নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > তৈমূর আলম খন্দকার > অশনি সঙ্কেতের পায়ের আওয়াজ

অশনি সঙ্কেতের পায়ের আওয়াজ

3 January 2020, dailynayadiganta PrintShare on Facebook

লোকে বলে, বাংলাদেশের মাটিতে সোনা ফলে। সুজলা, সুফলা এমন দেশ, যে দেশের ছয় ঋতু পৃথিবীর সব দেশের নাগরিকদের কাছে সমভাবে অনেক প্রিয়। দু’টি সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর যেকোনো সৈকতের চেয়ে আলাদা, রয়েছে বিশ্বের সেরা বনাঞ্চল, রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। আন্দোলনের মাধ্যমে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় উন্নীত করা এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার গৌরব এ দেশবাসীর রয়েছে। আরো রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবেলা করে বেঁচে থাকার অদম্য সাহস। আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে বটে, কিন্তু যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার দৃষ্টান্ত বিরল। সরকারের ভাষ্যমতে, উন্নয়নের গতি এখন জোরালো পক্ষান্তরে রয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ। কিন্তু যে বিষয়টির অভাব জনগণ গভীরভাবে অনুভব করে, তা হলো গণতন্ত্র তথা নির্ভয়ে কথা বলা এবং নিজ চাহিদামতো প্রার্থীকে ভোট দেয়ার স্বাধীনতা। অন্য দিকে শাসকদের নির্যাতনের আতঙ্ক, যে কারণে জনগণ হক কথা বলা বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা অতীব ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। পুলিশ ও মিথ্যা মামলাই যেন সরকার রক্ষার রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। উন্নয়নের গলাবাজির পাশাপাশি গণতন্ত্রের নির্বাসন প্রকটভাবে দৃশ্যমান।

ক্ষমতাসীনদের মূল প্রতিপক্ষ বিএনপিকে কোণঠাসা করে সরকার আপাতত নিশ্চিতে থাকলেও কোথায় যেন ‘ফাঁকা’ পড়ে আছে, যা ডায়াগনসিস করতে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এর মূল কারণ সরকারের একমাত্র টার্গেট বিএনপি। তাই অন্য কোনো দিকে সরকারের এজেন্সিগুলো মনোযোগ দেয়ার ফুরসত পাচ্ছে না। শয়নে স্বপনে সরকার যদি বিএনপিকে একমাত্র টার্গেট করে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে থাকে, তবে দেশ রক্ষায় নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলোর অন্য দিকে মনোযোগ দেয়ার অবকাশ থাকে কিভাবে?

বিডিআর সদর দফতর পিলখানার সেনাকর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞ, হোলে আর্টিজানের জঙ্গি হামলা অথবা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশাল গণজমায়েতের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে, যে সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো পূর্বাভাস ছিল না। সরকারি গোয়েন্দারা শুধু পূর্বাভাস পাচ্ছেন, কখন কোথায় বিএনপি-জামায়াত রয়েছে, যা দিয়ে পুলিশ ‘গায়েবি’ বা ভুয়া মামলা সৃজনের নিমিত্তে এজাহারের পাণ্ডুলিপি তৈরি করে উপরতলার কর্মকর্তাদের খুশি রাখে। পুলিশের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। সরকার পুলিশনির্ভর হলেও আখের গুছাতে তারা (পুলিশ) যত ব্যস্ত, সে অনুপাতে পক্ষপাতিত্বহীন আইনের সঠিক প্রয়োগে কতটুকু আত্মনিয়োজিত বা নিষ্ঠাবান?

সম্প্রতি কিছু ঘটনা সম্পর্কে সরকারের আগাম তথ্য নেই বলেই প্রতীয়মান। অন্য দিকে আগাম তথ্য জানা থাকলেও সরকারের ভূমিকা কী? নাকি সরকারের ভেতর থেকেই ঘুণে ধরার ভূমিকা পালিত হচ্ছে? আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। কিন্তু অত লম্ফঝম্পের পরেও তো এর কোনো বিচার বা কোনো প্রকার অ্যাকশন পরিলক্ষিত হলো না। ১৮ জুলাই ২০১৯ সালে পত্রিকান্তরে প্রকাশ যে, ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনা মৃত সংঘ’ (ইস্কন) চট্টগ্রামের বেশ কিছু স্কুলে ফুড ফর লাইফ কর্মসূচির অধীনে শিক্ষার্থীদের ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে, মাতাজি প্রসাদ কি জয় প্রভৃতি ধ্বনি দিয়ে খাদ্য বিতরণ করেছে। স্কুলে সব ধর্মের ছাত্রছাত্রী রয়েছে। সেখানে একটি বিশেষ ধর্মের সেøাগান দিয়ে খাদ্য বিতরণকে চট্টগ্রামবাসী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উসকানি মনে করে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে ১৮ জুলাই ২০১৯ চট্টগ্রামে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি অসাম্প্রদায়িক। ক্ষমতার দাপটে যারা হিন্দুর সম্পত্তি বা দেবোত্তর সম্পত্তি দখল করেছে, দেশের গণমানুষ তাদের পছন্দ করে না, কিন্তু বন্ধুরাষ্ট্র ভারত, মিয়ানমার, নেপালে এর ভিন্ন চিত্র।

সম্প্রতি ভোলায় ঘটে যাওয়া ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতায় মানুষের প্রাণহানি, বুয়েটে আবরার হত্যা, অতি সম্প্রতি ‘মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চ’ কর্তৃক ডাকসু কার্যালয়ে এর নির্বাচিত ভিপিকে মারধর, প্রভৃতি অঘটনে অন্তর্নিহিত শক্তির উসকানি আছে কি না তাও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নজরে সরকার দেখতে পাচ্ছেন কি না, এটা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

স্বপদে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারি দলের মুখপাত্র ও সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংখ্যালঘুরা ভারত থেকে ফেরত এলে তাদের জায়গা দেয়া হবে। এ কথায় তিনি বাংলাদেশকে কোন বাস্তবতার মুখে ঠেলে দিচ্ছেন তা পরিষ্কার নয়। ভারত থেকে মুসলিম বিতাড়িত করায় মোদি সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং বাস্তবতার মধ্যে কোনো সঙ্গতি নেই। মন্ত্রী বলছেন, ভারতে এনআরসি হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, অথচ পত্রিকান্তরে প্রকাশ, প্রতিনিয়তই ভারত থেকে মুসলমানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কথায় প্রতীয়মান হয়, তিনি মোদির এনআরসি প্রকল্পকেই পক্ষান্তরে সমর্থন দিয়েছেন।

সরকারের মুখপাত্র জনাব ও. কাদের জাতীয় পার্টির কাউন্সিলে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রে সরকারি দল একা শক্তিশালী হলে হবে না। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন।’ সরকারি দলের মুখপাত্র যদি ‘স্টেজ ফিটিং’ হিসেবে এ কথা বলে থাকেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি মোতাবেক, তিনি কোনো ভুল করেছেন বলে কেউ মনে করবে না। কিন্তু সরকার যদি গণতন্ত্র অর্থবহ করাকে সঠিক মনে করতেন তবে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল সৃষ্টিতে ব্যস্ত না থেকে প্রকৃত বিরোধী দলকে নীতিগতভাবে স্পেস দিতেন। রাষ্ট্রের উচ্চ আসনে বসে কে কখন সত্য বলেন বা কে কখন অসত্য কথা বলেন, তা আঁচ করা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় খুবই কঠিন বটে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যখন মানুষ মিথ্যা কথা বলে তখন সত্যের মতোই মনে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থে গাড়ি বাড়ি ব্যবহারকারীদের মঞ্চের বক্তৃতা বাস্তবে যখন ১০০ শতাংশ গরমিল হয়, তখনই রাজনীতির প্রতি গণমানুষের শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থা আর থাকে না। সে থেকেই শুরু হয়েছে রাজনীতির প্রতি হতাশা, রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থাহীনতা এবং জাতির জন্য তা একটা গুরুতর অশনি সঙ্কেত।

প্রতিপক্ষকে দুর্বল করলে নিজেই দুর্বল বা গুরুত্বহীন হয়ে যাওয়ার প্রবাদটি আজকের নয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্ব কমে যাওয়া বা না যাওয়া দু’টিই নির্ভর করে সরকারের নিজ আচরণের ওপরে। সরকার বিনা ভোটে কথিত নির্বাচিত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলা ও লাঠির জোরে দাবিয়ে রাখার যে অভিযোগ তা খণ্ডানোর জোরালো যুক্তি সরকার আন্তর্জাতিক দরবারে দাঁড় করাতে পেরেছে কি? বরং সরকার চেষ্টা করেও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে পাঠানোর বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, যা পেরেছে সুদূর আফ্রিকার ছোট দেশ গাম্বিয়া। অবশ্য বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে যা দৃষ্টান্তমূলক এবং সমর্থনের দাবি রাখে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, গত চার বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪৫২ জন বাংলাদেশী অভিবাসী নিহত হয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিষয়টি কর্মকর্তারা দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্যোগ তুলে ধরার ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আরব বিশ্ব, মালয়েশিয়াসহ যেখানে শ্রমবাজার রয়েছে, সেসব রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই শ্রমজীবী বাংলাদেশীদের দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। তবুও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সৃষ্টিতে বা রক্ষার্থে বাংলাদেশ সরকার কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। এ ব্যর্থতার দায় কার ওপর বর্তাবে? বৈদেশিক ঋণে উন্নয়নে যদি আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা বাড়ে তবে এ ঋণ কাকে পরিশোধ করতে হবে? নাকি এ ঋণ পরিশোধের কোনো প্রয়োজন হবে না? সরকারের চাহিদা পূরণের জন্য নানাভাবে ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হয়েছে, যথা- ভ্যাট, পৌর ট্যাক্স, ভূমি ট্যাক্স, অধিকন্তু ইনকাম ট্যাক্স তো রয়েছেই। ইনকাম ট্যাক্স অফিসের কর্মচারী-কর্মকর্তারা এখন নিজেরাই দালালি করছেন। অন্য দিকে আইনজীবীর দায়িত্ব তারাই পালন করছেন, ফলে ন্যায্য ট্যাক্স প্রদান করতে সরকারি ট্যাক্সের চেয়ে ঘুষের পরিমাণ বেশি নির্ধারিত হয় বলে অভিযোগ উঠছে। Income Tax Office এর নাম শুনলেই জনগণ আঁতকে ওঠে। সে অফিসে ঘুষ ‘সহনীয়’ মাত্রায় থাকলে জনগণ ট্যাক্স প্রদানে অধিক উৎসাহ বোধ করত। হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি পাওয়ায় বাসা ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃদ্ধি পাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। যুব সমাজের বিরাট একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ায় প্রতিপাড়া ও মহল্লায় গড়ে উঠেছে গ্যাং স্টার। বর্ডার সুরক্ষিত না থাকার কারণে মিয়ানমার থেকে অহরহ আসছে মাদকদ্রব্য, যার সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। পিতামাতা কর্তৃক সন্তান হত্যা, সন্তান কর্তৃক পিতামাতা হত্যা ঘটনা এর আগে এত প্রকট আকার ধারণ করেনি, যা বর্তমানে ঘটছে অভাবের তাড়নায়, এছাড়া রয়েছে মাদকের প্রভাব। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। এ প্রচণ্ড শীতেও রাজপথে খোলা আকাশের নিচে ছিন্নমূল মানুষদের ঘুমাতে হয়। ক্ষুধা নিবারণের জন্য এখনো অসহায় মানুষদের কাঠের নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে সাগরে ডুবে মরতে হয়। বর্তমান সরকারের সাবেক মন্ত্রী, নৌকা মার্কায় নির্বাচিত এমপি, ১৪ দলের অন্যতম নেতা ও নীতিনির্ধারক স্বীকার করেছেন, বিগত ১০ বছরে ৯ লাখ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। বিষয়গুলো জাতির সমাজ চৈতন্যবোধ ও সংস্কৃতির বিকাশে কী সঙ্কেত প্রদান করছে?

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com

Keywords