নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু মোসলমানদের হালচাল ১

ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু মোসলমানদের হালচাল ১

Saturday 18 April 2020, Sumona Choudhury Print

খুব শীঘ্রই হয়তো সারাদেশে সংখ্যালঘু, আরো স্পেসিফিক করে বললে মুসলমান নিধন শুরু হবে। আমার রাজ্য, আমার জেলাতেও। আমার পরিবার, আমাকেও হয়তো খুন করা হবে, বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হবে। হয়তো চোখের সামনে সারা শরীরে রক্ত নিয়ে নিথর দেহে পড়ে থাকবে আমার মা। অথবা মায়ের সামনে আমি। হয়তো দেশছেড়ে রক্তাক্ত শরীরে অন্য কোন দেশের সেনার রাইফেলের সামনে দাঁড়াতে হবে। ভারতবর্ষে আমার জীবনের নিরাপত্তা নেই। নিজেও জানি না ঠিক কতদিন, কত ঘন্টা বেঁচে থাকবো। তাই কথাগুলো এখানে থাক। পড়তেই হবে এরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যদি কখনো মরে যাই, আপনাদের অবসরের ফাঁকে, গান-ইন্টেলেকচুয়াল আড্ডা-সাহিত্যের মাঝে একবার এই কথাগুলোও দেখে নেবেন নাহয় । মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষের এক না-মানুষ মুসলমানের বয়ান, যার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী থাকে না। আপনারাও ছিলেন না।

তিয়াষ দি, Zobaen দা নারীদিবসের লেখা চেয়েছিলেন। এখানেই বলে রাখি, আমি আর লিখতে পারি না। আমার চারপাশের ভয়ার্ত, শঙ্কিত মুখগুলো দেখে নারীদিবসের কথা, নারীর কথা আলাদাভাবে আর লিখতে পারি না। চারপাশে এত রক্ত। মানুষের রক্ত। রাতে ঘুমাতে পারি না। লোডশেডিং এ ভয় পাই। রাস্তায় বেশী মানুষের কথা একসাথে শুনলে আলো নিভিয়ে ঘরে কুঁকড়ে বসে থাকি। সারাদিন টিভি নিউজের সামনে উৎকন্ঠা নিয়ে বসে থাকা আমার অসুস্থ মা, আমাদের বাড়ি না ফেরা অব্দি আশঙ্কা ভয় নিয়ে মিনিটে কুড়িবার ফোন করা আমার মা, তাঁর মুখের চিন্তার ভাঁজগুলো দেখতে দেখতে, চোখের অসহায়ত্ব মাপতে মাপতে, আমার আর কোন লেখা আসে না। ২০২০ এর ভারতের ঊনমানুষ মুসলমান আমি। যদি মানুষ হিসেবে মানুষের মতো এদেশে বেঁচে থাকতে পারি, সেদিন নাহয় নারীদিবস নিয়ে লিখবো। আপাতত আমার কোন দিবস নেই

(১)

আমি সুমনা। পুরো নাম সুমনা রহমান চৌধূরী। জন্মসুত্রে মুসলমান। পরিবেশ সুত্রে মুসলমান সমাজে বেড়ে উঠা। ভারতেই জন্মাবো, মুসলমান ঘরেই জন্মাবো, করিমগঞ্জেই জন্মাবো, এসব আমি ঠিক করিনি বা এতে কোন হাত ছিল না আমার। তাই এইসব পরিচয়কে স্রেফ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট হিসেবেই বয়ে চলি। অথবা চলতাম। আলাদা করে গর্ব বা বিদ্বেষ কোনোটাই অনুভব হয় নি কখনো। ভারতবর্ষে মুসলমান হয়ে জন্মানোর অসুবিধা এটাই যে তাকে কখনো ভুলতে দেওয়া হয় না সে মুসলমান। আমাকেও ভুলতে দেওয়া হয়নি। সে আমি যতোই নাস্তিক কিংবা অসাম্প্রদায়িক হই না কেন।

এই সাড়ে ত্রিশ বছরের জীবনে বারে বারে আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে তুই শালা মুসলমান। নর্দমার কীট মুসলমান। লাথখোর মুসলমান। উগ্র ধার্মিকদের পাশাপাশি উদার মানবতাবাদী সাম্যবাদী মুক্তমনারাও আমাকে ঠারে ঠারে বুঝিয়েছে তুই আসলে মুসলমান ই। রক্ত দিয়ে মুখের ভাষা রক্ষা করা উপত্যকার মেয়ে আমি। বরাক উপত্যকার। ছোটবেলা আমাদের ঘরে ইনভার্টার ছিল না। দুই রুম আর একফালি রান্নাঘরের সামনে একটা ছোট বারান্দা নিয়ে ছিল আমাদের স্বর্গ। সন্ধ্যেবেলা লোডশেডিং হলে বারান্দায় মাদুর পাতিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসতাম আমরা। বেশীরভাগ সময়ই বাপি বাড়ি থাকতেন না। পার্টির কাজে ওমুক গ্রাম তমুক গ্রামে দৌড়াদৌড়ি করতেন। আমরা পড়াশুনা শেষে ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনি বাড়ি ফিরতেন। মা জেগে থাকতেন তার ফেরার অপেক্ষা নিয়ে। কোনদিন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি থাকলে বাপি আমাদের নানা গল্প শোনাতেন। রুশ দেশের গল্প। ভাষার লড়াইয়ের গল্প। হ্যারিকেনের আলো-অন্ধকারের মিশিয়ে অদ্ভুত এক মায়াবী আলো পড়তো তার মুখে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতো মায়ের রান্নার ঝাঁঝ-গন্ধ। অদ্ভুত মায়াময় সেই পরিবেশে বাপি বলে চলেছেন "জান দিমু, তবু জবান দিমু না" এই স্লোগানে হাঁটা মানুষের উপর পুলিশের লাঠি নিয়ে উন্মত্ততার কথা। বাপি তখন কিশোর। ভয়, শঙ্কায় তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরতাম আমরা। আমরা চারবোন।

আমাদের কেউ আরবি শেখায়নি। উর্দু শেখায়নি। ফার্সিও শেখায়নি। রান্নাঘরে রান্না করতে করতে সন্ধ্যেবেলা মা আমাদের বর্ণপরিচয় পড়াতেন। অ এ অজগর বলতে বলতে মা ডাল ফোঁড়ন দিতে উঠতেন। সেই ডাল ফোঁড়নের ঝাঁঝের মাঝে খুব যত্নে আমাদের বুকে ডানা মেলতো বাংলা ভাষা। রাতে ঘুম না এলে ঠাকুমার ঝুলির গল্প শোনাতেন মা। কোনদিন পাগলা দাশু। শুনতে শুনতে কখনো হাসি, কখনো দুঃখের মাঝে রাজ্যের ঘুম নামত আমার চোখে। স্বপ্ন জুড়ে মায়াময় আলো ছড়াত বাংলা ভাষা। আজন্ম জানতাম মায়ের শাড়ির হলুদ, মশলা, কেও কার্পিন তেলের গন্ধের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জুড়িয়ে আছে যে গন্ধ, ওটাই আমার জবান। আমার আনন্দ, হাসি, চিৎকার, প্রতিবাদের ভাষা। বাংলা ভাষা।

বড় হতে হতে জানতে পারলাম মুসলমানের ভাষা নাকি বাংলা হতে পারে না। বাঙালির সংজ্ঞাতে মুসলমান নামক শ্রেণীটি আসে না। চোখের সামনে আমার সমস্ত শৈশব খুন হয়ে গেল। চিরন্তন বাঙালি যে নারীটিকে আমি মা সম্বোধন করি, জীবনানন্দ, জসিমউদ্দিনের কবিতা পড়তে পড়তে যে গ্রাম্য বধূর ছবি মায়ের মতো করে আঁকতাম মনে মনে, এক লহমায় তিনি হয়ে উঠলেন ’মুসলমান’। মুসলমানের মেয়ে এত ভালো বাংলা লেখে কিভাবে সে নিয়ে সন্দেহ এবং আশ্চর্যবোধ করলেন ভাষার উত্তরাধিকারীরা। তার ও অনেক পরে বেশ ভালোভাবেই আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হল উনিশে মে’র শহিদরা যেহেতু হিন্দু, তাই উনিশ নিয়ে মুসলমানের বড়াই করা চলে না। তা শোভন নয়। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে একজন ভাষাহীন মানুষ হয়ে ওঠা সেই থেকে শুরু।

সংখ্যালঘুদের বোধহয় না চাইতেও অনেককিছু জেনে যেতে হয়। ক্লাস ফোরের প্রাণের বন্ধু চৈতালি। আমারই মতো উশৃঙ্খল, ডাকাবুকো। আমারই মতো যার নামতা মুখস্ত হত না। ভালো লাগা মন্দ লাগা দুজনেরই হুবহু একই রকম। একদিন জানতে পারলাম আমি আর চৈতালী নাকি ভীষনরকম আলাদা। আমরা পানি বলি আর চৈতালীরা জল। আমরা মা কে আম্মা বলি, চৈতালিরা মা। আমাদের ঈদ, চৈতালীদের দূর্গাপূজো। আমাদের নামাজ, চৈতালীদের পূজা। আমরা মৃত্যুর পর কবরে যাই, চৈতালীরা কাঠের আগুনে। আমাদের ছোঁয়া চৈতালীদের পাপ। চৈতালীদের ঠাকুরঘরে আমাদের যেতে নেই। আমাদের ঘরের জল চৈতালীদের খেতে নেই। চৈতালিরা গরুকে পূজো করে, অতএব গরু খেলেও সামনে বলা যাবেনা। সেদিন প্রচুর মনখারাপ করে বাড়ি ফিরেছিলাম। হয়তো চৈতালিও ফিরেছিল। পরদিন বেঞ্চে পাশাপাশি বসে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলাম তাকে। খুঁজতে চাইছিলাম অনুপস্থিত সব অসাদৃশ্য। সেও কি খুঁজছিলো আমার মাঝে ওরকম? জানি না। ধর্ম দুজনার মাঝে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছিল। আমরা ক্রমশ পাপী হয়ে উঠছিলাম একে অন্যের কাছে। এই অসাদৃশ্য নিয়েই টিফিনের সময় খেলতে যেতাম আমরা। আমাদের চারপাশে তখন স্বর্গ নেমে আসত। জন লেননের স্বর্গ।

বড় ক্লাসে উঠতে উঠতে হিন্দু-মুসলমান পার্থক্যটা বেশ ভালো করেই বুঝে গেছিলাম। বাইরে কথা বলার সময় খুব সচেতনভাবেই খেয়াল রাখতাম আব্বা, চাচা, খালা, নানী, দাদি, পানী, গোসল এসব মুসলমানী শব্দ যাতে মুখ থেকে না বেরোয়। হয়তো সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়ার তাড়না থেকেই! হয়তো বা বন্ধুমহলে ’অপর’ হয়ে ওঠার ভয়ে! ক্লাস নাইনে পড়ি তখন। প্রাইভেট স্যারের বাড়ি। এক বন্ধু কথা প্রসঙ্গে বললো তার বাবা হজ্ব করতে যাচ্ছেন। পাশের বন্ধুটি বললো মক্কার কালো ঘরে নাকি শিবমূর্তি আছে আর মুসলমানরা সেই মূর্তিতে পাথর ছুঁড়ার পরই নাকি তাদের হজ্ব সমাপ্ত হয়। বই পড়া, বই কেনা, ছবি আঁকা, মায়ের হাত ধরে নাটক দেখতে যাওয়া ঘর আমার। ধর্ম সেখানে অনুচ্চারিত। নিজের রাজ্যতেই কি কি আছে সেটাই জানা হয়নি ততদিনে, মক্কার কালো ঘরের (ক্বাবা ঘর) রহস্য কি করে জানবো! বন্ধুর কথার উত্তর দিতে পারিনি সেদিন। একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম।

ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা দিতে কলেজে ভারতীয় ক্রিকেটারদের নাম, রান রেট সব মুখস্থ করতে হত। তাও বারবার প্রশ্নচিহ্নে জর্জরিত হত আমার দেশপ্রেম। মুসলমান প্লেয়াররা খারাপ খেললে অদ্ভুতভাবে তার উত্তর আমাকে জিজ্ঞেস করা হত। পাকিস্তান হারলে বন্ধুরা খিল্লির তোড়ে শুনিয়ে যেত "দ্যাখ তোর দেশ হেরেছে"। সদ্য কলেজে উঠা আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না পাকিস্তান কি করে আমার দেশ হয়! রাজ্যের মনখারাপ আর রাগ নিয়ে ঘরে এসে মা’কে জিজ্ঞেস করলে মা বলতেন, "ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শিখো। ভালোবাসা ছড়াও। দেখবে ওরা হেরে যাবে।" সাড়ে ত্রিশ বছর বয়স অব্দি সেটাই করে গেছি। শুধু আজ আমার অসুস্থ মা’কে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, তুমি মিথ্যে বলেছিলে মা। সবসময় মিথ্যে বলেছিলে। যুগে যুগে ঘৃণার ই জয়জয়কার হয়। ৯২ সালে হয়েছে। ২০০২ এ হয়েছে। আজ ২০২০ এও হচ্ছে।

সালটা ২০০২। স্কুলে প্রথমবার শাড়ি পরে সরস্বতী পূজোতে গেছি বন্ধুদের সাথে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে লক্ষ্য করলাম আমায় প্রসাদের ফলমূল কাটতে বা ছুঁতে দেওয়া হচ্ছে না। একবার ভুলক্রমে ফল কাটতে বসে গেছিলাম বলে বড় ক্লাসের দিদিরা একযোগে আৎকে উঠেছিল, আমি নাকি সব প্রসাদ নষ্ট করে ফেলেছি..! প্রথমে বুঝতে পারি নি, তারপর সবার সামনে নিজেকে প্রচন্ড ছোট লেগেছিল ! সরস্বতী ঠাকুর যে ঘরে রাখা হত তার সামনে আমার বন্ধুরা আল্পনা এঁকে রাখত, অনেক রঙের আবির দিয়ে, কিন্তু আমায় আঁকতে দিত না! বন্ধু মৌপ্রিয়াকে কারন জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলো, "তুই তো মুসলমান, তাই !" অবাক হয়ে জিঞ্জেস করেছিলাম, মুসলমান হলে ছোঁয়া যায় না ঠাকুরের জিনিষ? বন্ধুটা উত্তর দিয়েছিল "পাপ হয়, ঠাকুর রাগ করলে পরীক্ষায় ফেল করবি!" সেই থেকে সারা স্কুলজীবন বন্ধুদের চাপে পড়ে পূজোতে গেলেও, অদ্ভুত এক পাপের ভয়ে ঠাকুরের মূর্তি, ঠাকুরের প্রসাদ কাটার পাশ থেকে শতহাত দূরে দূরে থাকতাম ! যেতাম, বেঞ্চিতে বসে খিচুড়ী খেতাম তারপর বন্ধুদের সাথে বাড়ী ফিরে আসতাম। বড় ক্লাসে উঠার পর আমার সেই স্বতঃস্ফুর্ততা হারিয়ে গেছিল। কেমন যেন হীনমন্যতায় ভুগতাম! কবছর আগে সরস্বতী পূজার দিন সোস্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনাটা লিখেছিলাম। পশ্চিমবঙ্গীয় অনেক সমমনা উদার বন্ধুরা এসে বলে গেলেন তাদের স্কুলে নাকি এরকম হতোই না। তারা সবাই একপাতে খেতেন। তাঁদেরকে বুঝাতেই পারিনি যে অঞ্চলভেদে, রাজ্যভেদে একই উৎসবের অভিজ্ঞতা কতটুকু নিষ্ঠুর হয়! যেন তাদের সাথে হয়নি মানে আমার বা আমার মতো আরো অনেকের সাথে ঘটে চলা এই ঘটনা কিছুই নয়! আসলে প্রিভিলেজ শ্রেণীর কখনোই সংখ্যালঘু, আইডেন্টিটি যন্ত্রনা, অনুভূতি বোঝার কথা নয়। হয়তো তাঁরা সহানুভূতিশীল হতে পারেন বই পড়ে, রাজনৈতিক বোধ থেকে। তাঁরা হয়তো ধর্মহীনও হতে পারেন ব্যক্তিজীবনে। কিন্তু পরিবেশগত ভাবে তাঁরা সেই বৃহত্তর সংখ্যাগুরু সেকশনের ই অংশ। মুসলমান হয়ে জন্মানোর যে যন্ত্রনা, প্রতিনিয়ত যে প্রসেসের ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়, যে লজ্জা, ভয়, আশঙ্কা, অপমানে তাকে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকতে হয়, সেটা তাঁদের অবস্থান থেকে কোনভাবেই অনুভব করা সম্ভব নয়।

সারাটা জীবন আমাকে বন্ধু, পরিচিতদের কাছে শুনে যেতে হয়েছে, ’ঈশ! তুই একদম মুসলমানদের মতো না, আমাদের মতো!’ প্রশ্ন করেছিলাম, মুসলমানদের মতো না মানে? ওরা কি আলাদা গ্রহের প্রাণী? পিঠে কি একটা ডানা থাকে? উত্তর এসেছিল, "না, ঠিক তা না, তবে ওরা অন্যরকম হয়!" ঠিক কিরকম হয়, সেটা জানতে পারিনি এখনো! মানুষের মুখ দেখে কি করে হিন্দু-মুসলমান বোঝা যায় , সেই শিল্পটাও আজও শিখে উঠতে পারিনি।

কলেজে পড়ি তখন। গ্রাজুয়েশন সেকেন্ড ইয়ারে। অফ পিরিয়ডে গার্লস কমনরুমে বসে আছি। গল্প করছি বন্ধুদের সাথে। এক বন্ধু জিজ্ঞেস করলো "এই শোন না, তোদের পিরিয়ড হয়?" অবাক আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম পৃথিবীর সব মেয়েদের ই তো পিরিয়ড হয়, আমরা কি মেয়ে নই তবে? ইতস্তত করে বন্ধুটি বললো, না মানে আমাকে একজন বলেছিল হয় না। প্রথমে মেজাজ খারাপ হলেও পরে ভেবে দেখলাম, দোষ তো ওর নয়! সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হয় সংখ্যাগুরুদের দ্বারা। এবং অঞ্চল, দেশ ভেদে সংস্কৃতি হিসেবে সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতিই মান্যতা পায়। যে সামাজিক আবহে আমাদের বড় হয়ে ওঠা, তাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই আমি মুসলমান হয়েও হিন্দুদের উৎসব, প্রথা, নিয়মকানুন, পুরান, রামায়ন মহাভারতের গল্প সব জেনে যাই। শেখানোর জন্য কাউকে চোখ রাঙাতে হয় না, কান টানতে হয় না। অনুরূপভাবে মুসলমানদের উৎসব, প্রথা, নিয়ম কানুন, ধর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে উদাসীন এই রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজব্যবস্থায় থাকার ফলস্বরূপ ই হয়তো আমার বন্ধুটির এহেন অজ্ঞতা। কোনকিছু সম্পর্কে না জানাটা তো আর ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে না। আর দায় নিশ্চয় মুসলমানদেরও আছে। তারা তাদের সংস্কৃতি, প্রথা, নিয়মকানুন, উৎসব ইত্যাদি সংখ্যাগুরুদের সামনে তুলে ধরতে পারেনি, অথবা পারতে অপারগ হয়েছে!

সারাজীবন যতোবার নিজেকে মানুষ পরিচয় দিতে গেছি, ততোবার আমাকে মুসলমান বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কাছের বন্ধুদের মায়েদের থেকে শুনেছি "তুই নিশ্চয় আগের জন্মে হিন্দু ছিলি, এজন্মে ভুল করে মুসলমান হয়েছিস!" অবাক হয়ে তাকানো ছাড়া আর কোনো ভাষা খুঁজে পাইনি। একবার আমার এক কাছের মানুষ আমার পরিচয় দিচ্ছিলেন অন্যদের কাছে এই বলে যে, "ও মুসলিম, কিন্তু বামপন্থী!" আমি বামপন্থী শব্দের মানে জানি, কিন্তু ’মুসলিম বামপন্থী’ শব্দের মানে আজ অব্দি খুঁজে পাইনি! রক্ত দিয়ে এলাম এক হিন্দু মুমুর্ষ রোগীকে। পরিচিত যে মানুষটির ডাকে গেছিলাম তিনি বিনয়ের সাথেই জানালেন রোগীর আত্মীয় স্বজনকে যেন আমার পুরো নাম না বলি। ততোদিনে আর অবাক হই না এসব শুনে। লাথখোর, কাটার বাচ্চা মুসলমান আমি। চুপচাপ রক্ত দিয়ে রিয়েলের জুস খেতে খেতে বাড়ি ফিরেছিলাম।

জন্মইস্তক মুসলমান শব্দের সাথে বেশীরভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠের ঘৃণাকে ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে থাকতে দেখেছি। শুনে এসেছি মুসলমান মানেই নোংরা। চারবিবি, পনেরোটা বাচ্চা। একটা সংখ্যালঘু অনুন্নত গরীব এলাকায় স্কুলে পড়াই। কর্মসুত্রে বিভিন্ন মুসলমান মানুষের সাথেও দেখা হয়। সামাজিক সুত্রেও দেখা হয়। তাদের কারুরই চারবিবি, পনেরোটা বাচ্চা নেই। ফেসবুকেও এত এত মুসলমান মানুষের সাথে আলাপ হয়। তাদেরও কারোর চারবিবি নেই। পনেরোটা বাচ্চাও নেই। বিভিন্ন দেশে জঙ্গী হামলা হলে সন্দেহের চোখে আমাকে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর ওদেশের সংখ্যাগুরুদের নির্যাতনের উত্তর আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। বারবার আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে আমার কোন দেশ নেই। যে কোনদিন আমাকে লাথ মেরে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। মাথায় ওড়না, হিজাব দিলে যৌন দাসী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। হিজাব যদি পুরুষতান্ত্রিক হয়, হিজাব পরলে যদি যৌনদাসী হতে হয়, তবে তো শাখা-পলা, সিঁদুরও পুরুষতান্ত্রিক। সিঁদুর শাখা পরা মেয়েরা তবে যৌনদাসী কেন নয় এই প্রশ্ন করলে চ বর্গীয়, ম বর্গীয় গালি দেওয়া হয়েছে। আমার বাপি যদি দৈবাৎ কখনো ঈদে নামাজ পড়তে যান, উদার মুক্তমনা বামপন্থী বন্ধুদের কাছে তাঁর বামপন্থা, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাস্তিকতা প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে পড়ে, কিন্তু তাঁদের সরস্বতী পূজায় অঞ্জলি দেওয়া, ভাইফোঁটায় ফোঁটা নেওয়া, ধর্মীয় মতে বিয়ে - সব সংস্কৃতি আর বাড়ির বৃদ্ধ মা-বাবার ইচ্ছের দোহাই দিয়ে জায়েজ হয়ে যায় কি সুন্দরভাবে! মুসলমান মেয়েদের কেন কবর থেকে তুলে ধর্ষন করা হবে, এই প্রশ্নের জবাব চাইলে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে পাকিস্তানে পাঠানোর ভয়ে কোৎ করে প্রশ্নটাকেই গিলে ফেলতে হয়। অথচ যে লিঙ্গ জাতি তুলে ধর্ষনকে এমন বৈধতা দেয় তাকে জেলে পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা করতেই দেখা যায় না।

ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু মোসলমানদের হালচাল ২

Keywords: , , ,