নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > স্বাধীন দেশের মুক্তিযোদ্ধা

স্বাধীন দেশের মুক্তিযোদ্ধা

Friday 16 December 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে কখনো তেমন একটা স্বাধীন ছিল না। প্রায় সময়ই তাদের রাজা-বাদশাহদের অঙ্গুলি হেলনে চলতে হয়েছে। হাজার বছর পেছনে গেলে দেখা যাবে- সুলতান, মোগল, মধ্যে কখনো সনাতনধর্মী হিন্দুরাজা শেষের দিকে ইংরেজ। তার আগে কখনো রামরাজ্য, কখনো অন্যান্য রাজা-মহারাজাদের অধীন; সেন, পাল কত বংশের ছড়াছড়ি। কিন্তু এ ভূখণ্ডের মানুষ কখনো নিজেদের শাসন নিজেরা করতে পারেনি। তাই বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বহু দিনের। মধ্যে একবার সম্রাট আকবরের সময় মসদন-ই-আলা ঈসা খাঁ বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটা অংশকে স্বাধীনভাবে শাসন করার চেষ্টা করেছিলেন। সে স্বাধীনতাও দইয়ের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। নবাব আলীবর্দী খাঁর নাতি, অপ্রাপ্তবয়স্ক নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব বলা হয়। এটা অবশ্য পুরো সত্য নয়। কারণ দিল্লির শাসন তখন শিথিল হলেও একেবারে বিলুপ্ত ছিল না। দিল্লিকে কর দিয়ে মোটামুটি স্বাধীনভাবে আলীবর্দী খাঁ-ই বলি, সিরাজউদ্দৌলাই বলি, তারা শাসন করেছেন। আর আলীবর্দী খাঁ, সিরাজউদ্দৌলা- এরা কেউ বাঙালি ছিলেন না, এক পুরুষ আগেও তারা বাংলার মাটি চিনতেন না। সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার কথা ভাবার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। হয়তো রাজা, বাদশাহ, নবাব কে কতটা প্রতাপশালী, কে কতটা স্বাধীন সেসব ব্যাপার চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। কিন্তু মানুষের মানমর্যাদা, অধিকার, এগুলোর তেমন গ্যারান্টি ছিল না। এসবের গ্যারান্টি পেতেই সাধারণ মানুষ সব সময় স্বাধীনতা চেয়েছে। আর এটাও সত্য, ইংরেজ আসার আগে সমগ্র ভারত উপমহাদেশ কখনো এক ও অখণ্ড ছিল না।

রাজা-বাদশাদের মারামারি লেগেই থাকত। মোগলরা তিন-চার শ’ বছর মোটামুটি একটা সর্বভারতীয় কাঠামো সংযোজন করতে পেরেছিল। কিন্তু এর আগে তা-ও ছিল না। জয়পুর, যোধপুর, বিকানের, জয়সলমির, আজমির, রাজস্থানে কত বীর-মহাবীর, উত্তরপ্রদেশ এক রকম, মধ্যপ্রদেশ চলত আর এক রকম, কাশ্মির অন্য রকম, পাঞ্জাব নানা ভাগে বিভক্ত। ইংরেজরা ভারতকে মোটামুটি এক শাসনে এনেছিল। বেনিয়া ইংরেজদের বিরুদ্ধে যেই কথা বলেছে, তাকেই কতল করা হয়েছে। জীবন দিয়েছে ভগত সিং, জীবন দিয়েছে ক্ষুদিরাম। বাঁশের কেল্লা তৈরি করে লড়াই করেছেন তিতুমীর। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। সশস্ত্র বিপ্লবে অবতীর্ণ হয়েছেন মাস্টারদা সূর্য সেন। রক্ত আর রক্ত, জীবন আর জীবন কোরবানি দিয়ে ইংরেজকে বিতারিত করা হয়েছিল। ভারত ও পাকিস্তান নামে দ্বিখণ্ডিত হয় এই উপমহাদেশ। আমরা পূর্ববঙ্গের বাসিন্দারা হই পাকিস্তানি, পশ্চিমবঙ্গেরা ভারতীয়। আমাদের হাজার হাজার বছরের বাঙালি সত্তাই হারিয়ে যেতে বসে। অল্প দিনেই পাকিস্তানের নেশা আমাদের কেটে যায়। প্রথমেই আঘাত আসে ভাষার ওপর। তারপর শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি-বাকরি- সবক্ষেত্রেই বঞ্চনা আর বঞ্চনা। আমরা শতকরা ৫৬ জন, ওদের সংখ্যা ৪৪। আমাদের চেয়ে শতকরা ১২ জন কম। তার পরও সংখ্যাসাম্যের প্যারোডি করা হলো। সমান সমান প্রতিনিধি হবে।

আমাদের নেতারা মেনে নিলেন। এ সমান শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে। চাকরি-বাকরি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, উন্নয়নসহ অন্য কোনো ক্ষেত্রে নয়। দেখা গেল, সারা পাকিস্তানে শতাধিক জেলা যার ১৯টা পূর্ব পাকিস্তানে। এক শ’ জেলার ডিসির মধ্যে হয়তো ৯০ জনই পশ্চিম পাকিস্তানি আর মাত্র ১০ জন বাঙালি। পূর্ব পাকিস্তানের ১৯ জেলায় ১০-১১ জন বাঙালি হলেও অন্যরা পশ্চিম পাকিস্তানি। ব্যাংকের ম্যানেজার পাকিস্তানি কেরানি-চাপরাশি-পিয়ন বাঙালি। বিদেশী দূতাবাসে হাইকমিশনার, সেক্রেটারি, কাউন্সেলর- সব অবাঙালি। কেরানি, স্টেনো, পিয়ন, আর্দালি এসব বাঙালি। সেন্ট্রাল গভর্মেন্টের ৫০ কিংবা ৫৩টা সেক্রেটারির পদে বাঙালি গোটা তিনেক। সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য। ক্রুগ কমিশনের সুপারিশমতো পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন ছিল ৯০০ কোটি টাকা। সেই ’৫৬ সালের সুপারিশ অর্থের অভাবে ’৭১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে করাচি থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। ৩৩০০ কোটি টাকা খরচ করে তারবেলা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনা পেপার মিলে কাগজ তৈরি হয়ে যেত পাকিস্তানে। সেখানে সেন্ট্রাল গভর্মেন্টের সিল মারা হতো। আমাদের দেশে উৎপাদিত কাগজ ওরা কিনত পাঁচ আনা দিস্তা, মানে ৪০ দিস্তায় রিম ওরা কিনত সাড়ে ১২ টাকা। আর আমাদের আট আনা দিস্তা মানে ২০ টাকা রিম। তিন-সাড়ে তিন লাখ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১৬-১৭ হাজার। বেঙ্গল রেজিমেন্টে হাজার ছয়েক, আর্মি মেডিক্যাল কোরে দেড়-দুই হাজার। আর্মি সাপ্লাই, আর্মি সিগন্যাল, ইএমই সব বিভাগ মিলিয়ে এই ১৬-১৭ হাজার। কী দারুণ সাম্য! পশ্চিমারা পানি দেখেনি, সাঁতার জানত না। তবু পাকিস্তান নেভির হেডকোয়ার্টার করাচিতে, এয়ারফোর্স হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে।

পাকিস্তানের সাড়ে ২৪ বছরই যুক্তি দেয়া হয়েছে, ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তানের দিকে হাত বাড়ায়, তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান দিল্লি দখল করে নেবে। সেই যে গ্রামগঞ্জে বলে, ‘এ্যাত্ গাছ টান দিলে ব্যাত গাছ নড়ে, কানাকুক্কায় ডাক দিলে সমুদ্র নড়ে’, ‘এখান থেকে মারলাম ঢিল, লাগল কলাগাছে, হাঁটু ফেটে রক্ত পড়ল চোখ গেল রে বাবা।’ কী সব অভাবনীয় মিল! নিগূঢ় খুঁজলে এসব গ্রাম্য ‘সিমাসা’রও একটা সূত্র পাওয়া যাবে। কিন্তু পাকিস্তানিদের ধাপ্পাবাজির কোনো সূত্র পাওয়া যাবে না।

অত অত্যাচার করলে মানুষ আর কত সহ্য করতে পারে? এক সময় না এক সময় নিরীহ মানুষও ফুঁসে ওঠে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটাও অনেকাংশেই তাই। সহ্যের সীমা পার হয়ে গেলে সমগ্র জাতি এক হয়ে গিয়েছিল। আর জাতিকে একসূত্রে গাঁথতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো সার্থক ভূমিকা পালন করেছিলেন। জেল-জুলুম সহ্য করে মানুষের এত আস্থা কুড়িয়েছিলেন, তার কথায় লক্ষ কোটি মানুষ জীবন দিতেও প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক দিনে আসেনি। ধীরে ধীরে মানুষের চেতনা-চৈতন্যে স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। তারই সার্থক অঙ্কুরণ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। মজার ব্যাপার প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধের আগে যারা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন, প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে তারা তেমন কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেননি। আবার মুক্তিযুদ্ধে যারা অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছেন, তারা দেশ গঠনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। স্বাধীনতার পরপরই তাদের পিছে ফেলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। তারা পিছে পড়েও গেছে। কারণ শৌর্য-বীর্যে অগ্রসর হলেও গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেক কূটকৌশলীর মতো তেমন বুদ্ধিমান ছিল না। তারা ছিল দেশপ্রেমিক। দেশের কান্না তাদের সহ্য হয়নি, সে কান্না থামাতে রক্ত ঢেলেছে। যারা রক্ত দিয়েছে তারা তো বেঁচে গেছে কিন্তু যারা অত রক্তক্ষরণের পরও বেঁচে আছে, তারা স্বাধীন দেশে ‘জ্যান্ত মরা’য় পরিণত হয়েছে। কী দুর্ভাগ্য আমাদের।

কোনো মুক্তিযোদ্ধা যদি ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটে, বুক পিঠের হাড় দেখা যায়, ইদানীং টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। কত দরদ, কত ভালোবাসা! জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, সে কিছু চায়নি, তার প্রতি জাতির কর্তব্য আছে, তাকে সাহায্য করা দরকার, পাশে দাঁড়ানো দরকার। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সাহায্য যে কেউ করে না, তা নয়। সাহায্যও কেউ কেউ করে। দুই চারটা ছাগল কিনে দেয়, হয়তো গরুর বাচ্চা কিংবা হাঁস-মুরগি দেয়, কেউ হয়তো রিকশা বা ভ্যান কিনে দেয়। সরকার থেকেও অমন করে। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর বিশেষ দিনে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের গরুর বাচ্চা, ছাগলের বাচ্চা, তাদের বউদের জন্য সেলাই মেশিন কিংবা ভ্যানগাড়ি এসব কিনে টিনে দেয় এবং ওই সব জিনিস আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি তুলে সরকারের পক্ষ থেকে দান করে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতির বয়সের বর্তমান সরকারি কর্মচারীরা। বড় ব্যথিত হই যখন দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ভ্যান দেয়া হয়, রিকশা দেয়া হয়। বড় একটা অস্ট্রেলিয়ান দুধেল গাইও দেয় না, দেয় দেশী গাইয়ের বাচ্চা। মন বড় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কেন গো সরকার বাহাদুর, মুক্তিযোদ্ধাদের ভ্যানগাড়ি দাও কেন? রিকশা কেন? যদি দিতেই চাও, তাহলে দুটো প্লেন দাও না, শেষ বয়সে বউ পোলাপান নিয়ে তারা একটু হাওয়া খাবে! ঠিক আছে প্লেন দিতে না চাও, একটা বাস গাড়ি দাও, একটা টাটা ট্রাক দাও। না, তা দেবে না। মানে মুক্তিযোদ্ধারা রিকশা ও ভ্যানচালকের ওপরে স্তরে বলে সরকারই মনে করে না। ছাগলের বাচ্চা কেন, একটা করে উট কিনে দাও! দেশ স্বাধীন করেছে। উপহার যদি দিতেই চাও তাহলে মাহুতসহ সারাজীবনের খাবারসহ একটা করে হাতি দিতে পারো না? স্বাধীনতার পর থেকেই চাকরি-বাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা দেয়া হয়েছে।

যদি সে কোটার ১০ ভাগের এক ভাগও বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে তো একজন মুক্তিযোদ্ধারও বেকার থাকার কথা নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কতজন, এখন ২০-২৫ লাখ তো হবেই। ২৫ লাখের ৩০ শতাংশ কত হয়? সাত লাখেরও বেশি। স্বাধীনতার পরপরও ছয়-সাত লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। সে সময়ও তো ছয় লাখে ৩০ শতাংশ দুই লাখের কাছাকাছি তো হয়। আর বেসরকারি চাকরি তো ছিলই? সবখানে মুক্তিযোদ্ধার কোটা থাকলে এমন দুরবস্থা হওয়ার কথা ছিল না। সবই শুভঙ্করের ফাঁকি। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনাশের আরেক প্রতিষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। কতজন যে তাদের সুবিধামতো দোকান খুলে বসেছে, তার কোনো লেখাজোখা নেই। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো কাজের কাজ না হলেও যারা সাইনবোর্ড তুলেছে তাদের অনেকের পকেট হয়েছে ভারী। এখন তো মুক্তিযোদ্ধা সংসদ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিছু কামাই-রুজির একটা হাতিয়ার। যেখানে প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১০-১২ লাখের নিচে নয়, সেখানে কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার তালিকা করতে গিয়ে দেড়-দুই লাখে নামিয়ে এনেছেন। বর্তমান সংসদ ৬০-৬৫ হাজারের ভোটার তালিকা তৈরি করে সরকারি ছত্রছায়ায় সংসদ বানিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় হয়তো যাদের জন্মই হয়নি, তারা এখন মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করে। সে দিন শুনলাম কালিহাতীর এক মুক্তিযোদ্ধার কথা, যার যুদ্ধে ভূমিকা খুবই প্রশংসনীয়। আমার সাথেও দুই একটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। সব সময় তার মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ছিল। এই বছর দেড়েক হলো কে বা কারা অভিযোগ করেছে, সে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তার কাছে ওসমানী সাহেবের সার্টিফিকেট আছে, তাতে আমার স্বাক্ষর আছে। তার পরও সে ‘ভুয়া’।

অভিযোগকারীর সে সময় জন্ম হয়েছিল না হয়নি, অভিযোগকারী স্বাধীনতার পক্ষে না বিপক্ষে ছিল কিংবা সে মুক্তিযোদ্ধা, না রাজাকার? সে ভুয়া কি না, তার খবর নেই। কিন্তু হয়তো একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে ভুয়া বলে পেরেশানিতে ফেলে দিয়েছে। আর কে মুক্তিযোদ্ধা ছিল এটা তো রাস্তার মানুষের জানার কথা নয়। সব মুক্তিযোদ্ধারও খবর জানার কথা নয়। এই অতি সাধারণ কথাটি মুক্তিযোদ্ধারা বোঝার চেষ্টা করে না। যারা তথাকথিত যাচাই-বাছাই করছে তারাও ক্ষমতার গরমে এগুলো ভাবে না। সাধারণ গণমানুষ এবং নতুন প্রজন্মের এখনো মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভীষণ আকর্ষণ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রয়েছে তাদের গভীর দরদ। কিন্তু যারা এখন সমাজপতি, তারা ভাগাড়ের শকুনীর মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কুরে কুরে খাবার চেষ্টা করছে। কথাগুলো এ জন্য বললাম; কারণ খুব সম্ভবত ৯ অথবা ১০ তারিখ ইটিভিতে দেখলাম ক্রাচে ভর দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা চলছিল। তার প্রতি ভীষণ দরদ দিয়ে উপস্থাপক নানা কথা বলছিলেন। ধর্ষণকারী, লুটেরা, খুনি পাকিস্তান হানাদারদের বারবার বলছিলেন, পাক বাহিনী। অমন নাপাক কাজ করেও যদি ‘পাক’ থাকে, তাহলে আর হানাদারদের দোষ কী? ‘পাক, পাক’ বলতে বলতে শত বছর পর হানাদাররাই হবে পবিত্র। আর মুক্তিযোদ্ধারা হবে...। অন্য দিকে স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে ব্যক্তিগতভাবে ‘রাজাকার’ আখ্যা পেয়েছি। ‘বাংলা ছাড়া’র নির্দেশও পেয়েছি অনেক আগে। এই মাসখানেক আগে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবেও খেতাব পেলাম। সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করেনি। এতে করে স্বাধীনতার এই মহান দিনে ধরে নিতেই হবে, ওতে তাদের সম্মতি আছে। যে যা-ই বলুন, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বহু কষ্টে অস্ত্র সংগ্রহ করে যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের হারিয়েছি। যুদ্ধ শেষে বিনা শর্তে তার পায়ের কাছে সব অস্ত্র জমা দিয়েছি। আমি যুদ্ধাপরাধী হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিরপরাধ থাকেন কী করে? আমি যদি যুদ্ধাপরাধী হই, তাহলে তো মুক্তিযু্‌দ্ধই একটা যুদ্ধাপরাধ। আর মুক্তিযুদ্ধ অপরাধ হলে স্বাধীনতা নিরপরাধ থাকে না।

আমি জ্ঞানপাপীদের জন্য বলছি না, নতুন প্রজন্মকে তথা জাতির ভবিষ্যৎদের জন্য বলছি, ‘তোমরা বিচার করতে শেখো। নিজের বিবেকের বিচারের পক্ষে সক্রিয় হও।’ বয়স হয়েছে। পরিবেশ বৈরী। তাই ইচ্ছে করলেই যা খুশি করতে পারি না। কিন্তু এসব অন্যায় না হোক কথার একটা জবাব তো দিতেই হবে। তাই এবার ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে যাইনি, কী করে যাই? একজন ‘রাজাকারে’র জাতীয় স্মৃতিসৌধের পবিত্র অঙ্গন অপবিত্র করা চলে না। আর বিশেষ করে ‘যুদ্ধাপরাধী’ স্মৃতিসৌধে যায় কী করে? তাই প্রতিবাদ হিসেবে যাইনি। যত দিন ওই সব অমার্জনীয় অপরাধের বিচার না হবে, তত দিন ইনশাআল্লাহ আর যাবো না।
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ১৬/১২/১১]