নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > কাদের সিদ্দিকী > তিনি আমার বড় ভাই-১৬ (গতকাল এবং আজ)

তিনি আমার বড় ভাই-১৬ (গতকাল এবং আজ)

Wednesday 3 August 2011, কাদের সিদ্দিকী Print

লেখার প্রায় শেষদিকে চলে এসেছি। এবার খাতা জমা দেয়ার পালা। ব্যাকবেঞ্চের ছাত্র হিসেবে মোটামুটি সম্মানজনকভাবে যদি উতরে যেতে পারি তাহলেই বাঁচি। ‘তিনি আমার বড় ভাই’, এরপর ‘উনি আমার জ্ঞাতিভাই’ বা এ ধরনের শিরোনামে জনাব গাফ্ফার চৌধুরীকে নিয়ে দু’কলম লিখবো। কয়েক মাস আগে তিনি মহাশূন্যে বসে শুধু আমাকে নয়—মহান মুক্তিযুদ্ধকে, সব মুক্তিযোদ্ধাকে এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বড় অবমূল্যায়ন এক কথায় বলতে গেলে পদাঘাত করেছেন। আমি একেবারে গনেকস, পচা গুলালু আর উনি রসগোল্লা। আল্লাহর সৃষ্টি মানুষকে কেউ এত অবহেলা করতে পারে, এত নিকৃষ্ট ভাবতে পারে যা আমার চিন্তায়ও ছিল না। তার সে লেখা নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনে তিন-চারশ’ শব্দ ব্যবহার করেছিলাম। যেহেতু দশ দিগন্ত কাঁপিয়ে ইত্তেফাকে জনাব গাফ্ফার চৌধুরী লেখেন, সেইহেতু ইত্তেফাকেই পাঁচ-ছয় হাজার শব্দের একটি লেখা দিয়েছিলাম। এত সুনামি কাগজ দৈনিক ইত্তেফাক, যার প্রাণপুরুষ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, একসময় ছোট্ট কর্মী হিসেবে দু’চারবার তো তাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করেছি, দু’একটা ফুটফরমাশও করেছি। তার সুযোগ্য পুত্র আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এখন ইত্তেফাকের স্বনামধন্য মালিক এবং সম্পাদক। একজন রুচিবান ব্যক্তি। সংসদ সদস্য হিসেবে আমি তার সতীর্থ। ইত্তেফাক প্রতিদিন কত লেখা ছাপে; কিন্তু গাফ্ফার চৌধুরীর লেখার জবাবে এই অধমের লেখা কেন ছাপার মুখ দেখলো না, এখনও তা ভেবে পাই না। তাই ‘তিনি আমার বড় ভাই’ শেষ হলে দেখি জ্ঞাতিভাই নিয়ে এখানেই কিছু কলম লেখা যায় কিনা।

‘মিথ্যাচার, উচ্ছ্বাস আর চোরাবালির প্রসাদ যত তাড়াতাড়ি মিলিয়ে যায়, বাস্তবতাও তত তাড়াতাড়ি স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়। কাদের সিদ্দিকীর বীরত্বগাথার মুখোশ বিদীর্ণ করে সত্য প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণকে আমি স্বাগত জানাই। সত্যের জয় হোক, মিথ্যা হাইপ ধ্বংস হোক।’
আপনার এই আকুতি বা চাওয়া যথার্থই শতভাগ আন্তরিক বলেই এখন মনে হয়। আপনার দৃষ্টিতে আমার জীবন মিথ্যা, কর্ম মিথ্যা, আমি মিথ্যার বেসাতিতে সৃষ্ট একটি গুণহীন অজ্ঞান জীব; তারপরও আমার বীরগাথা সে তো আমার নয়, সেটা আমিও নই। সেটা তো আপনিও। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি যা করেছি তা আপনারা কেউ করলে আমাকে নিয়ে নয়, আপনাদের নিয়েই আলোচনা হতো। কষ্ট হলেও যে কাজ আপনি বা আপনারা করেননি, আমি বা আমরা করেছি, ভালো হলে ভালো, খারাপ হলে খারাপ। কর্মফল তো ভোগ করতেই হবে। আপনি বীরগাথার মুখোশ বিদীর্ণ করে সত্য প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছেন। আমরা যদি মুখোশধারী হই, তাহলে আমার নেতা আপনার নেতা বাঙালি জাতির নেতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও কি একজন মুখোশী? বঙ্গবন্ধু নেতা বলেই তো আমি মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে বলেই তো যুদ্ধ করেছি। তবে কি বলতে চান, বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নামে কোনো নেতা ছিলেন না? ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে এদেশের আবালবৃদ্ধবনিতা বুকের রক্ত ঢেলে দেশকে হানাদারমুক্ত করেনি? এপ্রিলের গোড়ার দিকে আপনিসহ সব নেতা আমাদের অসহায় ফেলে ভারতে পালিয়ে যাননি? তখন তো আপনি এবং জনাব শাজাহান সিরাজ দু’জনই ছাত্রলীগের বা আওয়ামী ঘরানার ছিলেন।

আজ যারা বড় বড় কথা বলেন, আপনি জনাব শাজাহান সিরাজ, খন্দকার আসাদুজ্জামান—তারা তো সবাই এক লাফে পগাড় পার হয়েছিলেন।
আর যারা এমপি-মন্ত্রী আছেন, জনাব আবদুর রাজ্জাক তাকে আমি তুমি বলি, স্নেহও করি, আপনি ওর থেকে অনেক বড় নেতা ছিলেন। যুদ্ধের একেবারে শেষে নভেম্বরের দিকে একটা চিঠি লিখে আপনিই ওকে কাদেরিয়া বাহিনীতে পাঠিয়েছিলেন। ড. রাজ্জাক তেমন কোনো যুদ্ধ করতে পারেনি। আরেকটু সময় যুদ্ধ হলে নিশ্চয়ই সে অনেক ভালো যোদ্ধা হতো। এখন যা-ই বলুন, মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীতে নাদানের স্থান ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের পর এইমাত্র ক’দিন আগপর্যন্ত সে সব সময় আমার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণই করেছে। এবার মন্ত্রী হওয়ার পরও করেছে। কিন্তু মন্ত্রী হয়ে বছরখানেক যেতে না যেতে পদের গরমে হয়তো লাল টকটকে হয়ে গেছে। তা না হলে সে কেন বলবে, আওয়ামী লীগে যাওয়ার জন্য কাদের সিদ্দিকী (স্যার স্যার বলেই সব সময় আমাকে ডাকে) তার সঙ্গে কথা বলেছে। আওয়ামী মোর্চায় বা মহাজোটে যাওয়ার জন্য আমার রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলতে হবে কেন? আল্লাহ এখনই আমাকে এত দুর্যোগে ফেলেছেন? পরম করুণাময় আল্লাহই সবকিছুর মালিক। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ যদি স্বাভাবিক চলতো, তাহলে আজকের নেতা, পাতিনেতা, মহানেতা কারোরই আচরণ এমন অসংলগ্ন হতো না। ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজাকারের বংশ আজকের নব্য আওয়ামী লীগ নেতারা কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে কথা বলতে পারতো না। প্রধান প্রধান দলের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে রাস্তাঘাটে অত ফেলানো ছড়ানো কথা হতো না। যত মতবিরোধই থাকুক, ঘরে বসে এখনও শেখ হাসিনা সম্পর্কে কোনো কটু কথা বলতে মনে বাধা অনুভব করি। সর্বজনাব তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এদের সম্পর্কে ঘরে বসে আলতু-ফালতু কথা বলতে নিজেকেই ছোট মনে হয়। কিন্তু রাজনৈতিক রঙের খেলা কী বিচিত্র, আমেরিকায় আমার ড. নুরুন্নবী একেবারে ছোটখাটো গরিব মা-মরা সত্মায়ের ঘরে বড় হওয়া ছেলে।

স্বাধীনতার পর আমার খরচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। ২০/৩০ বাবর রোডের বাড়িতে বকুলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগে আমি যে ঘরে থাকতাম, সেই ঘরে বাসর সাজানো হয়েছে। সেই নুরুন্নবী আমেরিকায় এখন খুবই নাকি বড় মানুষ। সিনেটের না কিসের যেন মেম্বার। অনেক বিষয়-সম্পত্তির মালিক। আমেরিকায় আওয়ামী ঘরানার মস্তবড় নেতা। নাম কাটা যাবে আশঙ্কায় দেশে এসে আমার সঙ্গে দেখা না করে পালিয়ে যায়। জনাব আনোয়ারুল আলম শহীদ মুক্তিযুদ্ধে একটিও গুলি ছোড়েনি, কোনো রণাঙ্গনে যায়নি। নিরাপদে হেড কোয়ার্টারে বসে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে। স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনীর ডাইরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে মোশতাক সরকারের প্রতি রক্ষীবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথম আনুগত্য জানিয়েছিল। টাঙ্গাইল জেলা শান্তি কমিটির অন্যতম সদস্য জনাব আবদুর রহিম মৌলভী সাহেবের দ্বিতীয় না তৃতীয় পুত্র আনোয়ারুল আলম শহীদ স্বাধীনতার পর রক্ষীবাহিনী, তারপর ফরেন সার্ভিস সবশেষে সেক্রেটারি না অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি হয়ে বছর দুই হলো অবসর নিয়েছেন। এখন নব্য আওয়ামী লীগার। স্বাধীনতার পর প্রায় ৩৭ বছর কারও কোনো খোঁজ করেনি, এখন বড় দরদী। কোনো বড়সড় পদও পেয়ে যেতে পারে। কারণ বঙ্গবন্ধুর জন্য জান কয়লা করলে তাদের তো স্থান নেই। খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় সব কলকাঠি নাড়ানো জনাব এইচ টি ইমাম কী দাপটেই না সব চালাচ্ছেন। আপনিই তো প্রমাণ; বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কিছুই করলেন না, আপনি মন্ত্রী না মহামন্ত্রী আর আমি যৌবন ঝরিয়ে পথের কাঙাল। আপনাদের আরেক এমপি একাব্বর হোসেন। সে তো ছিল মুক্তিযুদ্ধে আমার দলে একজন সাধারণ সৈনিকেরও নিচের পদে। ঘাটাইলের জনাব ডা. মতিউর রহমান, তাকে আমি কখনও দেখিওনি, চিনতামও না। প্রথম দেখি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব আবদুল জলিল চিকিত্সাশেষে দেশে ফিরলে তার গুলশানের বাসায়। এটা ২০০৪-০৫-এর কথা।

সেখানে জনাব মতিউর রহমানের সঙ্গে দেখা। এরপর তিনি ঘাটাইলের এমপি হয়েছেন। ঘাটাইলকে তিনি আর কখনও ঘাঁটাননি। কারণ ল্যাবএইডের পরিচালক ধনবান ব্যক্তি, ওদিকে যাওয়ার তার দরকার কী? নাগরপুরের খন্দকার বাতেন এখন আপনাদের দলের এক বৃদ্ধ তুর্কি। স্বাধীনতার পরপরই জাসদ করে খুন-খারাবি কম করেননি। টাঙ্গাইল মুক্তিযুদ্ধে প্রথম দুই শহীদ জাহাঙ্গীর হোসেন তালুকদার ও লাবিবুর রহমান তার হাতেই নির্মমভাবে নিহত হয়। আপনাদের তো ক্ষমতা দরকার। আপনাদের কাছে আবার ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার কী? আরেকজন জনাব শওকত মোমেন শাহজাহান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তহবিল তছরুপ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য তাকে বন্দি করে পাছায় বেত মারা হয়েছিল। মায়ের হুকুমের কারণে তার জীবনহানি হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় কাঙালীছেও-এর জনাব জলিল প্রিন্সিপালের পরিবারের মেডিকেলে পড়া কোনো এক কন্যাকে নিয়ে যেমন কেলেঙ্কারি করেছিল, ঠিক তেমনি আমি যখন নির্বাসনে ছিলাম, বছরটা আমার এই মুহূর্তে মনে নেই, ’৮২-৮৩ সালের দিকের ঘটনা। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খুনের আসামি হিসেবে শওকত মোমেন শাহজাহান পালিয়ে আমার ৪৬ সদরঘাট রোড, বর্ধমানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। মনে হয় সেখানে দেড়-দুই বছর ছিল। আমি থেকেছি ১১ বছর। কোনো প্রেম করতে পারিনি, কোনো ভারতীয় মেয়েকে বিয়েও করতে পারিনি। সে ছিল দেড় বা দুই বছর। আমি কখনও অত উচ্চস্বরে নামাজ পড়তে পারতাম না। শাহজাহান পারতো। আমার শোবার ঘরের পাশেই ছিল বৈঠকখানা। তার পাশের ঘরেই ৪-৫ জন ওরা থাকতো। ফজর, মাগরিব এবং এশার ফরজ নামাজ সে এত উচ্চস্বরে পড়তো যা বহুদূর থেকে শোনা যেতো। এই নামাজী বর্ধমানে আমাকে বড় বিপদে ফেলে এসেছিল। আমি সেখানে ভারত সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলাম। শাহজাহান গিয়েছিল পলাতক আসামি হিসেবে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগের বিপ্লবী তরুণ বিনয়, বাদল, দীনেশ তাদের একজনের পরিবার বর্ধমানের শ্রীপল্লীতে থাকতো। বিনয়, বাদল, দীনেশ নামে বিবাদীবাগ বলে কলকাতা মহাকরণের প্রসিদ্ধ রাস্তা কোটি বাঙালি চেনে। সেই বাড়ির সদস্যরা মাঝে-মধ্যে আমার বাড়িতে আসতো। ওরা কংগ্রেস করতো। সেজন্য বর্ধমানে যাওয়ার কয়েক বছর আগে কংগ্রেস আর সিপিএমের গোলযোগে ওদের এক ভাই মারা যায়। তার বিধবা স্ত্রী গৌরী গুহ, ছোট মেয়ে টোপা গুহ, ছেলে অভিষেক গুহ ড্যাফলকে নিয়ে মাঝেসাজে আসতো। মাঝেসাজে বাপ্পীদের পুরো পরিবার আসতো। সেখানে বাপ্পীর মা, বাপ্পীর বৌদি গৌরী, টোপা, ড্যাফল আর বাপ্পীর বোন শিপ্রা তার ৭-৮ বছরের মেয়ে ঝিলমিল থাকতো। আমার ৪৬ সদরঘাট রোড, বর্ধমানের বাড়ি সবসময় প্রতিবেশী বাচ্চাকাচ্চায় থাকতো ভরা।

আমার বন্ধু, বুম্বা, বাপ্পী, বাবনী, প্রশান্ত, রবি সারাদিন মাতিয়ে রাখতো। তেমনি শিপ্রারাও আসতো। শওকত মোমেন শাহজাহান আমার বাড়িতে আসার পর শিপ্রার যাতায়াত মনে হয় একটু বেড়েছিল। আমি বোকা মানুষ, ও লাইন কখনও ঘাঁটিনি বা চিনিনি। তাই বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারিনি। হঠাত্ একদিন দিল্লিতে ফোন পেলাম, শাহজাহান বাসায় নেই। ওইদিনই আমি বোধহয় দিল্লি থেকে বর্ধমান ফিরছিলাম। বাসায় এসেই শুনি শিপ্রাকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ৪০ ভরি সোনাসহ নিখোঁজ হয়েছে। বর্ধমান থানায় শিপ্রার মা মামলা দিয়েছে, শওকত মোমেন শাহজাহান নামে এক মুসলমান যুবক তার মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। সেই মুসলমান যুবকের ঠিকানা দিয়েছে আমার ৪৬ সদরঘাট রোডের বাড়ি। পরদিন কলকাতা গিয়েছিলাম। আমাকে যারা দেখাশোনা করতো, তারা খুব বিব্রতভাবে ঘটনাটা জানতে চাইলো। আসলেই আমি তেমন কিছু জানতাম না। তাদের বলে এলাম, জেনেশুনে পরে জানাবো। পরদিন সকালে সিপিএম নেতা বড় সজ্জন ব্যক্তি অমল ঘোষ এসে হাজির, ‘বাঘা দা, ব্যাপার কী? আপনার বাসার কে মেয়ে নিয়ে পালিয়েছে?’ বললাম, ‘আমার এখানে একজন থাকতো, আজ ক’দিন ধরে সে নেই। আদৌ সে শিপ্রাপরীকে নিয়ে পালিয়েছে কিনা বলতে পাচ্ছি না। এজন্য অন্তত পনের দিন সময়ের দরকার।’ কারণ তখন এত মোবাইল যোগাযোগ ছিল না। টেলিফোনে যোগাযোগ করতে সারাদিন লেগে যেতো। আর আমি থাকতাম মফস্বল শহর বর্ধমানে। বর্ধমান থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে ঢাকা, সেখান থেকে টাঙ্গাইল ফোন পাওয়া ছিল দুরূহ ব্যাপার। মোটামুটি কলটি এমনভাবে করতে হতো, বর্ধমান থেকে কলকাতা কোড ০৩৩ তারপর বাংলাদেশ ০৮৮, সেখান থেকে টাঙ্গাইল ০৯২১ এরপর কাঙ্ক্ষিত টেলিফোন নাম্বার। কলকাতা থেকে বিমানে লন্ডন যেতে যে সময় লাগতো, টেলিফোনে লাইন পেতে তার চাইতে কম লাগতো না।

(বাকি অংশ আগামীকাল)
**************
(গতকালের পর)
মামলা হয়েছে নারী অপহরণের। ভারতীয় দণ্ডবিধিতে সে এক মারাত্মক মামলা। সহজে রেহাই পাওয়া কঠিন। এক বা দু’দিন পর শিপ্রার মা দলবেঁধে এলো, ‘ও যায় যাক, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের যে টাকাপয়সা সোনাদানা নিয়ে গেছে সেটা এনে দিন।’ তারা আমার কাছে কোনো অন্যায় কথা বলেনি। সঠিক ঘটনা জানার জন্য কয়েকদিন সময় নিলাম। শিপ্রার মা ছিলেন বিপ্লবী ঘরানার সম্ভ্রান্ত এক মহিলা। তার আচার-আচরণে সবসময় তা ফুটে উঠতো। আর্থিক দৈন্য তাকে কখনও ছোট করতে পারেনি। অন্যের সঙ্গে মেয়ের পালিয়ে যাওয়া বা অপহৃত হওয়ার পরও তিনি সে ধৈর্য রেখেছেন। বয়সে আমি ছোট হলেও সবসময় দারুণ সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। শিপ্রার স্বামী ঝিলমিলকে রেখে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। যুবতী শিপ্রাকে নিয়ে শিপ্রার মা এবং তার পরিবার সবসময় কমবেশি বিব্রত থাকতো। গায়ের রং কালো হলেও উচা-লম্বা প্রতিমার মতো ছিল তার মুখাবয়ব। ক’দিনের মধ্যেই জেনে গেলাম সত্যিই শওকত মোমেন শাহজাহান শিপ্রাকে নিয়ে পালিয়েছে। টাঙ্গাইল এসে আমার বন্ধু হায়দার শিকদারের বাড়িতে উঠেছে। শুধু হায়দার নয়, আরও অনেকেই তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। কারণ সে সময় শওকত মোমেন শাহজাহান সত্যিই কর্মীদের মধ্যে একজন নিবেদিত নেতা হিসেবে পরিচিত ছিল। আর আমার সহকর্মীরা তো তাকে যে কোনো রকম সাহায্য করতে পারলে ধন্য হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় অত শাসন-ত্রাসন, মারপিঠ খাওয়ার পরও সে আমার সঙ্গে রাজনীতি করতো। সেজন্য অনেক কর্মী তাকে ভালোবাসতো। একটি সন্তানসহ এক হিন্দুর মেয়ে ভাগিয়ে এনেছে। শরিয়তমত বৈবাহিক জীবনযাপন করতে তার মেয়েটিকে মুসলমান বানানো উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। শওকত মোমেন শাহজাহান দেশে এসেই প্রচার করে দিলো, শিপ্রার সঙ্গে তার স্বাধীনতার পরপরই বিয়ে হয়েছিল। ঝিলমিল তার ঔরসজাত সন্তান। শিপ্রার বাড়ি বর্ধমান, শাহজাহানের বাড়ি সখীপুর। দূরত্ব প্রায় ৬-৭শ’ কিলোমিটার। কী করে পরিচয় হলো, কী করে বিয়ে হলো তা সে-ই জানে। এলাকায় প্রচার করলো, লতিফ ভাইর সঙ্গে ’৭২-এর মার্চ-এপ্রিলে একবার কলকাতা গিয়েছিল, সে সময় তাদের পরিচয় এবং বিয়ে হয়েছে। কলকাতা আর বর্ধমানের ব্যবধানও ১২০ কিলোমিটার। যাক, দুর্জনের তো আর ফন্দির অভাব হয় না! সে যত ফন্দিই করুক, কাজটা যে তার ঠিক হয়নি এটা একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। শিপ্রার ’৬৮ অথবা ’৬৯ সালে বিয়ে হয়েছিল। তার বিয়ের ছবি এখনও আমার কাছে আছে। দার্জিলিংয়ে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলে শিপ্রাই তার স্বামীর লাশ শনাক্ত করেছিল। ঝিলমিলের জন্ম ’৭০ সালে। নানা কারণে ’৭২ সালে তাদের বিয়ের গল্প অসার। তা ওরা যা করার করুক, অন্যের এখানে তেমন কিছু বলা সাজে না। কিন্তু তবু আমরা সভ্য সামাজিক জীব। আমাদের কিছু রীতিনীতি, আইনকানুন, শরিয়ত মেনে চলতে হয়। শওকত মোমেন শাহজাহানের মেয়ে ঝিলমিলকে বিয়ে করেছে আমার বন্ধু জয়নাল মওলানার ছেলে বাবুল। জয়নাল মওলানা সখীপুরের একজন আলেম হিসেবেই পরিচিত। তিনি তার মুসলমান ছেলে দিয়ে হিন্দুর মেয়ে বিয়ে করালেন, না মুসলমানের মেয়ে—মোটেই তলিয়ে দেখলেন না। শিপ্রাকেও হাদিস কোরআন শরিয়তমত বিয়ে পড়ালেন না। কারণ তাদের তো ’৭২ সালেই বিয়ে হয়েছে। যদি শিপ্রা আর শওকত মোমেন শাহজাহানের শরিয়তমত কোনোদিনই বিয়ে না হয়ে থাকে, তাহলে একটা অধার্মিক কাজ চলছে এবং সেই পাপের আমরাও ভাগীদার। শাহজাহানের একমাত্র ছেলে জয়। তার দোষ কোথায়? তার বাবা-মা যদি ধর্মমতে বিয়ে করে জয়কে পৃথিবীতে এনে থাকে, তাহলে জয় ভাগ্যবান। আর যদি না হয়, কোনোদিন যদি তাদের বিয়ে না হয়ে থাকে, তাহলে খোদার ঘরে এই ছেলেটির ঠিকানা কোথায় হবে? তার জন্মের জন্য জয়ের কী-ইবা করার ছিল! কারোরই তো তেমন কিছু করার থাকে না। বিষয়টিকে একটু তলিয়ে দেখা দরকার। একটা অসত্যকে ঢাকা দিতে কতো অসত্যের আশ্রয় নিতে হয়। তার চাইতে সত্য বলা ভালো নয় কি?
তখন আজকের মতো অবস্থা ছিল না। ক’দিনের মধ্যে শিপ্রা এবং শাহজাহানের চিঠি পাই। তারা যে উভয়ের সম্মতিতে এসেছে এবং আমি যেন ওদের ক্ষমা করি, দুজনই তা আবেদন করে চিঠি লেখে। ওদের চিঠি পেয়ে আমি শিপ্রাদের বাড়ি যাই। শিপ্রার মা ও পরিবারের সবাইকে ঘটনাটা বলি। শিপ্রার যদি আশ্রয় হয়, তাহলে তাদের আর তেমন দুশ্চিন্তা নেই। এর মধ্যে আবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাংলাদেশী যুবকের নারী অপহরণের বিষয়ে বাংলাদেশকে অবহিত করেছিল। ততদিনে শওকত মোমেন শাহজাহানের নামে ওয়ারেন্টও ইস্যু হয়ে গিয়েছিল। শিপ্রা ভালো আছে শুনে তারা সবাই খুশি হয়। কিন্তু তারা তখন সর্বস্বান্ত। সামান্য যে টাকা পয়সা ছিল, তা শিপ্রা নিয়ে এসেছে। সোনা ৪০ ভরি না হলেও যা ছিল, তা প্রায় সবই সে নিয়ে এসেছে। সব শুনে আমি আমার করণীয় ঠিক করেছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী হলে তাদের উপকার হয়। ’৮২-৮৩ সালে ভারতে সোনার ভরি ছিল ৭-৮শ’ টাকা। তারা ২০-২৫ ভরি সোনার ব্যবস্থা হলে খুশি। আর তক্ষুনি হাজার দশেক টাকা। তখন আমার খুব আর্থিক ক্ষমতা ছিল না। তবু দশ হাজার টাকা দিতে কোনো অসুবিধা হয়নি। দুলাল অথবা আবদুল্লাহকে পাঠিয়ে মায়ের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে তখনই দিয়ে এলাম। পরের সপ্তাহে আরও পঁচিশ হাজার। তখন ৪৬ সদরঘাট রোড ছেড়ে দিয়ে শ্রীপল্লীতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সদরঘাট রোডের মতো দুই-আড়াই হাজার স্কয়ার ফুটের কোনো বাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই শিপ্রাদের তিন রুমের বাড়ির এক রুম পোস্ট অফিসকে ভাড়া দিয়ে দুই রুমে ওরা থাকতো। ভারত সরকারকে বলে ওদের বাড়ির দোতলা কনস্ট্রাকশন করে নিলাম। তাতেও বোধহয় ২৩-২৪ হাজার টাকা খরচ হলো। ভাড়া ধরে দিলাম ১৫শ’ টাকা। হাজার টাকায় তখন একটা ভদ্র ফ্যামিলি চলার জন্য ছিল যথেষ্ট। এখন ৩০ হাজার টাকায়ও যা পাওয়া যাবে না, তখন হাজার টাকাতেই তা পাওয়া যেতো।
(শেষ)
[সূত্রঃ আমার দেশ, ০৩/০৮/১১]

Keywords: