নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > মাহমুদুর রহমান > রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিদেশ-নির্ভরতা

রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিদেশ-নির্ভরতা

Thursday 6 February 2014, মাহমুদুর রহমান Print

(প্রথম কিস্তি)
২০০৭ সালের মার্চ মাস। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বসে তারই আন্দোলনের ফসল, জেনারেল (অব.) মইন-ড. ফখরুদ্দীনের বিচিত্র যৌথ সরকারের যাবতীয় তোঘলকী কর্মকাণ্ডকে আগাম বৈধতা দিয়ে আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভ্রমণে বিদেশ গেছেন। এদিকে মইন-মাসুদের নির্দেশে মেজর জেনারেল (অব.) রুমি, ব্রিগেডিয়ার (অব.) বারী এবং তখনও ব্রিগেডিয়ার পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল (অব.) আমিন মাইনাস টু বাস্তবায়নে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
দেশের এমনই টালমাটাল অবস্থায় ডিজিএফআই কর্তাদের অতি উত্সাহে হিমশীতল পানি ঢেলে দিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সবরকম পরিস্থিতিতে দেশে থেকে যাওয়ার দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করলেন। তখনকার বহুল প্রচারিত গুজব অনুযায়ী নির্বাসনে পাঠানোর জন্য টারমাকে বিমান প্রস্তুত রাখা হলেও বেগম খালেদা জিয়া অনড় রইলেন। শেখ হাসিনা এবং তার সমর্থকরা নাটকের পাণ্ডুলিপির অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনে প্রমাদ গুনলেন। এমন তো কথা ছিল না। মামলা ও জেলবাস থেকে অব্যাহতির বিনিময়ে দুই নেত্রীকেই একে একে দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে, এমন পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েই তো শেখ হাসিনা বিদেশে তার ছেলে ও বোনের কাছে প্রথমে যেতে সম্মত হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে দেশত্যাগের পরিবর্তে জেল জীবনকে বেছে নিলে তো আওয়ামী লীগের আম-ছালা দুই-ই যাবে।
ঢাকা থেকে শেখ হাসিনার শুভানুধ্যায়ীরা তাকে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে আসার জন্য তাড়া দিতে থাকলেন। বর্তমানে যদিও উভয়ের মধ্যে চরম বৈরী
সম্পর্ক, কিন্তু তখন পর্যন্ত শেখ পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, পিতৃব্যতুল্য প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসাও তার মুজিব ভাইয়ের স্নেহাস্পদ কন্যাকে একই পরামর্শ দিলেন। তখনকার ঘটনা মূসা ভাইয়ের জবানীতেই জেনে নেয়া যাক—
“** আরেকটা কথাও মনে পড়ছে, সেটাও বলি। মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের চাপে শেখ হাসিনা যখন দেশের বাইরে, তখনকার কথা। এই সময় একদিন আমার মোহাম্মদপুরের বাসায় এলেন আলাউদ্দিন নাসিম। তিনি আমাকে হাসিনাকে ফোনে একটি অনুরোধ করতে বললেন।

* কী অনুরোধ?
** হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে বলা। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এ অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়েছেন বলে আলাউদ্দিন নাসিমের আমার কাছে আসা। নাসিমের উপস্থিতিতেই হাসিনার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। আমার একটিমাত্র কথায় হাসিনা দেশে ফিরতে রাজি হন।
* কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে : জানতে পারি কি?
** জীবনানন্দের কবিতা দিয়ে প্রশ্ন, বাহ।
* কিন্তু কী কথা তাহার সাথে বললেন না তো?
** থাক, পরে কখনও লিখে জানাব।

* এটা তো ‘টক শো’ নয় ‘টক টেক্সট’ এখানে কিছু বলা আর লিখে জানানো সমার্থক। অতএব সেই ‘একটিমাত্র কথা’ আমাকে বলতেই পারেন।
** শেখ হাসিনাকে আমি বলেছিলাম, আপনি আর বিদেশে থাকবেন না। যত তাড়াতাড়ি পারেন, দেশে ফিরে আসুন। ফিরতে দেরি হলে মইন উ আহমেদ কিন্তু খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন। আমার কথা শুনে মত পাল্টেছিলেন হাসিনা। পত্রপাঠ দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।”
(সাক্ষাত্কার নিয়েছেন, আবু হাসান শাহরিয়ার, আমাদের সময়, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৩)

মূসা ভাইয়ের পরামর্শে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেও ফিরতি বিমানে উঠতে শেখ হাসিনাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। কারণ ততক্ষণে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে তত্কালীন বাংলাদেশ সরকার প্রেসনোট ইস্যু করে তাকে বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তিরূপে উল্লেখপূর্বক বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব বিমান কর্তৃপক্ষকে ঢাকাগামী কোনো বিমানে আরোহণ করতে না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে যোগাযোগ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মতিন (অব.) সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমার বলার কিছু নেই। প্রেসনোট ইটসেলফ এ মেসেজ।’ স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুল করিম বলেছিলেন, “এ বিষয়ে যা বলার লিখিতভাবেই সব বলা হয়েছে। আর কিছু বলার নেই।” বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ১/১১ সরকারের বিশ্বস্ত এই স্বরাষ্ট্র সচিব পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার আমলে পদোন্নতি পেয়ে মুখ্য সচিব হয়েছিলেন এবং চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন। এক-এগারোর এসব পিলে চমকানো কাহিনী স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস সিরিজ গল্পের চেয়েও রোমাঞ্চকর। সেই সময়ের নাটের গুরু লে. জে. (অব.) মাসুদও অদ্যাবধি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের হাইকমিশনারের পদে বহাল আছেন। কোন্ গোপন আঁতাতের জোরে শেখ হাসিনার মেয়াদ সমাপ্তির পথে, অথচ মাসুদউদ্দিনের চাকরি শেষ হচ্ছে না, সে রহস্য কোনো এক পক্ষ মুখ না খোলা পর্যন্ত অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বিবিসি রেডিওর কাছে প্রদত্ত সাক্ষাত্কারে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন সেনা সমর্থিত সরকারের মুখপাত্র এবং আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তার বক্তব্য ছিল—

“শেখ হাসিনা যাতে দেশে না আসেন সে জন্যই এই প্রেসনোটের মাধ্যমে তাকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তারপরও যদি তিনি একান্তই এসে যান তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তার বিরুদ্ধে ক্রিমিন্যাল কেসও রয়েছে। আমরা এ মুহূর্তে চাচ্ছি না—এ মুহূর্তে তার মতো একজন নেত্রীকে কোনো রকম বিপদে ফেলতে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দিয়েছেন, সে প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, এ মুহূর্তে না আসার জন্য। হয়তো এমনও হতে পারে তিনি সরকারের এই অনুরোধ রাখবেন। আইন উপদেষ্টা আরও জানান, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ হয়েছে এবং না আসতে বলা হয়েছে।”

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বিবিসিকে যাই বলুন না কেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বিদেশি সমর্থনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল সরকার শেষ পর্যন্ত আটকাতে পারেনি। আটকাতে না পারার কারণটিই আমার আজকের মন্তব্য-প্রতিবেদনের শিরোনামের সঙ্গে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনা লন্ডনে তার স্বল্পকালীন নির্বাসনে থেকেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রভাবশালী বিদেশিদের কাছে দেন-দরবার করা ব্যতীত ঢাকাগামী কোনো বিমানে ওঠার ক্ষমতা তার নেই। বিশেষভাবে তিনি দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধু, ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে ফোন করে জেনারেল মইনের ওপর চাপ সৃষ্টির অনুরোধ জানান। প্রণব মুখার্জির হস্তক্ষেপের ফলেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সম্ভব হয়েছিল কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব না হলেও জেনারেল মইন যে ভারতের তল্পিবাহক ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীর পদতলে আমাদের সব স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার প্রক্রিয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই ছোট মাপের জেনারেলই শুরু করেছিলেন। কাজেই ভারতের নির্দেশ তার কাছে তখন শিরোধার্য। অর্থাত্, পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ভিন্ন বর্তমানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সে সময় দেশে ফেরা সম্ভব হতো না।

১/১১’র বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের বিদেশ নির্ভরতার আরও দুটি উদাহরণ এখানে দেয়া যেতে পারে। জনশ্রুতি রয়েছে, শেখ হাসিনার সাবজেলে বন্দিত্বকালীন সময়ে ড. গওহর রিজভী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে এসে তত্কালীন ব্রিগেডিয়ার আমিনের মধ্যস্থতায় তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং জেনারেল মইনের সঙ্গে যাবতীয় দরকষাকষি সম্পন্ন করেছেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বিদেশি নাগরিক সেই গওহর রিজভী বর্তমান সরকারের গত চার বছরের অন্যতম প্রভাবশালী উপদেষ্টা। ভারতের সব অন্যায্য আবদার রক্ষা করতে তার এবং পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ড. মশিউর রহমানের দেশবিরোধী ভূমিকার কথা সচেতন নাগরিকমাত্রই জানেন।

এবার দ্বিতীয় উদাহরণ প্রসঙ্গে কথা। ২০০৮ সালে সাবজেল থেকে মুক্তিলাভ করে শেখ হাসিনা আবারও বিদেশ সফরে যান। সেই সফরে তিনি দীর্ঘ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন এবং নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস আগে দেশে ফেরেন। বেগম খালেদা জিয়া যখন অশক্ত শরীরেও নির্বাচনী প্রচারণায় দিবারাত্র বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন, সে সময় নির্বাচনের বিষয়ে বিস্ময়করভাবে নিরুদ্বিগ্ন মহাজোট নেত্রী ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট বুশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শলাপরামর্শে ব্যস্ত থেকেছেন। অক্টোবরের ৩০ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ-এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড বাউচারের সঙ্গে সপুত্রক একান্ত বৈঠক শেষ করেই ফিরতি বিমানে চড়েছিলেন শেখ হাসিনা। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী সেই বৈঠকে বিশ্বব্যাপী কথিত ইসলামী জঙ্গিবাদ দমনের যুদ্ধে তার ভবিষ্যত্ সরকারের সহযোগিতার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের প্রতি মার্কিন সমর্থন নিশ্চিত করে এসেছিলেন বাংলাদেশের আজকের প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ও কম যাননি। কার্ল সিয়োভাক্কো (Carl Ciovacco) নামের মার্কিন সেনাবাহিনীর মুসলিম-বিদ্বেষী এক সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি যৌথভাবে প্রখ্যাত মার্কিন সাময়িকী Harvard International Review-তে Stemming the rise of Islamic Extremism in Bangladesh শিরোনামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য অবমাননাকর এক প্রবন্ধ রচনা করেন। সেই প্রবন্ধে আমাদের সেনাবাহিনীর শতকরা ৩৫ ভাগ সদস্যকে প্রকারান্তরে জঙ্গি অপবাদ দিয়েছিলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। শুধু তাই নয়। সেই লেখায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেনাবাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান (Purging) পরিচালনারও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সংস্থাটির অবলুপ্তি শুদ্ধি অভিযানের অংশ ছিল কি না, সে প্রশ্নের জবাব হয়তো কোনোদিনই মিলবে না। যাই হোক, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিদেশ কানেকশনের কাছে স্বদেশে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যাপক, কষ্টকর গণসংযোগ পরাজিত হয়েছিল। তার জনসভায় স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের স্রোত দেশি-বিদেশি কৌশলের ফলে ভোটে রূপান্তরিত করা যায়নি। মিডিয়ায় ব্যাপক বিএনপি-বিরোধী প্রচারণা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতেও যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। মনস্তাত্ত্বিকভাবে সম্ভবত সেই অবিশ্বাস্য পরাজয়কে এখনও মানতে না পারার ফলেই বেগম খালেদা জিয়াও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পুরনো কৌশল অনুকরণে মহাজোট সরকারের শেষ বছরে বিদেশনির্ভর হয়ে পড়ছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন টাইমস নামক স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার খোলা চিঠি অথবা নিবন্ধ মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের কাছে আপসহীন নেত্রীর করুণ আবেদন হিসেবেই হতবাক পাঠকের কাছে বিবেচিত হয়েছে। নিবন্ধটির শিরোনামেই লেখকের দুর্বলতা ও হতাশা ফুটে উঠেছে। The Thankless role in saving democracy in Bangladesh (বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষায় অপ্রশংসনীয় ভূমিকা) এই অদ্ভুত শিরোনাম ব্যবহার করে বেগম খালেদা জিয়া যদি বোঝাতে চেয়ে থাকেন যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার সুদীর্ঘ বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের জনগণ সুবিচার করেনি তাহলে এদেশের জনগণের প্রতি তিনি চরম অবিচার করবেন। এই জনগণই রাজনীতিতে নবীন একজন গৃহবধূর অপরিসীম ত্যাগকে সম্মান জানিয়ে তাকে তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে।

১৯৯১ সালে নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার বিএনপির ১০ সিট পাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষের গণজোয়ারের কাছে ভেসে গিয়েছিল। এই মুহূর্তে দেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বেগম খালেদা জিয়া নিশ্চিতভাবেই চতুর্থবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তার প্রতি সমর্থন দিতে জনগণ কোনোদিনই কার্পণ্য করেনি। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর সর্বাত্মক অসহযোগিতা সত্ত্বেও বিএনপি একাই ১১৬টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করেছিল। ২০০৮ সালের প্রেক্ষাপট অবশ্য একেবারেই ভিন্ন ছিল। কাজেই এই একটি অস্বাভাবিক নির্বাচনের ফলাফল থেকে এ দেশের জনগণের রাজনৈতিক পরিপকস্ফতা নির্ণয়ের চেষ্টা করা বড় রকমের ভুল হবে বলেই আমি মনে করি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে যে সামরিক ও বেসামরিক কোটারি তখন ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা যে কোনো মূল্যে নিরাপদ প্রস্থানের (Safe exit) একটি পথ খুঁজছিল।

শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে এক-এগারো সরকারকে সেই পথ দেয়ার বিনিময়ে নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় লাভে সক্ষম হন। সেই জয়ের মূল্য চুকাতেই আজ আমাদের সীমান্তের ভূমি প্রতিনিয়ত ফেলানীর মতো দরিদ্র বাংলাদেশী নাগরিকের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীকে করিডোর দেয়ার আয়োজন চলছে। সীমান্তের ওপারের পানি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় এ দেশের বৃহত্ অংশের মরুকরণ প্রক্রিয়া দ্রুততর হলেও শাসকগোষ্ঠী কোনোরকম প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত সঞ্চয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সবমিলে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের এই মাটিতে বেঁচে থাকাই কঠিন করে ফেলা হয়েছে। শাসকশ্রেণীর এই বিদেশ নির্ভরতার দায় আমরা আর বহন করতে চাই না। তাই বাংলাদেশের জনগণ এমন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করে যারা বিদেশি শক্তির অনুগ্রহে নয়, দেশপ্রেমিক জনগণকে সংগঠিত করেই সব ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করবে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার স্লোগান ছিল দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও। আমরা আশা করি দেশ ও মানুষকে রক্ষার সেই অদম্য প্রচেষ্টা থেকে তিনি কখনোই পিছু হটবেন না। বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে বাংলাদেশে অপশাসনের যে ভয়াবহ চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, তার সঙ্গে অধিকাংশ নাগরিকই একমত হবেন। কিন্তু সেই নিপীড়ক, ফ্যাসিস্ট শাসককে হটানোর জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে কোনো পরাশক্তি নয়, স্বদেশের জনগণের ওপরই পুনরায় আস্থা স্থাপন করতে হবে। হতাশাবাদীরা ভাবতে পারেন, আজকের ভোগবাদী সমাজে মানুষ প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে। তারা রাজপথের আন্দোলনে অংশ নিতে আর ইচ্ছুক নয়। তারা প্রশ্ন তুলতে পারেন, নইলে চার বছরের এই অপশাসন জনগণ নীরবে কেন সহ্য করছে? কিন্তু তাদের কাছে আমার পাল্টা প্রশ্ন, এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য কি কেবল জনগণই দায়ী? রাজনীতিবিদরা কি সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন? নাকি মূলত তাদের অধিকাংশই নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থেকেছেন? সারাজীবন নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জামানত হারানো, চাঁদার টাকায় কায়ক্লেশে দিন কাটানো জনসমর্থনহীন রাজনীতিবিদ একবার আঁতাতের সুযোগে মন্ত্রিত্ব নামক আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েই আধা-ডজন প্লটের মালিক হয়ে নির্লজ্জের মতো দম্ভ প্রকাশ করে বলবেন, প্রভাব খাটালে এক ডজন প্লটের মালিক হতে পারতাম! আর অসহায় জনগণ বঞ্চনা ও ঘৃণায় রাজনীতিবিমুখ হয়ে উঠলে তাদেরকেই আবার উল্টো দোষারোপ করব, এ হয় না। আগামী বুধবারের দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তিতে জনগণের পক্ষে এই প্রশ্নগুলোরই জবাব খুঁজতে চেষ্টা করব।

(আমার দেশ, ০৬/০২/২০১৩)

Keywords: