নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > প্রেস রিভিউ > আগ্নেয়াস্ত্রসহ সেই বিতর্কিত রকি বড়ুয়া গ্রেফতার

আগ্নেয়াস্ত্রসহ সেই বিতর্কিত রকি বড়ুয়া গ্রেফতার

Wednesday 13 May 2020, banglatribune Print

মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলের সঙ্গে বৈঠক করা বিতর্কিত সেই রকি বড়ুয়াকে বিদেশি পিস্তল, মদসহ গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-৭। মঙ্গলবার (১২ মে) ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

র‍্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল এ তথ্য জানিয়েছেন। একই অভিযানে এক নারীসহ রকির চার সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কিছুদিন আগে মাসুদ সাঈদী, তারেক মনোয়ারসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে রকির গোপন বৈঠকের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ছবিতে কালো টি-শার্ট ও নীল জিন্স প্যান্ট পরা অবস্থায় রকিকে একটি চেয়ার বসে থাকতে দেখা যায়।

লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মঙ্গলবার ভোরে নগরীর মুরাদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে রকি ও তার চার সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানের সময় র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে রকি তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় তার দুটি পা ভেঙে যায়। গ্রেফতারের পর তাকে করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার বাসা থেকে বিদেশি পিস্তল ও বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে।


কে এই রকি বড়ুয়া?

আলোচিত রকি বড়ুয়া সম্পর্কে অন্ধকারে স্বয়ং তার বাবা। ছেলের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা ও কর্মস্থল সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন বলে জানিয়েছেন তার বাবা জয়সেন বড়ুয়া। তবে এলাকাবাসী জানিয়েছেন, রকি বড়ুয়া দেশ বিদেশের উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা এলাকায় বলে বেড়াতো। লোকজন বিশ্বাস করতে না চাইলে তাদের সাথে তোলা ছবি দেখাতো। এ কারণে এলাকার লোকজন ভয়ে তাকে সমীহ করে চলতো। এভাবে চলতে চলতে এক পর্যায়ে রকি বড়ুয়ার কথায়ই এলাকায় আইনে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী ও মাওলানা তারেক মনোয়ারসহ জামায়াত নেতাদের সাথে বৈঠকের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গত সোমবার দিবাগত রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে ৪ সহযোগী ও ১ নারীসহ তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৭। এসময় তার কাছ থেকে বিদেশি পিস্তলসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় ৪টি মামলা হয়েছে। এদিকে, সহযোগী, নারী ও পিস্তলসহ গ্রেপ্তারের পর সবার একটাই প্রশ্ন ‘কে এই রকি বড়ুয়া’ ? কোথায় তার খুঁটির জোর ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় তার পরিবার, এলাকার লোকজন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে রকি বড়ুয়ার ইতিবৃত্ত।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ওসমান গণি জানান, চরম্বা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের বিবিরবিলা বড়ুয়া পাড়ার জয়সেন বড়ুয়ার পুত্র রকি বড়ুয়া। এখন থেকে ১৪-১৫ বছর আগে অভাবের তাড়নায় ভিক্ষু সেজে ভারতে যায় রকি বড়ুয়া। সেখানে যাওয়ার পর জগৎজ্যোতি বিহারে আশ্রয় নেয়। বিহারটির ধর্মীয় গুরু ধর্মবীর পাল ভারতের রাজ্য সভার সদস্য হন। এছাড়া ওই বিহারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রী-এমপি আসতেন। ফলে তাদের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পায়। পরে এসব ছবি নিয়ে রকি বাংলাদেশে আসার পর অনেক মন্ত্রী-এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদেরকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রী-এমপির সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা বলে বেড়ায়। এরই মধ্যে রকি বড়ুয়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা লোকজনের সাথে সাক্ষাত ও ছবি তোলার সুযোগ করে নেয়। এরপর শুরু হয় তার প্রতারণা।
চরম্বা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসহাব উদ্দিন জানান, এক পর্যায়ে রকি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। চরম্বা ও কলাউজান ভিত্তিক ৪০-৫০ জনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে। পরে এসব সন্ত্রাসীদেরকে দিয়ে এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড সংঘটিত করতো। আর এলাকার মানুষ হয়রানির ভয়ে এসব কিছু নিরবে সহ্য করে।
আওয়ামী লীগ নেতা আসহাব আরো জানান, রকি বড়ুয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে তোলা ছবি দেখিয়ে তাদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা বলে আসছিল। কিন্তু গত ৩১ মার্চ রাতে রকি বড়ুয়ার বাড়িতে জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী ও মাওলানা তারেক মনোয়ারসহ জামায়াত নেতারা এসে সাঈদীর মুক্তির বিষয়ে বৈঠক করার পর তার মুখোশ উন্মোচিত হয়। যুদ্ধাপরাধীর দায়ে সাজাপ্রাপ্ত সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী ও তারেক মনোয়ারের সাথে রকি বড়ুয়ার বৈঠকের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার ঝড় উঠে। এদিকে, গত ৩ মে রকি বড়ুয়া তার সহযোগীদেরকে সাথে নিয়ে চরম্বা ইউনিয়নের নাপার টিলা এলাকায় ওসমান ও মহিউদ্দিনের মালিকানাধীন পুকুর থেকে মাছ লুটে নেয়। মাছ লুটে নেয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ করায় পুকুরের মালিক মহিউদ্দিনের উপর ক্ষিপ্ত হয় রকি বড়ুয়া ও তার সহযোগীরা।
আসহাব উদ্দিন আরো জানান, মাছ লুটের ঘটনায় প্রতিবাদ করায় রকি বড়ুয়া মহিউদ্দিনকে মারার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। ফলে আমি ফোন করে রকিকে জানায়- মহিউদ্দিনকে আমি তোমার কাছে নিয়ে আসবো। এটা নিয়ে রাগারাগির দরকার নেই। প্রয়োজনে মহিউদ্দিন তোমার কাছে ক্ষমা চাইবে। পরে মহিউদ্দিনকে তার কাছে নিচ্ছি শুনে মারধর করার জন্য লোক জমায়েত করে রকি। ফলে আমি মহিউদ্দিনকে তাৎক্ষণিকভাবে তার কাছে নিয়ে যায়নি। রকি বড়ুয়া এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমার ইটভাটায় গিয়ে স্কেভেটর পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে স্কেভেটরের অন্যান্য মালিকদেরকে সাথে নিয়ে আমি ইটভাটায় গিয়ে স্কেভেটর না পোড়ানোর জন্য রকিকে অনুরোধ করি। কিন্তু রকি ও তার লোকজন জামাল কোম্পানি, সাবেক মেম্বার নজির আহমদ ও আমাকে ইটভাটা থেকে জোরপূর্বক সেলিমের দোকানে নিয়ে আসে। এক পর্যায়ে আমাদেরকে মারধর করে ও আটকিয়ে রাখে। দীর্ঘ ৫ ঘন্টা পর লোহাগাড়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাত ৩ টার দিকে আমাদের উদ্ধার করে।
এদিকে, সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী ও তারেক মনোয়ারসহ জামায়াত নেতাদের সাথে বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির জন্য রকি বড়ুয়ার নেতৃত্বে তার সহযোগীরা বিবিরবিলা শান্তি বৌদ্ধ বিহারে ভাংচুর চালায়। পরে বিষয়টি এলাকার লোকজনের ওপর চাপানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু বৌদ্ধ বিহার ভাংচুরের বিষয়ে রকি বড়ুয়ার এক অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর ঘটনার মোড় পাল্টে যায়। তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে চরম্বা তথা পুরো লোহাগাড়ার অনেক মানুষ। তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
চরম্বার চেয়ারম্যান মাস্টার শফিকুর রহমান জানান, রকি বড়ুয়া ভান্তে নয়। মূলত ভারতে যাওয়ার সময় রং কাপড় পড়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু সাজে। বাংলাদেশে আসার পর রং কাপড় ফেলে প্যান্ট-শার্ট পড়ে চাঁদাবাজিতে নেমে পড়ে। এলাকার অনেক ছেলেকে চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। রকি বড়ুয়া একজন প্রতারক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, রকি বড়ুয়ার নির্দিষ্ট কোন পেশা নাই। চাকরি দেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে।
রকি বড়ুয়ার বাবা জয়সেন বড়ুয়া জানান, আমি বিদেশে থাকা অবস্থায় রকি এসএসসি পাস করে। পরে ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হয়েছিল বলে শুনেছিলাম। কিন্তু ভর্তি হয়েছিল কিনা বা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে কিনা তা সঠিক জানি না। পরে ভিক্ষু সেজে ভারতে যায়। সেখানে ৩-৪ বছর থাকার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যায়। ওই সময়ে আমিও দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছিলাম। রকি সেখান থেকে আবার আমেরিকায় চলে যায়। আমেরিকায় এক বছর থাকার পর দেশে ফিরে আসে। এরপর থেকে মাঝে মধ্যে ভারতে যায়। তবে বেশির ভাগ সময় দেশে থাকে। শুনেছি ঢাকায় ব্যবসা করে। তিনি আরো জানান, রকি মূলত ভিক্ষু নয়। বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুবিধার্থে রং কাপড় পড়ে। বিহারে যাওয়ার পর ভান্তের কাছে শ্রমণ হয়ে রং কাপড় রেখে দেয়। এটা নিয়ম আছে। যতবার ইচ্ছা তত বার নেয়া যায়। এতে কোন সমস্যা নাই। ২০১৫ সালে ভারতের ৪ জন মন্ত্রী ও ৩ জন এমপিকে আমাদের এলাকায় এনেছিল।
সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী ও তারেক মনোয়ারের সাথে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের সাথে বৈঠকের ঘটনাটি সত্য। তবে তাদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছে তা আমি জানি না।
জয়সেন বড়ুয়া আরো জানান, নাপার টিলা এলাকায় পুকুরে মাছ ধরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে তাতে রকির কোন দোষ নাই। মাছ ধরার জন্য তাকে সেখানে ডেকে নেয়া হয়েছিল। link

Keywords: , , ,