নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক প্রলয়

একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক প্রলয়

Tuesday 1 May 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

শত বছর আগে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষ আজকের দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরে রক্ত দিয়ে দিনটির স্বীকৃতি আদায় করেছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি, বিশ্বের শত কোটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি বিনম্র অভিনন্দন ও গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

একদিকে মানুষের সৃষ্ট অশান্তি, অন্যদিকে প্রকৃতির ক্ষুব্ধ রোষে সাধারণ নাগরিক জীবন একেবারে পর্যুদস্ত। ২১ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাণকেন্দ্র, তীর্থভূমি সখিপুরের কয়েকটি ইউনিয়ন কালবৈশাখীর করাল থাবায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। জীবনে কত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখেছি কিন্তু এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা দেখিনি। গজারিয়া ইউনিয়নের পাথার, চৌরাস্তা, বাঘবেড়, গজারিয়ার সড়কঘাটা হজরত শাহ বদর উদ্দিনের মাজার সব বিরান হয়ে গেছে। যেসব মাঠে হাজার হাজার মণ ধান হতো সেখানে এক ছটাক ধান পাওয়ার উপায় নেই। সাধারণ মানুষ একেবারে বাকশূন্য-দিশাহারা হয়ে গেছে। শোক প্রকাশের অবস্থায়ও তারা নেই। শাহ বদর উদ্দিনের মাজারে এক অলৌকিক ঘটনা দেখে বিস্মিত হলাম। শিল পড়ে আশপাশের হাজার হাজার গাছপালা নুইয়ে পড়েছে, ঘর-দুয়ার ছিন্নভিন্ন, মাজারের চারপাশের আঙ্গিনা টনকে টন বরফ পড়ে ভরে গেছে। কিন্তু মাজার ঘরের চালে এক টুকরা বরফ পড়ার চিহ্ন নেই। আল্লাহর কি কুদরত, তাঁর অলিদের তিনি যে ছায়া দেন এটা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কাকড়াজান ইউনিয়নে ক্ষতির পরিমাণ অচিন্তনীয়। তৈলধরা, ঢনঢনিয়া, মুক্তিযুদ্ধের হেডকোয়ার্টার মহানন্দপুর একেবারে বিরান হয়ে গেছে। কোনো বাইদে ধানের চিহ্ন নেই। গাছে পাতা নেই।

প্রতিটি ঘরের চাল আকাশ থেকে শিল পড়ে হাজার হাজার ছিদ্র হয়ে ঝাঁজরা হয়ে গেছে। এ এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। চোখে না দেখলে কারও কথাই বিশ্বাস করতাম না। ঢনঢনিয়ার মুচারিয়াচালার একটি বাড়িও অক্ষত নেই। খেতে কোনো ফসল নেই, গাছে কোনো ফল নেই। মহানন্দপুরে এক আম বাগানে আট-দশ হাজার গাছ সাত নাকি আট লাখ টাকা বিক্রি করে এক-দুই লাখ টাকা বায়না নিয়েছিল। সে বাগানে একটি গাছেও পাতা নেই। তৈলধরায় ঘরবাড়ি এবং গাছপালার ক্ষতি হয়েছে অকল্পনীয়। আল্লাহর প্রতি হাজার শোকরিয়া জানাই দুর্যোগটি দিনে না হয়ে গভীর রাতে হয়েছে। লোকজন ঘরের বাইরে থাকলে অত বিশাল বিশাল বরফখণ্ড কারও গায়ে পড়লে সে সেখানেই মারা যেত। রাতে দুর্বিপাকের কারণে আল্লাহর দয়ায় জানের ক্ষতি না হলেও এখন অনেকের না খেয়ে মরার অবস্থা। ঝড়-বৃষ্টি এলে সন্তান-সন্ততি নিয়ে ভিজে মরবে তারা। কিন্তু এত দরদি সরকার, এত মন্ত্রী-উপদেষ্টা_ দুর্গত এলাকার মানুষের পাশে একজনও যাননি। কেউ কোনো সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। মানুষের মধ্যে কি যেন একটা নির্জীব ভাব কাজ করছে। আগে কেউ বিপদে পড়লে অন্তত দূর-দূরান্তের আত্দীয়-স্বজনরা দেখতে আসত। সেটিরও কেমন যেন ভাটা পড়েছে। সরকার শুধু কথায়ই খই ফুটাতে শিখেছে। কাজের কাজ কিছুই না। সখিপুর-বাসাইলের সংসদ সদস্যও ব্যতিক্রম নন। শুধু কথায় যে সব সময় চিঁড়া ভিজে না এ কথাটিও তিনি মানতে চান না।

নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় সার্কাস, জুয়া, হাউজি, যাত্রা আর উলঙ্গ নৃত্যের শেষ নেই। বহু শতাব্দী আগে পাহাড় এলাকা ছিল শান্তির নীড়। কত অলি-এ-কামেল নির্জনে আল্লাহর আরাধনা করেছেন, পায়ে পায়ে সেখানে অলি-এ-কামেলের মাজার, কত পবিত্র দরগাহ। শত শত হাজার হাজার ভক্ত মাজারে মাজারে পড়ে থাকেন। জিকির আজকার করে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। গত জাতীয় নির্বাচনের পর এমন কোনো দিন নেই যে কোথাও না কোথাও জুয়া, হাউজি, সার্কাস, যাত্রার আসর নেই। সখিপুর উপজেলা থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে এক জাগ্রত মাজার দরগারপাড় হজরত শাহ কামালের মাজার সম্পর্কে লোকাচার আছে ৭০-৮০ বছর আগে করটিয়ার জমিদাররা হাতিতে চড়ে ওই পথ দিয়ে যাওয়ার পথে একদিন হাতি বসে পড়েছিল। খোঁজখবর নিয়ে দেখে জঙ্গলে একটি কবর। একটি মস্তবড় বাঘ সে কবর পাহারা দিচ্ছে। জমিদারের লোকেরা বাঘকে গুলি করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। অনেক দাপাদাপি ঢোল পেটানোর পরও কবরের পাশ থেকে বাঘটি একচুল সরে না। তাকে গুলি করতে গিয়ে প্রথমজন অজ্ঞান হয়। দ্বিতীয়জনের বন্দুকে গুলি ফোটে না। এ রকম অবস্থা দেখে লোকজন নিয়ে জমিদার পিছিয়ে আসেন। হাতিতে সওয়ার হতে গেলে হাতি সওয়ারি নেয় না। এ রকম নানা আলামত দেখে জমিদাররা ওই রাস্তায় আর কখনো হাতিতে চড়ে পারাপার হননি। সব সময় ওইটুকু পথ হেঁটে যেতেন এবং প্রতি বছর ওরসের সময় স্টেটের পক্ষ থেকে খায়-খরচা করতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমিও ওই মাজারের অনেক কিংবদন্তি শুনেছি। সখিপুরের সর্বজনপ্রিয় সম আলী আজগর সব সময় মাজারটির দেখাশোনা করতেন। আমিও বেশ কয়েকবার গেছি। কয়েক মাস আগে মাজারের কাছে আজগরের বাড়িতে রাত কাটানোর সময় মাজারের প্রবীণ খাদেম আবুল হোসেন মারা যান। তাকে মাজারের পাশেই কবর দেওয়া হয়। তার জানাজায় উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। পৌরসভার চেয়ারম্যান হানিফ ও উপজেলা চেয়ারম্যান শওকত সিকদার জানাজায় ছিলেন। যে রাতে খাদেম মারা যান সে রাতেও মাজারপাড়ে হাউজি, জুয়া, সার্কাস কোনো কিছু বন্ধ থাকেনি। আমি খুব আহত হয়ে শওকত এবং হানিফকে ওসব বন্ধ করতে বলেছিলাম। ওরা এমপিকে বলবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। শুনেছি এসব সার্কাস, হাউজি, জুয়া যারা খেলে তারা নাকি প্রতি রাতে হাজার হাজার টাকা দেয়। তাই মহানন্দপুরের ধ্বংসলীলা দেখে যখন আমি খুবই পীড়িত তখন প্রবীণরা খুবই বিরক্তভাবে বলছিলেন, ’আল্লাহ-রাসূলের নাম নেই, খালি গান, বাজনা, হাউজি, জুয়া, নাচানাচি করলে আল্লাহর তরফ থেকে এমন গজব পড়বে না কি রহমত পড়বে।’ মুরবি্বদের কথা শুনে বড় ব্যাকুল হয়ে গিয়েছিলাম। তবে কি দয়াময় প্রভু দুষ্ট, ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের শাস্তি দরিদ্র জনসাধারণকে দেবেন? ক্ষমতাবানের পাপের শাস্তি কেন সাধারণ মানুষ ভোগ করবে। বারবার মন বলছিল, দয়াময় আল্লাহ তুমি দিনের বদলে রাতে দুর্যোগ দিয়ে যাদের বাঁচিয়েছ তাদের মুখের অন্ন এখন কে জোগাবে? সরকার উদাসীন, এমপি, মন্ত্রী উদাসীন। তুমি ছাড়া মানুষের বাঁচানোর আর কে আছে? দয়াময় তুমি মানুষের ওপর দয়া কর, তাদের বাঁচাও।

বাংলা বছরের শুরুতেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন যেন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রেল মন্ত্রণালয়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে কয়েকশ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তার ছিটেফোঁটা মন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে (৭০ লাখ টাকা) পাওয়া গেছে। তাতেই মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চাকরি গায়েব। আমাদের দেশে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের খুব একটা নজির নেই। তবুও একটা নজির স্থাপিত হতে চলেছিল। তাও আবার তাকে দফতরবিহীন খামাখা মন্ত্রী বানিয়ে সবকিছু বরবাদ করে দেওয়া হলো। এরপরে এলো একজন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ইলিয়াস আলীর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা। ঘটনাটি বড়ই বিস্ময়কর! ওরকম একজন মানুষ উধাও হয়ে গেলে তার যদি যথাসময়ে খবরাখবর সরকার বাহাদুর বের করতে না পারে, তাহলে যাদের কেউ নেই সেই সাধারণ মানুষ গুম হলে তার কি হবে? এ ব্যাপারে সারা জাতি ভীষণ শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য এক এক করে টানা তিন দিন হরতাল হয়েছে। গত দুই দিন হরতাল হলো। আবার কি হবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই জানেন। হরতালে হরতালে অতিষ্ঠ হয়ে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে আন্দোলনকারী প্রধান দল বিএনপির কার্যালয়ে গিয়েছিলাম বিকল্প পথের সন্ধান খুঁজতে। সব সভ্য সমাজের রীতিনীতি লঙ্ঘন বা পদদলিত করে সরকার আমার দলের কয়েকজন কর্মীকে গ্রেফতার করেছিল। পল্টনের তপ্ত রাজপথে এক ঘণ্টা পড়ে থেকে পিঠে ১০-১৫টা ফোঁসকা ফেলে তাদের বের করে এনেছি। কিন্তু আন্দোলনের জন্য আর যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের আনতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের। গণতান্ত্রিক দেশে প্রধান শর্তই হলো মানুষের জীবন। সেটাই যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে সভ্যতা কোথায়, সভ্য দেশ কোথায়? ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজের ওপর এক মারাত্দক হুমকি। সরকারকে এর সুষ্ঠু সমাধান দিতেই হবে।

প্রায় তিন বছর হলো আওয়ামী লীগ নেতা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ পদত্যাগ করেছেন। তার পদত্যাগ নিয়ে কি যে মাদারীর খেল খেলা হচ্ছে। এর মানে কি, লাভ কি, তা যারা খেলছেন তারাই জানেন। তবে এসবের সমাপ্তি হওয়া উচিত। মর্যাদাহীন, কর্তৃত্ব, নেতৃত্বহীন কাজের বুয়ার চাইতেও নিম্নমানের মন্ত্রিত্ব কেউ যদি করতে না চান তাকে ধরে রাখবেন কি করে? বিশেষ করে তিনি যদি আবার বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদের রক্ত হন। এবার আসছি গত পর্বের ’একশ টাকা তো কিছুই না’ সম্পর্কে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কিছু সময় ভারতীয় বাহিনী আমার দলের সঙ্গে মিলেমিশে লড়াই করেছে। যুদ্ধের ময়দানে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা, কথাবার্তায় যে যত বীরই হোক গোলাগুলির সামনে অনেকেই একদৌড়ে পগার পার। এটা আমি আমার দলের অনেকের ক্ষেত্রেও দেখেছি। এটা কোনো দোষের নয়, এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ’৭১-এর ২৭ মার্চ যেদিন টাঙ্গাইল সার্কিট হাউস দখল করতে অথবা ২ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের বি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে অভিযানে গিয়েছিলাম সেদিন আমরা অনেকেই সামনের কাতারে যেতে পারিনি, কুনি মেরে কতজন যে আগে চলে গেছে। টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনের স্বাস্থ্যবান পুলিশদের সে যে কি সাহস। টাঙ্গাইল পারদিঘুলিয়ার নজরুল গুণ্ডা সেদিন ছিল সবার আগে। একনলা বন্দুক নিয়ে তার আগে কেউ যেতে পারেনি। সবই তো বদলে গেছে, তাই পরিচয় দিতে অসুবিধা হয়।

জেলা সদরের কাছে লোহার পুলের ওপর থেকে কে বা কারা হঠাৎ গুলি ছোড়ায় টাঙ্গাইল সার্কিট হাউস থেকে মেশিনগানের গুলি ছুড়লে সারা শহর কেঁপে ওঠে। কত গুলি আর হবে? দুই বা তিনবার ট্রিগার টিপায় একশ-সোয়াশ বড়জোর দেড়শ রাউন্ড। ওই গুলির পর কোনো গুণ্ডাপাণ্ডা পাওয়া যায়নি। গুণ্ডাপাণ্ডারা তো শহর ছেড়ে ছিলই, ৯০ ভাগ সাধারণ বাসিন্দাও শহর ছেড়ে পালিয়েছিল। মেশিনগানের গুলিতেই ওই অবস্থা, কামান দাগলে যে কি হতো পাঠক আন্দাজ করতে পারেন। এটা মোটেই কোনো দোষের কথা নয়। মানুষ অযথা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে না- এটি পাখা গজালে পিপীলিকার কাজ। অযথাই কেউ বুক চিতিয়ে গুলি খেয়ে মরে না। সাহসী হলে কৌশলে প্রতিরোধ করে। যুদ্ধের ময়দানেও কিছু কিছু যোদ্ধা পিছিয়ে থাকতে চায়। আগে যায় না অথচ গুলি পেছনেও লাগে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছয়-সাত দিন যারা রণাঙ্গনে একত্রে হেঁটেছে তারা একটাই অভিযোগ করেছে, মিত্রবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আগে যেতে দিতে চায় না। এটা এক হতে পারে যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব তারা নেবে, অন্যটা হতে পারে মুক্তিযোদ্ধারা অনভিজ্ঞ বয়সে তরুণ, তারা কেন আগে গিয়ে গুলি খেয়ে মরবে। যে যাই বলুক ঢাকা দখলের অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর কাউকে যুদ্ধজয়ের একক কৃতিত্ব নেওয়ার মানসিকতা দেখিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের তারা যে মাঝে-মধ্যে আগে যেতে না দিয়ে নিজেরা গেছে সে শুধু মানবিক কারণে। কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে তারা বলির পাঁঠা বানাতে চায়নি।

মনে হয় মূল আলোচনা থেকে অনেক দূর সরে এসেছি। ভারতে নির্বাচন হয়েছিল ’৭৭-এর এপ্রিলে। মে থেকে দুর্দশা শুরু হলো। জিয়াউর রহমান ইংল্যান্ডে কি এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মোরারজি দেশাইর সঙ্গে আলোচনা করেন। জিয়াউর রহমান মোরারজি দেশাইকে বুঝাতে সক্ষম হন এবং আমাদের আশ্রয়স্থল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করেন। চার ডিভিশন সৈন্য দিয়ে সবদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। ’৭১-এ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের বলেছিলেন, ’আমরা তোমাদের ভাতে মারব, আমরা তোমাদের পানিতে মারব।’ ঠিক তেমনই আমাদেরও করার চেষ্টা করা হয়। পশ্চিমে রংপুরের রৌমারী-রাজিবপুর, পূর্বে জাফলং-তামাবিল পর্যন্ত হাজার হাজার সৈন্য দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। আমরা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কোনো কোনো বাজার থেকে চাল, ডাল, তেল, নুন সংগ্রহ করতাম। সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। তাদের পরিকল্পনা বুঝতে পেরে প্রথম সপ্তাহ খাওয়া-দাওয়া চার ভাগের তিন ভাগ করে দেওয়া হলো। পরের সপ্তাহে অর্ধেক করা হলো। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার, কর্নেল, জেনারেলরা আমার সঙ্গে আমার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে লাগলেন। মাহমুদুল হাসান নামে এক কর্নেলের নেতৃত্বে তিন-চারশ মাইল সীমান্তজুড়ে রাত-দিন মাইকিং করা শুরু হলো। দুই-চার দিন মাইকিংয়ের পর দেখা গেল আমাদের দলের দুর্বলচেতা কিছু সদস্য শত্রুপক্ষের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে মাইকিং করছে।

প্রথম সপ্তাহখানেক জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ সংগ্রামীরা কিছুটা বিভ্রান্ত ও ঘাবড়ে গেলেও ছয়-সাত দিনের মধ্যে দেখলাম তাদের ভয়ভীতি কেটে গেছে। মাইকিংয়ের ওই ছয়-সাত দিনে তারা একজন গারো, হাজং, কোচ সদস্যকে পায়নি। দালাল হিসেবে যা দুই-চারশ পেয়েছিল তার সবাই মুসলমান, তাতে একজন হিন্দুও ছিল না। আরও মজার ব্যাপার, শুধু বগুড়ার রেজাউল বাকী ছাড়া পক্ষত্যাগী আর সবাই ঢাকার এবং বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের। জিএম রহমান বাবুল, মোবারক হোসেন সেলিম ও সাইফুর রেজা মামুনের ভূমিকা ছিল খুবই জঘন্য। কিন্তু নাসিম ওসমান, মঞ্জু, যুগল, সেন্টু, খসরু, নসু এরা কেউ সেদিন কোনো দুর্বলতা তো দেখানইনি বরং ভীষণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ এবং ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলীর বর্তমান শিষ্য আবদুস সামাদ পিন্টু ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বর্তমান ডিজি শামিম মোহাম্মদ আফজাল পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। হাত-পা বেঁধে দুই-এক দিন কোয়ার্টার গার্ডে রাখা হলেও পরে ওদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং ওরা সত্যিই বেশ ভালো কাজ করে। পিন্টু তেমন কিছু না পারলেও শামিম আফজাল প্রথম জজ হন, এখন তো তার খুবই ক্ষমতা। তবে এখনো দেখা হলে বেশ সম্মানের আচরণ করেন।

আমাদের সুরক্ষিত হেডকোয়ার্টার ছিল ভারতীয় সীমান্তের দেড়-দুই মাইল ভেতরে পাঁচ-সাত মাইল এলাকাজুড়ে। প্রায় দুই বছর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দেখেছে জাতীয় মুক্তিবাহিনী নামের ’৭৫-এর প্রতিরোধ সংগ্রামীরা আদর্শের প্রতি কত নিবেদিত এবং দুর্ধর্ষ। তাই সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়তে তারা সাহস করেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ যে যত ফাটুস-ফুটুসই করুক সবার ওপর জিয়াউর রহমানের তেমন খুব একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সাধারণ সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে কোনোমতেই মেনে নেননি। তাই জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার না করায়, তার হত্যার বিচার না করায় অথবা এড়িয়ে চলায় তারা অসন্তোষ ছিলেন। স্বার্থান্বেষী কিছু উচ্চপদস্থ জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থাকলেও মনেপ্রাণে অনেকেই ছিলেন না।

লেখক : রাজনীতিক
(সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন,০১/০৫/১২)

Keywords: