নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > অরাজকতার বাংলাদেশ

অরাজকতার বাংলাদেশ

10 October 2019, বদরুদ্দীন উমর PrintShare on Facebook

৭ অক্টোবর রাতে ঢাকায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার নেতাকর্মীরা। ‘বুয়েটে ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা’ শীর্ষক এক রিপোর্টে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন আবরার।

এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা। তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলিট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন। এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ (যুগান্তর, ০৮.১০.২০১৯)।

বুয়েটে এই দানবীয় হত্যাকাণ্ড, পিটিয়ে মানুষ মারা কোনো নতুন ঘটনা নয়। এ ধরনের অজস্র ঘটনা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঘটিয়েছে। সদরঘাটে বিশ্বজিৎ নামে এক যুবককে তারা পিটিয়ে মেরেছিল নৃশংসভাবে। সবার চোখের সামনে এ ঘটনা ঘটেছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণ যথেষ্ট ছিল; কিন্তু বিচারের এক প্রহসনের পর শেষ পর্যন্ত সব অপরাধীর শাস্তি হয়নি। অনেকে ছাড়া পেয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতাদের জিরো টলারেন্সের জায়গায় টলারেন্সের স্বাক্ষর তারা রেখেছিল।

আবরার ফাহাদকে হত্যার কারণ, তিনি তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে কয়েক দিন আগের বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। এই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি যা বলেছিলেন সেটা যুগান্তরের অনলাইনে প্রকাশিত এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। রিপোর্টটি নিম্নরূপ : ‘‘ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ৮ ঘণ্টা আগে ভারতকে সমুদ্রবন্দর, পানি ও গ্যাস দেয়ার চুক্তির বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ। ... স্ট্যাটাসে ফাহাদ লেখেন ‘৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিয়েছিল।

বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ ইন্ডিয়াকে মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। ... কয়েক বছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।’’

আবরার ফাহাদের দীর্ঘ স্ট্যাটাসের এটা একটা অংশ মাত্র। এতে তিনি ভারতের সঙ্গে কয়েকদিন আগে স্বাক্ষরিত চুক্তির অনেক সমালোচনা করেন। আসলে এই চুক্তি খুব বিস্ময়কর। কারণ এই চুক্তিতে ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘মানবিক’ কারণে এটা দেয়া হয়েছে! মানবিক কারণ!! তাহলে ‘মানবিক’ কারণে ভারত বাংলাদেশকে তিস্তার পানি কেন দিচ্ছে না? এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশ আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে কিছুতেই তার ন্যায্য হিস্যার পানি দিচ্ছে না।

এটা কি একতরফা ব্যাপার নয়? অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই যে, ভারত বাংলাদেশের কাছে যা চেয়েছে, সবই বাংলাদেশ দিয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে বলতে গেলে কিছুই দেয়নি। তাহলে ভারতের সঙ্গে এই বন্ধুত্ব কি শুধুই একতরফা? বাংলাদেশ ভারতের পরম বন্ধু; কিন্তু এর প্রতিদানে ভারত যা করছে সেটা বন্ধুত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত।

দেশের জন্য যেসব চুক্তি বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে করে আসছে একের পর এক, সেগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। কাজেই এ বিষয়ে কথা বলা, প্রতিবাদ করার অধিকার এ দেশের জনগণের আছে। কিন্তু এ অধিকারের ওপর যেভাবে নিয়মিত হামলা করা হয়ে আসছে, তার সর্বশেষ উদাহরণ হল আবরার ফাহাদ হত্যা।

ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং উপরোক্ত চুক্তির সমালোচনা করায় তাকে শিবিরের সদস্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর থেকে মনে হয়, একজন শিবিরের সদস্য হলেই তাকে হত্যা করা দেশপ্রেমের কাজ! এ ধরনের পরিস্থিতি যেখানে থাকে, সেখানে যে ফ্যাসিবাদের রাজত্ব কায়েম হয় এতে সন্দেহ কী? প্রথমত, কেউ যদি শিবিরের সদস্য হয়, সে অধিকার তার আছে। শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করা দরকার।

এটাই গণতান্ত্রিক নিয়ম। শিবিরের সদস্য হওয়ার কথা বলে তাকে হত্যার যৌক্তিকতা উপস্থিত করেছে ছাত্রলীগ নেতারা, যা তাদের ফ্যাসিস্ট চিন্তাভাবনা ও তৎপরতারই পরিচায়ক। একজন আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করলেই তাকে শিবিরের লোক বলে আখ্যায়িত করা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে গণতান্ত্রিক কোনো উপাদান নেই।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ইত্যাদি আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনসহ খোদ আওয়ামী লীগে এখন চুরি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ছাড়িয়ে পড়েছে। এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা যতই লম্বা-চওড়া কথা বলুন, যতই তারা তাদের জিরো টলারেন্সের কথা বলুন, সত্যকে আড়াল করা যাবে না।

যুবলীগের ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে। যুবলীগ হচ্ছে ছাত্রলীগেরই পরবর্তী সংস্করণ। ছাত্রলীগের সদস্যরা ছাত্র অবস্থা থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর যুবলীগের সদস্য হয়। কাজেই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুবলীগের নাড়ির যোগ। আর আওয়ামী লীগ হল তাদের সবার পৃষ্ঠপোষক, রক্ষক এবং নিরাপত্তার পাহারাদার। যুবলীগের দুর্নীতিবাজ সন্ত্রাসীরা যা কিছু করে চলেছে, তার থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিজেদেরকে কিছুতেই আলাদা রাখতে পারেন না।

এ বিষয়ে ‘সম্রাটের অর্থ অনেক নেতার পকেটে’ শীর্ষক যুগান্তরের এক রিপোর্টে যা বলা হয়েছে, এটা শুধু হাজার হাজার ঘটনার একটি। এতে বলা হয়, ‘যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী খুনের পর অপরাধ জগতের ডন হয়ে ওঠেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তার অপরাধ-সাম্রাজ্যের পেছনে আছেন অনেক রাঘববোয়াল। যারা নিয়মিত সম্রাটের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা নিতেন। ক্যাসিনো আয়ের বড় অংশ শাসক দলের এক নেতা, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতাকে দিতেন।

এই ক্যাসিনো নয়, চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং টেন্ডারবাজি থেকে আয়ের অংশও দিতেন ওই নেতাদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা তার কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিতেন। তিনি যুবলীগের পদ-বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সবাইকে দেয়ার পর যা থাকত তা পাচার করেছেন মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে। গ্রেফতারের পর সম্রাট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও কয়েক নেতার কথা বলেছেন।’ (যুগান্তর, ০৮.১০.২০১৯)।

সম্রাটের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্কে যেসব আওয়ামী লীগ নেতার কথা এখানে বলা হয়েছে, দেখা যাবে তারা কেউই গ্রেফতার হয়নি। শুধু তাই নয়, তাদের নাম পর্যন্ত গোপন রেখে দেয়া হবে। তারা অধরাই থেকে যাবে। এই হচ্ছে এখন বাংলাদেশের অবস্থা। সারা দেশ এখন পরিণত হয়েছে অরাজকতার এক বেপরোয়া ক্ষেত্রে। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের জিরো টলারেন্সের বস্তাপচা বুলি এক মস্ত বাগাড়ম্বর ও মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

০৮.১০.১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Keywords

-