নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > সরকারের শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে

সরকারের শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে

4 November 2019, বদরুদ্দীন উমর PrintShare on Facebook

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি ও তাদের শাসক দল যা বলে তার উল্টো কাজ করে। এটা তাদের চলমান শুদ্ধি অভিযানের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। অনেক লম্বা-চওড়া কথা বলে ও ঢাকঢোল পিটিয়ে এই শুদ্ধি অভিযান চলছে।

কিন্তু এ পর্যন্ত মধ্যম স্তরের কিছু অপরাধী ছাড়া রাঘববোয়ালদের ধরার ব্যাপারে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, যদিও তাদের পেছনে রাঘাববোয়ালদের থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে।

সম্রাটের মতো অপরাধীরা পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে বলেছে যে, তারা বেশকিছু ওপরতলার লোককে প্রতি মাসে নিয়মিত খুব বড় অঙ্কের টাকা দিত, যার পরিমাণ লাখ লাখ টাকা। এসব লোকের তালিকা র‌্যাব ও পুলিশের হাতেও এসেছে, যার মধ্যে রাশেদ খান মেননের নামও আছে।

মেননের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই ঘুষখোরি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি ভিকারুননিসা ও আইডিয়াল স্কুলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য ক্ষেত্রে যে ঘুষখোরি ও দুর্নীতি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তা বহুবার সংবাদপত্রের রিপোর্টেও দেখা গেছে।

এখন সম্রাটের দেয়া বক্তব্য থেকে জানা গেছে যে, ক্যাসিনো বাণিজ্যের মতো অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং প্রতি মাসে দশ লাখ টাকা দেয়া হতো, যা এক বিরাট অঙ্ক। তার নাম আছে এই অর্থপ্রাপ্তদের তালিকায় পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে। তার নাম সংবাদপত্র রিপোর্ট মাধ্যমেই পাওয়া গেছে। সেটা তো বোঝা গেল।

কিন্তু এক থেকে চার নম্বরে যারা আছে, বিশেষ করে এক নম্বরে কার নাম আছে এবং তাকে মাসে কত টাকা দেয়া হতো তার কোনো খবর নেই! এ বিষয়ে সংবাদপত্রে কিছুই পাওয়া যায় না। এই অবস্থায় শুদ্ধি অভিযানে স্বচ্ছতা আছে একথা কে বলবে? মেনন আওয়ামী লীগের বাইরের লোক হিসেবে তার নাম সংবাদপত্রে বড় বড় অক্ষরে বের হয়েছে।

এ নিয়ে অনেক হুলুস্থূল হচ্ছে। মেননের কাছে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখা চাওয়া হয়েছিল। তিনি তার জবাবে বলেছেন, তার বরিশালে দেয়া বক্তব্য অনেক বিভ্রান্তিকর এবং বাড়িয়ে-চাড়িয়ে বলা হয়েছে। অসম্পূর্ণভাবে তার বক্তব্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ১৪ দল তার চিঠির বক্তব্যে সন্তুষ্ট!!

সন্তুষ্ট হওয়ারই কথা, কারণ মেনন অন্য দলের লোক হলেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক। তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করে নিজেদের অবস্থান রক্ষার জন্য এটা প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বারবার শুদ্ধি অভিযানের স্বচ্ছতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। ২৯ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অপরাধের সঙ্গে যাকে পাচ্ছি ধরছি, কেউ ছাড় পাবে না’, ‘ভয় শব্দটা আমার অভিধানে নেই।’ এসব ভালো কথা। তিনি বলেছেন, ‘অপরাধী অপরাধীই।

কোন দল কী বলল, সেটা বিবেচ্য বিষয় না। অপরাধের সঙ্গে যাকে পাচ্ছি, তাকেই ধরছি। কেউ ছাড় পাচ্ছে না। শুদ্ধি অভিযান আইওয়াশ নাকি, দেখা যাবে; আর এতে কখন কে ধরা পড়ে, সময়ই বলে দেবে’ (যুগান্তর, ৩০.১০.২০১৯)।

তাই যদি হয়, তাহলে ক্যাসিনো বাণিজ্যে সম্রাট কাদের কথা বলেছে এবং তাদের থেকে মাসোহারা পাওয়া যে রাঘববোয়ালরা তালিকায় ১ থেকে ৪ নম্বরে আছে তাদের নাম শোনা যাচ্ছে না কেন? সংবাদপত্রে তাদের নাম জানানো হচ্ছে না কেন? এজন্যই কি যে, তারা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের লোক?

আসলে বাংলাদেশে এটাই হয়ে আসছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত প্রায় সবাই নানা রকম অপরাধের সঙ্গে জড়িত। সাধারণভাবে তাদের অপরাধের কোনো বিচার নেই, কোন শাস্তি নেই। এ কারণেই অপরাধের মাত্রা একেবারে ছাড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশ এখন চোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, ধর্ষক ইত্যাদি অপরাধীদের শাস্তি নেই।

ব্যতিক্রম হিসেবে দু’-চারজনের শাস্তি হলেও সাধারণভাবে তারা র‌্যাব ও পুলিশের জালের বাইরে। সেভাবেই তারা অপরাধ করেই চলেছে। যে দেশে অপরাধের বিচার নেই সেখানে যে অপরাধীদের জন্য এক অভয়ারণ্যের সৃষ্টি হবে, এতে আর অবাক হওয়ার মতো কী আছে?

যেসব অপরাধের কথা বহুল প্রচারিত তার মধ্যে আছে সদরঘাটে টেলিভিশন ক্যামেরা ও জনগণের চোখের সামনে বিশ্বজিতের নির্মম হত্যকাণ্ড, সাংবাদিক সাগর-রুনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

বিশ্বজিতের মামলায় ধরা পড়া ছাত্রলীগ কর্মীদের কয়েকজনের শাস্তি হলেও পরে শাস্তির মাত্রা কমিয়ে আনা হয়েছিল এবং অন্যদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ড অনেক বছর হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত এর কোনো কূলকিনারা নেই! এসবের সঙ্গে সরকারের উদাসীনতার কি কোনো সম্পর্ক নেই?

শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপির শাসন আমলেও এ ধরনের ব্যাপার দেখা গেছে। তবে ২০০৯ সাল থেকে এতদিন পর্যন্ত একটানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সময় এর মাত্রা বিস্ময়করভাবে বেড়ে গেছে। চারদিকে চুরি, দুর্নীতি, ঘুষখোরি, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ইত্যাদি এমনভাবে হচ্ছে যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই।

এখন মাদ্রাসা ও স্কুলের শিক্ষকরা পর্যন্ত এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তারা আর্থিক দুর্নীতি তো করছেই, উপরন্তু তাদের দ্বারা ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাও ব্যাপকভাবে ঘটছে। কয়েকদিন আগে নুসরাত হত্যার অপরাধে এক মাদ্রাসা প্রিন্সিপালসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হলেও এটা এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার।

সংবাদপত্রে ঘনঘন, কয়েকদিন পরপরই শিক্ষকদের ছাত্রী ধর্ষণের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু এসব ধর্ষণকাণ্ডের কোনো বিচার হয় না। এর থেকে বোঝা যায় সমাজে অপরাধ কী ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর দায়িত্ব কার? যারা ক্ষমতায় রয়েছেন তারা কি এর দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন?

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ইত্যাদি সংগঠন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন হিসেবেই কাজ করে। তারা তাদের পিতৃদল আওয়ামী লীগের নাড়িতে প্রোথিত। তাদের চরিত্র প্রকৃতপক্ষে তাদের পিতৃদল কর্তৃকই নির্মিত। এটা অস্বীকার করার মতো অবাস্তব ও অযৌক্তিক চিন্তা আর নেই।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের হল দখল করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাস শুরু করেছিল, সেটা হতো উপাচার্য ও প্রিন্সিপালদের এবং পুলিশের নাকের ডগায়। তারা তাদেরকে বাধা অথবা শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে তাদের রক্ষক হিসেবেই নিজেদের ‘দায়িত্ব পালন’ করে এসেছে।

তারা এসব অপরাধের দিকে চোখ বন্ধ রেখে তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবেই ভূমিকা পালন করে এসেছে। এর পরিণতিতেই ছাত্রলীগ এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদককে বহিষ্কার করে অন্যদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন। যুবলীগের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা।

তাদেরকে তারা এমনভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং রক্ষা করে এসেছেন যে তারা দানবীয় চরিত্র পরিগ্রহ করেছে। তাদের অনেকে সরকারের ও দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার কয়েকজন যুবলীগ নেতাকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের ক্যাসিনো বাণিজ্যের কথা ফাঁস হয়েছে, যদিও এই ক্যাসিনো বাণিজ্য পুলিশের সহায়তাতেই চালানো হয়েছে এবং পুলিশ এই বাণিজ্যলব্ধ অর্থের ভাগ পেয়েছে।

বলাই বাহুল্য, এখন যে ক্যাসিনো ব্যবসায়ীরা ধরা পড়েছে, তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকেছে। তাদের গডফাদাররা তাদের পিতৃদল আওয়ামী লীগের নেতা। এ কারণেই সম্রাটের দেয়া তথ্য এবং র‌্যাবের হস্তগত তালিকায় ১ থেকে ৪ নম্বর নেতাদের কোনো নাম জনগণকে জানানো হচ্ছে না। সংবাদপত্রেও তার কোনো খবর নেই।

এ পরিস্থিতিতে শুদ্ধি অভিযান স্বচ্ছতার সঙ্গে চালানো সম্ভব নয় এবং সেটা হচ্ছেও না। পর্দার আড়ালে থাকা আসল লোকরা যদি অধরা থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত এই অভিযানের পরিণতি কী হবে সেটা অনুমান করা যেতে পারে।

যারা পর্দার আড়ালে থেকে গেছে তাদের ধরাছোঁয়া তো পাওয়াই যাবে না, এমনকি যাদেরকে ক্যাসিনো বাণিজ্যে সংশ্লিষ্টতার কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদেরও উপযুক্ত শাস্তি হবে কিনা এটা ঘোর সন্দেহের বিষয়।

৩১.১০.২০১৯
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Keywords