যখন একে অপরের সঙ্গে মিলিত হন, তাদের সৌজন্যবোধ দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী, শ্রী লালকৃষ্ণ আদভানী কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের বিরোধের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কিন্তু কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে তারা যে কী গভীর সম্মান প্রদর্শন করেন তা ছবি করে রাখার মতো। এরকম একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা নেতাদের প্রতিবেশী দেশ সফরে ২০ মাস ধরে তৈরি করা একটি পরিকল্পনা বা খসড়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেঁকে বসায় উলট-পালট হয়ে গেল, এটা মেনে নিতে মন সায় দিতে চায় না। কূটনীতির জনক শ্রী চানক্যের দেশের কূটনীতিকরা এমন কাঁচা খেলোয়াড় তা ভাবি কী করে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ২০ মাস পর অনুষ্ঠিত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিংয়ের সফর এমন অসফল হবে কেন? আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর দু’জন উপদেষ্টা এই সফরে বড় বেশি তত্পরতা দেখিয়েছেন। একজন ড. মসিউর রহমান, অন্যজন ড. গওহর রিজভী। দু’জনের একজনেরও কূটনৈতিক তত্পরতার অতীত সার্টিফিকেট আছে বলে আমার জানা নেই। আর এই সফরটা ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম সুযোগ। কখনও কোনোদিন রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা সহমর্মিতা রাজনীতি বিবর্জিত কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। সে যত চৌকস মেধাবীই হোক। রাজনীতির জাদুমন্ত্রই আলাদা। আজীবন যারা ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক চায় না তারাই এ সফরে বেশি খুশি হয়েছে। কারণ রাজনৈতিক সফর রাজনৈতিক সদিচ্ছার কাছাকাছি পৌঁছে শুধু পরিচালনার অক্ষমতার কারণে বিফল হয়েছে। অবশ্য অনেকেই বিশ্বাস করে অল্প ক’দিন পরই তিস্তার পানি বণ্টন, ভারতকে ট্রানজিট প্রদান, অপদখলীয় ভূমি প্রত্যার্পণ—এসব সমস্যার সমাধান হবে। অবশ্যই হবে, কিন্তু ৬ সেপ্টেম্বর সেই বিপুল উত্সাহের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের যে আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জিত হতো তা অর্জন করতে আবার কম করেও অর্ধশত বছরের প্রয়োজন হবে। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই ভারতের সঙ্গে বাস্তব সমস্যার চাইতে সন্দেহের সমস্যাই প্রকট এবং সেটাই দূর করার একটা মস্তবড় সুযোগ মহান ভারতের মহান প্রধানমন্ত্রী শ্রী মনমোহন সিংয়ের হাতছাড়া হয়ে গেল।

অতি সন্ন্যাসীতে গাঁজা নষ্টের মতো শুধু উপদেষ্টাদের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও বাহাদুরির কারণে এই রাষ্ট্রীয় সফরটা তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং গত ২০ মাস নানাভাবে আশার বাণী শুনিয়ে এই সফর সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যে একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল সেটাকে প্রায় একেবারে ধূলিসাত্ করে দেয়া হয়েছে। যে যতই বলুন শতভাগ সফলতা অথবা হাজার ভাগ সফলতা—এসব দাবির কোনোকিছুই সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তেমন স্থান করতেই পারেনি। দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে ধরনের শুভ প্রতিক্রিয়া আশা করা গিয়েছিল তা তো হয়ইনি বরং উভয় দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাসা বেঁধেছে। প্রতিবেশী এই দুই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে যাদের বাড়া ভাতে ছাই পড়ে এতে তারাই বরং বেশি খুশি হয়েছে। হয়তো এর চাইতেও অনেক বিষয় নিয়ে ভালো ভালো চুক্তি হবে কিন্তু মানুষের মধ্যে যে সদিচ্ছার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই অবস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের রেশ এখনও কাটেনি, রাস্তাঘাটে তার সফর নিয়ে এখনও আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই বলছে বিবাহযোগ্য পুত্র-কন্যার জন্য আলাপ-আলোচনা হলো, সব কথাবার্তা বনিবনা হলো, তারিখ ঠিক হলো, বরযাত্রী এলো, খাবার-দাবার, আদর-আপ্যায়নের কোনো কমতি হলো না, শুধু কবুল ছাড়া বরযাত্রী কনে ছাড়া ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। আসলে সাধারণ মানুষের এই অসাধারণ অনুভূতি খুব সহজে পায়ে দলে অস্বীকার করা যায় না। উভয় দেশই আরেকটু যত্নবান হলে আমরা সত্যিকার অর্থেই একটা বিশ্বাসের আবহ সৃষ্টি করতে পারতাম। যেটা ছিল অনেক কিছু পানা-দানার চাইতে অনেক বেশি মূল্যবান।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৩/০৯/১১]

Keywords: