নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > ফরহাদ মজহার > বাংলাদেশে ইসকনের ততপরতা

বাংলাদেশে ইসকনের ততপরতা

27 October 2019, ফরহাদ মজহার PrintShare on Facebook

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইস্‌কন (International Society for Krishna Consciousness) এবং বাংলাদেশে তাদের তৎপরতা সম্পর্কে ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন এবং উৎকন্ঠিত। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান যে ধর্মই হোক সচেতন নাগরিক মাত্রই বাংলাদেশে কোন প্রকার ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিরোধ চান না। কিন্তু ইসকনের তৎপরতা সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরি করছে। উৎকন্ঠা সে কারণেই।

ইসকন এই দেশের সনাতন হিন্দু ধর্মের কোন প্রতিনিধি নয়, তাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠানও নয়। বিশেষত তাদের আন্তর্জাতিক কর্পোরেট অপারেশানকে চৈতন্যের জাতপাত বিরোধী সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন এবং প্রেমধর্মের প্রতিনিধি গণ্য করাও মারাত্মক বিভ্রান্তি ও ভুল। এ কালে প্রেম ধর্ম কায়েম করার অর্থ সবার আগে প্রেমশূন্য পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং ভোগবাদ চ্যালেঞ্জ করা। ইসকন তাদের ভক্তদের নিরামিষাশি ও মিতাচারী হবার উপদেশ দিলেও বিশাল বিশাল মন্দির স্থাপনের মধ্য দিয়ে যে বার্তা দিয়ে থাকে সেটা দৃশ্যমান ভোগবাদী সংস্কৃতির বার্তা। ভার্জিনিয়ায় প্রভুপাদের স্বর্ণ প্রাসাদ বা ’নব বৃন্দাবন’ তার একটি দৃষ্টিকটু নজির। ’নব বৃন্দাবন’ বা স্বর্ণ প্রাসাদের প্রতিযোগিতা রাজরাজড়াদের সামন্ত ক্ষমতা প্রদর্শনের সঙ্গেই তুলনীয়। ভার্জিনিয়ায় ইসকনের ’নব বৃন্দাবন’-কে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের তাজমহলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। চৈতন্যের ধর্ম ভাবে হৃদয়ের বৃন্দাবনকে বৃহৎ ও বিশাল করাই ছি লক্ষ্য, বাইরের লোক দেখানো চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া ধর্ম মন্দির দিয়ে মানুষ তৈরি হয় না, আর্কিটেকচার হয়। ইসকনের সমালোচনা, পর্যালোচনা এবং তাদের কার্যক্রম বিরোধিতা সনাতন হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা নয়। বরং বাংলার ধর্ম ও ভাবের বিকৃতি রোধের জন্যই দরকারি।

ইসকন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। ষাট থেকে সত্তর দশক ব্যাপী পাশ্চাত্যের তরুণদের গভীর আধ্যাত্মিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে হরে কৃষ্ণ মুভমেন্ট হিশাবে এর শুরু। ধর্মীয় আন্দোলন হিশাবে গড়ে উঠলেও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের মধ্য দিয়ে পৃথিবী ব্যাপী একটি ’কাল্ট হিশাবেই ইসকন পরিণতি লাভ করেছে। অর্থ, প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় ইসকন নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বিদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যেন আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির উপাদান হিশাবে ব্যবহৃত না হয় তার জন্যই ইসকনের পর্যালোচনা জরুরি। সম্প্রতিকালে দিনাজপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম ভোলায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ইসকনের বিরোধ ও সংঘর্ষ এটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশে ইসকন মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বিদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের বিরোধ, সংঘাত ও দাঙ্গা তৈরির জন্য তৎপর।

ভোলায় সম্প্রতি পুলিশের গুলিতে চারজন শহিদ ও কয়েকশো মানুষ আহত হওয়ার আগে ইসকন কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল। এলাকায় আগে থাকতেই ক্ষোভ জারি ছিল। ইসকনের সঙ্গে স্থানীয়দের দ্বন্দ্বের সঙ্গে ভোলায় পুলিশের গুলি চালানোর সম্পর্ক আছে কিনা আছে কিনা তার নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। ইসকন মন্দির কেন্দ্র করে দাঙ্গা হাঙ্গামা বাংলাদেশে নতুন ঘটনা নয়। অনেক আগে থেকেই ঘটছে। ভোলার ঘটনার আগে দিনাজপুরে এবং সিলেটে ইসকন ও স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে হানাহানি ঘটেছে। চট্টগ্রামে স্কুলের ছাত্রদের প্রসাদ বিতরণ করে হরে কৃষ্ণ বলানোর ভিডিও ভাইরাল হবার পর ইসকন বাংলাদেশে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হচ্ছে ইসকন-এর তৎপরতা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ ও আপত্তিকে কখনই গ্রাহ্য করা হয় নি, বরং সবসময়ই অগ্রাহ্য করে দোষ দেওয়া হয়েছে মুসলমানদের অসহনশীলতা এবং ইসলামপন্থিদের সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া হিশাবে। এতে স্থানীয়দের ক্ষোভ বেড়েছে। তথ্য সংরহ ও বিশ্লেষণে প্রশাসনের অদক্ষতা প্রকট। তদুপরি সংকটের গভীরতা না বোঝার কারণে বাংলাদেশে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ইসকনের বিরুদ্ধে স্থানীয় অধিবাসীদের প্রধান অভিযোগ কি, এবং বিরোধ সৃষ্টির প্রধান কারনই বা কি? সেটা হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির দখল এবং স্থানীয় অধিবাসীদের জমি দখলের অভিযোগ, কিন্তু সরকারি ভাবে এর কোন তদন্তই হচ্ছে না। ইসকন বাংলাদেশের সরকার ও প্রশাসনিক পর্যায়ে শক্তিশালী। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিসহ পুলিশ ও প্রশাসনের অনেকেই ইসকনের সক্রিয় সদস্য। আবরার ফাহাদ-এর হত্যায় অভিযুক্ত অমিত সাহা এবং তাদের পরিবারও ইসকনের সদস্য বলে গণমাধ্যম জানিয়েছে। বাংলাদেশে যে বিপুল সংখ্যক ইসকন মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিম্বা ইসকনের বলে দাবি করা হচ্ছে সেখানে জমি বা মন্দিরগুলো কিভাবে ইসকন মন্দিরে রূপান্তরিত হোল সে সম্পর্কে পরিষ্কার কোন তথ্য বা গবেষণা নাই। অনেক মন্দিরেরই স্থানীয় ইতিহাস আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে মন্দিরগুলো ইসকনের মন্দিরে রূপান্তরিত হোল? এগুলো অতি প্রাথমিক জরুরি তথ্য। জানা খুবই জরুরী। আমার অনুমান প্রশাসনের কাছে এ ব্যাপারে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য নাই।

ইসকন একটি মার্কিন সংগঠন, ১৯৬৬ সালে অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ মার্কিন দেশে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। একটি মার্কিন ধর্ম সংগঠন বাংলাদেশে এতোগুলো মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ফেলল, যা তারা পশ্চিম বাংলা, বিহার কিম্বা উড়িষ্যাতেও পারে নি। ইসকনের প্রভাব পশ্চিম বঙ্গে যতোটা না তার চেয়ে হাজারগুন বাংলাদেশে। এটা খুবই আশ্চর্যের বৈকি! বাংলাদেশ নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কি আসলে সেটা তদন্ত করা সরকার ও প্রশাসনের উচিত ছিল। কিন্তু হয় নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংগঠনটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিশাবে নিজেকে দাবি করলেও সবসময়ই ’কাল্ট’ হিশাবেই পরিচিত হয়েছে। এছাড়া ইসকনের বিরুদ্ধে ’ব্রেইনওয়াশিং’, শিশু নির্যাতন ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে মামলা মোকদ্দমাও আছে। এই প্রসঙ্গে প্রয়োজনে আলাদা আলোচনা করব। আমাদের জন্য এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইসকনের আদর্শিক দিক। এই বিশেষ আন্তর্জাতিক হরেকৃষ্ণ মুভমেন্ট বাংলার গৌড়ীয় বৈষ্ণব চিন্তার আদৌ প্রতিনিধিত্ব করে কিনা সে সম্পর্কে বাংলাভাষী ও বাঙালিদের পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। বিস্ময়কর হচ্ছে সাধারণ ভাবে ধর্মের অনীহা ও বিদ্বেষের কারণে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় এই বিষয়ে আলোচনা একদমই অনুপস্থিত বলা যায়। কিন্তু অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। ইদানীং দেখা যাচ্ছে ইসকন ’হরে কৃষ্ণ’ কীর্তনের জায়গায় ’জয় শ্রীরাম’ কীর্তনও তাদের কীর্তনাঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করছে।

ধর্ম ব্যাখ্যা, ধর্ম চর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার অধিকার সকলেরই আছে, ইসকনেরও রয়েছে। কিন্তু ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাংলাভাষী ও বাঙালিদের জন্যই পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালে আন্তর্জাতিক নব্য ধর্মীয় আন্দোলন হিশাবে ইসকন কেন এবং কিভাবে গড়ে উঠল সেটা সঠিক ভাবে বোঝা এবং তার বিচারই আমাদের জন্য জরুরি কাজ। বিশেষত বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের পারস্পরিক বোঝাবুঝির জায়গা উপেক্ষা করা বিপজ্জনক। এড়িয়ে যাওয়া উভয়ের জন্য আত্মঘাতী হবে।

শ্রীল প্রভুপাদ ১৯৭৭ সালে মারা যান। এরপরে ইসকন যে রূপে বিবর্তিত হয়েছে তার সঙ্গে তার আদি কল্পের মিল আছে কিনা তা নিয়ে ভক্তদের মধ্যেই তীব্র তর্ক রয়েছে। বিশেষত দুটো তর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনটি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের চেয়েও আদতে বিশ্বব্যাপী মার্কিন গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সম্প্রতিকালে ইসরায়েল ও ভারতীয় গোয়েন্দা তৎপরতার আদর্শ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং ভারত ও ইসরায়েলের গভীর সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সম্বন্ধ ও সহযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে ইসকন বাংলাদেশে ভারত-ইসরায়েলের গোয়েন্দা তৎপরতার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম কিনা সেই তর্ক উঠেছে।

ইসকন-এ ’প্রভু’দের নাম পরিবর্তন করবার রীতির ফলে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড বা আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখা সহজ। যেমন ইসকনের প্রভাবশালী নেতা জয়াদ্বৈত স্বামীর আসল নাম ’জে ইসরায়েল’ (Jay Israel), তাঁর জন্ম নিউজার্সি রাজ্যে একটি ইহুদি পরিবারে। ইস্কনের নীতি নির্ধারনে ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আরেকজন অতিশয় প্রভাবশালী ব্যাক্তি হচ্ছেন রাধানাথ স্বামী। তাঁর আসল নাম রিচার্ড স্লাভিন (Richard Slavin)। তিনিও পারিবারিক সূত্রে ইহুদি। তাঁর মা ইডেল ও জিরাল্ড স্লাভিন। তাঁরা রাশিয়া, রুমানিয়া, পোলান্ড ও লিথুনিয়া থেকে যে সকল ইহুদি পরিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিফিউজি ছিল তাঁদেরই সন্তান। রিচার্ড স্লাভিনের পরিচিতি দিচ্ছি কারন ভারতে ও বাংলাদেশে ইস্কুলের বাচ্চাদের দুপুরের খাবার পরিবেশনার কর্মসূচী এরই পরিকল্পনা। রিচার্ড স্লাভিন ইসকনের কার্যকলাপ বোম্বাইয়ে বসে পরিচালনা করেন। মনে করিয়ে দিচ্ছি চট্টগ্রামে স্কুল বাচ্চাদের ’প্রসাদ’ খাইয়ে হরে কৃষ্ণ বলিয়ে নেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ফলে ইসকন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

জে ইসরায়েল ও রিচার্ড স্লাভিন দুই জনই চল্লিশ থেকে ৫০ বছর ধরে ইসকনের নীতি নির্ধারণী কাজের সঙ্গে জড়িত। রিচার্ড স্লাভিন ইসকনের গভর্নিং বডি কমিশনের সদস্য এবং একজন দীক্ষাগুরু। অন্যদের আসল পরিচয় জানলে ইস্কনের পরিচালনা কমিশন আসলে কারা চালায় আমরা তা বুঝতে পারব। এই তথ্য জোগাড় করা সরকারের দায়িত্ব।

সংগঠন হিশাবে ইসকনের বিবর্তনটা সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর দ্রুতই ঘটেছে। ভক্তদের মধ্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হচ্ছে সামগ্রিক ভাবে সংগঠনটিতে ’ইথনিক’, বিশেষ ভাবে ইহুদি প্রভাবে বেড়েছে। যার ফলে শ্রীল প্রভুপাদের ধর্মচিন্তার ধারণা থেকে ইসকন বিচ্যুত হয়েছে। ভক্তদের মধ্যে ইহুদি প্রভাবের একটা নামও আছেঃ ’জেবিডি’ (Jewish Background Devotee)। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা যখন ইসকনকে একটি ’ইহুদি’ সংগঠন বলে দাবি করেন ও জায়নিস্ট তৎপরতা প্রতিরোধের কথা বলেন তখন তাঁরা আসলে ইসকনের বিপুল সংখ্যক কৃষ্ণভক্তদের অভিযোগেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। একে নিছকই ইহুদি বিদ্বেষ হিশাবে গণ্য করবার কোন কারণ নাই।

ইসকনের সঙ্গে যুক্ত আন্তরিক রাধাকৃষ্ণভক্তকুল আমাদের আলোচনার বিষয় নন। তাঁদের সঙ্গে সম্প্রীতি চর্চাও জরুরি কাজ। আশা করি তাঁরাও আমাদের উৎকন্ঠা আন্তরিক ভাবেই বিবেচনা করবেন।

Keywords

-