নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর (তিন)

প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর (তিন)

Wednesday 23 May 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

গত পর্বে ভারতের বর্ষীয়ান নেতা প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পরিচয়ের কিছু স্মৃতিচারণ করেছিলাম। এ নিয়ে অনেক টেলিফোন, চিঠিপত্র ও নানাভাবে অনেকে অনেক কিছু জানতে চেয়েছে। তাই এ পর্ব তাকে নিয়েই সাজাচ্ছি কিন্তু দেশের অবস্থা বড় উত্তাল। কোনো কিছু করতে গেলেই রাজনীতি সামনে এসে যায়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় হুকুমের আসামি করে বিরোধী দলের প্রধান প্রধান নেতাকে এভাবে গ্রেফতারের কোনো নজির নেই। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের সময় বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলায় জড়িয়ে পাকিস্তানের সামরিক সরকার এখনকার মতোই উল্লাস করেছিল, বিরোধী দল শেষ। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান দম্ভ করে বলেছিলেন, ’আর কোনো দিন শেখ মুজিবকে সূর্যের মুখ দেখতে দেব না।’ হ্যাঁ, কয়েক বছর জেলে রেখে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়া থেকে তাকে অবশ্যই বঞ্চিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সব বাঙালির মনের মণিকোঠায় ঠিকানা লিখে বাংলার মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে ক্যান্টনমেন্টের লৌহ বেষ্টনী ভেঙে বঙ্গবন্ধু যেদিন জনতার দরবারে এলেন, সেদিন মোনায়েম খানকেই বরং অন্ধকারে নির্বাসিত হতে হয়েছিল। এমন অগণতান্ত্রিক নিষ্ঠুর আচরণ করলে বর্তমান শাসকদের কি পরিণতি হবে তা তাদের ভেবে দেখা উচিত।

যুগের ধর্ম এই, ’পীড়ন করিলে সে পীড়ন একদিন পীড়া দেবে তোমাকেই।’ তাই সময় থাকতে সাবধান। সব রাজনৈতিক নেতাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিন। গণতন্ত্রের প্রধান শর্তই হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা, বিরোধী দলকে সম্মান করা। ১৮ মে প্রথম আলোয় হরতাল সমর্থক একজনকে যশোরের পুলিশ যেভাবে দুই হাতে গলা টিপে ধরেছে, তাকে তো আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী দেশের সেবক বলা চলে না। সে তো মস্তবড় মস্তান, জল্লাদে পরিণত হয়েছে। ওরকম পুলিশ কর্মকর্তা থাকা রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর। ওকে আজই ১২ বছরের জেল দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ ’ও’ চাকর হয়ে মনিবের গলা টিপে ধরেছে। দেশের মালিক জনগণ, সেই জনগণকে শ্বাসরোধ করতে চাচ্ছে। এ অন্যায় কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এ তো কোনো আন্দোলনকারীর গলা টিপে ধরা নয়, এ যে সমগ্র মানবতার গলা টিপে ধরা। ১৬ কোটি বাঙালির তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের গলা টিপে ধরা। সর্বোপরি বাংলাদেশের সংবিধানের গলা টিপে ধরার নামান্তর। এর অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। এসব অপকর্মের বিচার না হলে এই দুর্বিনীতদের সাহস আরও বেড়ে যাবে। ছোবল দেওয়ার আগেই তাদের সামাল দিতে হবে।

প্রণব মুখার্জি ভারতের একমাত্র বাঙালি, যিনি দিলি্লর ক্ষমতার বলয়ের উচ্চাসনে আছেন। এখন আর নাম করার মতো তেমন কোনো বাঙালি দিলি্লর ক্ষমতার কাছাকাছি নেই এবং বাঙালি নেতা হিসেবে আর কারও তেমন সর্বভারতীয় পরিচয়ও নেই। এই কিছু দিন আগেও ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ছিলেন সিপিএমের সোমনাথ চ্যাটার্জি। এখন তিনি নেই। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী বেশ কয়েক বছর ধরে অচেতন। পশ্চিমবঙ্গের মালদহর এ বি এ গনি খান চৌধুরী একজন অসাম্প্রদায়িক নেতা হিসেবে এক সময় দিলি্লর মসনদের খুব কাছাকাছি ছিলেন। তিনি নেই। সিপিএমের জ্যোতিবসু যিনি একনাগাড়ে অনেক বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি নেই। কিশোরগঞ্জ ইটনার কৃতী সন্তান শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সহপাঠী সিপিআই-এর এমপি ভূপেশ দাসগুপ্ত নেই। আরও অনেক সর্বভারতীয় পর্যায়ে বাঙালি নেতা, যারা ছিলেন তারা কেউ নেই। একমাত্র প্রণব মুখার্জিই বাংলা, বাঙালির কৃষ্টি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রয়েছেন। তার সঙ্গে ’৭৭-এ আমার প্রথম পরিচয়, ’৭৮-এ ঘনিষ্ঠতা। এখন তিনি আমাদের পরিবারের একজন অতি আপনজন, পরম হিতৈষী। আমি যেমন তার বংশপরম্পরায় খবরাখবর রাখি, তিনিও আমার অনেক খবর রাখেন।

’৭৮-এর শেষ দিকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বারবার পাটনা-দিলি্ল করেছি। কথায় আছে, রাখে আল্লাহ মারে কে! ইন্দিরাজি সরকারের পতন ঘটিয়ে কেবলই জনতা পার্টি ক্ষমতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন মোরারজি দেশাই। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর সময় থেকেই শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যার ছিল চরম বিরোধ। তিনি হয়েছিলেন জনতা পার্টির প্রথম প্রধানমন্ত্রী। একেবারে নির্বিবাদে নয়, চৌধুরী চরণ সিং এবং হরিজন নেতা জগজীবন রামের সঙ্গে এ জন্য বহু খেলা করতে হয়েছে। যাই হোক জীবন আর অস্তিত্ব রক্ষায় নেতাজি সুভাষ বোসের এক সময়ের কর্মী ফরোয়ার্ড ব্লকের এমপি সমর গুহের সঙ্গে কয়েকবার পাটনা গেছি জনতা পার্টির প্রাণপুরুষ সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের বিশ্বাস অর্জন ও সমর্থন পেতে। তিনি পাঠিয়েছেন জনতা পার্টির সভাপতি চন্দ্র শেখরের কাছে। জনতা পার্টির অসংখ্য নেতা আমার প্রতি সহানুভূতিশীল। তাদের মধ্যে জর্জ ফার্নান্ডেজ, মধু লিমায়ে, সুরেন্দ্র মোহন, উড়িষ্যার রাজনীতিতে মুকুটহীন সম্রাট বিজু পট্টনায়েক। এ রকম সময় ধীরে ধীরে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সম্পর্ক হয়। তিনি তখন রাজ্যসভার সদস্য।

অনেক দিন তার বদনাম ছিল, তিনি সরাসরি ভোটে জিততে পারেননি। সেই দুর্নাম ঘুচেছে গত দুইবারের লোকসভা নির্বাচনে। পশ্চিমবঙ্গের নেতা হিসেবে প্রণব মুখার্জি এবং গনি খান চৌধুরীর মধ্যে সব সময় একটা রাজনৈতিক বিরোধ ছিল। গনি খান চৌধুরী সরাসরি নির্বাচনে কখনো হারেননি। ছয়বার বিধানসভায় ও আটবার লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। আর অনেক দিন পর্যন্ত প্রণব মুখার্জি জিতেননি। আমার জীবনটাই যেন কেমন। চরম রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যেও আমি যেন কীভাবে কারও সুনাম-বদনাম না করেই সমদূরত্বে চলতে পেরেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর হুজুর মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মাঝে থাকতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। ঠিক তেমনই প্রণব মুখার্জি ও গনি খান চৌধুরী দুজন দুই মেরুর হলেও তাদের উভয়ের সঙ্গে অবলীলায় চলেছি, কোনো দিন কোনো বিরোধ ঘটেনি। তাদের দ্বন্দ্ব থেকেছে তাদের কাছে, সে দ্বন্দ্ব কখনো আমাকে স্পর্শ করেনি। প্রণব মুখার্জি তখন তালকাটোরা রোডের ৭ নম্বর বাড়িতে থাকতেন। একদিন সকালে এ. সি. সেনের চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়ি থেকে নিজে গাড়ি চালিয়ে সেখানে গেছি। প্রণবদার সঙ্গে বেশকিছু প্রয়োজনীয় কথা হয়েছে। তিনি অফিসে চলে গেলেন। দিদি শুভ্রা মুখার্জি আমাকে আটকে রেখে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করলেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ দেখে আমি অভিভূত হলাম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তিনি দেবতুল্য জ্ঞান করতেন। কথায় কথায় এক সময় জিজ্ঞাসা করলেন, ’বঙ্গবন্ধুর মেয়েরা নাকি দিলি্লতেই আছে? কোথায় কীভাবে আছে তুমি কি জান? ওদের আমার দেখার খুব শখ। এ সময় আমি যদি ওদের জন্য কিছু করতে পারি তাহলে খুব ভালো লাগবে।’ বললাম, ’জানি। দেখি কীভাবে আপনার ইচ্ছা পূরণ করা যায়।’ প্রণব মুখার্জির স্ত্রী ততদিনে আমার আপনজন হয়ে গিয়েছিলেন। ওখান থেকেই পান্ডারা রোডের বাড়িতে এলাম। সব শুনে জননেত্রী শেখ হাসিনা খুবই খুশি হলেন। পারলে তখনই বেরিয়ে পড়েন। কারণ বান্ধবহীন দিলি্লতে তিনি বড় একা ছিলেন। মনে হয় চার-পাঁচ দিন পর জননেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ৭ নম্বর তালকাটোরা রোডে গেলাম। সেদিন প্রণবদার সঙ্গে দেখা হলো না। শ্রীমতী প্রণব মুখার্জি মানে শুভ্রাদি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে খুবই যত্ন করলেন। মনে হয় উভয়েরই ভালো লেগেছিল। এরপর যাতায়াত এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। দিলি্লতে থাকলে আমি প্রায় প্রতিদিনই জনতা পার্টির নেতা, এমপি, মন্ত্রীদের বাড়িসহ প্রণবদার বাড়ি যেতাম। প্রণবদা রাজ্যসভার সদস্য, গনিদা লোকসভার। গনি খান থাকতেন ১২ নম্বর আকবর রোডে, প্রণবদা ৭ নম্বর তালকাটোরা রোডে। আমার চলাফেরা নিয়ে সরকারি মহল মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু অসন্তুষ্ট হলেও তাদের করার কিছু ছিল না। সরকারি কেউ রুষ্ট হলে বিচার দেওয়ার জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম।

ছুটে যেতাম জয়প্রকাশ নারায়ণের কাছে অথবা চন্দ্র শেখরের কাছে। মধু লিমায়ে, অশোক দণ্ডপাথ, সুরেন্দ্র মোহন, রবি রায়, জর্জ ফার্নান্ডেজ_ এরা সবাই সমর্থন করতেন। জর্জ ফার্নান্ডেজ এবং বিজু পট্টনায়েক ছিলেন আমার প্রশ্নে যারপরনাই স্পষ্টবাদী। তাই কেউ তেমন কিছু করতে পারতেন না। জগৎ মেহতা নামে একজন হোম মিনিস্টার বা ডেপুটি মিনিস্টার ছিলেন। তিনি একবার ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ’টাইগার, তুমি বাইরের লোক হয়েও এতজনকে ম্যানেজ করলে কীভাবে?’ আমার জবাব শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনিও আমাদের পক্ষ নিয়েছিলেন। মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হয়েও আমাদের প্রশ্নে একা হয়ে পড়েছিলেন। অটল বিহারি বাজপেয়ি তখন ভারতের জনতা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ব্যক্তিগতভাবে চার-পাঁচবার মিটিংয়ের পর তিনি যখন জানলেন আমি আলাউদ্দিন সিদ্দিকীর নাতি তখন অন্যরকম আচরণ শুরু করলেন। আমি মোটেই বুঝতে পারিনি। একদিন তার বাড়িতে খাওয়ার দাওয়াত করলেন। ফরেন মিনিস্টার হিসেবে তিনি তখন ৭ নম্বর সফদর জং রোডে থাকতেন। কিন্তু আমাকে নিয়ে গেলেন ২ নম্বর নাকি ১ নম্বর যন্তর মন্তর রোডে। যেখানে এমপি হিসেবে বহু বছর ধরে তিনি থাকেন। ড্রইং রুমে গিয়ে দেখি এক বিশাল ছবি।

২০-২২ জনের সেই ছবিতে প্রত্যেকের পরিচয় দেওয়া ছিল। সেখানে অটল বিহারি বাজপেয়ির বাবার ছবিও ছিল। সবাই মহাত্দা গান্ধীর সঙ্গে বসে আছেন। হঠাৎ দেখি ’Alauddin Siddique of Bengal’। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আলাউদ্দিন সিদ্দিকী তো আমার দাদু। ছোটবেলায় বাড়িতে চরকা দেখেছি। মহাত্দা গান্ধীর সঙ্গে রাজনীতি করতেন তাও শুনেছি। কিন্তু দাদুকে কখনো দেখিনি। কারণ আমার জন্মের সাড়ে সাত-আট বছর আগে আর বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর জন্মের ৪০-৫০ দিন পরে মারা যান। ছবি দেখে তাকিয়েছিলাম বলে এক সময় অটলজি বললেন, ’কি টাইগার, কি দেখছ?’ বললাম, ’এ যে আমার দাদুর ছবি। কোনো দিন কোথাও দাদুর ছবি দেখিনি, দাদুকেও দেখিনি।’ অটল বিহারি বাজপেয়ি খুব সাদামাঠা হাস্যরসে ভরা সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন অমায়িক ভদ্র মানুষ। বললেন, ’এ জন্যই তো তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। নাহলে মন্ত্রীর বাড়িতেই তো খাওয়াতে পারতাম। তোমার দাদু আর আমার বাবা একসঙ্গে মহাত্দাজির অসহযোগ করেছেন, লবণ সত্যাগ্রহ করেছেন। তোমার বাবা আমার বড়দি ও বড়দার বাল্যবন্ধু। আমার দিদি তোমার বাবাকে ছোট ভাইয়ের মতো যত্ন করেন। বহু বছর দেখা নেই। তবু তাদের সম্পর্কে চিড় ধরেনি।’

খাওয়ার টেবিলে বসতে বসতেই বাবার দিদি মানে আমার ফুফু এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন বেশ কয়েকটি চিঠি। বাবার হাতের লেখা এত ঝকঝকে তকতকে লাখো লেখার মাঝেও তা আমরা চিনতাম। বড় ভালো লাগল অসহায় ভারত প্রবাসে এরকম আপনজন পেয়ে। অটল বিহারি বাজপেয়ির সেই বড় বোন ’৮৮-’৮৯ এ কোনো এক সময় সাপের কামড়ে মারা যান। খবর পেয়ে বাবা যে কি কান্না কেঁদেছিলেন তা বলার মতো নয়। ’৭৮-এর শেষ অথবা ’৭৯-র শুরুর দিকে শঙ্কা অনেকটা কেটে গিয়েছিল। জনতা পার্টি একক থাকতে পারছিল না। চরণ সিং, জাগজীবন রাম, হেমবতী নন্দন বহুগুনা, নন্দিনী শতপথী নানাজনের নানা মতের ঠেলায় জনতা পার্টির ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ভেতরে ভেতরে নানা রকম রাজনৈতিক উথাল-পাতাল চলছিল। জনতা পার্টি বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও সে প্রতিশ্রুতি তারা রাখতে পারছিল না। প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওপর অনেক জোর-জুলুম করছিল, যা জনগণ সহজে মেনে নিতে পারছিল না। ’৬৯-এর জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেস ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ইন্দিরাজির নেতৃত্বে একটি, অন্যটি কে. কামরাজ, নিজুলিং গাপ্পা, এস. কে. পাতিল, মোরারজি দেশাই, অতুল্য ঘোষ, নীলম সঞ্জিব রেড্ডি।

’৬৯-এ গরিবী হঠাও স্লোগানের ওপর ভিত্তি করে ইন্দিরা গান্ধীর বিপুল বিজয় সারা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। কিন্তু ’৭৫-এর ইমার্জেন্সির পর ভারতে ’৭৭-এর সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের চরম পরাজয়ে ইন্দিরা গান্ধী ভীষণ বেকায়দায় পড়ে যান। তার নিজের আসন রায়বেরিলিতে চরণ সিংয়ের এক মন্ত্রশিষ্য রাজনারায়ণের কাছে চরমভাবে হেরে গিয়েছিলেন। পরে অন্ধ্রপ্রদেশের চিক মাঙ্গালোরের আসনে নরসিমা রাও পদত্যাগ করে সেই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। বিরোধী দলের নেতা নির্বাচনেও গোল বাধে। কারণ সংসদে কংগ্রেস দলের নেতা ছিলেন ওয়াই. বি. চ্যাবন। ইন্দিরাজির সঙ্গে তারও বিরোধ ছিল। তখন পর্যন্ত ইন্দিরা কংগ্রেস হলেও প্রতীক ছিল গাভী। কিন্তু যখন বিরোধ দেখা দেয় তখন ইন্দিরাজির নতুন প্রতীকের প্রয়োজন হয়। সে প্রতীক হয় ’হাত’। এখন যেটা কংগ্রেস (আই)-এর প্রতীক। ইন্দিরাজির নাজেহালের তখনো শেষ ছিল না। দুর্নীতির অভিযোগ এনে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়। ভারতীয় রাজনীতির টালমাটাল অবস্থায় ’৭৯ সালের মাঝামাঝি মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন কৃষক নেতা জাঠ ব্রাহ্মণ চরণ সিং। সংসদে তারও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় রাষ্ট্রপতি লোকসভা ভেঙে দিয়ে ’৮০ সালের ৩ জানুয়ারি মধ্যবর্তী নির্বাচন আহ্বান করেন। শুরু হয় নির্বাচনী দামামা।

এর মধ্যে পাটনার গান্ধী ময়দানে ২০-২৫ লাখ মানুষের এক বিশাল জনসভায় ইন্দিরাজি বক্তৃতা করে জয়প্রকাশ নারায়ণের কদমকুয়ার বাসভবনে যান। কিন্তু দেখা করতে পারেন না। তখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চরম ইন্দিরাবিরোধী কর্পুরি ঠাকুর। তাই তিনি তাকে দেখা করতে দেননি। ইন্দিরাজি চাইছিলেন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারাভিযানে যেন সরাসরি জয়প্রকাশজি অংশ না নেন, এ ব্যাপারে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করা। ইন্দিরাজি জানতেন ততদিনে জয়প্রকাশজি আমাকে সন্তানের মতো ভালোবেসে ফেলেছেন। সে সাক্ষাতের ব্যবস্থা খুব সহজেই করতে পেরেছিলাম। ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে একটি ছোট্ট হেলিকপ্টারে ইন্দিরাজি বর্ধমানে এসেছিলেন, আমি সে জনসভায় গিয়েছিলাম। আমার সহকর্মীদের কৃষ্ণনগরে পাঠিয়ে দিতে বলেছিলেন। কারণ তার কৃষ্ণনগরে রাতযাপনের কথা ছিল। গিয়াস, গৌর, বৈদ্য, গোপাল, সুধীর আরও যেন কে কে কৃষ্ণনগর গিয়েছিল। সকালে নাশতা খাইয়ে তাদের সঙ্গে চমৎকার অনেক ছবি তুলেছিলেন, যা দেখে আমারই হিংসা হয়েছিল। ইন্দিরাজি বর্ধমানে আমাকে বলেছিলেন, ’চিন্তা কর না, আমরা সাড়ে ৩০০ আসনে জিতব।’ তার কথাই সত্য হয়েছিল। ৩৭০ বা ৩৭২ সিটে জয়লাভ করে কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল।

’৮০-র কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় প্রণবদা প্রথম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তখনো তিনি ৭ নম্বর তালকাটোরা রোডে থাকতেন। আমি গিয়ে দেখা করলে ভীষণ অভিভূত হয়েছিলেন। আমার ভাঙা নিক্বন ক্যামেরায় একটা অ্যাম্বাসেডর গাড়ির পাশে তার একটি চমৎকার ছবি তুলেছিলাম। তার অত সুন্দর ছবি আর কোনো দিন উঠেছিল কিনা, আমার হাতে অত সুন্দর ছবি আর কোনো দিন হয়েছে কিনা বলতে পারব না। এর কিছু দিন পর তিনি চলে আসেন যন্তর মন্তর রোডের বাড়িতে। আট-নয় একরজুড়ে তার সে বাড়ি। কতবার যে সেখানে গেছি তার ইয়ত্তা নেই। তখন তার প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন মি. কুমার। মনে হয় গুজরাটি হবেন। লোকটি তেমন জুতসই ছিলেন না। কতবার যে সেখানে কে. কে. বিড়লাকে বসে থাকতে দেখেছি। রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার তদবির করতে আসতেন। আমি গেলে দেখা করতে কোনো পাস লাগত না। কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হতো না। এটা দেখে সফল ব্যবসায়ী মানুষ আমার সঙ্গে আগবাড়িয়ে পরিচিত হয়েছিলেন। আমি তাকে বেশ কয়েকবার সিরিয়াল ভেঙে প্রণব দা-র সঙ্গে দেখা করিয়েছি।

নাছোড়বান্দা মানুষ। তিনি রাজ্যসভার সদস্যও হয়েছিলেন। আরেক দিনের এক ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার বালিগঞ্জ ফরেন অফিস খুব ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই সে অফিসের প্রধান ছিলেন শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায়। ১৯৮২-’৮৩ সালের কথা। শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায় আমার বর্ধমানের বাড়িতে হাজির। ’কি ব্যাপার?’ ’না তেমন কিছু না।’ তার চাকরির সময় শেষ। অবসরের মাসখানেক আছে। আমাকে কি করতে হবে? আমি বিদেশি রিফিউজি। আমি কি করতে পারি? তার কথা আমিই নাকি সব পারি। প্রণবদা’কে বললেই সব হয়ে যায়। শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায় আমাকে এবং আমাদের সব সময় সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন। আমি বললেই যদি হয় তাহলে আপত্তি কোথায়। গেলাম দিলি্লতে। প্রণবদা’র বাড়িতে গিয়ে দেখি তিনি আগে থেকেই সেখানে বসে আছেন। তাকে নিয়ে ঢুকলাম অফিস ঘরে। সব কথা বিস্তারিত খুলে বললাম। বললাম, ’তিনি কলকাতা ফরেন অফিসে থাকলে আমাদের ভালো হয়।’ বললেন, ’ঠিক আছে। আমি বিকালে এসে বাঘা তোমাকে জানাব।’ বিকালের প্রয়োজন হলো না। দুপুরেই প্রণব দা-র ফোন পেলাম। বললেন, ’পরদিন সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সাউথ ব্লকের অফিসে দেখা কর।’ পরদিন গেলাম পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসে।

তার অফিস আগে থেকেই চেনা ছিল। অটল বিহারি বাজপেয়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে দুই-তিনবার সেখানে গেছি। নরসিমা রাও অন্ধ্রপ্রদেশের (কালো রংয়ের) হলেও অসাধারণ মার্জিত, ভদ্র, শালীন স্বভাবের মানুষ। অন্তর তার আকাশের মতো বিশাল, বলাকার মতো সাদা। ভীষণ সমাদর করলেন। শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, ’এঙ্টেনশন দিলে তোমার কি লাভ?’ বললাম, ’অবশ্যই আছে।’ আমরা চা খেতে খেতে এক বছরের এঙ্টেনশন লেটার শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন। আসলে ব্যস্ত থাকলে সময় যায় পানির মতো। কিভাবে বছর পেরিয়ে গেল বোঝাই গেল না। আবার এক মাস থাকতে শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায় হাজির। আমার ভালো লাগছিল না। তবুও গেলাম প্রণবদা’র কাছে। কারণ শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায় আমাদের জন্য যথেষ্ট করেছেন। নতুন কেউ এলে অতটা সহযোগিতা পাব কিনা তাই গেলাম। কিন্তু প্রণবদা কিছুতেই রাজি হলেন না। তবে আর. কে. ধাওয়ানকে বলে পরদিন ইন্দিরাজির সঙ্গে দেখা করার সময় করে দিলেন।

গেলাম ১ নম্বর সফদর জং রোডে ইন্দিরাজির বাড়িতে। আমাকে দেখেই একটু স্মিত হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ’টাইগার, তোমার আবার কি হলো?’ সবিস্তারে সব বললাম। শরদ্বিন্দু চট্টোপাধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অফিসার হিসেবে দূর থেকে হয়তো দুই-একবার দেখেছেন। কিন্তু কখনো অত কাছাকাছি হননি। একেবারে জড়সড়ো হয়ে বসেছিলেন আর আমি হাত-পা নেড়ে চেড়ে আপনজনের সঙ্গে কথা বলার মতো যখন অনর্গল বাংলায় বলে চলেছিলাম তখন তিনি বিস্মিত হচ্ছিলেন। সব শুনে ইন্দিরাজি বললেন, ’ঠিক আছে।’ আবার এক বছর। পরেরবার মাস দুই থাকতেই তিনি আমাকে বারবার অনুরোধ করছিলেন। আমি ক্ষমা চাচ্ছিলাম। তার ধারণা ছিল আমি ইন্দিরাজিকে বললেই আবার এঙ্টেনশন হবে। হয়তো তার ধারণাই ঠিক। কিন্তু আমার আর সাহস হয়নি। শুনেছি যেদিন তার শেষ অফিস ছিল, অফিস ছেড়ে বাড়ি যেতে চাননি। চেয়ার ধরে বসেছিলেন। অনেকটা অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলেন। অবসরের পর তিনি বেশিদিন বাঁচেননি। অমন অফিসপাগল মানুষ চাকরি ছেড়ে বেশিদিন বাঁচেনও না। সুস্বাস্থ্যে পরপারে চলে গেছেন।

লেখক : রাজনীতিক

(সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন,২৩/০৫/১২)

Keywords: