নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > মুজিব আমলে ফ্যাসিস্ট বাহিনী

মুজিব আমলে ফ্যাসিস্ট বাহিনী

8 December 2019, Pinaki Bhattacharya PrintShare on Facebook

মুজিব আমলে ফ্যাসিস্ট বাহিনীর আদলে গড়া আলোচিত সংগঠন ছিল ‘লালবাহিনী’। এই লালবাহিনী মারমুখী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন আওয়ামী শ্রমিক লীগের নেতৃত্বে। এই বাহিনীর নেতা ছিলেন শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান।

লাল বাহিনীর ক্যাডাররা লাল জামা পরতো। মাথায় লাল একটি শিরস্ত্রাণও থাকতো তাদের।

শেখ মুজিব স্বয়ং জনগণ ও বিভিন্ন বিরোধী সংগঠনকে এই বাহিনীর ভয় দেখাতেন। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে এক বিরাট জনসভায় ‘লালবাহিনী দিয়ে দাবড়ানো’র ভয় দেখান জনগণকে। এই লালবাহিনী আসলে ছিলো তাঁর নিজস্ব মিলিশিয়া।

লালবাহিনীর তৎপরতার কেন্দ্র ছিল দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। প্রতিদ্বন্দ্বী বাম সংগঠনগুলোকে উৎখাত করা এবং সর্বগ্রাসী হয়ে চাঁদাবাজি করা ছিল এই লাল বাহিনীর মূল কাজ। বিরোধীদলগুলোর সমর্থক প্রায় সব সিবিএ-ইউনিয়নকে হাইজ্যাক করে এরা। তবে পোশাকিভাবে ‘রাজাকার ও সমাজবিরোধীদের নির্মূল’-এর নামেই এসব গুন্ডামি বৈধ করে নেয়া হচ্ছিল। লালবাহিনী বিশেষভাবে ‘বিহারী’ নামে পরিচিত উর্দুভাষীদের ওপর আক্রমণাত্মক ছিল। ঢাকায় বাহাত্তরের ‘মে দিবস’-এর সমাবেশে আবদুল মান্নান ঘোষণা দেন, ‘সরকার যদি বিহারীদের আটক ও বিচার না করে তাহলে তার সংগঠনই সেই কাজটি করবে।’

১৯৭২-এর মার্চ মাসে খুলনায় শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ করতে গিয়ে এই লাল বাহিনী রীতিমতো তাণ্ডব ঘটায়। তাদের গুলিতে সরকারি হিসেব মতে নিহত হন ৩৬ জন শ্রমিক, আহত হন ৮০ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে নিহত হয়েছিলেন দুই হাজারের বেশি লোক।

১৯৭২-এর জুন থেকে লালবাহিনী ঘোষণা দিয়ে কথিত সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করে। এমনকি অভিযানকালে আটককৃতদের ‘শাস্তি’ প্রদানের আইনগত ক্ষমতার আবদারও তারা করেছিল।

১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি বাকশাল গঠন প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করলে এই লালবাহিনীর প্রধান আবদুল মান্নানকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

ছবিতে লাল বাহিনীর কমাণ্ডার আব্দুল মান্নানকে মাথায় সামরিক ক্যাপ পরা অবস্থায় ঢাকায় তার আশি হাজার লাঠিয়াল বাহিনীর সমাবেশে শেখ মুজিবের পাশে থেকে অভিবাদন গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে।

Lal Bahini, meaning ‘red force’ in Bengali, was raised as a fascist force during the regime of Sheikh Mujib. Lal Bahini was raised as a militant force under the leadership of Awami Shramik League, a wing of Awami League. Labour group leader Abdul Mannan headed Lal Bahini. Members of Lal Bahini used to put on red shirt and red headpiece.

Sheikh Mujib sometimes used Lal Bahini to intimidate people. In December 1972, in a big public rally, he threatened people to use the force of Lal Bahini against them. Lal Bahini functioned as the personal militia of Sheikh Mujib. The force was very active in the industrial areas of Bangladesh.

Lal Bahini launched attacks on the Leftist organisations aiming to disable them completely. It also became notorious for extorting money from people. Lal Bahini highjacked almost all CBA unions that supported the opposition parties. However, the hooliganism unleashed by Lal Bahini was viewed by the authorities as actions to punish the Rajakars or war criminals and free the society from all antisocial elements.

The force was also known for its violent attacks on the Urdu-speaking people who were identified as Biharis. On the May Day in a rally, Abdul Mannan announced that if the government did not arrest the Biharis and put them on trial his force will act against those Urdu-speaking people.

In March 1972 Lal Bahini acted against some workers in Khulna to desist them from a labour movement. According to the government-provided statistics, the force killed 36 and injured 80 of the labourers. Several other non-government estimates put the death toll in that case at over 2,000.

In June 1972, Lal Bahini launched its “purification campaign” by launching actions against the so-called anti-socials. They even sought to punish the people they detained during raids.

Later when Abdul Mannan opposed Sheik Mujib’s political plan of creation of a single party ruling system of BaKSAL he was arrested on charges of corruption.

In the following photo Lal Bahini commander Abdul Mannan is seen standing beside Sheikh Mujib in a rally of 80,000 members of his militia. He is wearing a military cap and accepting salutes from his men.


"সেই সময় (মুজিব আমলে) দলীয় ক্যাডার আর রক্ষীবাহিনী ছাড়াও নানা ‘প্রাইভেট বাহিনী’ গড়ে উঠেছিল। ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে’ মুজিব শাসনামলে ঢাকায় পুলিশের একটি ‘স্পেশাল বাহিনী’ও সক্রিয় ছিল। বড় ভয়ঙ্কর ছিল স্পেশাল বাহিনী। সাদা টয়োটা গাড়িতে ঘুরে বেড়াত তারা। হঠাৎ কাউকে ‘সন্দেহজনক’ মনে হলে গাড়িতে তুলে নিয়ে উধাও করে দিত। তাদের আর খোঁজ পাওয়া যেত না।

সেই সময়ের আরেকটি বহুল আলোচিত সংগঠন ছিল ‘লালবাহিনী’। এই লাল বাহিনী মারমুখী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন আওয়ামী শ্রমিক লীগের নেতৃত্বে। এই বাহিনী তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান। এই ‘লাল বাহিনী’র ক্যাডাররা লাল জামা পরতো। মাথায় লাল একটি শিরস্ত্রাণও থাকতো তাদের।

শেখ মুজিব স্বয়ং এই বাহিনীর ভয় দেখাতেন। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে এক বিরাট জনসভায় ‘লালবাহিনী দিয়ে দাবড়ানো’র ভয় দেখান জনগণকে। এই লালবাহিনী ছিল তাঁর নিজস্ব প্যারামিলিশিয়া।

‘লালবাহিনী’র তৎপরতার কেন্দ্র ছিল দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। প্রথমে এই বাহিনী একটি ইতিবাচক উদ্দেশ্যেই গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সরকারি ও উর্দুভাষীদের মালিকানাধীন কারখানা দখলের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এই ধরনের অবৈধ ও নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে কল-কারখানা রক্ষার জন্যই ‘লালবাহিনী’র গোড়াপত্তন।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বাম সংগঠনগুলোকে উৎখাত এবং সর্বগ্রাসী চাঁদাবাজি হয়ে পড়ে এদের কার্যক্রমের প্রধান অংশ। বিরোধীদলগুলোর সমর্থক প্রায় সব সিবিএ-ইউনিয়ন হাইজ্যাক করে এরা। তবে পোশাকিভাবে ‘রাজাকার ও সমাজবিরোধীদের নির্মূল’-এর নামেই এসব গুন্ডামি বৈধ করে নেয়া হচ্ছিল। ‘লালবাহিনী’ বিশেষভাবে ‘বিহারী’ নামে পরিচিত উর্দুভাষীদের ওপর আক্রমণাত্মক ছিল। ঢাকায় বাহাত্তরের ‘মে দিবস’-এর সমাবেশে আবদুল মান্নান ঘোষণা দেন, ‘সরকার যদি বিহারীদের আটক ও বিচার না করে তাহলে তার সংগঠনই সেই কাজটি করবে।’

১৯৭২-এর জুন থেকে ‘লালবাহিনী’ ঘোষণা দিয়ে কথিত সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করে। এমনকি অভিযানকালে আটককৃতদের ‘শাস্তি’ প্রদানের আইনগত ক্ষমতার আবদারও তারা করেছিল। এই ধরনের এক শুদ্ধি অভিযানেরই করুণ শিকার হন আহমেদ ফজলুর রহমান। তিনি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ, আগরতলা মামলায় সহ-অভিযুক্ত এবং মুক্তিযুদ্ধের আগে যে সব উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে গোপনে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তাদের একজন। ১৯৭৩ সালের ৩০ এপ্রিল ‘মে দিবস’-এর আগের দিন ঢাকায় ‘ব্যাপকভিত্তিক শুদ্ধি অভিযান’-এর সময় ‘লালবাহিনী’র কয়েক ডজন সদস্য আহমেদ ফজলুর রহমানকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মারতে মারতে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় শ্রমিক লীগ অফিসে। সেখানে স্বয়ং বাহিনীপ্রধান আবদুল মান্নান ছিলেন। তার সামনেই ফজলুর রহমানকে জেরা করা হয়। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পর ১৩টি পেট্রোলপাম্প দখলের অভিযোগ আনে লাল বাহিনী। পরে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে শ্রমিক লীগ অফিস থেকে মুক্তি পান ফজলুর রহমান। পরদিন ঢাকার অনেক দৈনিক পত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়। আহমেদ ফজলুর রহমান লালবাগ থানায় একটি অভিযোগও দায়ের করেছিলেন।

শিল্পাঙ্গনে এ ধরনের অস্থিরতার মধ্যেই ১৯৭৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বাড়বকু- শিল্পাঞ্চলে ‘আর আর টেক্সটাইল’ মিলে কেবল একটি ঘটনাতেই ২২ জন শ্রমিককে হত্যা করা হয়। জেলা প্রশাসন অবশ্য প্রেস রিলিজে ৯ জনের কথা স্বীকার করে। আর ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ নিহতের সংখ্যা ৫০ বলে উল্লেখ করে। বাঁশের তৈরি শ্রমিক কলোনিতে চারদিক থেকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তারপর তিন দিক থেকে গুলি ছোঁড়ার মাধ্যমে এই আক্রমণ হয়। এ নিয়ে পরদিন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লায় হরতাল পালিত হয়। গণমাধ্যমের ভাষ্য থেকে জানা যায়, নোয়াখালী অঞ্চলের শ্রমিক প্রাধান্যপূর্ণ এই কারখানায় কিছুদিন পর সিবিএ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনোভাবেই সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনটি তার শাখা স্থাপন করতে পারছিল না; তারই প্রতিশোধ ছিল এই হামলা।

১৯৭২-এর মার্চ মাসে খুলনায় শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ করতে গিয়ে এই লাল বাহিনী রীতিমতো তা-ব ঘটায়। তাদের গুলিতে সরকারি হিসেব মতে নিহত হন ৩৬ জন শ্রমিক, আহত হন ৮০ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে নিহত হয়েছিলেন দুই হাজারের বেশি লোক।

১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি বাকশাল গঠন প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করলে এই লালবাহিনীর প্রধান আবদুল মান্নানকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।" - [স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বই থেকে]

Keywords

-