নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন, ‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি (...)

বাংলাদেশে বেপরোয়া ইসকন, ‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’য় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা

27 October 2019, southasianmonitor PrintShare on Facebook

ইসকনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবও বাড়ছে। একই সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে উঠছে সংগঠনটির সদস্যরা। ‘আযানের সময় ঢোল-বাদ্যযন্ত্রের বিরতির’ রীতিকেও সমীহ করছে না তারা। যাকে ‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’ বলছেন সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিরা। আর বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় অভিযুক্ত ‘ইসকন সদস্য’ অমিত সাহাকে প্রথমে মামলার এজহার থেকে বাদ এবং আটকে বিলম্বকে এই গোষ্ঠীর ‘প্রভাবের প্রমাণ’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসকন (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ) প্রতিষ্ঠার ২৯ বছরে সংগঠনটির মোট স্থায়ী বা আজীবন সদস্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৯০০ জনের মতো। গত দেড় দশকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজারের ওপরে। সাধারণ ভক্ত-অনুসারির সংখ্যা এর কয়েকগুণ। ২০০৯ সালের দিকে এর মন্দিরের সংখ্যা ছিল ৩৫টি। বর্তমানে তা দ্বিগুণ বেড়ে ৭১টিতে দাঁড়িয়েছে।

পুরান ঢাকার ৭৯ স্বামীবাগে স্বামী ত্রিপুরলিংগ প্রতিষ্ঠিত মন্দির ও আশ্রমটি অর্পণ নামার ভিত্তিতে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে দখলে নেয় ইসকন। বর্তমানে এটিই ইসকনের প্রধান কার্যালয়। এর ঠিক উল্টোদিকে ৮২ স্বামীবাগ প্লটের ওপর রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো স্বামীবাগ জামে মসজিদ। মসজিদটির পুরনো স্থাপনার স্থানে বর্তমানে ৫ তলা ভবন। মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা প্রায় দেড় হাজার। মুসল্লিদের অভিযোগ প্রতিনিয়ত আযান-নামাজের সময়ও ইসকন মন্দিরে লাউড স্পিকারে ঢোল-বাদ্যের সঙ্গে চলে কৃষ্ণ কির্তন। যা নামাজে বিঘ্ন ঘটায়।

গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে টানা কয়েক দিনের অনুষ্ঠান চলে। এরই এক দিন গিয়ে দেখা গেল আশ্রম-মন্দির ঘিরে এলাকা জুড়ে সাজসাজ রব, অসংখ্য মানুষ। গভীর রাত অবধি লাউড স্পিকারে ঢোল-বাদ্যের সঙ্গে চলে আরতি, ভক্তিগিতি, কৃষ্ণ কির্তন ও নাচ। মাঝখানে আসর, মাগরিব ও এশার আযান হয়, নামাজ হয় কিন্তু সাময়িক বিরতিটুকুও দেয়নি ইসকন।

এর কয়েকদিন পরে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। মসজিদের খাদেম, মুয়াজ্জিন, মুসল্লি এবং স্থানীয় দোকানদারদের বক্তব্য, ‘এভাবেই চলে।’

এতে বিচলিত সাধারণ হিন্দুরাও। ইসকন মন্দির থেকে ফিরে যাওয়ার পথে তপন দাস নামের একজন বলেন, ‘ইসকনে যোগ দিতে এর কর্মীবাহিনী অনেক দিন ধরে পিড়াপিড়ি করে আসছিল। বলেছিল, একদিন এসে যেন ঘুরে যাই, ভালো লাগবে। কিন্তু তাদের আচরণ আমার পছন্দ হয়নি। এই দেশে আমরা বড় হয়েছি। পুজা-অর্চনা, অনুষ্ঠান সব কিছুতে দেখে এসেছি আযানের সময়তো বটেই, মাগরিবের সময় (সন্ধ্যায়) অবশ্যই বিরতি দেয়া হয়। কিন্তু এখানে সেই সমীহটুকু দেখলাম না। উগ্রতার মধ্যে ভালো কিছু থাকতে পারে না।’

মসজিদ কমিটির সহসভাপতি মো. সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘আমরা তাঁদেরকে (ইসকন সদস্যদেরকে) সরাসরি কিছু বলিনা, কী বলতে গিয়ে কী ঘটে যাবে এই আশঙ্কায়। যা কিছু বলি প্রশাসনের মাধ্যমে। থানা-পুলিশকে বিষয়টি কয়েকবার জানানো হয়েছে। ইসকনই আমাদের কাছে আযান ও নামাজের সময়সূচী চেয়েছে, সেই অনুযায়ী দেয়াও হয়েছে। কিন্তু কয়েকটা দিন বন্ধ রেখে আবার শুরু করেছে। এখন সেভাবেই চলছে।’

মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগটি প্রথমে অস্বীকার করেন ইসকন বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি এবং প্রবীণ ব্রহ্মচারি কৃষ্ণ কির্তন দাস। কিন্তু পরে তিনি বলেন, সবার বোধ-চেতনা সমান নয়। আমিও সব সময় থাকিনা। দু’একটা দিন এদিক সেদিক হতে পারে। আমার সামনেই একদিন এমনটি ঘটেছিল। আমি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে বলি- ইউ ক্যান্ট ডু দ্যাট।

এর পরের দিন ক্যামেরার সামনে তিনি একে ‘ছন্দপতন’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার মতে এগুলো ধর্তব্যের মধ্যে পরে না।’

এর আগে ২০১৪ সালে রোজার মাসে তারাবির নামাজের সময় উচ্চশব্দে ঢোল-বাদ্য বাজানো বন্ধ করতে বলা হলে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও প্রশাসনের হস্থক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে এই সবকিছুকেই ‘স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা’ বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে এত বছরের পুরনো একটি মসজিদ রয়েছে, মন্দির ও আশ্রমও ছিল। অতীতে সেখানে কিছু ঘটলনা, এখন ঘটছে কেন?

রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘বেপরোয়া’ আচরণ শুভ কিছু বয়ে আনতে পারেনা। ইসকন আন্তর্জাতিক একটি সংগঠন। পরধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা, মর্যাদা তাদের থাকা উচিত।’

এদিকে ইসকনের প্রসার আর প্রভাবের তথ্য জানান ইসকনের ওই কেন্দ্রীয় স্বামীবাগ আশ্রমের ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮-২০১৩ মেয়াদে গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করা তরুণ এই ব্রহ্মচারী গত মে মাসে এই প্রতিবেদককে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের মধ্যে ৩/৪ জন করে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি রয়েছেন। আর নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রেই ২/৩ জন করে থাকছেন।

ইসকনের শর্ত হচ্ছে, দীক্ষা নিতে কেউ আগ্রহী হলে তাকে কমপক্ষে এসএসসি পাস ও বয়সে তরুণ হতে হবে। এই তরুণদের দিয়েই চলছে ইসকনের প্রচার কাজ। গৌরহরিদাস জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সারাটা বেশি।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র এবং বুয়েট ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক অমিত সাহা, যার রুমেই (শেরে বাংলা হলের ২০১১) নির্যাতন চালিয়ে হত্যা তড়িত ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়। মূল ধারার গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বুয়েট শিক্ষার্থী অনেকের অভিযোগ, অমিত সাহা ইসকনের সদস্য এবং আবরারকে ফলো করা, তার ফেসবুক আইডি চেক করা এবং তাকে ছাত্রলীগের কাছে ‘শিবির’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন অমিত। কিন্তু আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনার পরে সারা দেশ যখন ক্ষোভ এবং নিন্দার ঝড় উঠে তখন ছাত্রলীদের সদস্যদের বহিষ্কার, মামলার আসামি এবং আটক করে রিমান্ডে নেয়া হয়। তখনও সবকিছু থেকে মুক্ত এবং ধারা ছোয়ার বাইরে থাকেন আমিত শাহ। এ নিয়ে সন্দেহ, সমালোচনা এবং ‘ইসকন সম্পৃক্ততার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছেন’ এমন ধারনা সাধারণ মানুষের মনে বাড়তে থাকলে ৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অমিত সাহাকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।’

এরপর ১০ অক্টোবর অমিত সাহা আটক হন এবং ১১ অক্টোবর ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে আরো ৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে।

তবে ইসকনে অমিত শাহের সম্পৃক্ততা এখন অস্বীকার করছেন কেন্দ্রীয় আশ্রমের ব্রহ্মচারি এবং ‘অমৃতের সন্ধানে’ পত্রিকার সম্পাদক সুখী সুশীল দাস। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে চিনিই না। এই ঘটনার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে ইসকনকে জড়ানো হচ্ছে’। একই বক্তব্য কৃষ্ণ কির্তন দাসেরও।

এদিকে রথযাত্রা উপলক্ষে ফুড ফর লাইফ কর্মসূচির আওতায় গত ১১ই জুলাই থেকে সপ্তাহব্যাপী চট্টগ্রাম নগরীর ১০টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করে ইসকন। তখন প্রসাদ বিতরণের সময় ইসকনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ মন্ত্র পাঠ করানোর অভিযোগ উঠে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। গত ১৮ জুলাই আইনজীবী তৈমুর আলম খন্দকার দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন নজরে আনলে এ ঘটনাকে ‘অন্যায়’ বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

তখন হাইকোর্ট বলেন, ‘একটি এনজিও কোনও স্কুলে খাবার বিতরণ করতে পারে। কিন্তু জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে যদি প্রসাদ খাইয়ে মন্ত্র পাঠ করিয়ে থাকে, তবে সেটা অন্যায়।’

ওই দিন রাতেই চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনারের কাছে খাবার বিতরণের ব্যাখ্যা দিয়ে এক চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করে ইসকন এবং এর পরের দিন বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দুঃখ প্রকাশ করেন ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক দারুব্রহ্ম জগন্নাথ দাস। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করারও অঙ্গীকার করেন।

এছাড়া ইসকনের বিরুদ্ধে মন্দির দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর এলাকার শ্রী শ্রী রশিক রায় জিউ মন্দির দখল নিয়ে ২০০৯ সালে দু’পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহতের ঘটনাও ঘটে। একই ঘটনার জের ধরে ২০১৮ সালে মন্দির তালাবদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয় স্থানীয় প্রশাসন। বর্তমানে ওই মন্দিরটি ইসকনের দখলেই রয়েছে বলে জানান সুখী শুশীল দাস।

১৯৬৬ সালে ইসকন প্রতিষ্ঠা করেন এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। তাঁর জন্মস্থান ভারতের উত্তর কলকাতার ১৫১ নং হ্যারিসন রোডে হলেও তিনি ইসকন প্রতিষ্ঠা করেন আমেরিকায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল ও শ্রীলংকায় তাদের উপস্থিতির তথ্য জানাচ্ছে ইসকন সেন্টারস ডিরেক্টরি। এর মধ্যে ইসকনের কেন্দ্রীয় দপ্তর ভারতের মায়াপুরে যেখানে স্বামী প্রভুপাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে ভারতের চেয়েও তাদের প্রসার বাড়ছে বাংলাদেশে। এ প্রসঙ্গে গত মে মাসে ‘রাম ভক্ত’ আর ‘কৃষ্ণ ভক্তের’ ফারাক টানেন কৃষ্ণ কির্তন দাস। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটার পর একটা ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ইসকন। অভিযোগ-বিতর্কও পিছু ছাড়ছে না তাদের। যাকে ‘ভিন্ন দৃষ্টিতেই’ দেখছেন সাধারণ মানুষ। সজাগ দৃষ্টি প্রশাসনেরও।

Keywords

- -