নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > আজ কত কথা মনে পড়ে-২

আজ কত কথা মনে পড়ে-২

Saturday 31 December 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যার ছিলেন ঘোরতর মুসলিম লীগার। আমাদের বিরোধী ঘরানার মানুষ। বিরোধী কাফেলার সদস্য। এরপর পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পানি অনেক গড়িয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক সূর্যসৈনিক জাসদ নামে দল করেছে। ছাত্রলীগ ভাগ হয়েছে। জাসদের গণবাহিনী হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে। সর্বহারার হাতে দিনে দুপুরে সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতারা খুন হয়েছেন। একটা মারাত্মক অস্থিতিশীল অবস্থা। এমনই সময় ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের ১৬ তারিখ আমাকে টাঙ্গাইলের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। আমার বয়স তখন খুবই কম। ২৯ ছুঁই ছুঁই করছে। জাসদের গণবাহিনী টাঙ্গাইলে বহু মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে। ফুলকীর কমান্ডার গোলাম মোস্তফা, দেওপাড়ার কমান্ডার রিয়াজ, পাইকরার হুমায়ুন, কাউলজানীর কলিবুর রহমান বাঙালী, আরো অনেক কৃতী মুক্তিযোদ্ধা জাসদের গণবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। আমাকে যখন টাঙ্গাইলের গভর্নর নিযুক্ত করা হয় তখন গণবাহিনীর অনেকেই কারাগারে। করটিয়া কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যারের ছেলে জুয়েল এবং জামুর্কী হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক জিয়ারত স্যারের ছেলে আরজু তাদের মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া কাদেরিয়া বাহিনীর বিখ্যাত কমান্ডার উল্কা বাহিনীর প্রধান বড় চওনার ইদ্রিস একটি অস্ত্রসহ ধরা পড়ে কারাগারে ছিল। ইদ্রিসের কারণেই গভর্নর নিয়োগের পরপরই বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম যারা বেআইনি অস্ত্র রাখা ও অন্যান্য অভিযোগে বন্দী তাদের সংশোধনের কোনো সুযোগ আছে কি না। তাদের ব্যাপারে আদালতের বাইরে কিছু করা যাবে কি না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘অবশ্যই যাবে। আমি দেশটাকে হানাহানি মুক্ত করতে চাই। এ জন্য যতটা সহনশীল হওয়া দরকার, হবে। জেলা গভর্নর হিসেবে আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তার সব দায়িত্ব তোমার। তুমি কাউকে শাস্তি দিতে না পারলেও শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করতে পারবে, নবনিযুক্ত গভর্নরদের সব সুপারিশ অনুমোদন করা হবে। যারা দণ্ডিত হয়নি তাদের ওপর থেকে সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়ার ক্ষমতা গভর্নরদের দেয়া হয়েছে। তোমাদের কোনো সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয় বাগড়া দিতে পারবে না।

তোমাদের সিদ্ধান্তে অনুমতি দেয়া, না দেয়ার কোনো ব্যাপার নেই। ব্যাপারটা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার মতো। ক্ষমতা কুক্ষিগত নয়, বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাই। সরাসরি তোমরা আমার সাথে মানে রাষ্ট্রপতির সাথে যোগাযোগ করতে পারবে।’ বঙ্গবন্ধুর কথাবার্তায় মনে হয়েছিল সত্যিই তিনি দেশে একটা পরিবর্তন আনতে চান। ক্ষমতা হাতের মুঠোয় ধরে না রেখে ছড়িয়ে দিতে চান। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে কোনো এক দিন করটিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল ঠাণ্ডু স্যার সস্ত্রীক আমার বাড়িতে আসেন। খবর পেয়ে বৈঠকখানায় গিয়ে দু’জনকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলে তারা দু’জন খুব কাঁদেন, স্যারের চেয়ে তার স্ত্রীই বেশি কাঁদেন। চা-নাশতা দিলে তা অনেকক্ষণ পড়ে থাকে। কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করলে স্যার খুব অস্বস্তি নিয়ে বললেন, ‘বাবা, তুমি গভর্নর হয়েছ তাই এসেছি। তোমার যদি অসুবিধা হয় তাহলে বলছি না। তুমি যদি পারো তাহলে করো। না পারলে করো না। আমরা অসন্তুষ্ট হবো না।’ বেশ কিছুটা সময় নিয়ে আবার বললেন, ‘আমার ছেলে জুয়েল অস্ত্র মামলায় জেলে আছে। তার ব্যাপারে তুমি কিছু করতে পারো কি না তাই এসেছি।’ জুয়েল জেলে আছে তা কয়েক দিন আগে জেনেছিলাম। আর দু-তিন দিনের মধ্যে জেলখানায় যাওয়ার কথা ছিল। বললাম, ‘জুয়েল জেলে আছে দু’দিন হলো জেনেছি। আপনারা কী চান?’ স্যার বললেন, ‘অনেক চেষ্টা করছি, জামিন হয় না। ছেলেটা অনেক দিন ধরে জেলে। তেমন দেখা সাক্ষাৎও করতে পারি না। যত দিন জেলে থাকে সহজে যাতে দেখতে পাই। আর যদি জামিন পাওয়া সম্ভব হয়, তুমি যদি একটু দেখো আমরা খুব দোয়া করব।’ স্যারের স্ত্রীর কান্না থামছিল না। ঠাণ্ডু স্যারের বুকও হয়তো কাঁদছিল। কিন্তু চোখে পানি ছিল না। স্যারের স্ত্রীকে খালা বলে ডাকতাম। কারণ করটিয়ায় আমার ছোট মায়ের বাড়ি। করটিয়া চৌধুরীপাড়ায় আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। আমরা আমাদের দুই মায়ের মধ্যে কোনো দিনই আসল-নকল বুঝিনি। জুয়েলের মাকে বললাম, ‘খালাম্মা, কান্না বন্ধ করেন। ছেলের কাছে যখন এসেছেন তখন আরেক ছেলের জন্য কাঁদবেন কেন? আপনি যা চান আল্লাহর রহমতে তাই হবে।’ জুয়েলের মায়ের কান্না থেমে গেল। মোটামুটি ৩০ মিনিট পেরিয়ে গেছে।

তারাও অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছেন। স্যার তো তার কথা বলেছেনই। খালাম্মা বললেন, ‘ছেলেটাকে আজকে দেখে যেতে চাই। আর পারলে তুমি জামিনের ব্যবস্থা করে দাও।’ বললাম, ‘জেলে গিয়ে দেখবেন, নাকি এখানে?’ স্যার ও খালাম্মা যেন আসমান থেকে পড়লেন। দু’জনই করুণ সুরে বললেন, ‘তোমার এখানে আনা যাবে?’ ‘নিশ্চয়ই, আপনারা চাইলে চেষ্টা করব।’ তা হলে বাবা, ‘ছেলেটাকে একবার আনো না। কত দিন ওকে জেলের বাইরে দেখিনি।’ ‘ঠিক আছে। আনার ব্যবস্থা করছি।’ শুকনো মুখে স্যার এসেছিলেন। ওকে আনার ব্যবস্থা করছি বলায় দু-তিন মিনিটের মধ্যেই তাদের চেহারা বদলে গেল। চোখ-মুখে এক অনাবিল প্রশান্তি দেখা দিলো। মানুষের অন্তরে স্বস্তি ও সুখ থাকলে চোখ-মুখে যেমন ঠিকরে পড়ে তেমনই পড়তে লাগল। ডিসিকে ফোন করা হলো। একজন ডেপুটি জেলারসহ কারারক্ষী দিয়ে জুয়েলকে তক্ষুনি আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে জুয়েলকে নিয়ে এলো। ২০-২২ বছরের ছেলে আমার বাড়িতে হঠাৎ মা-বাবাকে দেখে কাঁদবে না হাসবে বুঝতে পারছিল না। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে শান্ত হলো। আমাকে ধরেও কয়েক মিনিট কাঁদল। ওকে অনেক দেখেছি, আমাকেও হয়তো দেখেছে। কিন্তু কোনো দিনই তেমন কথাবার্তা হয়নি। দুয়েকবার হয়তো হাত মিলিয়েছে। জড়িয়ে ধরা বা কোলাকুলি করার সুযোগ পায়নি। হালকা-পাতলা ছেলে, জেলে থেকে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। পুষ্টিহীনতার ছাপ চোখ-মুখে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘জেলে কেমন আছো?’ সবাই যেমন বলে সে-ও বলল, ‘ভালো আছি’। ওর মা বললেন, ‘ভালো না ছাই, ভালো থাকলে চোখ-মুখের এমন অবস্থা হয়?’ স্যারকে বললাম, ‘এখন কী করবেন? ছেলে নিয়ে যাবেন, নাকি রেখে যাবেন?’ স্যার আঁতকে উঠলেন। ‘কেঁদে ফেলে বললেন, ‘কী বলো, বাবা? আমরা ওকে নিয়ে যেতে পারব?’ ‘কেন পারবেন না? খালাম্মাকে তো বলেছি উনি যা চাইবেন তাই হবে। উনি যদি ছেলেকে নিয়ে যেতে চান, নিয়ে যাবেন, ফেরায় কে?’ খালাম্মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমি তো আমার ছেলেকে নিয়ে যেতেই চাই। তুমি ছেড়ে দিতে পারবে?’ ‘না, আমি পারব না। তবে আপনারা চাইলে ছেলেকে নিয়ে যেতে পারেন। তার জন্য আপনারা দু’লাইন লিখে দিলেই চলবে।’ ‘কী বলো? যা লেখা দরকার যে ধরনের বন্ড দেয়া দরকার আমরা সব করতে রাজি। বলো, কী লিখতে হবে?’ ‘শুধু লিখে দিন আমাদের ছেলে জুয়েলকে নিয়ে গেলাম। যখন প্রয়োজন হবে তখনই তাকে হাজির করব। সে ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হবে না।’ কথাগুলো ঘচঘচ করে একটা সাদা কাগজে লিখে সই করে দিলেন। তাতে লিখে দিলাম, ‘কারাবন্দী অভিযুক্ত জুয়েলকে তার বাবা-মায়ের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হলো। ডিএম টাঙ্গাইল বিষয়টি আইনানুগ প্রক্রিয়া করুন।’

এর পরে খুব একটা বেশি সময় পাইনি। অকস্মাৎ বজ্রপাতের মতো বাঙালি জাতির ললাটে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। বঙ্গবন্ধু সপরিবার নিহত হন। আর আমি হই গৃহহারা সর্বহারা। প্রতিরোধ আর প্রতিবাদেই কেটে যায় যুগ। ইদানীং সেই সব দিনের কথা লিখতে গিয়ে কত কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে স্বাধীনতার পরপরই কবি সায্‌যাদ কাদির আর কবি মাহবুব সাদিককে করটিয়া সাদত কলেজের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদানের জন্য খন্দকার আহমদ হোসেন ঠাণ্ডু মিয়াকে চিঠি দিয়েছিলাম। ঘটনাটা ছিল এ রকম- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একদল গুণীজন কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিল। তাদের মধ্যে কবি রফিক আজাদ, বুলবুল খান মাহবুব, আবু কায়সার চৌধুরী, সায্‌যাদ কাদির, মামুনুর রশীদ, মাহবুব সাদিক অন্যতম। ১৯৭২ সালের জানুয়ারির ১৩ বা ১৪ তারিখ দৈনিক পূর্বদেশে কাদেরিয়া বাহিনীর নামে একটি ক্রোড়পত্র ছাপা হয়েছিল। পত্রিকায় যে পয়সা দিয়ে কিছু ছাপা যায় বা বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপা যায় সে ব্যাপারে তখনো আমার কোনো জ্ঞান ছিল না। পত্রিকায় ছাপার জন্য কাদেরিয়া বাহিনীর তহবিল থেকে দুই-তিন হাজার টাকা চাওয়ায় আমার বিরক্ত লেগেছিল। তখন আমরা এর ওর জন্য টাকা বরাদ্দ করতাম বিশ-পঞ্চাশ-শ’, হাজারের অঙ্ক ছিল আমাদের কাছে বড় অঙ্ক। এখনকার কোটি টাকা বরাদ্দের চেয়েও বেশি। তবুও ক্রোড়পত্র বেরিয়েছিল। ক্রোড়পত্র বের করতে দারুণ ভূমিকা রেখেছিল সায্‌যাদ কাদির, মাহবুব সাদিক, সোহরাব আলী খান আরজু, কবি রফিক আজাদদেরা। এর মনে হয় ১০-১৫ দিন পর সায্‌যাদ কাদির আর মাহবুব সাদিক তারা দু’জনই দেখতে ছোটখাটো বললেন, ‘করটিয়া সাদত কলেজে আমাদের মাস্টারির চাকরি দরকার’। দু’কলম লিখে দেয়া হলো। তাদের চাকরি হয়ে গেল। আসলে আমরা তো কখনও এক ও অভিন্ন থাকতে পারিনি, যেমন এখনো পারি না। মুক্তিযুদ্ধ শেষ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজন শেষ। ম্রিয়মান রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধীরে ধীরে সবল হতে থাকলে মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা রাখা মুক্তিযোদ্ধারা নিঃস্ব, অপমানিত, অপদস্থ হতে লাগল। এর ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই।

ঘাটাইলের মাকড়াইয়ে ১৬ আগস্ট ১৯৭১ যেখানে আমার হাতে পায়ে গুলি লেগেছিল, সেখানকার একজন বেশ বড়সড় যোদ্ধার মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার ভূমিকা ছিল বিবেচনা করার মতো। ৩০-৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার ছিল সে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ হবে। কোনো মিটিংয়ে মধুপুর অথবা ধনবাড়ী যাচ্ছিলাম। সাত-আটটি গাড়িতে আমরা তখন ছিলাম। ব্রাহ্মণশাসনের উত্তরে কালিদাসপাড়া বিধ্বস্ত সেতু পার হয়ে দেখি চার-পাঁচজন দারোগা পুলিশ একজনের কোমরে দড়ি বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে চলেছে। কারো কোমরে দড়ি বেঁধে পুলিশের আনা নেয়া আমার আগাগোড়াই অপছন্দ। আর তখনতো আমাদেরই কর্তৃত্ব। হঠাৎ মনে হলো দেখি তো স্বাধীনতার পরপরই স্বাধীন দেশের মানুষকে কেন এভাবে পুলিশেরা কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি থামতে আসামি ফেলে সব পুলিশ ছুটে এলো। আসামি নিজেই আসে- আসে- সামনে এসে হাউমাউ করে কান্না শুরু করল, ‘স্যার, আপনি আমারে চিনেন না? আমি মাকড়াইয়ের মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ। ধলাপাড়া যুদ্ধের সময় আপনার সাথে ছিলাম।’ আসলেই তাকে চিনি, খুব ভালো করে চিনি। বাসেত সিদ্দিকী এমপির ছেলে সেলিম, ভাতিজা হারুনকে যেমন চিনি তেমনি করে চিনি। দারোগাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপার কী?’ দারোগা তখন ইতস্তত করতে করতে বলল, ‘বছরখানেক আগে তার নামে একটা দাঙ্গাহাঙ্গামার অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগে ধরা হয়েছে।’ আমার মাথায় আগুন ধরে গেল। এ কেমন কথা! মাত্র ১০-১২ দিন আগে অস্ত্র জমা দিয়েছি। সব প্রশাসন তখনো আমাদের হাতে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কোমরে রশি বেঁধে ধরে নিয়ে এলো কিছুই জানলাম না। ওই অল্প সময়ের মধ্যে আসামি আনন্দ স্বমূর্তি ধরে ফেলেছিল। সে চিৎকার করে খেদ ব্যক্ত করছিল, ‘হায় আল্লাহ, এক মাস আগে পাইলে আমি শালাগোরে বানতাম, আইজ শালারা আমাকে বানছে।’ আনন্দের দুঃখ দেখে আমি বড় মর্মাহত হয়েছিলাম।

সত্যিই তো এ কেমন হলো? ততক্ষণে কোমরের বাঁধন খুলে দেয়া হয়েছিল। দারোগা পুলিশসহ আনন্দকে গাড়িতে তুললাম। ওখান থেকে পাঁচ-সাত মিনিটের রাস্তা ঘাটাইল থানা। ওসিকে ডাকতেই রকেটের মতো ছুটে এলো। সে-ই আগের রাতে পাঠিয়েছিল আনন্দকে গ্রেফতার করে আনতে। কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। ডায়েরি খুঁজে খুঁজে পুলিশ পাঠিয়েছে। কারণ তখন থানার কারো হাতে তেমন কোনো পয়সাকড়ি ছিল না। কেবল স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি থানা পাহারাদারদের তখন বড় করুণ অবস্থা। পাকিস্তানি থানা পাহারাদার বললাম এই জন্য যে, স্বাধীনতার পরপরই সব থানাতে যে পুলিশ ছিল তার শতকরা ৮০ জনই যুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানিদের অনুগত হয়ে কাজ করেছে। ঘাটাইল থানাতেও দেখলাম তাই। সর্বমোট ১৩ বা ১৪ জন, তার মধ্যে তিনজন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিল আর বাকিরা অন্য জেলা থেকে এসেছে। মানে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা, ১১ জন রাজাকার-আলবদর বা হানাদার। এই নিয়ে ঘাটাইল থানা। বিরক্তিতে মন ভরে গিয়েছিল। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যখন আমরা ঘাটাইল থানা দখল নিয়েছিলাম তখন ঘাটাইলের ওসি আমাকে দেখে খাড়া অবস্থায় পেশাব করে ফেলেছিল। পূর্ণ বয়সী কেউ ভয় পেয়ে পেশাব করলে কেমন হয় সেদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম। বিরক্তি ভরা মন নিয়ে ওসিকে বললাম, ‘অত বেশি দারোগাগিরি করতে হবে না। থানায় যত কাগজ আছে এক্ষুনি তাতে আগুন দাও।’ শুরু হয়ে গেল দৌড়াদৌড়ি। পাঁচ মিনিটে আগুন জ্বলে গেল। কমান্ডার হাবিবের লোক বসিয়ে রেখে চলে এলাম আমাদের কাজে। বলে এলাম, ‘নতুন মামলা ছাড়া পাকিস্তানের সময়ের কোনো অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করা চলবে না। আর উলুর বাসা তো পুড়ে দিয়েই গেলাম। কাউকে রশি দিয়ে কোমরে বাঁধা যাবে না। কোনো আসামির প্রতি অত্যাচার করা চলবে না। কথাগুলো মনে রেখো।’ টাঙ্গাইল ফিরে এসপিকে ডেকে নির্দেশ দিয়েছিলাম পাকিস্তানের সময় কোনো অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না। কোমরে রশি বেঁধে কাউকে আনা যাবে না। মুক্তিবাহিনীর অনুমোদন ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না। যত দিন আমাদের প্রশাসন ছিল তত দিন তাই হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে টাঙ্গাইলে যে সভা সমিতি হয়েছে, রাস্তার পাশে সুতা বেঁধে রাখলে সেটা ছিঁড়ে গেলে লোকজনেরাই আবার সুন্দর করে বেঁধে দিতো। একটা নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তখন। দুর্ভাগ্য আমাদের। স্বাধীনতাকামী আর স্বাধীনতা বিরোধীদের এক করে ডাল-চালে খিচুড়ি করে ফেলে জাতির সর্বনাশ করা হচ্ছে।

লেখাটা শুরু করেছিলাম খন্দকার আহমদ হোসেন ঠাণ্ডু মিয়াকে নিয়ে। তার ছেলে জুয়েলের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে, সঙ্গত কারণেই দু-একটি অন্য প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় তা নিয়ে আলোকপাত করার লোভ সামলাতে পারিনি। ইতোমধ্যেই গত ২৩ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক চার যুব নেতার অন্যতম জননেতা আব্দুর রাজ্জাক-অনাদরে অবহেলায় লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ঠিক সময় তার চিকিৎসার জন্য দুই-আড়াই কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ পেতে গিয়ে তার পরিবার-পরিজন হিমশিম খেয়েছে। চার-পাঁচ মাস লন্ডনে থাকার সময় একজন মন্ত্রী বা বড় আওয়ামী লীগ নেতা তার শয্যার পাশে যাননি। কিন্তু তার লাশ বহন করতে একসাথে ১৩ মন্ত্রী। এটাও আল্লাহর এক অসীম কুদরত। জীবিত মুজিবের চেয়ে যেমনি মৃত মুজিব ছিলেন শক্তিশালী, জননেতা আব্দুর রাজ্জাকও তাই। জীবন থাকতে অবহেলিত হলেও তার নশ্বর দেহকে কেউ অবহেলা করতে পারেননি। এ নিয়ে দৈনিক আমার দেশে একটা লেখা লিখব। আমি জননেতা আব্দুর রাজ্জাকের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা আব্দুর রাজ্জাকসহ খন্দকার আহমদ হোসেন ঠাণ্ডু মিয়া ও তার ছেলে জুয়েলকে বেহশ্‌তবাসী করুন।
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ৩১/১২/১১]

Keywords: