নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু মোসলমানদের হালচাল ২

ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু মোসলমানদের হালচাল ২

Saturday 18 April 2020, Sumona Choudhury Print

সুকুমার আমার নয়। রবীন্দ্রনাথ আমার নয়। কোন কিছুই আমার নয়। আমার ছোঁয়া পড়লে গঙ্গাজল ছিটিয়ে সব শুদ্ধ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজ জীবনে বন্ধুদের বাড়ি গেলে আলাদা কাপে চা দেওয়া হয়েছে। সেদিন এক বন্ধুর বিভিন্ন রান্নার রেসিপি শুনে যখন তার বাড়ি গিয়ে খাব জানালাম, সে বললে আমি টিফিনে করে তোকে এনে দেব। বাড়িতে মায়ের একটু সমস্যা আছে ছোঁয়া টোয়া নিয়ে। সংখ্যালঘু নর্দমার কীট মুসলমান আমি। আমার এসব শুনে অবাক হওয়া সাজে না। কোন হিন্দু ঘরমালিক আমাকে বাড়ি ভাড়া দেয় না। আমার কাছে জমি বিক্রি করে না। মানুষের মতো দেখতে এমনই এক ভয়ানক ড্রাকুলা আমি।

কয়েকমাস আগে আসামের চরঅঞ্চলের মিঞা কবি, মিঞা জনগোষ্ঠী নিয়ে উতলা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ-বরাকের বাবু বুদ্ধিজীবীরা। তাঁদের দুঃখ আর সমবেদনায়, বিপ্লবী লেখায় ভরে উঠেছিল পাতার পর পাতা। মিঞারাও বাঙালি বলে উত্তেজনার বশে কিছুসংখ্যক মিঞাদের চলো পাল্টাই এর ডাকে জান কবুল অব্দি করে দিয়েছিলেন তাঁরা। অথচ বরাক উপত্যকায় জন্মানো আমি আজীবন দেখে আসছি বরাক উপত্যকায় মুসলমানদের বাঙালি বলা হয় না। ’বাঙ্গাল’ বলা হয়। ’মিঞা’ শব্দের ভেতরে যেমন ঘৃণা, আপমান আর বিদ্বেষ লুকানো আছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়, ’বাঙ্গাল’ শব্দের ভেতরেও ততোটাই ঘৃণা, অস্পৃশ্যভাব, অপমান আর বিদ্বেষ লুকিয়ে থাকে বরাক উপত্যকায়। অথচ আজ অবধিও বরাক উপত্যকার এই বাঙালিত্ব নিয়ে চোখের জল নাকের জল এক করা বাবু-বুদ্ধিজীবীদের বিদ্বেষমোচনের উদ্দেশ্যে, ঘৃণা, অস্পৃশ্যভাব আর বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলা, সেতুবন্ধনের প্রয়াস তো দূর --- এই কথাটুকুও জনমানসে প্রচার করতে দেখি নি, ’বাঙ্গাল’ নয়, মুসলমানরাও বাঙালি। যারা বাংলায় কথা বলে, বাংলার সংস্কৃতি, আচার আচরণ বুকের মাঝে লালন করে, তারা সবাই বাঙালি। এই বাবুদেরই দেখেছি দূর্গাপূজাকে গোটা বাঙালির জাতীয় উৎসবে ফেলে শারদ সংখ্যা বের করতে। অথচ আজ অবধি দায়িত্ব নিয়ে ‘ঈদ সংখ্যা’ বের করতে এদের কারুরই কোন উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায় নি। কারন ঈদ তো বাঙালিদের উৎসব নয়! বাঙ্গালদের উৎসব। লাথখোর, নর্দমার অস্পৃশ্য কীট মুসলমানদের উৎসব। সেখানে বড়জোর ছোঁয়া বাঁচিয়ে সেমাই খেয়ে বা ইফতার পার্টিতে দুটো জিলিপি-খেজুর খেয়ে নিজেদের প্রগতিশীলতা প্রমাণ করা যায়। ব্যস ও-টুকুই।

এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্পে বাঙালি নিধন, বাঙালি নির্যাতন স্লোগানে যাঁরা হিল্লী দিল্লী এক করছেন, পত্রিকার পাতা ভরে ভরে লিখছেন, সেই তাঁদেরকেই দেখি, ডিটেনশন ক্যাম্প জুজুতে আত্মহত্যা করা অমৃত দাস, ফালু দাসের মৃত্যুকে রাষ্ট্রের বাঙালি নিধন হিসেবে চিহ্নিত করতে। এবং হানিফ খানদের মৃত্যুকে মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করে নীরব থাকতে। চারবিবি পনেরোবাচ্চা রাখা বদমাইশ নির্লজ্জ মুসলমান। ভারতবর্ষের বুকে যাদের মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী থাকে না। এদেরই কেউ কেউ সেটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট আইন সমর্থন করেছেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ভেবে যে হিন্দুরা সুরক্ষা পাক, মুসলমানরা চুলোয় যাক। চারদিকের মুসলমান নিধন যজ্ঞে অসাম্প্রায়িক, উদার, মানবতাবাদী বহু মানুষকে দেখেছি দেশভাগের দায় একা মুসলমানের অথবা মুসলমানদের দেশ তো আছেই, এসবের বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি সাজাতে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু বিতাড়নের জন্যে এদেশের সংখ্যালঘু বিতাড়নের যোগ বিয়োগ অঙ্ক কষতে। দেখেছি তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় মুসলমান মৌলবাদের আক্রমনের সামনে পড়ে ভারত ত্যাগ করতে হয়েছিল সেই ঘটনার নিরিখে আজকের সারা ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানকে সফ্টলি জাস্টিফায়েড করতে। একটা কথা আজ এই বয়েস অব্দি এসেও বুঝতে পারিনি, ঠিক কোন যুক্তিতে কিছুসংখ্যক ধর্মান্ধ অশিক্ষিত অমানুষ মুসলমান মৌলবাদীদের কর্মের দায় বৃহত্তর সাধারন মুসলমান মানুষগুলোর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়! সমাজে তো বহু সংখ্যক চোর, খুনী, ডাকাত, ধর্ষকও বাস করে। তাদের কর্মের দায় যদি গোটা সমাজের উপর না পড়ে, তবে কিছু সংখ্যক মুসলমান মৌলবাদীদের কর্মের দায় কেন গোটা মুসলমান সমাজের উপর ন্যস্ত করা হবে? কেনোই বা পাকিস্তান, বাংলাদেশের দোহাই তুলে তাদের রক্তে রাঙিয়ে দেওয়া হবে গোটা ভারতবর্ষটাকে? সংখ্যায় কতখানি বৃহৎ হলে, সংখ্যার গর্বে কতখানি গর্ববতী হলে মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে মেপে তার বুকে ঘৃণার ধারালো নখ গেঁথে দেওয়া যায়, ঘৃণার অযোগ্য আমার মুসলমান মায়ের আজোও আমাকে শেখানো হয়ে উঠেনি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা থেকে শুধু যে ঘৃণাই পেয়েছি, তা নয়। বহুসংখ্যক মানুষ আছেন যাঁরা আমার মতো বদরাগী, অভদ্র, উশৃঙ্খল মানুষের হাতও ভালোবাসায় শক্ত করে আঁকড়ে রেখেছেন। শত ঝড়, তুফানেও ছেড়ে দেননি। কিন্তু এই নতুন ভারতে তাঁরাও দিনকে দিন বড্ড সংখ্যলঘু হয়ে উঠেছেন। প্রচন্ড রকমের সাম্প্রদায়িকতা পোষন করা মানুষের ভীড়ে, কপালে লাল টিকা দিয়ে রামের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে মানুষ খুন করা গুন্ডাদের ভীড়ে, যারা কোনো ধর্মেরই পতাকা বহন করেন না, কোনো ধর্মের মানুষকেই জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে, ঘরছাড়া, দেশছাড়া করার ভাবনা মনে মনে পোষন করেন না, হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টান পরিচয়গুলোকে স্রেফ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই ভাবেন, তারা সবাই প্রচন্ড রকমের সংখ্যালঘু। আমারই মতো সংখ্যালঘু। আমারই মতো তাঁরাও আশঙ্কা আর ভয় নিয়ে কোনপ্রকারে বেঁচে আছেন। তাঁদের কেও বাড়ি থেকে বেরোতে গেলে ’জয় শ্রী রাম’ বলে টিটকিরি শুনতে হয়। তাঁদেরকেও ’কাটার বাচ্চাদের গোলাম’ গালি শুনতে হয়। পাকিস্তানে চলে যাওয়ার হুমকি শুনতে হয়। রাষ্ট্র তাঁদের উপরও মাওবাদী, দেশবিরোধী তকমা দিয়ে সেডিশন চার্জ লাগায়। আদালতে কালো কোট পরা গুন্ডারা "ভারত মাতা কী জয়" স্লোগান দিয়ে আদালত কক্ষে ফেলেই পেটায় তাদের। পুলিশ মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে সেই মারের দৃশ্য উপভোগ করে। মার খেতে খেতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আমরা, বড় ভয়ে, বড় গোপনে একটা অন্ধকার টানেলে আটকে আছি। সুড়ঙ্গের ওপাশের আলো দেখতে পাওয়ার ক্ষীণ আশা বুকে নিয়ে। আদৌ জানি না সেই আলো দেখার আগে ঠিক কতটা লাশের উপত্যকা পেরোতে হবে!

"শুধু ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে রক্ত।

এক মূহূর্তের রক্ত

অন্য মূহূর্তের গায়ে ঝরে পড়ে।

চশমা পরিস্কার করে আমি ইতিহাস পড়ি।

ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ে

বিছানার ওপর

রক্ত ঝরে পড়ে সমস্ত জীবন বেয়ে।"

আমি মানে সুমনা, আমি তো এরকম হতে চাই নি। আর দশটা সাধারন মানুষের মতো আমিও ভালো থাকতে চেয়েছিলাম, আনন্দ, স্বাধীনতা, সন্মান, সুরক্ষা সব নিয়ে। নিজের মতো। বই পড়ে, গান শুনে, হৈ হৈ করে। প্রতিবাদ টতিবাদ এসব তো শখ করে কেউ করে না, না। নির্ভেজাল জীবন চায়। আমিও চেয়েছিলাম। সমাজ, রাষ্ট্র, সহনাগরিকেরা আমাকে আমার মতো থাকতে দেয় নি। আমাকে মুসলমান নাম দিয়ে আমার জীবন থেকে সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ঘৃণা করা হয়েছে। আশঙ্কায় আশঙ্কায় সকাল থেকে দুপুর নেমেছে আমার। দুপুর থেকে রাত। ঘৃণার বদলে ভালোবাসার কথা বললে জন্মপরিচয় তুলে গালি উপহার পেয়েছি। দয়া করে থাকতে দেওয়ার নামে অভুক্ত রাস্তার কুকুরের সামনে রুটি ছুঁড়ে দেয় কেউ যেমন, সেরকমভাবে জীবন ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে আমার সামনে। আমার ভালোবাসার নাম দেওয়া হয়েছে লাভজেহাদ। ভালোবাসায় পাহারা দেওয়ার জন্যে রাষ্ট্রীয় মদতে বানানো হয়েছে ’এন্টি রোমিও স্কোয়াড’। সংবিধানের কথা বললে শুনতে হয়েছে সংবিধান বদলে দেওয়ার নিদান। স্বাধীনতার কথা বললে রাষ্ট্র আখ্যা দিয়েছে সন্ত্রাসবাদী। যন্ত্রনার কথা বললে বুদ্ধিজীবী মহল মৌলবাদীর শিরোপা দিয়েছে। খাওয়ার নামে, পরার নামে আমারই মতো অনেককে গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। ভিডিও ভাইরাল করে উল্লাস প্রকাশ করা হয়েছে সেই হত্যার। হত্যাকারীদের ব্যাঙ্ক একাউন্টে দুহাত ভরে টাকা পাঠিয়েছে আমারই সহনাগরিকদের অনেকে। সমর্থন করেছে বিধর্মীদের পিটিয়ে খুন করাকে। এহেন হত্যা, উল্লাস, সমর্থন দেখে সেদিন যত না খারাপ লেগেছিলো তার চেয়েও বেশী আশ্চর্য হয়েছিলাম, আশঙ্কিত হয়েছিলাম। এখন আর কোনকিছুতেই আশ্চর্য হই না। আশঙ্কিত হই না। আমার অনুভূতি কি মরে যাচ্ছে! আমি মরে যাচ্ছি কি?

সেদিন স্কুলে বসে বাচ্চাগুলোর মুখ দেখে কেঁদে ফেলেছিলাম। বড়দের ঘৃণার বিষ আমার এই ছেলেমেয়েগুলোরও শৈশব হয়তো কেড়ে নেবে। আপনজনদের কেড়ে নেবে। হয়তো মেরেও দেবে। আগুনে পুড়িয়ে দেবে ঘর। কেউ কেউ হয়তো বেঁচে থাকবে বড়দের ঘৃণা আর হিংসার পৃথিবীতে। যেখানে প্রতি মূহূর্তে সংখ্যালঘু হওয়ার যন্ত্রনা, অপমান, আশঙ্কা নিয়ে কেঁচোর মতো কুঁকড়ে জীবন কাটাতে হবে! বাচ্চাগুলো সেদিন ক্লাসে সমস্ত সারল্য আর অভিমান মিশিয়ে যত বলছিলো ’মিস কি হয়েছে, আমরা কিছু করেছি’, ততো কান্না দুমড়ে দুমড়ে উঠছিলো। ওই অবোধ শিশুগুলোকে কি করে বুঝাতাম তাদের মিস আসলে হেরে গেছে। ঘৃণার কাছে হেরে গেছে। তাদেরকে একটা সুরক্ষিত, সুন্দর আগামী দেওয়ার কোন ক্ষমতাই তার নেই। বহরমপুরের এক বন্ধু কাল মেসেজে বলছিলো তার আত্মহত্যা চিন্তা প্রকট হচ্ছে। এইসমস্ত কিছু সহ্য করতে পারছে না। অসহায় লাগছে। আমার সান্ত্বনা তাকে বোঝাচ্ছে তুমি তো মানুষ। ঘৃণার কাছে হেরে যেয়ো না। দুঃখিত হয়ো না। তুমি তো মানুষ! আর বাস্তবতা চোখের সামনে রক্ত ঢালছে। বাল্টি বাল্টি রক্ত। ছিটকে পড়া রক্ত। ভাত খেতে বসলে রক্তের গন্ধ নাকে লাগে। বমি পায়। মুখে হাত চেপে বেসিনের কল খুলে দেই।

গত কয়েকদিন ধরে সমস্ত দেশ জুড়ে মানুষের হাহাকার ছাড়া আর কিচ্ছু শুনিনি। গতকাল দেখলাম একটা পাঁচ - ছ বছরের বাচ্চা বাবার লাশের পাশে বসে কাঁদছে। দিল্লীতে। ঘৃণা ওর বাবাকে কেঁড়ে নিয়েছে। ঘৃণা ওর শৈশব নিয়ে গেছে। বাচ্চাটার কান্নার দৃশ্য সারারাত ঘুমোতে দেয় নি আমায়। আজ সারাদিন বাড়ির বাইরে বেরোই নি। যদি বাচ্চাটা এসে পা জড়িয়ে ধরে! আমি কি করবো? একজন অনুভূতিহীন মৃত মানুষ কি করতে পারে? দিনদিন কেমন যেন পশু হয়ে উঠছি। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা চামড়া খসা কুকুরটির মতো। আমার চলাফেরাও কেমন যেন সন্দেহজনক হয়ে উঠছে।

এখানেই শেষ করবো ভাবছি। আসলে শেষ তো নেই। দেশ, অঞ্চলভেদে এই যন্ত্রনাগুলোর, অপমানগুলোর, ভয়গুলোর শেষ তো নেই, না! তাই শেষটা কেমন হতে পারে সেটা ভাবতে ভাবতেই কথাগুলো বলছি। ’আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো’ বলে সম্প্রীতির মেলবন্ধনে সুখী সুখী আবেশে শেষ করাই হয়তো সুখের ছিল। কিন্তু কথা আমার ফুরোচ্ছে ঠিক ই, নটে গাছটি তো মুড়োয় নি। সে দিব্যি সার-জল পেয়ে তরতর করে শাখা প্রশাখা মেলে ধরছে। শুনলাম কলকাতাতেও নাকি ’গুলি মার’ স্লোগান দিয়ে বিশাল মিছিল হয়েছে। সেই মিছিলে কারা ছিলেন? এই সমাজেরই লোকজন। কতটা হিংস্র হলে মানুষ তার পাশের মানুষটিকেই গুলি করে উড়িয়ে দেওয়া স্লোগান নির্দ্বিধায় আওড়াতে পারে! আরো শুনলাম আমার উপত্যকার ই ধর্মে হিন্দু একটা ছেলে ফেসবুকে দিল্লী দাঙ্গার প্রতিবাদে, সেই দাঙ্গায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক নীরবতাকে দায়ী করে কিছু একটা লিখেছিল। তার ফলস্বরূপ সে এখন জেলে। শুধু জেলেই শেষ নয়, শখানেকের হিন্দু ধর্মের স্বঘোষিত ধ্বজ্জ্বাধারী একদল তার বাড়িতে তাকে "সহী হিন্দু ধর্মে"র পাঠ পড়িয়েও এসেছে। এই যে নব্বই-একশো জন মানুষ, তারা কারা? আমাদের ই পড়শী। আমাদেরই পরিজন। রোজ স্কুল যেতে আসতে, বাজার হাটে বেরোলে যে হিংস্র কথাবার্তাগুলো শুনি, "ওদের বহুত বাড় বেড়েছে" বলা ঘৃণায় মুখ বাঁকানো মুখগুলো দেখি, সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণা উচ্চারনের প্রোফাইলগুলো দেখি, সংখ্যার নিরিখে তারাই ভারতবর্ষে সংখ্যাগরিষ্ট। তাই সম্প্রীতি নেই। কোনদিন ছিল না। চুড়ান্ত উদারতা প্রকাশ করা সত্ত্বাগুলোর ভিতরেও চোরা সাম্প্রদায়িকতা বিরাজমান ছিল, আছে এবং থাকবেও। তাই, আপনারা যারা এই লেখা পড়ছেন, যারা ফোন করে, সামনাসামনি দেখা করে অথবা ইনবক্সে জানাচ্ছেন এই কথাগুলো না বলতে, আপনাদের কষ্ট হচ্ছে! অথবা যারা সম্প্রীতির ঘটনার উদাহরন পাঠাচ্ছেন, বলছেন সম্প্রীতিতে শেষ হোক সব, তাদের কষ্ট দেওয়ার অপরাধভোগে ভুগতে থাকা এক না-মানুষ মুসলমান, পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ভয়ানক একা হয়ে যাওয়া একজন ঊনমানুষ মুসলমান অত্যন্ত লজ্জার সাথে জানিয়ে যাচ্ছে আপনাদের সুখী গল্প উপহার দেওয়ার কোন সামর্থ তার নাই। তাই দুঃখিত। সুখী গৃহকোনে অবস্থানরত নিরাপদ ’মানুষ’। আমি আপনাদের ব্যাথায় খুবই ব্যথিত। ক্ষমা করে দেবেন।

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্লস হোস্টেলে যেদিন রাতে একটা বিশেষ দলের কিছু গুন্ডা দ্বারা ছাত্রছাত্রী, শিক্ষিকাদের উপর বীভৎস আক্রমন চালানো হল, ঐশী ঘোষদের মাথা ফাটানো হল, তারপরদিন একটা ভিডিও এসেছিল। ’হিন্দু সুরক্ষা দল’ বলে কোন একটা সংগঠনের। ভিডিওটিতে মাথায় লাল টিকা দেওয়া লোকটা জেএনইউ কান্ডের দায় স্বীকার করে সরাসরি হুমকি দিচ্ছিল আরো এরকম আক্রমণ চালানোর। এনডিটিভি সহ সমস্ত টিভি চ্যানেলেই ভিডিওটা দেখানো হয়েছিলো। সেদিনই কেউ একজন কোন একটা ’প্রতিবাদী’ হোয়াট্স অ্যাপ গ্রুপে ভিডিওটি সহ খবরের লিংক দেয়। এক না-মানুষ আমি ওই গ্রুপেই দোষের মধ্যে লিখে ফেলেছিলাম "এটাকে কেন হিন্দু টেরর বলা যাবে না? ইসলামিক টেরর আর হিন্দু টেরর ভাই ভাই, এবারে অন্তত মেনে নিন"। ব্যস। এডমিন মহোদয় রে রে করে তেড়ে এলেন। "এরকম উস্কানিমূলক কথাবার্তা গ্রুপে বলা যাবে না। মন্তব্যটা যেন এখনই মুছে দেই। গ্রুপের উপর ভিজিলেন্সের নজর আছে।" অশিক্ষিত, লাথখোর মুসলমান আমি। কি উস্কানিমূলক কথা ছিল ওই মন্তব্যে আজও বুঝতে পারিনি! একটা স্পেসিফিক ধর্মের নাম উল্লেখ করে, স্লোগান দিয়ে সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে, হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কমবয়েসী ছাত্র-ছাত্রীগুলোর উপর সমস্ত রকমের আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে, দেশ জ্বালানো হচ্ছে দাউ দাউ করে, বিরোধীদের খুনের প্ল্যান করা হচ্ছে, সংখ্যালঘু মুসলমানদের গণপিটুনি দিয়ে মারা হচ্ছে, তারপর সেইসব কিছুকে ধর্ম রক্ষার্থে খুন বা মার হিসাবে জাস্টিফাই করা হচ্ছে! সেটাকে ’টেরর’ বলে সমালোচনা করা যাবে না। বললে সেটা উস্কানো। শুধু পাশের দেশের ইসলামিক মৌলবাদীদের কার্যকলাপকে সন্ত্রাস, টেরর আখ্যা দিয়ে সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে আলোচনা, সমালোচনা, প্রতিবাদের নাম "উদার প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতা"। তাতে ভিজিলেন্সের ডর ভয় থাকে না। এটা সেদিন ই হাতেকলমে শিখিয়ে দিলেন ওই গ্রুপের ’লড়াকু’ এডমিন সহ অন্যান্য রা।

কুড়ি বছর ধরে কঠিন অসুখ লুকিয়ে রাখা আমাদের না-মানুষ মুসলমান মা উদয়অস্ত খেটে সারাজীবন শুধু এটাই চেয়েছেন আমরা যেন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হই। নামী মানুষ হই। আমি কোনদিনই নাম চাই নি, প্রতিষ্ঠিত হতে চাইনি। শুধু মানুষ হতে চেয়েছি। মাথা না নুয়ানো মানুষ। ঠিক কে ঠিক আর ভুল কে ভুল স্পষ্টভাবে উচ্চারন করা মানুষ। জীবনের সমস্ত সারেগামা পেরিয়ে যে দিদির কাছে দুঘন্টা শুধু বসে থাকতে ইচ্ছে হয়, তিনিও চান আমি যেন নামী লেখক হই। সবাইকে সাথে নিয়ে চলা শিখি। ঝগড়া হাঙ্গামা না করি। কথাকে সুন্দর রঙিন মোড়কে মুড়িয়ে পরিবেশন করি। মায়ের মতো তাঁকেও আমি বুঝিয়ে উঠতে পারি না, নাম চাই নি। নাম চাইনা কখনো। লেখক নয়, যন্ত্রনাগুলোর, পাশের মানুষের ছুঁড়ে দেওয়া বিশ্বাঘাতকতা আর ঘৃণাগুলোর ধারাভাষ্যকার হতে চাই। পাথরের দেশে আয়না হাতে চলা মানুষ আমি। জানি ক্ষতবিক্ষত হব বারে বারে। বাজে, ঝগড়ুটে আখ্যায় আখ্যায়িত হবো। শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। আঘাতে আঘাতে ভেঙ্গে পড়বো। তবু সেই ভেঙ্গে পড়া থেকে আবার নতুন উদ্যমে গড়ে উঠার নাম আমি রেখেছি "মানুষ"।

এই যে সমস্ত কিছু, যা কিছু বললাম, যা কিছু বলা এখনো বাকী রয়ে গেল, এই সমস্ত কিছুর জন্যে দায়ী কাদের করে যাওয়া যায়? রোহিত ভেমুলা মৃত্যুর আগে লিখে গিয়েছিল "My Birth is My Fatal Accident"। আমারও কি তাই বলা উচিৎ! নাকি এই সমস্তকিছুর পাশাপাশি, আমার সংখ্যালঘু জন্মের পাশাপাশি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে যাওয়াটা উচিৎ তাদেরও যারা শুধুমাত্র সংঘ পরিবার, ধর্মীয় রাজনীতি, ফ্যাসীবাদের উপর সমস্ত দায় চাপিয়ে নিরাপদ দুরত্বে অবস্থান করেছেন সারাজীবন। কোনদিন যারা অন্যায়কে অন্যায় বলে স্পষ্ট উচ্চারন করেননি। রাজনীতি আর নাম যশের সুবিধার্তে, সুখী গৃহকোন আর চাকরি বাঁচানোর ধান্ধা নিয়ে বেঁচে থেকেছেন। এখনো বেঁচে আছেন। ভেতরের চোরা সাম্প্রদায়িকতা আর নারীবিদ্বেষীতা নিয়ে। সিস্টেম তো এই মানুষগুলোকে নিয়েই। এরকম আরো বহু বহু মানুষকে নিয়ে। নরম হিন্দুত্ববাদ আর চরম হিন্দুত্ববাদ এই দুই তত্ত্বের মাঝামাঝি অবস্থান নিয়ে তারাই আজকের এই দিন ডেকে এনেছেন। হাঁটুর বয়েসী ছেলেমেয়েগুলো জানোয়ারের মতো মার খাচ্ছে, সেডিশন চার্জে জেলে যাচ্ছে, উজ্জ্ল ভবিষৎ নষ্ট করে মানুষের জন্যে, মানুষের হয়ে রাস্তায় নামছে, তারপর ও যারা পলিটিক্যাল কারেক্টনেস বজায় রাখছে, যারা এইসবের বিরুদ্ধে বললে ’উস্কানোর’ তকমা আর ভিজিলেন্সের ভয় দেখাচ্ছে, আমি তাদের মনুষ্যত্বই স্বীকার করি না! তাই হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপের ’উদার’, ’প্রগতিশীল’ এডমিন মহোদয়কে সেদিন যা বলেছিলাম তা নিয়ে কোনো অনুশোচনাই নেই আমার। বেশ করেছিলাম। আরো বলবো। মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্নবানে বিক্ষিপ্ত করবো এই চরিত্রের প্রত্যেকটা মানুষকে। যতদিন ঐশীদের দেখবো, যতদিন জামিয়ার কথা মনে হবে, যতোদিন আলিগড়, দিল্লী, গুজরাট, গোধরা, অযোধ্যা, শাহীনবাগের কথা মনে হবে, ততোদিন বলবো। যতদিন মুসলমানদের ঘৃণ্য জীব হিসেবে এদেশে ভাবা হবে, ততোদিন বলে যাব। ক্লান্তিহীন মুখে রক্ত তুলে বলে যাব। বলেই যাব।

সবশেষে, এতকিছুর পর যারা এখনো চুপ করে আছে, এখনো স্বাভাবিক হয়ে আছে, এখনো মানুষের নৃশংস মৃত্যুকে ’মুসলমান মরছে’ নামে অভিহত করছে, আমি তাদেরকেও ঘৃণা জানিয়ে গেলাম। জামিয়ার চোখ অন্ধ করে দেওয়া ছেলেটার জন্যে, শাহীনবাগের বৃদ্ধ দাদীদের হাঁটুতে রাষ্ট্রের দেওয়া কালশিটে ক্ষতচিহ্নের জন্যে, নাজিবের জন্যে, রোহিতের জন্যে, দিল্লীর প্রগ্রোমে খুন হওয়া অতোগুলো মানুষের জন্যে, ছেলেমেয়ে গুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহী চিহ্নিত করে কারাগারের অন্ধকারে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে, যে ভাই, যে বোন এখনো পথে নামতে ভয় পায়, আমি তাদের জন্যে অনন্ত ঘৃণা রেখে গেলাম। এই জল্লাদের তান্ডবের মাঝে মানুষকে দেশহীন করে দেওয়ার চক্রান্ত দেখেও, যারা এখনো নিজেদের নিরাপদ অবস্থান বজায় রাখছে, আমি তাদের ’সুখী জীবনে’র প্রতি অপরিসীম করুণা রেখে গেলাম। সারা দেশে জেনোসাইড, সন্ত্রাস, নিপীড়ন, মানুষ খুন দেখেও যে ছেলে বা মেয়েটি সোস্যাল মিডিয়ায় ছবি কবিতা ফুল শাড়ী ভালোবাসায় মত্ত, তাদের প্রতি আমার অপরিসীম ক্রোধ রেখে গেলাম।

সংখ্যালঘু নর্দমার কীট মুসলমান আমি। আপনাদের লাথির আগায় যার জন্ম এবং ইচ্ছের উপর নির্ভর করে যার মৃত্যু। অপরিসীম ক্রোধ ছাড়া এইমূহূর্তে আপনাদের দেওয়ার মতো আর কিছুই আমার নেই।

ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু মোসলমানদের হালচাল ১

Keywords: , , ,