নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > আমাজন বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড ও পরিবেশ সংকট

আমাজন বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড ও পরিবেশ সংকট

17 September 2019, বদরুদ্দীন উমর PrintShare on Facebook

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বনভূমিতে বিগত মে মাস থেকে যে অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়েছে, তা এখনও পর্যন্ত চলছে। যে আকারে এই অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে, তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আমাজনে অগ্নিকাণ্ড কোনো নতুন ব্যাপার নয়। দীর্ঘদিন থেকে এই বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড হয়। এর কিছুটা হয় মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমের কারণে।

এই মৌসুমে সহজেই বনভূমিতে আগুন লাগে। এ কাজ একদিকে করে পুঁজি মালিকরা এবং অন্যদিকে কৃষকদের একাংশ। তারা কলকারখানা স্থাপন, পুঁজিবাদী কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং কেউ কেউ চাষযোগ্য জমি বের করার জন্য এ কাজ করে।

আমাজন বনভূমির বড় অংশটি ব্রাজিলে হলেও চারদিকে বেশ কয়েকটি দেশে, উত্তর ও দক্ষিণে এ বনভূমি বিস্তৃত। এ দেশগুলোর মধ্যে আছে কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, ফ্রেঞ্চ গায়ানা, পেরু, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে।

ব্রাজিলে এখন যে আকারে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে তার জন্য মূলত দায়ী বর্তমান ব্রাজিল সরকার, বিশেষত তার চরম প্রতিক্রিয়াশীল প্রেসিডেন্ট। তারা ব্রাজিলের উন্নয়নের জন্য আমাজন বনভূমি পরিষ্কার করে সেখানে কৃষির সম্প্রসারণ এবং শিল্প-কারখানা, খনি তৈরি ইত্যাদির উদ্যোগ নিয়েছেন।

এ ব্যাপারে তাদের কোনো লুকোচুরি নেই। ব্রাজিল সরকারের এ অবস্থানের কারণে তাদের বিরুদ্ধে এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জি-৭ এর বৈঠকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে অগ্নিকাণ্ড বন্ধ করার জন্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

তারা অগ্নিনির্বাপণের জন্য অর্থ সাহায্যের প্রস্তাবও করেছেন। এ নিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট এবং জি-৭ দেশগুলো, বিশেষত ফ্রান্সের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়েছে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যেই বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ডের পক্ষে থাকলেও তিনি এর জন্য কৃষক ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও দায়ী করেছেন। তিনি বলেই যাচ্ছেন যে, কৃষকরা বন পরিষ্কার করে জমি দখলের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে গাছপালায় আগুন দিচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

আমাজন বনভূমি বিশ্বের সর্ববৃহৎ বনভূমি। এই বনভূমি বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেন তৈরি করে এবং ২০ শতাংশ কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে ধরিত্রীর তাপমাত্রা কমিয়ে রাখার কাজ করে। এখন যে হারে এই বনভূমি নষ্ট হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যমান পরিবেশ সংকট যে আরও অনেক তীব্র আকার ধারণ করবে এতে সন্দেহ নেই।

বিশ্ব পরিবেশের ক্ষেত্রে যে আতঙ্কজনক ব্যাপার ঘটছে তা হল বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড। এই অগ্নিকাণ্ড এখন আমাজনে বিশাল আকারে বিস্তার লাভ করায় তা বিশ্বের জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এটা কোনো নতুন বিষয় নয়। আগেই বলা হয়েছে যে, এই অগ্নিকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

তাছাড়া বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড শুধু আমাজনেই হচ্ছে না, আফ্রিকার পূর্ব উপকূলেও এখন ব্যাপক আকারে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে। এটা হচ্ছে অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া, জাম্বিয়া, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, কঙ্গো ইত্যাদি দেশে। এই সমগ্র অঞ্চলে এখন হাজার হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদিক দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থা সব থেকে খারাপ। পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইন্সটিটিউটের মতে, দুই দশকের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার রেইন ফরেস্টে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালে (কালের কণ্ঠ, ১৪.০৯.২০১৯)।

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের থেকেও বেশি প্রভাব ফেলে ইন্দোনেশিয়া। পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা গ্রিনপিসের হিসাবে, গত ৫০ বছরে ইন্দোনেশিয়ার রেইন ফরেস্টের ১৮ কোটি ২০ লাখ একর বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে।

কোথাও গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে, কোথাও আগুনে পোড়ানো হয়েছে। পাম অয়েল ও কাগজ শিল্পের জন্য দেশটির সুমাত্রা ও বর্নিও দ্বীপে অবৈধভাবে বন ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের অর্থাৎ ২০১৯ সালের আগুন ২০১৫ সালের চেয়েও মারাত্মক। কিন্তু শুধু আমাজন বনভূমি, আফ্রিকা বা ইন্দোনেশিয়াতেই নয়, বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। দিন দিন এর এলাকা বিস্তৃত হচ্ছে।

কিছুদিন থেকে বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে ব্যাপক আকারে বিশ্বজুড়ে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংগঠন ক্লাইমেট ফোকাসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর ব্রিটেনের থেকেও বড় অঞ্চলজুড়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে এবং এর ফলে গাছপালা উজাড় হচ্ছে।

এতে বলা হয়েছে, উজাড়ের এ হার প্রতি বছর ২ কোটি ৬০ লাখ হেক্টর (৬ কোটি ৪০ লাখ একর) ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালে বিশ্বের দেশগুলো বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ এবং বন উজাড় প্রতিরোধ শীর্ষক ঘোষণার পরও গত ৫ বছরে এ হার আরও বেড়েছে। বর্তমানে আমাজন বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ডে যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, এটা এই হিসাবের বাইরে।

কলকারখানা থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের বর্তমান মাত্রা পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হওয়ায় তা কমিয়ে আনার জন্য বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনগুলোতে জোর দেয়া হয়েছে এবং তাপমাত্রা যাতে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর না যায় সেই লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে।

কিয়োটো পরিবেশ সম্মেলন থেকে প্যারিস পরিবেশ সম্মেলন পর্যন্ত এবং তারপরও এ বিষয়টির ওপরই জোর দেয়া হয়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি কলকারখানা থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রথম থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধী ছিল। তারা কিয়োটো প্রটোকলে স্বাক্ষর দেয়নি। তবে বারাক ওবামার আমলে প্যারিস সম্মেলনে তারা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার নানা অপরাধমূলক কাজের মধ্যে অন্যতম হল প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করলেও ভারত, চীন, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করতে অসম্মত থেকেছে। সেই সঙ্গে অন্যান্য উন্নত পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোও এক্ষেত্রে যা করণীয় তার সামান্যই করেছে। এদিক দিয়ে এসব পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার যে কোনো কর্মসূচির বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

শিল্পকারখানা থেকে এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড বের হওয়ার ওপর এ পর্যন্ত যতটুকু পর্যালোচনা, গবেষণা হয়েছে, তার তুলনায় গাছপালা ধ্বংসের ভূমিকা এক্ষেত্রে কোনো গুরুত্ব পায়নি। এখন আমাজন বনভূমিতে বড় আকারে অগ্নিকাণ্ড চলতে থাকায় বিষয়টি সামনে এসেছে।

আমাজন বনভূমি এত বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যে এই বনভূমি বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগান দেয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ২০ শতাংশ কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে। বিশ্বের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এই বনভূমির ভূমিকা কত বড় সেটা এর থেকেই বোঝা যায়।

এছাড়া আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে যেসব বনভূমি আছে সেগুলোও বড় আকারে অক্সিজেন ছাড়ে এবং কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশের সংকট কমিয়ে রাখে। এ অবস্থায় এখন যেভাবে বিশ্বজুড়ে বনভূমি ধ্বংস করার কাণ্ড চলছে, এটা এক মহাবিপজ্জনক ব্যাপার।

এর জন্য কোনো কোনো এলাকায় কিছু কৃষককে দায়ী করা হলেও এ কাজ মূলত করছে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো নিজেরা। পুঁজির মুনাফার স্বার্থেই বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে। এভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস যে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর শিল্পকারখানা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হওয়ার মতো অথবা তার থেকেও বিপজ্জনক, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

শিল্পকারখানা থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণই হোক বা বনাঞ্চল ধ্বংস করে এবং অন্যান্য উপায়ে হোক, মুনাফার জন্য পুঁজিবাদীরা এখন বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে এক সংকটজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এবং এই সংকটকে ভয়াবহ করতে নিযুক্ত হয়েছে।

পুঁজির সঙ্গে শ্রমের দ্বন্দ্ব, পুঁজিমালিকের সঙ্গে শ্রমিকের দ্বন্দ্বের কথা আমরা সবাই জানি। জানি কিভাবে পুঁজি মানবসমাজে শোষণ টিকিয়ে রেখে, লুটপাট করে সমাজে এক গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এদিক দিয়ে বলা চলে যে, পুঁজিবাদ বিশ্বের দেশে দেশে বিপুল অধিকাংশ জনগণের শত্রু।

এজন্য তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম চলছে। লড়াই চলছে সমাজতন্ত্রের জন্য। কিন্তু এখন বিশ্বে যেভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, কলকারখানা থেকে কার্বন নিঃসরণ এবং গাছপালা ধ্বংস করে আবহাওয়াতে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন করছে; শুধু মানবজাতি নয়, সমগ্র প্রাণিকুল ও উদ্ভিদজগৎ ধ্বংস করার ব্যবস্থা করছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, পুঁজিবাদ শুধু শ্রমিক ও সবরকম শ্রমজীবী মানুষেরই শত্রু নয়, তারা হল সমগ্র জীবজগতের শত্রু।

তাদের তৎপরতার ফলে শুধু শ্রমিক শোষণ নয়, মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়েছে। এদিক থেকে পুঁজিবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সমগ্র মানবজাতির শত্রু, এমনকি পুঁজিবাদীদের নিজেদেরও শত্রু। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নেই, ক্ষেত্রবিশেষে সেটা থাকলেও এর গুরুত্বের উপযুক্ত উপলব্ধি নেই।

এই পরিস্থিতিতে শুধু শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণ নয়, সমগ্র মানবসমাজের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পুঁজিবাদকে উৎখাত করা, সেই উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে সংগ্রাম করা। পুঁজিবাদকে উৎখাত করা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতেই পুঁজিবাদ মানবজাতিকে ধ্বংস করবে।

১৫.০৯.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Keywords