নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > প্রেস রিভিউ > জিয়াউর রহমান: বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক

জিয়াউর রহমান: বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক

Tuesday 16 June 2020, thikana Print

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। এটি ঐতিহাসিক সত্য। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে তেমন একটা জোরালো কোন বিতর্ক নেই। যারা বিতর্ক করেন সেটি উদ্দেশ্যমূলক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্যসুত্র থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে পরপর কয়েকদিন কয়েকবার দেশে বিদেশে প্রচারিত হয়েছে। তবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের জনগনের উপর হামলা শুরু করলে কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে পড়ে স্বাধীনতাকামী জনগণ। এমনই এক অবস্থায় ২৬ মার্চ এর প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তৎকালীন তরুণ মেজর জিয়াউর রহমান। ‘উই রিভোল্ট’ বলে সশ্রস্ত্র যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন বইয়ে এসবের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তবে খোদ জিয়াউর রহমানের লেখায়ও এর বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা পত্রিকায় একটি জাতির জন্ম শিরোনামে একটি নিবন্থ লিখেন জিয়াউর রহমান নিজে। এত তিনি লিখেন, সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশে একটি ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলাম। ….. আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদেরকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা জানিয়ে নির্দেশ দিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিল। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। .. .. .. ” তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সাল। রক্ত আঁখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটা দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখবে, ভালোবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনো দিন ভুলবে না। কো-ন-দি-ন না”।
জিয়াউর রহমানের নিজের এই লেখায় স্পষ্ট, তিনি ২৬ মার্চই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ঘোষণাটি তিনি নিজেই ড্র্রাফট করেছেন। নিজের মত করেই দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন ইতিহাস থেকে দেখা যায়, সময়ের কারণে জিয়াউর রহমানের ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেশে বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় সেটি বেশী মানুষের কানে পৌঁছেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে ইস্যুটি নিয়ে বিতর্ক চলছে সেটি হলো জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতার ঘোষকই ছিলেন না তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। এ নিয়ে যারা বিতর্ক করছেন তাদের হয়তো কোন ভিন্ন যুক্তি থাকতে পারে তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যারা বই লিখেছেন অধিকাংশ বই থেকেই জানা যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনাটি তিনি দিয়েছিলেন নিজেকে বালাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র, তৃতীয় খ-ে বর্ণিত জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাটি এভাবে উল্লেখ আছে।
Dear fellow freedom fighters, I, Major Ziaur Rahman, Provisional President and Commander-in-Chief of Liberation Army do hereby proclaim independence of Bangladesh and appeal for joining our liberation struggle, Bangladesh is independent. We have waged war for liberation war with whatever we have. We will have to fight and liberate the country from occupation of Pakistan Army. Inshallah, victory is ours.
এছাড়াও এর সমর্থনে সুনির্দ্দিষ্ট তথ্য রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক সচিব মঈদুল হাসান তরফদার লিখেন, “২৭ শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮-ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষনা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসাবে ঘোষণা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।” (মূলধারা:৭১, পৃষ্ঠা ৫)। এখানে উলেখযোগ্য যে, মেজর জিয়া শেখ মুজিবের নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বললেও নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে আগেকার ঘোষণা সংশোধন করেননি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিক-উল ইসলাম বীরউত্তম মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি ১৯৭১ সালের ১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দয়িত্ব পালন করেছেন তিনি তার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা বই ”অ্যা ট্যাল অব এ মিলিয়ন্স” (A Tale of millions) বইয়ের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ২৭ মার্চের বিকেলে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন। পরে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছন। তবে জিয়াউর রহমান কেন প্রথম ঘোষণা একটিু পরিবর্তন করেছেন তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন মেজর রফিক-উল ইসলাম। তিনি লিখেন ”একজন সামরিক কর্মকর্তা নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা দিলে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র (Political Character of the Movement) ক্ষতিগস্ত হতে পারে এবং স্বাধীনতার জন্য এই গণ-অভ্যুত্থান সামরিক অভ্যুত্থান রূপে চিত্রিত হতে পারে, এই ভাবনায় মেজর জিয়া পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। এই ঘোষণা শোনা যায় ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি বর্তমানে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ, বীরউত্তম যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তার লেখা বই “বাংলাদেশ এট ওয়ার” বইয়ের ৪৩-৪৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাত্রিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। এই ঘোষণায় তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন।
কে এম সফিউল্লাহ আরো লিখেন, “জিয়াউর রহমান তার ঘোষনায় আরো বলেন, “আমরা বিড়াল-কুকুরের মতো মরবো না, বরং বাংলা মায়ে যোগ্য সন্তান রূপে (স্বাধীনতার জন্যে) প্রাণ দেব। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং সমগ্র পুলিশ বাহিনী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোহর, বরিশাল, খুলনায় অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের ঘিরে ফেলেছে। ভয়ংকর যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে”। সফিউল্লাহর মতে, এই ঘোষণা দেশে এবং বিদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্দীপ্ত করে। যারা ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধে রত ছিলেন এই ঘোষণা তাদের নৈতিক বল ও সাহসকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যরাও এই যুদ্ধে শামিল হন”।
আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখ সমরে যুুদ্ধ করেছিলেন তিনি ১৯৭২ সালে একটি বই লিখেছিলেন “মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস” নামে। সেই বইতে তিনি লিখেছেন, ”জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আরেকটি ঘোষণা দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে। তবে সেই সময়ও তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসাবেই ঘোষণা দেন। এছাড়াও ড. আজিজুর রহমান, এম আর সিদ্দিকী এবং অন্য আরো অনেকেই তাদের বক্তব্যে বলেছেন, জিয়া প্রথম দিনের ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।
সাবেক মন্ত্রী এবং বর্তমানে এলডিপি’র সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ, বীরবিক্রম, অক্সফোর্ড বুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের অনুবাদ গ্রন্থে-রাষ্ট্র বিপ্লব : সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বলেছেন, মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (মুখবন্ধ)। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার সময় তিনি মেজর জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এবং সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার যিান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক তিনি মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ বইতে বলেন, “মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে এসে প্রথম যে ঘোষণাটি দিলেন, সে ঘোষণায় তিনি নিজেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দ সৈনিক বেলাল মোহাম্মদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার স্মৃতিকথায় বলেছেন, “জিয়াউর রহমান যে খসড়াটি তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি নিজেকে প্রভিশনাল হেড অব বাংলাদেশ বলে উল্লেখ করেছিলেন।”
জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এটি ঐতিহাসিক সত্য। ঐতিহাসিক সত্যের কয়েকটি তথ্য এখানে উল্লেখ করা হলো। যাদের বই থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তাদেও অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন। আদালতের মাধ্যমে ইতিহাসের সত্য নির্ধারন নয় বরং ইতিহাসের তথ্যসুত্রের আলোকেই ঐতিহাসিক সত্যটি মেনে নেয়াই সময়ের দাবি। এটি ভবিষত প্রজন্মের কাছে বর্তমান প্রজন্মের দায়।

(সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী প্রেস সচিব)

Keywords: ,