নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > কেন এত অসহিষ্ণুতা?

কেন এত অসহিষ্ণুতা?

Monday 21 May 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

প্রধান বিরোধী দল বা জোটের প্রথম সারির প্রায় সব নেতা ঠুনকো অজুহাতে এখন কারাগারে। যেমনটা পাকিস্তানের জমানায় আয়ুব খানের আমলে ঘটেছিল। শাসকের পীড়ন কোনোদিন জয়লাভ করেনি। এটা ইতিহাস। ইতিহাস খণ্ডনের ক্ষমতা আমাদের কারোরই নেই। আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারি, কিন্তু ইতিহাস খণ্ডন করতে পারি না। গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে পরমত-সহিষ্ণুতা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষের মান-সম্মান, নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়া। প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীই যদি না থাকে তাহলে রাজনীতি থাকে কোথায়? ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ায় কৃতিত্ব কোথায়? দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জয়ী হওয়ার আনন্দই আলাদা।

গণতান্ত্রিক সমাজ কারও একার নয়। সবার মতামত নিয়েই গণতন্ত্র। সভ্য সমাজে চরম শত্রুর সঙ্গেও ভদ্র আচরণ করতে হয়। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধরত অবস্থাতেও কোনো কারণে উভয় পক্ষের কথা বলার প্রয়োজন হলে তা ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে করতে হয়। সব মিটিংই যে সফল হয়, তা নয়। কিন্তু আলোচনার কথা বলে একত্র হয়ে কেউ কাউকে হত্যা করে না। হ্যাঁ, নবাব আলীবর্দী খাঁ মারাঠা দস্যু বর্গি সর্দার ভাস্কর পণ্ডিতকে আলোচনার্থে ডেকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছিলেন। তাতে বাংলায় বর্গির হাঙ্গামা নির্মূল হয়েছিল। গ্রামবাংলার মায়েদের আর বলতে হয়নি, ‘শিশু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?’ কিন্তু কেন যেন গণতন্ত্রের এ যুগে সব অগণতান্ত্রিক মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের ৩৩ নেতাকে গ্রেফতার করে জেলে পোরা হলো। এখন যারা সরকারে আছেন আল্লাহ না করুন তারা যদি সরকারে না থাকেন, যারা বাইরে আছেন তারা যদি সরকারে যান, তাহলে যে ৬৬ জনকে খোঁয়াড়ে ঢোকানো হবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? এমন প্রতিহিংসা নিয়ে আর যাই হোক সুস্থ সমাজ চলে না। মানবতা থাকা চাই; সভ্যতা, শালীনতা থাকা চাই। ধীরে ধীরে রাজনীতির সম্মান ধ্বংস হয়েই গেছে। আজ রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। আজ রাজনীতি হয়েছে বিত্তের দাস। কিন্তু বিত্ত ছিল একদিন রাজনীতির দাস।

এখন গোলাম মনিব হয়েছে, মনিব হয়েছে গোলামের চেয়েও অধম। তা না হলে ক’দিন আগে দেখলাম, এক বঙ্গসন্তানকে রাস্তায় ফেলে পুলিশ বুট দিয়ে তার গলা চেপে রেখেছে। তারও আগে বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে যা-তা-ভাবে নাজেহাল করেছে। আবার ১৮ তারিখের এক পত্রিকার প্রথম পাতায় এক পুলিশ কর্মকর্তার দু’হাতে গলা চেপে ধরা দেখে হৃদয়-মন-অন্তরাত্মা শিউরে উঠেছে। এ কী করে সম্ভব? এ কী দেখছি? এ তো মাস্তানের কাজ, গুণ্ডা-জল্লাদের কাজ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর এ কাজ হয় কী করে? গুণ্ডা-তস্করের কাজ যদি সংবিধানের শপথ নেয়া কোনো কর্মচারী-কর্মকর্তা করে, তাহলে দেশ থাকে কোথায়? বড় মর্মপীড়ায় ভুগছি আর অপেক্ষায় আছি—আমরা বাঙালিরা কবে শাড়ি-চুড়ি ভেঙে আবার মানুষ হব। এমন কাপুরুষোচিত আচরণ এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এই যদি গণতন্ত্র হয়, আমরা সে গণতন্ত্র চাই না। আমরা মানুষের মর্যাদা চাই। কেউ ১৬ কোটি জনতার গলা টিপে ধরুক, এটা বরদাশ্ত করা যায় না। আর যদি একজন পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারী কিছু শক্তি আছে বলেই মালিকের গলা টিপে ধরতে পারে, তাহলে শক্তিমান বিশ্ব গোটা দেশটার যে এভাবে গলা টিপে ধরবে না, বা ধরে নেই, তাই বা বলি কী করে? তা না হলে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিতে পারছি না কেন? সব সময় কেমন যেন বুকের ওপর একটা পাথরচাপা ভার অনুভব করি। এটা আমার কথা নয়, এটা রাস্তাঘাটে, আকাশে বাতাসের কথা।

বঙ্গবন্ধু একসময় বলেছিলেন, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী।’ শক্তিমানরা অনেক সময় শক্তিহীনদের কথায় গা করে না। কিন্তু যখন শক্তিহীনদের সম্মিলিত আওয়াজ বিসুবিয়াসের আকার নেয়, তখন কারও পক্ষেই তা সামাল দেয়া সম্ভব হয় না। গণতান্ত্রিক আচার-আচরণকে নির্বাসন দিয়ে পরিচালনা করা যায় না গণতান্ত্রিক দেশ ও গণতান্ত্রিক সমাজ। কৌশল ভালো, কিন্তু বড় বেশি কৌশল অপকৌশলের নামান্তর। সরকারকে যেমন সারাদেশের সরকার, সবার সরকারের মতো আচরণ করতে হয়, ঠিক তেমনই বিরোধী দলকেও দেশের কল্যাণ চিন্তা করে অগ্রসর হতে হয়। যারা হয় না বা হতে পারে না তারা সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
গত ১৮ মে শুক্রবার বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গিয়েছিলাম। বড় ভালো লেগেছে তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সফলতা দেখে। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী আমাদের ঘনিষ্ঠজন। তাঁর বাবা কফিল উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭০-এ আওয়ামী লীগের এমএনএ ছিলেন। তাই বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আগেই তাকে চিনতাম।

দু-চারবার রাজনৈতিক প্রোগ্রামে আর্থিক সাহায্যও নিয়েছি। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ডাক্তারি পাস করে প্রথম যৌবনে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে চাকরি করতেন। মায়া আপা পড়তেন কুমুদিনী কলেজে। আমার শাশুড়ি নার্গিস হামিদ কোরায়শী ছিলেন কুমুদিনী কলেজের প্রিন্সিপাল। তাই তাদের বিয়েতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন, যে কারণে তারা আমার শাশুড়িকে শেষ দিন পর্যন্ত মায়ের মতো দেখতেন। সে কারণে ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের একটা আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে। অন্যদিকে বিকল্পধারার মূলস্তম্ভ মেজর (অব.) আবদুল মান্নান একজন সফল ব্যবসায়ী হলেও তাকে আমি একজন বড় মাপের দেশপ্রেমিক হিসেবেই মনে করি। কতদিন তার কত অমূল্য সময় নষ্ট করেছি। কখনও কোনো উহ্আহ্ করেননি। বারবার চলে আসতে চাইলেও ছাড়তে চাননি। মনে হয়, আমার সঙ্গে সময় নষ্টই যেন তার বড় ব্যবসায়িক সাফল্য। বিএনপি সরকারের বস্ত্রমন্ত্রী থাকতে যেদিন প্রথম তার মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন সিরাজগঞ্জের ৫-৬ এমপির সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমাকে দেখেই আলাদা ঘরে নিয়ে কথা বলেছিলেন। ছোট মানুষ, কাজও ছিল ছোট, সময় লাগেনি। কথা শেষে বেরিয়ে এলে এমপি সাহেবদের বলেছিলেন, ‘বাংলার বীর কাদের ভাই এসেছিলেন আমার কাছে। এ যে আমার কত গর্বের। দেশ ঠিকভাবে চললে, বঙ্গবন্ধু থাকলে কাদের ভাই মন্ত্রী থাকতেন, আমরা গর্ব করে তাকে দেখতে যেতাম।

আজ আমি মন্ত্রী, তিনি এসেছেন। আপনাদের রেখে তার সঙ্গে কথা না বললে এটা হতো আমার জাতির সঙ্গে চরম বেয়াদবি। এ দুনিয়ায় আমরা যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ একজনের কাজে আরেকজনকে লাগতে হবে। বেহেশত-দোজখে আমাদের যেহেতু কিছুই করার থাকবে না, তাই আমরা কারও কোনো কাজে আসব না।’ তার সেদিনের সে কথা আজও আমাকে আলোড়িত করে। মাঝে মাঝে তার কাছে গেলেই আমার দলকে দু-চার লাখ টাকাপয়সা দিয়ে সহযোগিতা করেন। যেখানে লাগবে কোটি, সেখানে অনেকেই দেন লাখ—এটাই স্বাভাবিক। তবে এক বিশাল হৃদয়ের অসাধারণ মানুষ মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। তাই তার বারবার আহ্বান ফেলতে পারিনি, সাড়া দিয়েছিলাম। বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে, এক নতুন চিন্তার খোরাক দিয়েছে। বিএনপি সরকারে থাকতে তাদের ব্যর্থতা, অদক্ষতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে যেমন বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর জন্ম, তেমনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী সরকারের অনেক কাজের সঙ্গে একমত হতে না পেরে আমরা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেছিলাম। উভয় দল এক রকম অত্যাচারিত হয়েছে। যে মূল দল থেকে বিভক্ত হয়ে বিকল্পধারার জন্ম, সেই দল বিএনপির জাতীয় নেতারা অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উপস্থিত হয়ে তাদের জন্মের বাস্তবতা স্বীকার করে অভিনন্দন জানানোয় আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। একেই বলে রাজনীতি। রাজনীতিতে যে শেষ কথা নেই, এটাই হলো তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

তাই আমরা আশা করে রইলাম কবে হবে সেই শুভদিন যেদিন আওয়ামী লীগকেও স্বীকার করতে হবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের জন্ম ছিল সময়ের এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। অন্যদিকে কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সব সময় চমত্কার বক্তৃতা করেন। খোলামেলা হৃদয় দিয়ে বলেন। এখনও বড়সড় শক্তিশালী রাজনৈতিক হুমকি না হওয়ায় তাদের ওয়ান-ইলেভেনের সময় জন্ম প্রসঙ্গে কেউ তেমন সমালোচনা করে না। কারণ মাঝারি গাছ নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই। বড় হলে ঝড়ে ভাঙে, ছোট হলে ছাগলে খায়। ভদ্রলোক আমাকে অসম্ভব সম্মান করেন, যে কারণে আমিও তাকে ভালোবাসি। আর সব থেকে বড় কথা মুক্তিযুদ্ধে তার যথার্থই ভূমিকা রয়েছে। তিনি যখন বললেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এককভাবে তেমন ভূমিকা রাখতে পারা যাবে না মনে করেই বিএনপির জোটে গেছেন। কেন যেন তখন আমার মনে হয়েছিল, তার যখন মনে হলো একা থেকে তেমন কিছু করা যাবে না বলে জোটবদ্ধ হওয়া দরকার, তখন সরকারেরও কি মনে হয়েছে জোটবদ্ধ সব দলের প্রধান নেতাকে অহেতুক গ্রেফতার করলেও তাকে বাইরে রাখা দরকার? সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হয়েছে, ৮ বছর আগে যে সময় বিএনপির চরম সুদিন, তখন কী কারণে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব তার তিল তিল শ্রমে-ঘামে গড়ে তোলা সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর জন্ম দিয়েছিলেন। একেই বোধ হয় বলে জগত্, একেই বলে যাওয়া-আসা। এটাই বাস্তবতা।

বিকল্পধারার আরেক সম্ভাবনাময় নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর একমাত্র ছেলে মাহী বি চৌধুরী টোনাকে নিয়ে অনেকেই স্বপ্ন দেখেন। আমার স্ত্রী তাকে কোলে নিয়েছে। ও খুব ছোট থাকতে বহুবার টাঙ্গাইলে গেছে। আমরা তাকে খুবই স্নেহ করি। মনপ্রাণ উজার করে চাই—সে সফল হোক, জাতিকে অমানিশার অন্ধকার থেকে বের করে আনার নেতৃত্ব দিক। তাই আমার বক্তৃতার একাংশে বলেছিলাম, মাহী বি চৌধুরী বর্তমান যুবসমাজের সম্ভাবনাময় নেতা। এক হাতে দুই মাছ ধরা যায় না। দেশ ও দেশবাসীর অঙ্গের ভূষণ যদি হতে চাও, তাহলে সব ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা থাকতে হবে মানুষের ওপর। সার্বক্ষণিক রাজনীতিক হতে হবে। খণ্ডকালীন রাজনীতি করে উপনেতা পাতিনেতা হওয়া যায়, জাতির নেতা হওয়া যায় না। মাহী আমার সঙ্গে একমত হয়নি। না হওয়ারই কথা। কারণ চিন্তা-চেতনার দিক থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল চিন্তায় আমাদের পার্থক্য অনেক। তবুও তাকে বলে এসেছি, এটা-ওটা করে এ পর্যন্ত কেউ জাতীয় নেতা হয়নি, জাতীয় নেতাদের অনুসারী হয়েছে। জানি না আমার কথা ওর চিন্তায় নাড়া দেবে কিনা, কিন্তু আমি তার সফলতা কামনা করি। সর্বোপরি সভ্য দেশ ও সমাজ হিসেবে আমি সুশাসন চাই, গণতান্ত্রিক শাসন চাই।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সুস্থ রাজনৈতিক দল বিকাশ অন্যতম উপাদান। রাজনৈতিক দল যত সবল ও সফল হবে, দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চা তত নিরাপদ হবে। ছোট্ট চারাগাছকে যেমন সময়মত সার-পানি দিয়ে বড় করতে হয়, তেমনই রাজনীতিকে সবল স্বাস্থ্যের অধিকারী করতে হলে রাজনৈতিক দলকে সঠিকভাবে রাষ্ট্র এবং সমাজের লালনপালন করতে হয়। তাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বারবার বাধা দিয়ে আর যাই হোক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সমাজ বিকাশ হয় না।
গত পর্বে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিময় ধানগড়া নিয়ে আলোকপাত করেছিলাম। অনেক পাঠক তার পরের কথা জানতে চেয়েছেন। তাই ওদিকটায় কাউকে অন্ধকারে রাখতে চাই না। গভীর রাতে যখন ছাতিহাটির পৈতৃক ভিটায় পৌঁছই, তখন বাড়ির চেহারা দেখে অবাক হয়ে যাই। অনেক ডাকাডাকির পর চাচা বেরিয়ে আসেন। বেরিয়েই তিনি বলেন, ‘ভাই-ভাবীরা তো এখানে নেই।’
—কেন? তারা কোথায় গেছেন?

—কয়েকদিন হলো তারা ধানগড়া চলে গেছেন। মা-বাবা, ভাই-বোনদের দেখতে মন বড় ছটফট করছিল। তাই আর কোনো প্রশ্ন না করে ধানগড়ার দিকে পা বাড়াই। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক, আর মিটমিটে জোনাকির আলো। ওর আগে কোনোদিন ধানগড়া যাইনি। কিন্তু বাবা-মা যেখানে ছিলেন, সে বাড়ি খুঁজে পেতে কোনো কষ্ট হয়নি। গ্রামের প্রান্তঃসীমায় লোকজনের সঙ্গে দেখা হওয়ায় তারাই নিয়ে গিয়েছিল নাজির হোসেন নাদুর বাড়ি। রাত সাড়ে ১২টা-১টা হবে। আস্তে করে ‘মা, মা’ ডাক দিতেই দরজা খুলে গেল। মনে হয়, মায়েরা তাদের সন্তানের জন্য সব সময় হৃদয়ের দুয়ার খুলেই রাখেন। প্রায় ২০ দিন পর মা-বাবাকে পেয়ে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলাম। খুব একটা সময় লাগেনি, সব ভাই-বোন ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে বানরের বাচ্চার মতো চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরেছিল। ছোটবেলায় ভাই-বোনেরা আমাকে বড় বেশি জড়াজড়ি করে থাকত।

কেন যেন আমি ছিলাম ওদের বড় কাছের মানুষ। মনে হয়, মা সব সময় আমার জন্য খাবার রেখে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধের অত কঠিন সময়েও সব বাচ্চাকাচ্চাদের বাবা-মা আগলে ছিলেন। একমাত্র বড় ছেলে লতিফ সিদ্দিকী এমপি আর আমি তাদের পাখনার বাইরে। দশ মিনিটও লাগেনি আমাদের খাবার দিতে। আমরা গেলে নাজির হোসেনের বাড়ির সবাই জেগে উঠেছিল। এই সেদিন নাজির হোসেনের স্ত্রী বেগম হাফছা খাতুন যে মারা গেলেন, তিনি সবার আগে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলেন। খাবার খেয়ে মা-বাবার পাশেই শুয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে দেখলাম ধানগড়া গ্রাম। বংশাই নদীর পাড়ে হতদরিদ্র ছোট্ট একটি তন্তুবায়ী পল্লী। তারা সবাই কারিগর। কাপড় বুনে রুটি-রুজি নির্বাহ করে। কোনো রাস্তাঘাট নেই। গ্রামের মানুষ খুব একটা বাইরে যায় না, বাইরের মানুষও তেমন আসে না। একেবারে নিরিবিলি কোলাহলহীন ছোট্ট একটি গ্রাম। সকালে নাস্তা খেয়ে মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা এখানে কেন? কীভাবে এলে?’ তখনই শুনলাম পৃথিবীর এক নির্মম দুর্ভাগ্যের কাহিনী।
(সূত্র: আমার দেশ,২১/০৫/১২)

Keywords: