নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > কেন এত অসংযত আচরণ?

কেন এত অসংযত আচরণ?

Tuesday 6 March 2012, কাদের সিদ্দিকী Print

জীবনের শুরুতেই শুনেছিলাম চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। ঔপনিবেশিক মানসিকতায় লালিত আমাদের প্রশাসন। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী লোকজন নিজেদের সেবক না ভেবে কেমন যেন প্রভু ভাবে। গ্রামের একেবারে অসহায় পরিবারের কোনো সন্তানও একটা সরকারি চাকরি পেলে তার আচার-আচরণ মুহূর্তে কেমন বদলে যায়। কেউ পুলিশের সিপাই হলে নিজেকে এসপির মতো ক্ষমতাবান ভাবে। এ থেকে কেন যেন আমরা কোনোমতেই বেরিয়ে আসতে পারছি না। রাষ্ট্র থাকলে দারোগা-পুলিশ থাকবে। দারোগা-পুলিশ থাকলে কালেভদ্রে দু’চারটা দুর্ঘটনাও ঘটবে। কিন্তু সেটি প্রতিনিয়ত ঘটবে সভ্য সমাজে তেমন আশা করা যায় না। রাস্তাঘাট থাকলে কালেভদ্রে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু সেই দুর্ঘটনাই যদি নিয়মিত হয় আর ভালো থাকাই যদি কালেভদ্রে হয়, তাহলে তো সেটাকে ভালো বলা যায় না। এক্ষেত্রে ঠিক তেমনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছে। তার মধ্যে মির্জাপুরের বিভক্ত আজগানা ইউনিয়নের লতিফপুর অন্যতম। ওইদিন সখীপুর উপজেলার গজারিয়া ও দাড়িয়াপুর ইউনিয়নের নির্বাচন হয়েছে। দুটি ইউনিয়নেই মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে যে জন্য তারা সাধুবাদ পেতে পারে। মির্জাপুর উপজেলাতেও লতিফপুর ও আরও দু’একটা কেন্দ্র বাদে অন্য নির্বাচনগুলো মোটামুটি শান্তিপূর্ণই হয়েছে। লতিফপুর ইউনিয়নেও শান্তিপূর্ণই হতো। যদি সেখানে বর্তমান এমপি একাব্বরের সম্বন্ধি চেয়ারম্যান প্রার্থী না হতো। নির্বাচনী নিয়মানুসারে ভোটের ফলাফল প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীর এজেন্টদের সামনে দিয়ে আসতে হয়—এটাই নিয়ম। সব জায়গাতেই এ নিয়ম মানা হয়েছে। ভোট শেষে পোলিং এজেন্টদের নিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোটের বাক্স খুলে যার যার মার্কার ভোট আলাদা প্যাকেট করে যার যার নামে গণনা করে সীলগালা করে ছালার বস্তায় ভরে উপজেলা সদরে পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে কেন্দ্রেই প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ফলাফল ঘোষণা করে প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরে সব প্রার্থীর এজেন্টদের ফলাফল দিয়ে চলে আসে। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নির্বাচনী নিয়ম অনুসারে সঠিকভাবে কাজ করলে গত ১৫-২০ বছরে এ নিয়ে দু’একটি বিশৃঙ্খলা ঘটার খবরও তেমন নেই। কিন্তু বাদসাধে যখন অনিয়ম করা হয়। গণনা করা ভোটের ফল যদি হয় এক রকম ঘোষণা করা হয় অন্য রকম। অথবা ভোট কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা না করে প্রিসাইডিং অফিসার দারোগা পুলিশরা যদি ভোটের বাক্স উপজেলায় নিয়ে যেতে চান তখনই হাঙ্গামার সৃষ্টি হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মির্জাপুরের লতিফপুর ইউনিয়নেও তেমনটাই হয়েছে। লতিফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সারাদিন সুষ্ঠুভাবেই ভোট গ্রহণ হয়। গণনাও হয় নির্বিঘ্নে। মেম্বার, মহিলা মেম্বার যথারীতি তাদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। বিঘ্ন সৃষ্টি হয় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর ফলাফল ঘোষণা নিয়ে। শোনা যায়, সংসদ সদস্য লতিফপুর কেন্দ্রে চেয়ারম্যানের ফলাফল ঘোষণা না করে ব্যালট বাক্স নিয়ে সবাইকে উপজেলায় চলে যেতে বলেন। ভোট কর্মীরা মির্জাপুর উপজেলায় চলে যেতে চাইলে মানুষ বাধা দেয়। তখন পুলিশ আকাশে গুলি চালায়। এতে সাধারণ মানুষ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। হাঙ্গামার সময় প্রতি মুহূর্তে লোকজন বাড়তে থাকে আর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। মানুষ তাতে আরও ক্ষিপ্ত হয়। বিশেষ করে ভাস্কর দেবনাথ নামে একজন নতুন ম্যাজিস্ট্রেটের খামখেয়ালিতে ঘটনাটি এমন ভয়াবহ রূপ নেয়। উন্মত্ত জনতা ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ’৮৩-’৮৪ সালের থানা কর্মকর্তাদের লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি আগুনে পুড়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়। পুলিশ লাঠি চালায়, গুলি চালায়, সাধারণ মানুষ ইটপাটকেল ছোড়ে। একপর্যায়ে গুটিকয়েক পুলিশ স্কুল ভবনের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। জনসাধারণ ঘরের বাইরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভাগ্য ভালো দালানঘর থাকায় আগুন ভেতরে যায়নি এবং অতিরিক্ত ফোর্স এসে তাদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তেমন না হলে মহাত্মা গান্ধীর কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলনের সময় যেমন উত্তেজিত জনতা বিহারের চৌরিচৌরা থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়; হাজার হাজার মানুষ থানার দালান ঘরের ভেতরে কাপড়-চোপড়, কাগজপত্র ও জ্বালানি ছুড়ে দিয়ে আগুনকে আরও তেজী করে তোলায় থানার সব ক’জন পুলিশ পুড়ে মরে। যে কারণে প্রায় সব নেতার ইচ্ছের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধী আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তার কথা ছিল আমি অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ভারত স্বাধীন করতে চাই, হিংসার মাধ্যমে নয়। শত উসকানির মধ্যেও পুলিশকে পুড়িয়ে মারা অহিংস আন্দোলনের পর্যায়ে পড়ে না। লতিফপুরের ঘটনাটিও তেমন হতে পারত। সব ক’জন পুলিশই পুড়ে মরতে পারত। যদি জনতা জ্বালানি এনে আগুনের তেজ আরও বাড়িয়ে দিত এবং দরজা-জানালা ভেঙে ঘরের ভেতর ছুড়ে দিত। আল্লাহকে হাজার শুকরিয়া যে, তেমনটা হয়নি। প্রায় এরকমই ঘটনা প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় হয়েছিল। কোনো দোকানের ভেতর থেকে ইঁদুর তাড়া করে এক বিড়াল পোল্যান্ডের রাস্তায় কোনো রাজপরিবারের মহিলা সদস্যের সামনে লাফিয়ে পড়েছিল। সেই মহিলা ভয় পেয়ে ছিটকে গিয়ে রাস্তায় পড়ে মারা যান এবং এটাকে একটি হত্যা বলে আখ্যা দিয়ে এক সময় দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পরে সেটা বিশ্ব যুদ্ধের আকার নেয়। এমনিতেই আমরা মারাত্মক যুদ্ধাবস্থায় আছি, তার ওপর লতিফপুরের ঘটনা নিয়ে একটা বিশ্ব যুদ্ধের অবস্থা যে হয়নি এ জন্য আল্লাহর প্রতি শতকোটি শুকরিয়া জানাই। প্রবাদ আছে, শিল পাটার ঘষাঘষি মরিচের জান ক্ষয়। লতিফপুর ইউনিয়নের ভোট কারচুপির ঘটনাও তেমনি।

নির্বাচনে কারচুপি করেছে কারা, ফলাফল ঘোষণা না করে ভোটের বাক্স নিয়ে মির্জাপুর চলে যেতে চেষ্টা করেছে ম্যাজিস্ট্রেট ভাস্কর দেবনাথ। পুলিশ জনগণকে পিটিয়েছে। ক্ষিপ্ত জনতা আত্মরক্ষার জন্য হাতের সামনে যা পেয়েছে তা-ই ব্যবহার করেছে। একপর্যায়ে কাপুরুষের মতো জীবন বাঁচাতে পুলিশরা স্কুল ঘরে গিয়ে কপাট দিয়েছে। কিন্তু পরে পুলিশ-র্যাব এসে আশপাশে যাকে পেয়েছে তাকেই ভীষণভাবে মারধর করেছে। স্কুলের একেবারে লাগোয়া রফেজ উদ্দিনের বিধবা স্ত্রী জবাতুন নেছাকে বেদম মারধর করেছে। তার সদ্য বিদেশ ফেরত ছেলে মাজেদ কেবলই বাড়ি ফিরেছিল, তাকে র্যাব-পুলিশ ধরে নিয়ে এমন অমানুষিক অত্যাচার করেছে যে, সে বাঁচবে কি না সন্দেহ। সে এখন মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। রেফাজ উদ্দিনের স্ত্রী রুবি বেগমের শরীরের নানা জায়গায় এখনও অত্যাচারের দাগ রয়েছে। ঘটনার দু’দিন পর বিকাল চারটায় ঘটনাস্থলে গিয়ে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখলাম তা পাকিস্তানি হানাদারকেও হার মানায়। স্ত্রী নাসরীন সিদ্দিকী সঙ্গে ছিলেন। শত শত মহিলা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেছে, নানা অভিযোগ করেছে। এসব দেখে বড় খারাপ লেগেছে। এ কেমন অসভ্য দেশ! মা-বোনদের ওপর অত্যাচার করার কারণে, তাদের সম্মান হরণের কারণে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলাম স্বাধীনতার এত বছর পর সেই পাকিস্তানি মনোভাব, আচার-আচরণ ত্যাগ করতে পারলাম না। একটা পুলিশ, একটা র্যাব যখন একজন মহিলার গায়ে হাত তোলে তার আর ইজ্জত-সম্ভ্রমের থাকে কী? দেশের প্রধানমন্ত্রী মহিলা, বিরোধী দলের নেতা মহিলা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, কৃষিমন্ত্রী মহিলা। সংসদে উপনেতা মহিলা। তাও মহিলারা নিরাপদ নয়। কবে তাদের সম্মান রক্ষা হবে? কে তাদের রক্ষা করবে? এসব ভাবলে মন বড় বিষাক্ত হয়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধু তখন বেঁচে ছিলেন। ’৭৪-এর মার্চ-এপ্রিলের দিকের ঘটনা। রামপুর কুকড়াইলে ডাকাতি করতে গিয়ে বল্লা ক্যাম্পের পুলিশরা ধরা পড়েছিল। গণপিটুনিতে একজন মারা যায়। পুলিশ মেরেছে সেই আক্রোশে বল্লা ক্যাম্পের পুলিশরা রামপুর কুকড়াইলকে কারবালা বানিয়েছিল। তখন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ছিলেন, আমরা ছিলাম, পরিস্থিতি অল্পতেই শান্ত করা গিয়েছিল। এইতো গত বছর ওই চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়েই ভোট চুরির কারণে পুলিশি নির্যাতনে কালিহাতীর সহদেবপুর এবং নারান্দিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম বিরান হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচন এলেই কেন যেন এদেশের মানুষের দুঃখ বাড়ে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ব্যাপক জয় হলেও মির্জাপুরে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছিল। সে কারণে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ হিন্দুদের দোকানপাট, ঘরবাড়ি, মন্দির ভেঙে খান খান করে ফেলেছিল। কীভাবে যেন সেবারও সামনে পড়েছিলাম। সে যাত্রায় মির্জাপুরের মানুষ রক্ষা পেয়েছিল। এ যাত্রায় লতিফপুর ইউনিয়নের ঘরছাড়া নিরীহ মানুষ রক্ষা পাবে কি না, তাদের রক্ষা করতে পারব কি না তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই জানেন।

মার্চ মাস এই অঞ্চলে একটি সংগ্রামের মাস। আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য বোধহয় আবহাওয়াটিও বেশ অনুকূল। না শীত, না গরম, না বৃষ্টি, না ঝড়, একটা নাতিশীতোষ্ণ ভাব। এ বছর মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে চারদলীয় জোট সেই কবে ঢাকা চলো আন্দোলনের ডাক দিয়ে রেখেছে। এ যাবত্কাল বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে বার বার আওয়ামী লীগ ঢাকা অবরোধ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ঢাকা অবরোধ আন্দোলন হয়েছে। এবার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চারদলীয় জোটের ঢাকা অবরোধ আন্দোলন প্রতিহত করতে আওয়ামী মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির সহযোগিতা কামনা করেছে। রাজনীতির কী মহিমা! আজ যে শত্রু, আগামীকাল তার বন্ধু হতে কোনো সমস্যা নেই। ঢাকা চলো আন্দোলন নিয়ে মানুষ সত্যিই খুব শঙ্কিত। যদিও মহাশঙ্কার বিপদ সঙ্কেত কিছুটা কমে এসেছে। তবু এখনও ঝড় থামেনি। চারদলীয় জোট ঢাকা চলো আন্দোলনের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু পাতি নেতা, পাতি মন্ত্রী গলা ফাটিয়ে চিত্কার করছিল, ১২ তারিখের আগেই তারা ঢাকা দখল করে ফেলবেন। মনে হচ্ছিল পুরোনো যুগে জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর চর দখলের মতো অবস্থা। যদিও মনিবের ইচ্ছায় ঢাকা দখলের কথাবার্তা বন্ধ হয়েছে। পাল্টা কর্মসূচিও দেয়া হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মহাজোট ১৪ মার্চ কর্মসূচি পালন করবে। এটা খুবই ভালো কথা। কিন্তু হঠাত্ই সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি উক্তি শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি কী কারণে যেন বলেছেন, “বিরোধী দল কোনো গোলমাল করলে ‘খবর আছে’।” হায়রে দুর্ভাগা বাঙালি জাতি! গাছতলার অথবা চায়ের দোকানের ভাষা রাজকার্যে স্থান করে নিয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের অভিধানে যদি চায়ের দোকানের ভাষা স্থান পেয়ে যায় তাহলে তারা আর কী নিয়ে কথা বলবে? শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে গরিবের আড্ডা মারার ভাষাও যদি উচ্চ মহলের নেতা-নেত্রীরা এভাবে কেড়ে নেন তাহলে তো মহা সর্বনাশ। গরিবের ভাষা গরিবকে ফিরিয়ে দিন, মাঠের ভাষা মাঠে থাকুক। মার্জিত ভাষায় আপনারা কথা বলুন— এটাই স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে জাতির প্রত্যাশা।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ০৬/০৫/১২]