নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > প্রেস রিভিউ > ভারতেও পঙ্কজের অভিজাত মার্কেট ও আবাসস্থলের সন্ধান!

ভারতেও পঙ্কজের অভিজাত মার্কেট ও আবাসস্থলের সন্ধান!

29 October 2019, barishalcrimenews PrintShare on Facebook

শাকিব বিপ্লব :: ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ বলে কথা। সেচ্ছাসেবকলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পঙ্কজ দেবনাথের নাম শুনলে শুধু নিজ এলাকা মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা নয়, রাজধানীতেও আতঙ্ক ভর করার কথা শোনা যেতো। সাধারণ মানুষতো দুরের কথা, খোদ দলীয় লোকেরাও তার প্রভাবের বিপরিতে মুখ খুলতে সাহস নিতেন না। বিশেষ করে নির্বাচনী এলাকা হিজলা মেহেন্দিগঞ্জে অঘোষিত রাজার ন্যায় সম্রাজ্য চালাতেন। তৎসময়ের ছাত্রলীগ নেতা এই পঙ্কজ ক্ষমতার গত এক যুগকালে হয়েছেন হাজার কোটি টাকার মালিক। বাংলাদেশ ছাপিয়ে ভারতেও রয়েছে তার দৃশ্যমান সম্পদ। অনেকটা আকস্মিক সেচ্ছাসেবকলীগের নেতৃত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার পর এখন তার সম্পদের পরিমাণ নিয়ে কথা উঠেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার এই সম্পদের অস্থিত্ব চিহ্নিত করতে নিরব কার্যক্রম শুরু করেছে। যেকোন সময় তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

রাজধানী ঢাকার একাধিক সূত্র এমন তথ্য দিয়ে বলছে- ক্যাসিনোকাণ্ডে যখন যুব ও সেচ্ছাসেবকলীগের প্রভাবশালী নেতাদের মসনদ টলে পড়েছে তখন পঙ্কজ দেবনাথ নিজ এলাকা মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনিও খসে পড়লেন নেতৃত্বের ক্ষমতা থেকে।

সূত্রগুলো জানায়- রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহন মালিক পঙ্কজ শাহাবাগে নিজের বাসে নিজেই আগুন দিয়ে ২০১৪ সালে দেশব্যাপি আলোচনায় এসেছিলেন। তৎসময়ে পেয়েছিলেন সাংসদ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন। পরে সরকারবিরোধী একটি মন্তব্য করে তোপের মুখে পড়ের দলীয় হাইকমান্ডের। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ দশকের তুখোর ছাত্রনেতা এই পঙ্কজ আন্তর্জাতিক শক্ত লবিংয়ের কারণে দলীয় হাউকমান্ডে প্রভাব বিস্তার করে সেচ্ছাসেবকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে অসীন হন। এর পর আর তাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। শোনা যায়- ভারতীয় লবিংয়ের কারণে বারবার দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা এই নেতার সাংসদ হিসেবে বরিশাল ৪ আসনের (হিজলা মেহেন্দিগঞ্জ) দলীয় টিকিট নিশ্চিত করেন।

ঢাকার সূত্র জানায়- সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার আগেই পঙ্কজ অর্থের সিঁড়ি বাইতে শুরু করেন। সেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ব্যবসায়ীক মহলের সাথে সুযোগ সখ্যতার বুনিয়াদে পরিবহন ও গার্মেন্টেস ব্যবসার মাধ্যমে ক্রোড়পতির তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। ২০১৪ ও ১৮ সনে দুই দফা সাংসদ নির্বাচিত হয়ে দলীয় হাইকমান্ডে যেমন পঙ্কজ শক্তপোক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন তেমনি একের পর এক দৃশ্যমান সম্পদের মালিকও হতে থাকেন।

এক্ষেত্রে রাজধানীতে টেন্ডারবাজির মাধ্যমে শতকোটি টাকার মালিক হন। কৌশলী এই রাজনীতিবীদ টেন্ডারবাজি বা ঠিকাদারি কাজে নিজে কখনও সরাসরি সম্পৃক্ত হননি। রাজধানীর উত্তরা ও ধানমন্ডি এলাকায় রয়েছে তার অভিজাত দুটি বাড়ি।

মেহেন্দিগঞ্জে নিজ গ্রাম সোনামুখিতে অট্টালিকা গড়ে তুলেছেন। রয়েছে গার্মেন্টেস ব্যবসার সুবিশাল সাম্রাজ্য। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতেও তার অভিজাত মার্কেট ও আবাসস্থলের সন্ধান পাওয়া গেছে। আগরপুরে তার মালিকানাধীন একটি হাসপাতালে রয়েছে- এমন তথ্য ঢাকার মিডিয়া নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়- তার শ্বশুরালয় সিলেটে হওয়ায় জেলা লাগোয়া ভারতের আগরপুরসহ বিভিন্ন স্থানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠনগুলো তারাই দেখাশুনা করেন। সাংসদ হিসেবে ক্ষমতা ও অর্থের ভীত মজবুত হওয়ার পরেই পঙ্কজ দেবনাথ ঢাকা রেখে নির্বাচনী এলাকা মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলায় রাম রাজত্ব শুরু করেন। পরিস্থিতি এমন দাড়ায় যে বরিশাল আওয়ামী লীগের কর্ণধররাই তার ক্ষমতার কাছে পেরে উঠছিলেন না। জেলা নেতৃবৃন্দের চরম বৈরী সম্পর্ক থাকলেও পধাধিকার বলে সাংগঠনিক সভা সমাবেশে তাকে না ডেকে উপায় ছিল না। অনেকটা নিজ ইচ্ছায় চলাফেরা করা পঙ্কজ জাতীয় নেতার ভঙ্গিময় বরিশাল রাজনীতি থেকে নিজেকে দুরত্বে রেখে নির্বাচনী এলাকায় তার সিদ্ধান্তই প্রতিষ্ঠা করতেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পৌর ও উপজেলা কোন স্তরেই তার মনোনীত প্রার্থী ছাড়া কারও বিজয় নিশ্চিত হয়নি। জেলা অথবা কেন্দ্রীয় সিন্ধান্তও কোন কোন ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়ে যায়। এসব ঘটনায় পঙ্কজ দেবনাথ শক্তিশালী নেতা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করায় হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে কারও টু-টা শব্দ করার সাহস ছিল না। পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধররাও এই নেতাকে নদীবেষ্টিত দুই উপজেলার অঘোষিত রাজা হিসেবেই মূল্যায়ন করতেন। এক রাজ্যে এক নেতার আদলে পঙ্কজের ভুমিকায় সর্বত্র অনুগত-অনুসারীরাই ছিলেন এলাকার নিয়ন্ত্রক। স্কুল কলেজ থেকে হাটবাজার সর্বক্ষেতেই তার অনুগতরা জায়গা নিয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কারও ভবিষ্যৎ ভাল যায়নি। উদাহরণস্বরুপ জাতীয় পার্টি থেকে আ’লীগে আসা সাবেক এমপি মাইদুল ইসলাম তার সাথে মনোনয়নের টক্কর দিয়ে মেহেন্দিগঞ্জে কয়েক দফা অবরুদ্ধ ও নাজেহাল হন। এসময় পুলিশ প্রশাসনকে পঙ্কজের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করতে দেখা যায়।

পুলিশ সূত্র জানায়- হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ দুই থানা কর্তাদের বদলি ক্ষমতা হাতে থাকায় ওসিরা গদি রক্ষায় তার দিকনির্দেশনায় চলতে বাধ্য ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে পঙ্কজ দেবনাথের ‘দাদা বাহিনী’ নামে একটি নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী দাপিয়ে বেড়ায় মেঘনা তীরবর্তী এই জনপদে। টেন্ডারবাজি, হাট-বাজার নিয়ন্ত্রণ, নদীর বালু উত্তোলন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা খাত থেকে দাদা দেবনাথের নামে লাখ লাখ টাকা আসতে থাকে।

সূত্র জানায়- ২০১৭ সালে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৫ জন নৈশপ্রহরী কাম দফতরি অবৈধভাবে নিয়োগ দেন সেচ্ছাসেবকলীগের কেন্দ্রীয় এই নেতা। এর জন্য প্রত্যেকের কাজ থেকে ৫-৭ লাখ টাকা নেন তিনি। এছাড়াও হাইস্কুল ও কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ডোনেশনের নামে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন। তার ভাই মনোজ দেবনাথ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে ভুমিকা রাখেন। স্কুলশিক্ষক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি দুই উপজেলার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফলে দুই ভাই মিলে অর্থের চাবিকাঠি নিজেদের হাতে রেখে হিজলা মেহেন্দিগঞ্জের টাকায় রাজধানীসহ ভারতে সু-বিস্তার বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গতে তুলেছেন।

এই সাংসদের বিরুদ্ধে বেশকিছু দিন যাবত স্থানীয় আওয়ামী লীগ একট্টা হয়েছিলেন এক তরফা ভুমিকায় সেচ্ছাচারিতার ছাপ রাখায়। সর্বশেষ ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী তার মনপুত না হওয়ায় নিজেই দাড় করিয়ে দেন বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশ উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিদ্রোহী প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার পরেই পঙ্কজের বিরুদ্ধে দলীয় নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুলে বরিশাল ও ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন। এমন এক সময় সংবাদ সম্মেলনে এই সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ফিরিস্তি তুলে ধরা হল যখন অনিয়মের কারণে ছাত্রলীগ এবং ক্যাসিনোকাণ্ডে যুব ও সেচ্ছাসেবকলীগে শুদ্ধি অভিযানে লণ্ডভণ্ড। সেই অভিযানের তালিকায় কাকতলীয়ভাবে চলে আসে পঙ্কজ দেবনাথের নাম। অবিশ্বাস্য হলেও যা হবার তাই ঘটেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে কেড়ে নেওয়া হয় সেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক পদটি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার মসনদ টলে পড়ার পরে এখন এই নেতার সম্পদের সন্ধান শুরু হয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়- বিতর্কের বাইরে থেকে কৌশলে পথচলা পঙ্কজ দেবনাথের সম্পদের প্রাথমিক বর্ণনায় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার চোখ কপালে উঠেছে। শোনা যাচ্ছে- দুদক তার পিছু নিয়েছে। এই খবরে হিজলা মেহেন্দিগঞ্জের অবহেলিত-নির্যাতিত নেতারা অভিযোগের ফিরিস্তি নিয়ে হাইকমান্ডের দুয়ারে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি মিডিয়াকেও তথ্য উপাত্ত দেওয়া শুরু করেছে।’

Keywords

-