নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > আলমগীর মহিউদ্দিন > সুন্দর জীবনের ভাবনা

সুন্দর জীবনের ভাবনা

9 March 2020, আলমগীর মহিউদ্দিন PrintShare on Facebook

যে আকাঙ্ক্ষা মানুষকে সদা কর্মচঞ্চল রাখে তা হলো, এক সুন্দর জীবন নির্মাণ। তবে সুন্দর জীবনটি কেমন হয়, হবে বা হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা ও অনুসন্ধানের শেষ নেই। এর একটি সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে জীবন বহুমাত্রিক।

সে জন্য জ্ঞানী-গুণী অনুসন্ধানীরা সুস্থ দেহের ওপর জোর দিয়েছেন। আবার প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলো দৈহিক সুস্থতাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে বিধায়, এই প্রকৃতিনির্ভর বক্তব্যও বহু। তবে এর ভিত্তি শক্ত, কারণ মানুষ সামনের দিকে এগোতে থাকলে তারা শারীরিকভাবে দুর্বলও হতে থাকে। সুস্থতা এই দুর্বলতাকে অনেক দিক দিয়ে এর গতিকে শ্লথ করে ফেলে।

মানুষ যেমন নিজের প্রয়োজনে সময়কে বছর, মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ডে ভাগ করে নেয়, তার কর্মকাণ্ডগুলোকে এগিয়ে নেয়ার জন্য, সেখানে তাকে কিছু নিয়মনীতিও সৃষ্টি করতে হয়, এগুলোকে সহজ করার জন্য। সবারই লক্ষ্য, সুন্দর জীবন।

এখানে এই নিয়ম-নীতিগুলোর বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যায়। ১. সুস্থ থাকার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত স্লোগান হলো ‘ব্যায়াম করো’। সেটি কোনটা, তা নির্ভর করবে প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের ওপর। ২. কম খেতে হবে, তবে তা হতে হবে স্বাস্থ্যকর খাদ্য। খাদ্যের ধরন স্বাস্থ্যকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ৩. আলস্য থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ আলস্য শুধু দেহকেই অকর্মণ্য করে ফেলে না, মানসিকতাকেও নানাভাবে প্রভাবিত করে। ৪. সে জন্য মনোযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে এবং মানসিক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। ৫. নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে হবে। ৬. কর্মচঞ্চল হতে হলে নিজের ওজনের দিকে নজর রাখতে হবে। ৭. আয় বৃদ্ধির চেষ্টায় নতুন কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে হবে। ৮. বিনয়ী এবং মার্জিত হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ৯. চাপের বাইরে থাকতে হবে। জানা গেছে- সামাজিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় চাপে বিশ্বে সর্বাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ১০. জীবনকে নিয়ে সুখী থাকার চেষ্টা করতে হবে। ১১. সময়মতো গভীর নিদ্রা যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ১২. সব নেশা পরিত্যাগ করতে হবে। ১৩. টিভিতে শিক্ষণীয় কিছু না থাকলে, তা দেখার সময় কমাতে হবে। ১৪. বই পড়া বাড়াতে হবে। অবশ্য সে বইগুলো হতে হবে চরিত্র গঠনে, নিজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এমন। বছরে অন্তত ২০ খানা বই পড়া ভালো। ১৫. শিক্ষিত, দক্ষ এবং সমাজের নীতিবান ব্যক্তিদের সাথে কথা বলা। ১৬. পোশাক-পরিচ্ছদে কখনো লোক দেখানোর ছাপ থাকা ঠিক হবে না। তবে তা সুন্দর এবং শালীন হতে হবে। ১৭. সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ১৮. নতুন ভাষা জানার চেষ্টা করতে হবে। ১৯. জনকল্যাণে সাহায্য করতে হবে। ২০. শখ বা ‘হবি’ পরিচ্ছন্ন হতে হবে। ২১. কখনো ঋণগ্রস্ত থাকা উচিত হবে না। ২২. সাহায্যকারী সংস্থাগুলোকে সহায়তা করো, যাতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। ২৩. কারো প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করা ঠিক হবে না। ২৪. সময়ের সঠিক ব্যবহারের জন্য চেষ্টা করতে হবে। ২৫. বিশ্বকে দেখা এবং জানার চেষ্টায় ভ্রমণের অভ্যাস করা যায়। ২৬. রান্নাও জানতে হবে- প্রয়োজনে নিজের এবং প্রিয়জনকে খাইয়ে বন্ধন সুদৃঢ় করার জন্য। ২৭. স্বাস্থ্য সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য ডাক্তারের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করা প্রয়োজন। ২৮. নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। ২৯. এমন শখ থাকতে হবে, যা প্রয়োজনে কর্মজীবন হিসেবে গ্রহণ করা যায়। ৩০. সৃষ্টিশীল হওয়ার চেষ্টা থাকতে হবে। ৩১. অন্যের সামনে নিজেকে এমনভাবে তুলে ধরতে হবে যেন নিজের সুন্দর সৎ মানবীয় চিত্রটিই প্রধান হয়। ৩২. শঙ্কা ও ভীতিগুলোকে নিরোধের প্রস্তুতি থাকতে হবে। ৩৩. নিজের কথাগুলো লিখে রাখতে হবে। বিশেষ যে ঘটনাগুলো জীবনকে কখনো ব্যাহত করেছে এবং সেগুলো যা জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। ৩৪. খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস সুস্বাস্থ্য গঠনের সহায়ক হতে হবে। ৩৫. কখনো উপবাসকে স্বাস্থ্যের পথ হিসেবে না গ্রহণ করে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ভালো (ইসলামের এক মাস রোজা এক চমৎকার উদাহরণ। উপবাস বা রোজার পরে অপরিমিত খাবার খাওয়া ভালো নয়)। ৩৬. শাকসবজি খাওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। ৩৭. বাসস্থান সব সময় পরিচ্ছন্ন এবং সুঘ্রাণে ভরে রাখতে হবে। ৩৮. ফোনের অভ্যাস সীমিত করতে হবে এবং এটা পরিষ্কার রাখতে হবে। ৩৯. পরিবারের সবাইকে নিয়ে কখনো কখনো বাইরে যেতে হবে আনন্দঘন সময় সৃষ্টির জন্য। ৪০. পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক থাকতে হবে। ৪১. কখনো একসাথে অনেক কাজ না করাই ভালো। এক-একটি কাজ করা উত্তম। ৪২. নতুন ধারণা ও বক্তব্য জানার চেষ্টা করতে হবে এবং জীবনকে সুন্দর করতে সেগুলো সাহায্য করে কি না, জানতে হবে। ৪৩. দরকার হলে দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। ৪৪. কখনো নিজেকে লিখতে হবে নিজের ভাবনাগুলো নিয়ে। মানুষ প্রায়ই ভালো ভাবনাগুলো ভুলে যায়। ৪৫. দরকার হলে, কাজ ভাগ করে নিতে হবে। ৪৬. সব সময় গোলমালের এলাকা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং নিজেকে কোনো গোলযোগের অংশ হতে দেয়া যাবে না। ৪৭. কোনো কিছুতে কৃতকার্য হলে প্রথমে সৃষ্টিকর্তাকে এবং পরে নিজেকে ধন্যবাদ দেবে। ৪৮. ধর্মীয় অনুশাসনগুলো মানতে হবে। ধর্ম কখনই মানুষকে বিপথে অথবা বিপদের দিকে ঠেলে দেয় না। ৪৯. বর্তমান সময়ের অথবা অতীতের কোনো মত বা পথ অনুসরণ করার আগে তা ভালোভাবে বুঝতে হবে। ৫০. বর্তমান সময়ের ঘটনাগুলোকে জানতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগুলোকে জানতে হবে, কারণ আজকের জীবনকে এগুলো নিবিড়ভাবে পরিচালনা করে। আর এই প্রযুক্তিগুলো অনেক সময় মাত্র গুটিকয়েক মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই নিয়ন্ত্রকরা যদি অমানবিক বা মানবতাশূন্য মানুষ হয়, তাহলে প্রযুক্তির কল্যাণে কী ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, তা শুধু ধারণাই করা যায়। এ অবস্থার এখন অনেক স্থানে উদ্ভব হয়েছে।

একটি বিষয়ে সবাই প্রায় একমত; তা হলো- প্রতিদিন কিছুক্ষণ ধ্যান করা। ধ্যান কেমনভাবে করতে হবে তার প্রকারভেদ রয়েছে। ধ্যানের প্রধান প্রয়োজন হলো, সব কর্মকাণ্ড থেকে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে একেবারে গুটিয়ে রাখা এবং মনটাকে ফাঁকা করে দেয়া। এই চাপমুক্ত মন দেহকে তার নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাবিশ্বের রহস্য এবং খুলির নিচে একখণ্ড মাংসপিণ্ডের (মগজের) রহস্য সমান। এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের বুদ্ধি মগজের বুদ্ধির মাত্র একাংশ। অন্য কথায় মানুষ যদি তার সুন্দর জীবনের অন্বেষায় শুধু মগজের কাছে ধরনা দেয়, তাহলে সে পথ পেয়ে যাবে। সে জন্য অনুসন্ধানীরা বলেন, প্রশ্নের জন্য নিজেকেই প্রশ্ন করো।

লেখক প্যাট্রিক জে কিজার ১০টি চমৎকার পরামর্শ দিয়েছেন সুন্দর সুস্থ জীবনের জন্য। এগুলো হলো- ১. নিজের সহজাত কর্মদক্ষতাকে ভালো কাজে লাগাতে হবে; ২. প্রতিবেশীদের জানতে হবে; ৩. নতুন ঝুঁকি নেয়া; ৪. দীর্ঘ জীবনের জন্য চেষ্টা করা এবং কম টিভি দেখা; ৫. প্রতিদিন একটি নতুন জিনিস শেখা; ৬. মুক্তহস্তে দান করা; ৭. বিপদকে সামনাসামনি দেখার চেষ্টা চালানো; ৮. কাউকে-না-কাউকে মাফ করে দেয়া; ৯. অলসতা ও ঢিলেমি পরিহার করা এবং ১০ নিজের সহজাত ধারণা ও প্রবৃত্তিতে বিশ্বাস করতে হবে।

এই ধারণাগুলো ধারণ এবং সমন্বয় করতে পারলে অবশ্যই জীবনের বাধাগুলো পার হওয়া হবে সহজ। এটা চলমান জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করবেই। তবে মজার কথা হলো- জীবনের সমস্যা এবং বাঁকগুলো খুব কম সময়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। এ জন্য মানবসমাজ কিছু মৌলিক বিষয়ের চার দিকে ঘোরে। এর ফলে সমাজের সৃষ্টি হয়। এ জন্যই অভিজ্ঞজনরা বলেন, নিজের জীবনকে নিয়ে খুশি থাকো, তাহলে জীবন সুন্দর হবে। অন্যের সুখ বা অভ্যাসকে কখনো ঈর্ষার চোখে দেখবে না। যখন সামান্য কিছু নিয়ে সুখে থাকতে পারা যায়, সেটি হলো জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। যারা অনেক কিছু নিয়ে সুখে থাকতে চায়, তারা এমন সুখীদের হিংসা করে।

সময় আবার কখনো কখনো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। যেমন, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলোর বহুমাত্রিকতা মানুষকে অত্যন্ত অশান্ত করে রেখেছে। কিছু চ্যালেঞ্জের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়- ১. পৃথিবীর আবহাওয়া এবং অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে; ২. দারিদ্র্যের প্রসার ঘটছেই; ৩. জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি থেমে নেই; ৪. জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা; ৫. যুদ্ধের দামামা এবং যুদ্ধগুলোকে থামাতে হবে; ৬. বিশ্বায়নবাদের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ করে স্বকীয় কৃষ্টিকে সংরক্ষণ ও লালন করতে হবে; ৭. বায়োস্ফিয়ারের সংরক্ষণ; ৮. বিশ্ব-আতঙ্কবাদ থেকে মানুষকে রক্ষা করা; ৯. সৃষ্টিশীলতাকে সাহায্য করতে হবে; ১০. রোগের প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; ১১. মানুষের কার্যকর ক্ষমতাকে বাড়াতে হবে; ১২. মেশিনের চিন্তা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে; ১৩. পার্থিব জীবনের সব সমস্যাকে বিচক্ষণতার সাথে মোকাবেলা করা; ১৪. উন্নততর সভ্যতা নির্মাণ করা।

এমন আরো ভাবনা এবং অবস্থা আজকের মানুষের জীবনকে জটিল করে তুলছে। এগুলোর সম্যক নিয়ন্ত্রণ করে জীবনকে অর্থবহ করতে পারলে জীবন সুন্দর হবে।

প্রযুক্তির পেছনে বিশ্ব ছুটছে। অনেক দেশ প্রযুক্তির কল্যাণে সবার সামনে চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে চীন সবার আগে। তাই অনুসন্ধানীরা বলছে- একবিংশ শতাব্দী হবে ‘চীনের শতাব্দী’। এ বিষয়ে হার্ভার্ডের তিনজন চীনবিশেষজ্ঞ উইলিয়াম কিরবি, ওয়ারেন ম্যাকফারলেন ও রেজিনা এম আব্রামি তাদের অনুসন্ধানীমূলক বই ‘ক্যান চায়না লিড’ বইতে লিখেছেন। এর সত্যতা অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। কারণ, চার দিকে তাকালেই এখন চীনকে দেখতে পাওয়া যায়।

এই বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তা হলো- প্রযুক্তি যেমন বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে, তেমনি প্রতিটি দেশের সামরিক শক্তিকে আরো শক্তিশালী করেছে। তবে একটি পার্থক্য হলো- সেটি দৃশ্যমান নয়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ তারা অদৃশ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ করছেও। এরই ফলে দেশের মানবকল্যাণের জন্য বরাদ্দ, সামরিক বাহিনীর জন্য বরাদ্দের অনেক কম। যে দেশে এই অদৃশ্য শক্তি যত কর্মচঞ্চল, সেখানে বহু ব্যক্তিস্বাধীনতা, স্বাধীন বক্তব্য এবং মুক্তসমাজ ততই সঙ্কুচিত।

তাই দেখা যায়, এই শতাব্দীর দুই দশকে যে পার্থিব এবং বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটেছে, তা আগে কখনো ঘটেনি। তবে উল্লেখযোগ্য হলো- মানব ইতিহাসে এই পরিবর্তনগুলো বারবার ঘটেছে এবং মানুষ ফিরে গেছে তার শুরুর সময়ে। কারণ, মানুষ একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে থাকে।

Keywords