নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > যে কাজ করতে হবে

যে কাজ করতে হবে

19 September 2019, বদরুদ্দীন উমর PrintShare on Facebook

বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর পর শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ শাসন শেষ পর্যন্ত একদলীয় শাসনে পরিণত হয়ে দেশে এক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। এই বিপর্যয়ের হাত থেকে তারা নিজেরাও রক্ষা পায় নি। শেখ মুজিব শুধু নিহতই হন নি, তাঁর দল বাকশাল উচ্ছেদ হয়েছিল। ইঁদুর যেভাবে ভয় পেয়ে গর্তে ঢোকে, সেভাবেই আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা পালিয়ে গর্তে ঢুকেছিল। তাদের জন্য কাঁদার কেউ ছিল না। ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর ঢাকার রাস্তায় আনন্দ মিছিলের ঢল নেমেছিল। লোকজন মিষ্টি বিতরণ করেছিল। শুধু জনগণের মধ্যেই যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও ক্রোধ ছিল তাই নয়। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সামরিক বাহিনীর হাতে শেখ মুজিব নিহত হলেও এর সাথে আওয়ামী লীগের লোকজন গভীরভাবে জড়িত ছিল। তাঁর নির্যাতন নানাভাবে আওয়ামী লীগের একটা অংশকে স্পর্শ করেছিল। এজন্য ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের পর জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল লন্ডনে এক সফরে গিয়ে বলেছিলেন যে, শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর তাঁরা একটা ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন!

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাশ করে বাকশালের একদলীয় শাসন কায়েম করেন। শুধু বাকশাল ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়, রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। সরকারী কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ হয়। এক কথায় বাঙলাদেশে কায়েম হয় এক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র। এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে দেশের জনগণের ওপর নির্যাতনের শেষ ছিল না। ১৯৭২ সাল থেকেই শেখ মুজিবের আমলে রক্ষী বাহিনীর হাতে হাজার হাজার বাপন্থী ও সরকার বিরোধী ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন। সে সব দিন ছিল জনগণের জন্য চরম দুর্দিন।

স্বাধীন বাঙলাদেশের জনগণ কখনোই স্বাধীনতার স্বাদ পান নি। তাঁদের ওপর শোষণ নির্যাতন প্রথম থেকে শুরু হয়ে দশকের পর দশক ধরে জারী আছে। এদিক দিয়ে মুজিব পরবর্তী জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সামরিক সরকার জনগণকে কোন রেয়াত দেয় নি। ১৯৯০ এর পর এখানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও কোন উন্নতি হয় নি। উপরন্তু অবনতি হয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দেশে শেখ মুজিবের আমলের মত পরিস্থিতি নোতুন ভাবে শুরু হয়েছে। এই শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতিতে জনগণ শোষণ নির্যাতনের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছেন।

২০০৯ সাল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের শাসন একটানাভাবে এখনো পর্যন্ত চলছে। এই শাসন ব্যবস্থা, এই সরকার কোন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। নির্বাচনের মহড়া দিয়ে, প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন ব্যবস্থা উৎখাত করে, সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট পদ্ধতিতেই এই সরকার ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে ক্ষমতায় এসেছে। এরা সারা দেশ জুড়ে ফ্যাসিজমের জাল এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছে যার কারণে দেশে এখন প্রকৃতপক্ষে কোন প্রতিরোধ সংগ্রাম নেই। জনগণের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে, ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে, ক্ষোভ ও ক্রোধ আছে, কিন্তু তার কোন বহিঃপ্রকাশ নেই ছোটখাট কোন কোন ঘটনা ছাড়া। অবস্থা দেখে মনে হয় এখানে একটা রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বিরাজ করছে।

একদিকে নির্যাতন এবং অন্যদিকে স্থিতাবস্থা দেখে মনে হয়, এই অবস্থা স্থায়ী, এর কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু পরিবর্তনই দুনিয়ার নিয়ম। কাজেই পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তবে এ পরিবর্তন কিভাবে ও কখন আসবে এটা চিন্তাভাবনার বিষয়। ইতিহাসে দেখা যায় এবং বাঙলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসেও দেখা যায় যে, শাসন যতই নির্যাতনমূলক, নিষ্ঠুর ও কঠোর হোক, ‘বজ্র আঁটুনী, ফসকা গেরো’ বলে একটা কথা আছে। এটা আমরা দেখেছি শেখ মুজিব সরকার এবং এরশাদ সরকার উৎখাতের মধ্যে। কঠিন শাসনে তারা জনগণকে বেঁধেছিল, কিন্তু সেই শাসনের এমন অবস্থা ছিল যাতে ভেতর থেকেই তা ধসে পড়েছিল। শেখ মুজিবের শাসন খতম হয়েছিল সামরিক বাহিনীর হাতে। কিন্তু সামরিক বাহিনী এ কাজ করতে পারতো না যদি জনগণ শেখ মুজিবের হত্যার পর আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করার মত অবস্থায় না থাকতেন। জনগণের সাথে নাড়ীর যোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়াই ছিল শেখ মুজিবের পতনের কারণ। এরশাদের সাথে জনগণের এ ধরনের কোন সম্পর্ক কখনেই ছিল না। কিন্তু পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর জোরে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। জনগণ সে ক্ষমতার বিরোধীতা করে এমন অবস্থা তৈরী করেছিল যাতে তাঁর ক্ষমতার গেরো ফসকে গিয়েছিল।

বর্তমান আওয়ামী লীগ শাসনের বেড়াজালে জনগণ শৃঙ্খলিত। তাঁদের নড়াচড়ার মত অবস্থা নেই। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণের কোন প্রতিরোধ নেই। এর থেকে মনে হতে পারে যে, এই সরকারের বজ্র আঁটুনী এদেরকে টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু দুনিয়া পরিবর্তনশীল। এর পরিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী। তবে এরা কিভাবে ক্ষমতা থেকে বহিস্কৃত হবে, কিভাবে এর পতন ঘটবে এটা ভেবে দেখার বিষয়।

শেখ মুজিবের সময় সামরিক বাহিনীর সাথে সরকারের সম্পর্ক ভালো ছিল না। সরকার রক্ষী বাহিনীকেই সামরিক বাহিনীর মত ব্যবহার করতো। তাছাড়া তখনকার সামরিক বাহিনীর নেতৃস্থানীয় অফিসাররা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। এখনকার সামরিক বাহিনীর অবস্থা অন্য রকম। এই বাহিনী এখন বাস্তবতঃ ভারত সরকারের প্রভাবাধীন। ভারত যেহেতু এই সরকারের পরম বন্ধু, এ কারণে এই সামরিক বাহিনীর সাথে সরকারের সম্পর্ক ভালো। তাছাড়া সামরিক বাহিনীকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য শেখ হাসিনা তাদেরকে অনেক রকম সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। কাজেই তাদের দ্বারা বর্তমান সরকার উৎখাতের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এরশাদের পতন ঘটেছিল আশীর দশকে তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও ক্রোধ এবং বিভিন্ন দক্ষিণ ও বাম বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের কারণে। বর্তমানে জনগণের মধ্যে সরকার বিরোধী ক্ষোভ ও ক্রোধ থাকলেও আশীর দশকের মত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কোন তৎপরতা নেই। দক্ষিণ ও বামপন্থী দলগুলির কোন তুলনীয় সক্রিয়তা ও ক্ষমতা এখন আর নেই।

কিন্তু বাম ও দক্ষিণ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির এই দুর্বল অবস্থা সত্ত্বেও জনগণের মধ্যে সরকার বিরোধী ক্ষোভ ও ক্রোধ এখন খুব গভীর ও তীব্র। এর কোন প্রতিফলন বা বহিঃপ্রকাশ না থাকলেও এটা আছে। এই অবস্থায় বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির কার্যকর অনুপস্থিতিতে সরকার ও নিষ্ক্রিয় জনগণ এখন মুখোমুখী। এ ধরনের অবস্থা আগে এভাবে কখনো দেখা যায় নি। এটা এক অস্বাভাবিক অবস্থা। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। বস্তুতঃপক্ষে এখন সক্রিয় সরকারের বিপরীতে বাঙলাদেশের জনগণ এক নিষ্ক্রিয় শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সক্রিয়তার একটা নিয়ম হচ্ছে অন্যকে, বিশেষতঃ বিপরীতকে সক্রিয় করা। বাঙলাদেশ এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম হবে এটা মনে করার কারণ নেই। সরকারের বিরুদ্ধে, সমগ্র শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ক্ষোভ ও ক্রোধ নিয়ে জনগণ যেভাবে দাঁড়িয়ে আছেন এটা বিরোধী শক্তির উত্থানের ও শক্তি বৃদ্ধির শর্ত হিসেবে কাজ করছে। বাস্তব অবস্থা এখন এদিক দিয়ে যতই প্রতিকূল মনে হোক।

এই প্রতিকূল অবস্থার একটা বড় দিক হলো জনগণের সকল অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও ক্রোধ থাকলেও তাঁদের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধের মানসিকতা এখন নেই। কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপার নেই। এদিক দিয়ে মধ্য শ্রেণীর শিক্ষিত অংশের অবস্থা সব থেকে খারাপ। তাদের মধ্যে সুবিধাবাদ, ভোগের চিন্তা, লোভ লালসা, দুর্নীতি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার প্রবল প্রাধান্য। এই অবস্থায় তারা কোন বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিরোধ সংগঠিত করতে অক্ষম। অথচ যে কোন অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ দেশে এই শ্রেণীর শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক তৎপরতা এবং জনগণের মধ্যে তাঁদের সক্রিয়তা ছাড়া কোন পরির্তন সম্ভব নয়। এটাই সাধারণ অবস্থা। কিন্তু এই অবস্থাতেও মধ্য শ্রেণীর শিক্ষিতদের মধ্যে জনগণের জন্য কাজ করার মত কেউ নেই এটাও ঠিক নয়। তাঁদের সংখ্যা সামান্য হলেও তাঁরা আছেন। তাঁদের মধ্যে কিছু সংখ্যক জনগণের মধ্যে কাজও করছেন। কিন্তু কাজ করলেও জনগণের মধ্যে, কৃষক শ্রমিক ও শ্রমজীবী অন্যদের মধ্যে সমাজ চেতনার, প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনার ও তৎপরতার অভাব তাঁদেরকে হতাশাগ্রস্থ করে। তাঁরা দেখেন যে, যে জনগণের এগিয়ে আশা দরকার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তারা ব্যক্তি স্বার্থ চিন্তায় মগ্ন এবং নিজেদের উন্নতির স্বপ্নে বিভোর। প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এসব প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। তবে এই প্রতিবন্ধক দূর করার কাজও যে অল্প সংখ্যক শিক্ষিত মধ্য শ্রেণীর কর্মী সমাজ পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করেন তাঁদের।

নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য স্বপ্ন দেখা কোন দোষের ব্যাপার নয়। যাঁরা সমাজতন্ত্র কায়েম করে জনগণকে শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্ত করে তাদের জন্য এক আলোকিত জীবন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান তাঁদের একটা বড় কাজও তো জনগণকে এর স্বপ্ন দেখানো। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করে মানুষ নিজের জীবন যাত্রা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। এর একটা রূপ হলো আত্মকেন্দ্রিকতা। এই আত্মকেন্দ্রিক স্বপ্ন শুধু নিজেকে কেন্দ্র করেই। এর জন্য অন্যের ক্ষতি হলেও অসুবিধা নেই। কিন্তু উন্নতির এই স্বপ্নের আর একটা রূপ হচ্ছে নিজের উন্নতির সাথে অন্যদেরও উন্নতির চিন্তা। অন্যের উন্নতিকে নিজের উন্নতির শর্ত হিসেবে দেখা। অর্থাৎ এই স্বপ্ন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, এই স্বপ্ন এমন যা সকলে মিলে একত্রে দেখে। সমাজ চেতনার সাথে এই স্বপ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আমাদের কাজ হলো জনগণকে এই স্বপ্ন দেখানো। তারা যেভাবে আত্মকেন্দ্রিক স্বপ্ন দেখছে তার থেকে তাদের মুখ ফিরিয়ে তাদেরকে অন্য স্বপ্ন দেখানো। সমাজ নির্মাণের এমন কর্মসূচী তাদের সামনে উপস্থিত করা, এমনভাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়া যাতে তারা এই স্বপ্ন দেখার মত অবস্থায় আসতে পারে। আমরা নিজেরা এই কর্তব্য কাজে ব্যর্থ হলে কৃষক শ্রমিক জনগণকে আত্মকেন্দ্রিক স্বপ্ন দেখার জন্য দোষারোপ করে লাভ নেই, তা অর্থহীন।

এই রাষ্ট্র, এই শাসন ব্যবস্থা, এই সরকার এবং এই সরকারী দলকে বাইরে থেকে যত শক্তিশালী মনে হয়, আসলে এদের অবস্থা সে রকম নয়। প্রথম থেকেই একটি মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্র হিসেবে বাঙলাদেশের যাত্রা। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থেকে, তাদের হুকুম অনুযায়ী সব কিছু করে এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে লুণ্ঠনজীবীদের একটি দল হিসেবে গড়ে তুলে এদেশের শাসক শ্রেণী রাষ্ট্র ও সমগ্র শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল রেখেছে। হঠাৎ করে এদেশের জনগণের একটা অংশের জন্য অবাধ সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হওয়ায় সমাজ ক্রিমিনালাইজড হয়েছে, দেশে শাসক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে এটা অপরাধের জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের জনগণের ওপর নয়, এই অপরাধ জগতের লোকদের ওপর নির্ভর করেই এদেশের শাসন ব্যবস্থা চলছে। কাজেই এর মধ্যে এমন কোন প্রকৃত শক্তি নেই যা এই শাসন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে পারে। এই শাসন ব্যবস্থার নিজের মধ্যেই এর ধ্বংসের বীজ নিহিত আছে।

সরকারী দল আওয়ামী লীগকে এখন প্রকৃতপক্ষে কোন রাজনৈতিক দল বলা চলে না। তৃণমূলে এদের সংগঠন বলে কিছু নেই। গ্রামাঞ্চলে থেকে শহর পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে এদের লোকজন আছে যারা চুরি দুর্নীতি, লুটপাট ইত্যাদির সাথে জড়িত থেকে নিজেদের ধন সম্পদ বৃদ্ধি করছে। এই লোকদের মাধ্যমে এবং পুলিশসহ সকল প্রকার সশস্ত্র ও গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে এরা দেশ শাসন করছে। দেশের জনগণের সম্পদ ও বাইরে থেকে পাওয়া ঋণের মাধ্যমে এই সরকার উপরিকাঠামো, অবকাঠামো ইত্যাদির উন্নতি করছে, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটাচ্ছে কিন্তু জনগণের কাছে এর কোন ফল পৌঁছাচ্ছে না। তাঁরা বঞ্চনার শিকার হয়েই থাকছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেকড়বিহীন ভাসমান অস্তিত্ব।

দুর্নীতি আওয়ামী লীগের মধ্যে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প, ব্যবসা, বাণিজ্য খাতকে গ্রাস করে আছে। এই দুর্নীতির জালে আটকে আছে আওয়ামী লীগ থেকে নিয়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ তাদের সকল স্তরের সংগঠন। যে ছাত্ররা বাঙলাদেশ পূর্ব এই অঞ্চলে ছিল প্রগতিশীল সংগ্রামের ধারক বাহক, তারা এখন আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্রলীগের মধ্যে পরিণত হয়েছে একটা অপরাধী বা ক্রিমিনালাইজড সংগঠনে। ছাত্রলীগ মানেই হচ্ছে চোর, দুর্নীতিবাজ, ধর্ষণকারী অথবা তাদের সাঙ্গপাঙ্গ। ঠিক এই মুহূর্তে সংবাদপত্রে যে সব রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে তার থেকে দেখা যায় যে, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা ক্যাসিনো বাণিজ্যে বসতি করছে। অগুণতি জুয়োর আড্ডা ক্যাসিনোর মালিক ও সংগঠক তারাই। তাদের দুর্নীতি ও চরিত্রহীনতা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যাতে শেখ হাসিনাকে এসব নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এদের ওপর পুলিশ র‌্যাব দিয়ে হামলা করতে হচ্ছে। কিন্তু এসব দুর্নীতি এখন বিস্তৃত হয়ে যে পর্যায় এসেছে তাতে একে দমন করা ও নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সরকারী দলের নেতৃস্থানীয় লোকজন, মন্ত্রী আমলা ও সশস্ত্র বাহিনীর লোকজনই হলো এই দুর্নীতিবাজ ক্রিমিনালদের পৃষ্ঠপোষক, যাদেরকে বলা হয়‘গড ফাদার’।

এই যেখানে অবস্থা সেখানে এটা ভাবার কারণ নেই যে, এই সমাজ ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, সরকার ও সরকারী দল খুব শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব। এরা এখনো পর্যন্ত টিকে আছে এ কারণে যে, জনগণ নিজেদের মনে এদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও ক্রোধ ধারণ করে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদেরকে এদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার মত কোন শক্তি নেই। এদিক দিয়ে বলা চলে যে, তাঁরা এখন এ ধরনের শক্তির উত্থানের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই উত্থানের জন্য কাজ করাই আজকের দিনে বাঙলাদেশের সচেতন, প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের, যে কোন প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের আশু জরুরী কর্তব্য। জনগণ সংগ্রামের জন্য যে নেতৃত্বের অপেক্ষায় আজ ঐতিহাসিকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, সে নেতৃত্ব তাঁদেরকেই দিতে হবে। বাঙলাদেশের সমাজভূমিতে এখন এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের শর্তই তৈরী হয়েছে।

এদেশ থেকে নির্বাচন উচ্ছেদ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। পাঁচ বছর অন্তর এরা নির্বাচনের একটা মহড়া দিচ্ছে কিন্তু ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে না দিয়ে ভোটের বাক্সে ব্যালট পেপার এরা নিজেরাই ফেলছে আমলা ও পুলিশের সাহায্যে। সারা দেশকে এরা এখন পরিণত করেছে পুলিশের রাজত্বে, এক মাফিয়া রাষ্ট্রে। কাজেই নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের জন্য সংগ্রামের কোন পথ বর্তমান শাসক শ্রেণী আজ খোলা রাখে নি। জনগণকে কোন্ পথ ধরে সংগ্রাম করতে হবে তার পথ শাসক শ্রেণী ও তাদের সরকারই এখন নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ পথ হলো জনগণকে সংগঠিত করে, তাঁদের সংগঠিত শক্তির ওপর নির্ভর করে সংগ্রাম করা। কৃষক শ্রমিকের মধ্যে শ্রেণীভিত্তিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজ করা। এক কথায় বাঙলাদেশের গ্রাম থেকে শহরাঞ্চল সর্বত্র শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলা। শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে শ্রেণী চেতনা বৃদ্ধি করা। বাঙলাদেশে কোন গেরিলা যুদ্ধ সম্ভব নয়। শ্রেণী সংগ্রাম সংগঠিত করে শ্রমজীবী জনগণকে গণঅভ্যুত্থানের দিকে পরিচালনা করতে হবে। আমরা এদেশে গণঅভ্যুত্থান দেখেছি ১৯৫২ সালে, ১৯৬৯ সালে, ১৯৭১ সালের মার্চে এবং ১৯৯০ সালে। এসব অভ্যুত্থানে জনগণই মূল শক্তি হলেও বুর্জোয়ারা নেতৃত্বে থেকে প্রত্যেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নোতুন করে ক্ষমতায় বসেছে। যেহেতু আগামী দিনে বাঙলাদেশে যে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান হবে তাতে বাম অথবা দক্ষিণ বুর্জোয়া কারও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা থাকা সম্ভব নয় সেজন্য তার নেতৃত্ব প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তির হাতেই থাকবে। আগামী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারাই ক্ষমতায় আসবে। এটা কোন কল্পনা বিলাস নয়। বাঙলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এই সিদ্ধান্তই বাস্তব এবং অপরিহার্য। কাজেই বর্তমানে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তির অবস্থান যতই দুর্বল হোক, এই শক্তির বৃদ্ধি ও বিকাশ অবধারিত। এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই বাঙলাদেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী, সমাজ ও সংস্কৃতি কর্মীদেরকে কাজ করতে হবে। যে যেখানে আছেন সেখানেই তাঁদেরকে সংগঠিত হতে হবে। এই সব সংগঠনের কাছে, এদের সংগ্রামের মুখে শোষক শাসক শ্রেণীর ভঙ্গুর শক্তি, তাকে আপাতঃদৃষ্টিতে যতই বড় মনে হোক, বিধ্বস্ত, ধ্বংস ও পরাজিত হবে।

প্রথম প্রকাশ: ১৯.৯.২০১৯, সংস্কৃতি পত্রিকা

Keywords