নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > প্রেস রিভিউ > অপকর্মে তিন এমপির সম্পদের পাহাড়

অপকর্মে তিন এমপির সম্পদের পাহাড়

Tuesday 23 June 2020, kalerkantho Print

করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) দুর্যোগ মোকাবেলায় নিরলস কাজ করে চলেছে সরকার। ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টানা ছুটি, লকডাউন ঘোষণার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আবার দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন সচল রাখতে নেওয়া হচ্ছে বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণাসহ নানা উদ্যোগ। অথচ স্বাস্থ্য খাতে ব্যর্থতা ও দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা, ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের ত্রাণের চাল ও অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সর্বোপরি তিন সংসদ সদস্যের নানা অপকর্ম সরকারের সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে।

মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি, ফসলি জমির মাটি কাটা, সন্ত্রাস আর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। লক্ষ্মীপুর-২ আসনের কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল অর্থ ও মানবপাচারের পাশাপাশি নানা অপকর্ম ঘটিয়ে কুয়েতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন। আবার রাজশাহী-৪ আসন থেকে তিনবারের সংসদ সদস্য এনামুল হক কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন নিয়োগ বাণিজ্য করে। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে জড়িয়ে দিয়েছেন মামলায়।

মানিকগঞ্জের শিবালয়ে আরিচা-কাজিরহাট-নগরবাড়ী নৌরুটে ৪০টি স্পিডবোট রয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যের প্রভাবে ওই ঘাটে স্পিডবোট চলছে মাত্র ৯টি।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্জয়ের নিজের দুটিসহ ৯টি স্পিডবোটই তাঁর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চালানো হয়। অন্য বোটের মালিকরা অনেক আবেদন-নিবেদন করেও এই ঘাটে প্রতিদিন বোট চালাতে পারেন না। কয়েকজন স্পিডবোট মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এমপি ও তাঁর সিন্ডিকেটের কারণে আমাদের এখন করুণ দশা। এ নিয়ে কথা বলারও কেউ নেই। তারা প্রতি মাসে তিন লাখ টাকার বেশি উপার্জন করলেও আমাদের তেলের খরচ ওঠানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’

স্পিডবোট কিনেও নিয়মিত ঘাটে চালাতে পারছেন না জেলা ছাত্রলীগের এক সহসভাপতিসহ যুবলীগের কয়েক নেতা। কিন্তু দুর্জয় সিন্ডিকেটের ভয়ে তাঁরা কেউ মুখ খুলতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা যুবলীগের এক নেতা বলেন, ‘সংগঠন করতে গিয়ে আমাদের কিছু খরচের দরকার পড়ে। তাই শেয়ারে স্পিডবোট কিনেছিলাম। কিন্তু এখন ঘাটে নিয়মিত চালাতে পারছি না। পুরো ঘাট একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন এমপি দুর্জয় ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা।’ উপজেলা যুবলীগের সাবেক এক সহসভাপতি বলেন, ‘দেখুন, স্পিডবোট কী চালামু; আমাদের কোনো ট্রিপই দেওয়া হয় না। শুধু পরিবহন ট্রিপ কিছু পাই। সেই টাকা দিয়ে নিজের সংসার চলা তো দূরের কথা, তেল খরচ এবং চালকের বেতনও দিতে পারি না। আমার মতো অবস্থা অনেকেরই।’

নৌকায় চাঁদাবাজি : শিবালয়ের আরিচা পুরাতন টার্মিনাল তিন নম্বর ঘাটের কড়ইতলি থেকে পিডিপি এলাকায় ইঞ্জিনচালিত ৭০ থেকে ৮০টি নৌকা চলাচল করে। সেখানে এমপির ক্যাডার বিশ্বজিৎ কুমার ও ওসিউর রহমান সিকো নৌকাপ্রতি ৫০০ টাকা চাঁদা নিচ্ছেন। তাঁদের পক্ষে চাঁদা তুলছেন তেওতা ইউনিয়নের সমেসঘরের যুবলীগ ক্যাডার মো. জালাল, হৃদয়, রাজা, জুয়েল, ফিরোজসহ আরো কয়েকজন।

ইঞ্জিনচালিত নৌকার মালিক রবিউল বলেন, ‘নৌকা চালাতে হলে চাঁদা দিতে হবে। আর যারা চাঁদা নেয় হেরা এলাকার প্রভাবশালী লোক। আমরা গরিব মানুষ, এইডা ছাড়া কোনো উপায় নাই। সরকার চাঁদামুক্ত ঘাট করে দিলে বাঁইচা যাইতাম।’ তাঁর এ কথায় সমর্থন দেন বিল্লাল ও আসলাম।

ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে মাদকের কারবার : এলাকায় মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন সংসদ সদস্য দুর্জয়ের ঘনিষ্ঠরা। শিবালয় উপজেলায় যাঁদের বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারের অভিযোগ রয়েছে তাঁদের সঙ্গে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শিবালয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে ইমন, উপজেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি দুলাল হোসেন ও তাঁর চাচা আসলাম মাদকের কারবারে সক্রিয়দের অন্যতম। সম্প্রতি দুই হাজার ১০০ পিস ইয়াবাসহ পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করলেও সংসদ সদস্যের ইশারায় প্রশাসন থেকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সংসদ সদস্যের ভাই মাহবুবুর রহমান জনির আশ্রয়ে থেকে ইয়াবার কারবার চালাচ্ছেন অসিউর রহমান সিকো ও ইয়াবার ডিলার তেওতা ইউনিয়নের নেহালপুরের খোকার ছেলে তুষার। তুষার ইয়াবাসহ কয়েকবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছেন এমপির ভাই : ঘিওর উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে উত্তরপাড়ার শত শত বিঘা তিন ফসলি জমি কেটে পুকুরে পরিণত করেছে স্থানীয় সংসদ সদস্য নাইমুর রহমান দুর্জয়ের ভাই মাহবুবুর রহমান জনি ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী।

একইভাবে বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের পুখুরিয়া গ্রামের তিন ফসলি জমি কেটে নিয়ে যাচ্ছে সংসদ সদস্যের ক্যাডার বাহিনী। সংসদ সদস্য দুর্জয়ের ভাই জনি ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা ইফতে আরিফসহ তাঁদের ক্যাডার বাহিনী জোরপূর্বক ফসলি জমি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিসহ মানববন্ধন করলেও তাদের তাণ্ডব থামেনি।

এই চক্রের তাণ্ডবে মহাদেবপুর উত্তরপাড়ার শত শত মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। শুধু মহাদেবপুর ও খালিয়াখোড়া ইউনিয়নে নয়; ধুলন্ডী, মৌহালী, করজোনা, আঙ্গারপাড়া, ভালকুটিয়া, বাষ্টিয়ার, পুরান গ্রাম, শ্রীবাড়ি, বড়টিয়া, সিংজড়ি ইউনিয়নের চরবাইলজুড়ি, বানিয়াজুরি, শোলধারা, নয়াচরসহ উপজেলার অর্ধশত গ্রাম থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে সংসদ সদস্য দুর্জয় সিন্ডিকেট।

পুখুরিয়া গ্রামের আব্দুর রহমান, আজিজুল ইসলাম, কামাল হোসেন, কুলসুম বেগমসহ ১০ জনের বেশি কৃষকের সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠ প্রতিবেদকের। কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘যারা মাটি কাটছে হেরা এমপির লোকজন। কিছু কইলে আমাদের ওপর নির্যাতন করবে। বিকালে জমি ঠিক থাকলেও সকালে দেখি পুকুর করে রেখেছে।’

মহাদেবপুরের উত্তরপাড়ার সত্তরোর্ধ্ব মজিবুর রহমান গ্রামের চলাচলের রাস্তাটি দেখিয়ে বলেন, ‘ইটের সলিং করা রাস্তাটি এখন খাল বানাইছে ওরা। এমপির লোকজন আমাদের ওপর জুলুম করতেছে।’ কুলসুম বেগম নামের স্থানীয় এক নারী বলেন, “জমির মাটি কাটায় বাধা দেওয়ায় এমপির লোকজন আমার স্বামী-সন্তানকে খুন করার হুমকি দেয়—‘তোরা বাঁইচ্যা না থাকলে জমি দিয়া কী করবি?’ ওদের ভয়ে মুখ বুজে আছি।”

মানবপাচারের টাকায় সম্পদশালী এমপি পাপুল
অর্থ, মানবপাচারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল কুয়েতে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে। প্রতারণার শিকার ১১ প্রবাসী কর্মী এরই মধ্যে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এদিকে সংসদ সদস্য পাপুল, তাঁর স্ত্রী সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ও শ্যালিকার বিরুদ্ধে অর্থ, মানবপাচারসহ নানা পথে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে সংসদ সদস্য পাপুলের স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকা যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য দুদক থেকে ইমিগ্রেশন বিভাগসহ বিভিন্ন স্থানে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এমনকি পাপুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত রাখাসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে নির্বাচন কমিশন ও এনবিআরে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক।

জানা গেছে, এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থপাচারের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

এমপি এনামুলের অপকর্মের বিরোধিতা করলেই মামলা
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এলাকায় মামলাবাজ সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। টানা তিনবারের এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বাগমারায় গত ১১ বছরে অন্তত ২০টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় ৫০ জনকে, যাঁদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। সর্বশেষ এই জনপ্রতিনিধি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর বিরুদ্ধেও মামলা করেছেন।

সংসদ সদস্য এনামুল হকের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ভবানীগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি নাহিদুজ্জামান নাহিদ। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ও বাগমারা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান আসাদ আইসিটি আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। অথচ সেই দ্বিতীয় বিয়ের কথা এখন সংসদ সদস্য এনামুল নিজেই স্বীকার করছেন। দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জনসমক্ষে আনায় লিজার বিরুদ্ধেও মামলা করেছেন সংসদ সদস্যের পিএস।

শুধু ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ ও দ্বিতীয় স্ত্রী লিজাই নন, সংসদ সদস্য এনামুলের বিপক্ষে যাঁরাই অবস্থান নিয়েছেন, তাঁদের নামেই দেওয়া হয়েছে মামলা। আর তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নিজ দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর সংখ্যাই বেশি। এসব মামলায় অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মীকে কারাবরণ করতে হয়েছে।

বাগমারার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন সংসদ সদস্য এনামুলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পৌর মেয়র কালামের গ্রুপে থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া হয় তিনটি মামলা। যোগীপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে একটি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মতিউর রহমান টুকুর বিরুদ্ধে একটি, বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আকবর আলীর বিরুদ্ধে একটি এবং আওয়ামী লীগ কর্মী আক্কাছ আলীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্য এনামুল বলেন, ‘বাগমারায় যাঁরা বিভিন্ন অপরাধ করেছেন, তাঁদের নামে মামলা হয়েছে। আমি কাউকে মামলা করার পরামর্শ দিইনি।’

নিয়োগ বাণিজ্য, বিএনপি-জামায়াতিদের পুনর্বাসন ও জঙ্গিদের দলে ঠাঁই দেওয়া নিয়েও একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছেন সংসদ সদস্য এনামুল। বাগমারা উপজেলায় ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘দপ্তরি কাম প্রহরী’ পদে ৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগ আছে, নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এনামুল হক চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। সে হিসাবে অন্তত দুই কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা টাকা দেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন।

তবে এসব নিয়োগ বাণিজ্যের কথা অস্বীকার করে এনামুল হক বলেন, ‘ওই সময় দলীয় কিছু লোকের জন্য ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। তবে কারো কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি।’

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া চাকরি হয়েছে—এমন নজির কমই আছে। বেশির ভাগ নিয়োগ পেয়েছে জামায়াত-বিএনপির লোকজন। শুধু চাকরি নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদে বিএনপি-জামায়াতের লোকদেরই বসানো হয়েছে।

Keywords: , , ,