নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > তাজ হাশমি > পলাশীর যুদ্ধ: ইতিহাস আর উপাখ্যান

পলাশীর যুদ্ধ: ইতিহাস আর উপাখ্যান

Tuesday 23 June 2020, তাজ হাশমি Print

আজ ২৩ জুন, পলাশীর যুদ্ধের ২৬৩ বার্ষিকী I

অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় (১৮৬১–১৯৩০) রচিত সিরাজুদ্দৌলা (১৮৯৮) গ্রন্থের নাট্যরূপ, আর তার উপর নির্ভরশীল খান আতাউর রহমানের সিরাজুদ্দৌলা ছায়াছবি ৯৯% ভাগেরও বেশি বাংলাদেশীদের পলাশীর যুদ্ধ ও নবাব সিরাজুদ্দৌলা সম্পর্কে তারা যা জানে বা জানে না তার মূল বা একমাত্র উৎস I আর বাদবাকি যারা স্কুলে বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পাঠ করেছে তারাও পলাশী, সিরাজুদ্দৌলা, মীর জাফর, রবার্ট ক্লাইভ, ও তাদের সমসাময়িক ব্যক্তিদের সম্পর্কে যা জানে সেটাও সিরাজুদ্দৌলা নাটক বা সিনেমা দেখে যা শিখেছে, তার চাইতে পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কে খুব একটা বেশি জানে মনে করার কোনো কারণ নেই! আমি আজ এখানে পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কে যে কথা গুলো বলছি, অনেকেই তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত ধারণার বশবর্তী হয়ে তার বিরূপ সমালোচনা করবেন বলে আমার আশংকা !

আমি আরেকটু ভূমিকা দিয়ে আমার মোদ্দা কথায় আসছি I ইসলাম ধর্ম ও ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে যারা প্রায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ, তাদের কাছে আপনি একটু যুক্তি ও প্রমান দিয়ে ইসলামের কোনোকিছুর উপর নতুন একটা কিছু বললে অনেকেই আপনাকে কাফির, মুরতাদ,ইসলামের শত্রু বলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করবে I যেটা তারা আগে কোনোদিন শোনেনি, কেননা হাদিসে একথা লেখা নেই আর হুজুরদের কাছ থেকে এ কথা তারা কোনো দিন শোনে নি! আমি আরো উদাহরণ দিতে পারি, যেমন ১৯৭১-এর সংগ্রামে কত লোক মারা গেছে বা কে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন সম্পর্কে নতুন কোনো মত দিলেই আপনার মাথা দ্বিখণ্ডিত হতে পারে!

অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় নিয়ে আমি আলোচনা শুরু করেছি I তিনি রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী ও বন্ধু I যদিও রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস নির্ভর গল্প বা উপন্যাসে সাহিত্যিকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন — অর্থাৎ তিনি মনে করতেন গল্পের খাতিরে লেখক ঐতিহাসিক ঘটনাবলী পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারবেন — অক্ষয় মৈত্রেয় ছিলেন নিষ্ঠাবান ঐতিহাসিক I কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ অক্ষয় বাবু তার সিরাজুদ্দৌলা গ্রন্থ নিজের অজান্তেই বহু-বহু উপাখ্যান বা প্রচলিত গালগল্পের ব্যবহার করেছেন ।

যেটা প্রায় সব বাংলাদেশিরাই পলাশী সম্পর্কে জানেন সেটা হলো নবাব সিরাজুদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য যুদ্ধে নবাবের পরাজয় ঘটে I শুধু তাই নয়, তারা আরো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে ,পলাশীর যুদ্ধে যদি নবাব পরাজিত না হতেন, তাহলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা সহ সমগ্র ভারতবর্ষ স্বাধীন থাকতো ! ইংরেজের মানদণ্ড কোনোদিনই তাদের রাজদণ্ডে রূপান্তরিত হতো না! এ কথা যে কতটা উদ্ভট, অসত্য, আর ইতিহাসনির্ভর নয়, এটা বলে শেষ করা যাবে না!

প্রথমেই দেখা যাক পলাশীর প্রান্তরে সেদিন নবাব আর ক্লাইভের কার কত সৈন্য উপস্থিত ছিল, আর সেকালে যুদ্ধজয়ের অন্যতম প্রধান অস্ত্র গোলন্দাজ বাহিনীর অবস্থা কি ছিল! অর্থাৎ কার কাছে কতগুলো কামান ছিল!

নবাবের ছিল ৬২,০০০ সৈন্য আর ক্লাইভের ছিল ২,৮০০ (৮০০ ইংরেজ আর ২,০০০ ভারতীয় ভাড়াটে সেনা বা mercinary) I নবাবের ছিল ৫০ টা বড়-বড় কামান আর তার সাথে ছিল কিছু ফরাসি সেনা (ফ্রান্স আর ব্রিটেনের সপ্তবর্ষীয় যুদ্ধ বা Seven-Year-War [১৭৫৭-১৭৬৩] পলাশী পর্যন্ত চলে এসেছিলো) I আর ক্লাইভের ছিল ১০টা ছোট-ছোট কামান I তবে ক্লাইভের ২,৮০০ সৈন্যের ৩০০ জন ছিল ইংরেজ বেয়োনেট-ধারী সেনা I যুদ্ধ শুরু হবার আগেই মীর জাফর তার ৫০,০০০ সৈন্য নিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় I তবুও নবাবের হাতে ছিল ১২,০০০ সেনা আর কয়েকশত ফরাসি সেনা I তাদের পক্ষে ক্লাইভের বাহিনীকে পরাজিত না করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণই ছিল না ! তবুও তারা সেদিন ভীষণ ভাবে পরাজিত হয় এবং পরে নবাব ধরা পড়েন ও নিহত হন I ঘটনার সঠিক ইতিহাস জানলে আমরা কিন্তু কেউ মীরজাফরকে গালাগাল না করে অন্য কথা চিন্তা করবো!

ক্লাইভের ২,৮০০ সৈন্যের হাতে নবাবের ১২,০০০ আর ফরাসিদের কয়েকশ সৈন্য পরাজিত হয়, এবং কয়েক হাজার প্রাণ হারায় I মূল কারণটা কি!? মীরজাফরের বিস্বাসঘাতকতা নাকি উন্নত, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার আধুনিক সেনাবাহিনীর হাতে একটা অনুন্নত,অপেশাদার, অপটু, সেনানী ও সেনাপতিদের পরাজয় ছিল অবধারিত?

জুন মাস বর্ষা কাল ! যুদ্ধ শুরু হবার কিছুক্ষন পরেই প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় I নবাবের সেনাবাহিনী পলাশীর খোলা মাঠে, আর ইংরেজ সেনাবাহিনী — নবাবের বাহিনীর এক চতুর্থাংশের কম শক্তিশালী — নিকটবর্তী আমের বাগানে তাদের তাঁবু স্থাপন করে I আম্রকাননে বড়-বড় আমগাছগুলো ক্লাইভের বাহিনীকে কামানের আক্রমণ থেকেও কিছুটা রক্ষা করে I তবে বৃষ্টি শুরু হবার প্রায় সাথে সাথেই নবাবের গোলন্দাজ বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে I তাদের বিরাট-বিরাট কামানগুলো হঠাৎ গোলাবর্ষণে অপারগ! নবাব বাহিনীর কি গোলা শেষ হয়ে যায় নাকি বারুদ!? কোনোটাই নয়! তবে বৃষ্টি হলে যে কামানের বারুদের বস্তা গুলো ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখতে হয় তারা সেটা জানলেও সেদিন ত্রিপল আন্তে ভুলে যায়! আহারে ভোলা মন! আর ওদিকে ক্লাইভের ছোট-ছোট কামান গুলো শুষ্ক বারুদ দিয়ে এক নাগাড়ে গোলা বর্ষণ করে যাচ্ছিলো ! ফলে যুদ্ধের পরিণতি যা হবার তাই হলো! নবাবের অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যরা কামানের গোলায় পর্যুদস্ত হয়ে ময়দান ছেড়ে জান নিয়ে পালালো ! যারা তখনও পালাতে পারেনি তারা কামানের গোলা আর দুই কোম্পানি (প্রায় ৩০০) ইংরেজ সঙিনধারী সেনার হাতে অকালে প্রাণ হারালোI ৬/৭ ঘন্টার ভেতরেই যুদ্ধ শেষ, নবাব পালালেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না! তিনি ধরা পড়লেন আর পরে তাকে হত্যা করা হলো!

যারা এখনো মনে করেন যে মীর জাফর যদি সেদিন যুদ্ধ করতো, তাহলে নবাবের পরাজয় হতো না, তাদের কথা না হয় তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম! কিন্তু ১৭৬৪ সালের ২৩ অক্টবর বিহারের বক্সার নামক স্থানে বাংলার নবাব মীর কাসিম, দিল্লির মুঘল বাদশা দ্বিতীয় শাহ আলম, আর অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দউলা এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আবার রবার্ট ক্লাইভের ছোট এক বাহিনীর হাতে পরাজিত হলো! ব্যাপারটা কি, এবার তো কোনো মীর জাফর বিশ্বাস ঘাতকতা করে নি ! আসল ঘটনা হলো একটা উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আধুনিক সেনাবাহিনীর হাতে একটা অনুন্নত অপেশাদার বাহিনীর — সেটা যতই বড় হোক না কেন — পরাজয় ছিল একটা অবধারিত বিষয়! নবাব সিরাজুদ্দৌলার ওর পরে বক্সারের দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরা খালি পায়ে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলো, কেননা তারা বুটজুতার সাথে তখন পরিচিত হয়নি!

মীর জাফরী বা বিস্বাসঘাতকতা তত্ত্বের অসারতা প্রমান করার জন্য বলা যায় যে কোনোরকম বিশ্বাস ঘাতকতা ছাড়াই ভারতে ও পৃথিবীর অন্য প্রান্তে — আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দূর প্রাচ্য, ইন্দোনেশিয়া, মালয়, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, চীন ও সর্বত্র — দেশীয় বাহিনী ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর হাতে অতি সহজেই পরাজিত হয়! কারণগুলো নিশ্চই অনন্য কিছু! উপসংহারে বলা যায় পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের জন্য আর কতদিন আমরা মীর জাফরকে গাল দেব! মীর জাফর ইংরেজের সাহায্যে নবাব হতে চেয়েছিলো, যেমন হাসিনা ভারত ও চীনের সাহায্যে ক্ষমতায় বসেছে! আসল গলদ টা কোথায় সেটা নির্ণয় না করে কেবল কতিপয় লোকের বিশাসঘাতকতায় কোনো দেশের পরাজয় ঘটে, এই তত্ত্বের অবসান হওয়া দরকার!

Keywords: