নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > বড় অসময় (৫)

বড় অসময় (৫)

Monday 9 April 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

আপনার ছায়ায় ভদ্রলোক যদি অর্থ আত্মসাতের কথা বলত তাহলেও হয়ত তা নিয়ে আলোচনা করা যেত। একটি সুসংগঠিত মুক্তিযোদ্ধা দল যার নিয়মকানুন এমন কঠিন ছিল যা নিয়ে সারা পৃথিবী বিস্মিত। সভা-সমিতির জন্য কোনো সুতো বেঁধে রাখা হলে সেটা পথচারীদের অসাবধানতায় ছিঁড়ে গেলে তারাই আবার বেঁধে দিত। কেউ ভয়ে কেউ আবার শ্রদ্ধায়। এ ব্যাপারে আপনাকে একটি কথা বলি, আপনি তো ঢাকায় ছিলেন সন্তানসম্ভবা। তাই না বললে বুঝবেন কী করে? আগে ছিল কালিহাতী থানায় এখন সখীপুরে বাঘের বাড়ির কাছে পলাশতলী বাজার। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে এক কমান্ডারের হাত থেকে পড়ে যাওয়া ১০০ টাকা পেছন ফিরে আর পায়নি। দুঃখ করে শুড়িরচালা ক্যাম্পে বাবার কাছে হাটের ঘটনা বললে বাবা তাকে পরের হাটে দশ টাকা ফেলে রাখতে বলেন। সে তাই করে। যেইমাত্র একজন টাকাটা তোলে তখনই চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনী তাকে ধরে ফেলে। কুড়িয়ে পাওয়া টাকার জন্য তার বিচার হয়। বিচারে কানমলা, নাকমলা, চড়-থাপ্পড় এবং নাকে ছেচড় দিয়ে মুক্তি দেয়।

এরপরের হাটে আবার একদল মুক্তিবাহিনী ৫০ টাকার একটি নোট ফেলে রাখে। তখন ৫০ টাকা ছিল অনেক টাকা। ৭-৮ টাকা মণ ধান, ১৬ টাকা মণ চাল, দুই আনা সের দুধ। সবকিছুর দাম নাগালের মধ্যে। হাটের লোকজন যেই পায়ের নিচে টাকা দেখে তুলতে যায়, তুলতে গিয়েই মনে হয় মুক্তিবাহিনী কোথায়? যদি ধরে ফেলে। সন্ধ্যা হয়ে যায়। শত মানুষের পায়ের পাড়ায় টাকাটা অচল হয়ে যাওয়ার দশা। তবে মজার কথা পাকিস্তানি নোট এখনকার মতো নিম্নমানের কাগজে ছিল না। সাতবার ধুয়েও তা ব্যবহার করা যেত। কাদেরিয়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত সব এলাকাই ছিল এরকম। মানুষ চুরি-ডাকাতি রাহাজানি ভুলে গিয়েছিল। কোনো জিনিস কোথাও পড়ে থাকলে কেউ স্পর্শ করত না। এটা ছিল কাদেরিয়া বাহিনীর গর্বের বিষয়। কিন্তু স্বাধীনতার এতকাল পর একটি স্বনামধন্য সুসংগঠিত মুক্তিযোদ্ধা দলের বিরুদ্ধে শুধু মতের অমিলের কারণে এত বড় কলঙ্কজনক অপবাদের সঠিক প্রতিকার না হলে ভাবীকালে মুক্তিযুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, মুক্তিযুদ্ধের মহিমা ভূলুণ্ঠিত হবে।

আরেকটি ঘটনা বলি। না বললে আপনি বুঝবেন কী করে। এটা স্বাধীনতার পরের ঘটনা, যা নিয়ে বড় ভাইজান মুক্তিযোদ্ধাদের দারুণ গালাগাল করেছিলেন। স্বাধীনতার বিশ-বাইশ দিন পরের কথা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি টাঙ্গাইলে শিল্প এলাকা গোড়াইয়ের শ্রমিকদের সঙ্গে কিছুটা জড়িত ছিলেন। সেই হিসেবে স্বাধীনতার পরপরই শ্রমিকদের কাছে তার প্রভাব বাড়াতে তিনি হয়তো কিছু টাকা-পয়সা খরচ করতে চেয়েছিলেন। আগের দিনই তাকে বিশ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল। পরে ফেরত দেবেন বলে আরও তিরিশ হাজার চাইলেন। টাঙ্গাইলে তখন পাঁচজন জাতীয় পরিষদ আর নয়জন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। তার মধ্যে দু’জন বাদে আর সবাই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জননেতা আবদুল মান্নানের মতো জাতীয় নেতা মুক্তিবাহিনীর তহবিল থেকে মাত্র আট-নয় হাজার টাকা নিয়েছিলেন। অন্যরা পাঁচ-ছয় হাজারের বেশি না। কিন্তু স্বাধীনতার ওই বিশ-বাইশ দিনে বড় ভাইয়ের খরচের বহর প্রায় অর্ধ লাখ পেরিয়ে গেছে। তখন লিখিত নির্দেশ ছাড়া মুক্তিবাহিনীর তহবিল থেকে দশ টাকাও খরচের পথ ছিল না। আমি খুবই বিব্রতবোধ করছিলাম। জবাব দিতে পারব না বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

কিন্তু তা পারিনি। আজ তো আমি শক্তি-সামর্থ্যহীন। আপনি প্রধানমন্ত্রী, তিনি মন্ত্রী। আপনারা বড় ভাইবোন। এখনকার গালাগাল তো সেদিনের গালির কাছে কিছুই না। সেদিন আমার অনেক ক্ষমতা ছিল। বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে যে পরিমাণ অস্ত্র আছে বলতে গেলে তার চাইতে আমাদের কাছে কম ছিল না। সেই গালাগালির জন্য তাকে মাটি থেকে চল্লিশ হাত উপরে ছুড়ে মারতে চাইলেও সেদিন আমরা তা পারতাম। কিন্তু আমার হৃদয় সায় দেয়নি। সেদিন বড় ভাইয়ের কাছে আমার মুক্তিযুদ্ধকেও ছোট মনে হয়েছে। সবাই শুধু অঝোরে কেঁদেছে। আমি মাথা নিচু করে তার তিরস্কার সহ্য করেছি। জগেক বোঝাবার চেষ্টা করেছি, সভ্য সমাজে সব ক্ষেত্রে অস্ত্রের ভূমিকা থাকে না। বড় ভাই না হয়ে অমন কথা অন্য কেউ বললে দশ সেকেন্ড জীবিত থাকতেন কি-না সন্দেহের অবকাশ আছে।

এরকম অবস্থায় একজন পা থেকে মাথা পর্যন্ত পাকিস্তানি চাকর মুক্তিযুদ্ধকেই লুটতরাজ বলে যে অভিযোগ এনেছে তার কোনো প্রতিকার না পেয়ে সত্যিই বিস্মিত হয়েছি। আশিকুর রহমানের অভিযোগটা ছিল স্বাধীনতার পরের। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেও টাঙ্গাইলের ন্যাশনাল ব্যাংকের অর্থ নিয়ে অমন একটি ঘটনা ঘটতে পারত। আর তা যদি হতো আমরা অনেকেই বেঁচে থাকতাম কি-না জোর দিয়ে বলতে পারি না। ২৬ মার্চ ’৭১ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য বদিউজ্জামান খানকে চেয়ারম্যান ও লতিফ সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক করে টাঙ্গাইল গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং সেই সঙ্গে টাঙ্গাইলের সব প্রশাসনিক ক্ষমতা সংগ্রাম পরিষদের অধীনে নিয়ে আসা হয়। ডিসি, এসপি, ব্যাংক, বীমা সব তাদের অধীনে চলে আসে। দু’তিন দিন পর আলোচনা হয় টাঙ্গাইল যদি হানাদারের দখলে চলে যায় তাহলে ব্যাংকের টাকা-পয়সা তাদের হাতে পড়বে, তার চেয়ে সব টাকা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলা হোক। সবাই এতে একমত পোষণ করে। আমি তখনও সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো কেউ ছিলাম না।

প্রস্তাবটি আমারও অপছন্দ ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান প্রশাসনের ঝানু সিএসপি টাঙ্গাইল সংগ্রাম পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা আসাদুজ্জামান খান মঞ্জু আপত্তি তোলেন। তিনি পরামর্শ দেন, ব্যাংকের টাকা ব্যাংকেই থাকুক, ট্রেজারির টাকা ট্রেজারিতেই থাকুক, যা প্রয়োজন সংগ্রাম পরিষদ ডিমান্ড দিয়ে খরচ করবে। পরে এই সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেয়। ন্যাশনাল ব্যাংকে তখন টাকা ছিল সাড়ে চার কোটির মতো। আমি সে সময় সে লেজার দেখিনি। তখন বয়সও ছিল কম, অভিজ্ঞতা ছিল আরও কম। আর আমাদের নেতাদেরও রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তাদেরও হাত ছিল ছোট। তাই ২৬ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল আমাদের নেতারা আর কত টাকাই বা খরচ করেছিলেন। মনে হয়, দশ থেকে বারো লাখ। তারপরই পাকিস্তান আর্মি টাঙ্গাইল দখল করে নেয়, নেতাদের হাত থেকে সবকিছু চলে যায়। স্বাধীনতা ’৭১ বিশাল বইয়ে আমি এর নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছি। সেই টাকা থেকে ছয়-সাড়ে ছয় হাজার টাকা আমাকেও দেয়া হয়েছিল। টাংগাইল সংগ্রাম পরিষদ অথবা গণমুক্তি সংগ্রাম পরিষদ আমার হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল বলেছে, এটা সত্য নয়। অস্ত্র আমরা নিজেরাই তুলে নিয়েছিলাম।

কিন্তু সংগ্রাম পরিষদ পূর্ণ সমর্থন করেছে, এখনকার মতো বিরোধিতা করেনি। খরচ চালাবার জন্য টাকা দিয়েছিল তাতো বললামই। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যদি ন্যাশনাল ব্যাংকের টাকা সংগ্রাম পরিষদ কোথাও সরিয়ে নিত সে টাকা তারা হেফাজত করতে পারত না। মুক্তিযুদ্ধের বিপদের মতো তাদের টাকাও একটা উপরি বিপদ হতো। এর জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল প্রমাণ জনাব আসাদুজ্জামান এবং জনাব লতিফ সিদ্দিকী যখন (টাঙ্গাইল ক-১) ডিসির টয়োটা জীপে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে জামালপুর শেরপুর হয়ে সীমান্তে যাচ্ছিলেন তখন শেরপুরের এমপি নিজাম এবং আনিস মোক্তাররা গাড়ি ভর্তি টাকা আছে বলে তাদের কৌশলে আটক করেছিলেন। তারা নেতাদের কথামত গাড়ি থেকে দূরে গেলে সব গাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে হতাশ হয়ে নেতাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন। সংগ্রাম পরিষদের দেয়া ছয় হাজার টাকা যখন তিনশ’তে নেমেছিল তখন আমরা সুসংগঠিতভাবে আবার যুদ্ধ শুরু করি। যুদ্ধের সময় আমরা প্রায় দুই কোটি ঊনচল্লিশ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছি এবং খরচ করেছি। বর্তমান হিসাবে সে টাকা তিন-চারশ’ কোটিরও বেশি। এই টাকা কোনো দিন আমাকে গুনতে হয়নি। দশ-বারো ঊর্ধ্বে বিশ হাজারের বেশি আমার দলের কাছেও থাকেনি।

সেটাও অন্য সহকর্মীরা কাছে রাখত, হিসাব করত। হেড কোয়ার্টারের অর্থ বিভাগে হিসাব দিত। আমাদের কাজ ছিল যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চলের জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা। টাকা-পয়সার হিসাব করা সেটা তো বেনিয়াদের কাজ, যোদ্ধাদের নয়। যুদ্ধের শুরুর সময়ের আদান-প্রদানের চুলচেরা তেমন কিছুই আমার জানা নেই। তবে কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মুক্তাঞ্চলের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের চুলচেরা হিসাব দেয়া আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কীভাবে আমাদের আয়-ব্যয় হতো তার দু’চারটি প্রমাণ এখনও আমাদের কাছে আছে। তাই আশিকুর রহমানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এটা বলতেই হয়, স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দেয়া পর্যন্ত সবকিছু মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। যে আশিকুর রহমান আজকে এতবড় কথা বলছে সে তো সারাদিন আমাদের বেসামরিক দপ্তরে হুকুমের আশায় টুলের ওপর পিয়নের মতো বসে থাকত।

সে বলেছে, ব্যাংকের টাকা পুড়িয়ে ফেলার কাগজে অনুমোদন দিতে তাকে অনুরোধ করেছিলাম। সে আমার অনুরোধ শোনেনি বলে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগ এনেছি। ভদ্রলোক কি মনে করে পাকিস্তানের ডিসি বাংলাদেশেও ডিসি ছিল? বিশেষ করে কাদেরিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায়? যার চাকরের সমান মর্যাদা ছিল না এতদিন পর এত বড় অস্পর্ধা ভালো না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতার পর টাঙ্গাইল ন্যাশনাল ব্যাংকের লেজার বের করুন। ২৪শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ওর পাতায় পাতায় আমার স্বাক্ষর আছে। বেসামরিক প্রশাসক হিসেবে আনোয়ারুল আলম শহীদের স্বাক্ষর আছে। অর্থ বিভাগের প্রধান হিসেবে সখীপুরের আনোয়ারের স্বাক্ষর আছে। কোন দিন কত টাকা খরচ করা হয়েছে এবং যেদিন ন্যাশনাল ব্যাংকে আঠার লাখ টাকা থাকা অবস্থায় আদান-প্রদান বন্ধ করা হয়েছে, সেদিন আমারসহ প্রয়োজনীয় সব কাদেরিয়া বাহিনীর কর্মকর্তার স্বাক্ষর রয়েছে। এখানে আরেকটি জিনিস উল্লেখ করা যায়; বাস শ্রমিক ইউনিয়নের বিখ্যাত শ্রমিক নেতা হাবিবর রহমান খান কাদেরিয়া বাহিনীতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। ঢাকা ময়মনসিংহ টাঙ্গাইলের যতগুলো বাস ছিল সব মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল।

সেগুলো প্রায় দেড়-দুই মাস মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে। শ্রমিক ইউনিয়নের বোস বাবু বলে একজন প্রতিদিনের আয়ের অর্থ ন্যাশনাল ব্যাংকে জমা করতেন। ন্যাশনাল ব্যাংকই তখন ট্রেজারির কার্যক্রম করত। দু’মাস পর ছোট-বড় নোট মিলিয়ে সাত বস্তা টাকা আনুষ্ঠানিকভাবে বাস শ্রমিক ইউনিয়নের দপ্তরে গিয়ে মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে হাবিবর রহমানের হাতে দান করা হয়েছিল। পদের গরমে ভদ্রলোক হয়ত দিশেহারা হয়ে গেছে। তাই তার খেয়াল নেই স্বাধীনতার পর ডিসেম্বর মাসে সরকারি কর্মচারীদের ওই ভদ্রলোকের স্ব্বাক্ষরে নয়, আমাদের অর্থ বিভাগের প্রধান আনোয়ার এবং বেসামরিক প্রধান আনোয়ারুল আলম শহীদের সুপারিশে আমার অনুমোদনে ট্রেজারির চালান পাস করে বেতন দেয়া হয়েছিল। এখানে আরও একটি জিনিস দেখার কথা। পাকিস্তানিদের সারেন্ডারের সময় তারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য ছিল, বিভ্রান্ত ছিল। ক্ষমতাও ছিল না অনেকের। প্রশাসনিক শহর ছিল একদিকে, বাণিজ্যিক শহর ছিল আরেকদিকে। ব্যাংক পরিচালনা সম্পর্কে হানাদারদের কারোরই হয়তো তেমন কিছু জানা ছিল না। যতটা জানা ছিল তখনকার দালাল ডিসি আশিকুর রহমানের। এ বিষয়ে একটি প্রশ্ন আমাকে সব সময় নাড়া দিয়েছে, ১১ ডিসেম্বর ছিল শনিবার। ১২ তারিখ রোববারে ন্যাশনাল ব্যাংকের লেজারে ছিল ৫১ লাখ টাকা। অথচ ৮ তারিখে লেজারে ছিল ছয় কোটি আশি লাখ টাকা।

৮ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত এই বিপুল পরিমাণ টাকা গেল কোথায় তার কিন্তু কোনো হিসাব ছিল না। অথচ ন্যাশনাল ব্যাংকের কার্যক্রম একদিনের জন্যও বন্ধ ছিল না। ১১ তারিখ টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত হলে সেদিনও ব্যাংকের কিছু কর্মচারী ছিল। ব্যাংকের এজিএম নিজে লকার খুলে দিয়ে বজ্র কোম্পানির কমান্ডার বায়জিদ আলমকে টাকা বের করে দেন। কমান্ডার বায়জিদ আলম এবং ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমানের লেজার বইয়ে প্রাপ্ত টাকার স্বাক্ষর ছিল। সেদিন ব্যাংকে কত টাকা আছে সেই এমাউন্টে স্বাক্ষর ছিল ডিজিএমের। সে সময় কাদেরিয়া বাহিনীর কোনো কাজে লুকোচুরি করার উপায় ছিল না। বজ্র কোম্পানির কমান্ডারকে টাকা এনে ব্যাংকে জমা দিতে বললে পরদিন তালিকায় দেখায় যে, তার গ্রহণ করা থেকে জমা দেয়ার মধ্যে আশি হাজার টাকা কম আছে। সেদিনই তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে সে খুবই বিচলিতভাবে জানায়, এক টাকার নোটের একটা বস্তা তারা কোথায় ফেলেছিল আর খুঁজে পায়নি। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা চিন্তায় এনে আর ওই সময় সে আশি হাজার টাকা তছরুপ করতে পারে এরকম লোভী কমান্ডার মনে না হওয়ায় এবং আর এরকম বিষয়ে নাড়াচাড়া করলে তার সম্মানহানি হতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মানহানি হতে পারে বিবেচনা করে তাকে আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। বিশেষ করে ওরই মধ্যে নিয়ত আলী নামে একজন দুঃসাহসী কমান্ডারকে চার ভরি সোনা, কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল, কিছু ধান-চাল লুট বা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

যাতে করে আমি বেশ বিরক্ত ছিলাম। কারণ রাজাকারদের লুট করা ওই সোনা ও হাঁড়ি-পাতিল, ধান-চাল সে ক্যাম্পে রেখেছিল। হেড কোয়ার্টারে রিপোর্ট করার আগেই মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দারা মালামালসহ তাকে গ্রেফতার করে আনে। প্রায় ২৫ দিন কারাগারে থাকার পর চুলচেরা তদন্ত করে তাকে সসম্মানে মুক্তি দেয়া হয়। স্বাভাবিক কারণেই এখানে প্রশ্ন জাগে, ছয় কোটি আশি লাখ টাকা থেকে মাত্র একান্ন লাখে এল কী করে? এ টাকা গেল কোথায়? ব্যাংকের ক্যাশ থেকে এক টাকা সরালেও লেজারে লিখতে হয়। ৮ তারিখ ট্রেজারি জমা দেখানো হলো ছয় কোটি আশি লাখ। ১১ তারিখ কোন ডেবিটের ব্যাখ্যা ছাড়া আমরা পেলাম মাত্র একান্ন লাখ। তার মধ্যে খরচ করেছিলাম তেত্রিশ লাখ। কিন্তু ছয় কোটি ঊনত্রিশ লাখ টাকা তবে কি আশিকুর রহমান একাই সরিয়ে ছিল নাকি অন্যদের ভাগ দিয়েছিল?

কারণ ট্রেজারি পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিল আশিকুর রহমান। আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাব বিষয়টাকে হালকাভাবে না নিয়ে চুলচেরা তদন্ত ও বিশ্লেষণ করে প্রতিকার করুন। আপনার দলে আছে বলে অপরাধী পার পেয়ে যাবে এটা ঠিক নয়। আপনার দলের কোষাধ্যক্ষ, তার কাছে বিপুল টাকা আছে ওগুলো নিয়ে নিন। তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কাশিমপুরে বিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স করছেন। ওটার তো ফাউন্ডার মেম্বার আমিও একজন। ওটার দায়িত্ব তার কাছ থেকে নিয়ে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। বিষয়টি ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে আপনাকে গভীরভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।

(সূত্র: আমার দেশ,০৯/০৪/১২)

Keywords: