নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > আবরার হত্যা ও বাংলাদেশ

আবরার হত্যা ও বাংলাদেশ

9 October 2019, Oliullah Noman PrintShare on Facebook

হায়েনাদের হিংস্ত্রতার কাছে বাংলাদেশ পরাজিহ হয়ে গিয়েছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরই। সেদিনের বিজয়ীরাই পিটিয়ে মানুষ হত্যার উল্লাসের সংস্কৃতি শুরু করেছিল। বিচারের নামে প্রহন সাজিয়ে ফাঁিসতে ঝুলিয়ে মানুষ খুন করার সংস্কৃতি সেই পরাজয়েরই ধারাবাতিকতা। যাকে ইচ্ছা তাঁকে নিয়ে গুম, ক্রসফায়ারের বয়ান সাজিয়ে মানুষ খুন সেদিনের বিজয়ীরাই করছেন। সার্বভৌমত্ব অন্যের হাতে নির্বিঘেœ তোলে দিচ্ছেন তারাই। ২৮ অক্টোবরের বিজয়ী হায়েনারাই ক্রমে ক্রমে দৈত্বে রুপান্তরিত হয়েছেন।

মনে আছে, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা? সেদিন কি ঘটেছিল দেশজুড়ে? কতজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল! পল্টনমোড়ের ঘটনা মনে পড়ে কারো? নাকি ভুলে গেছেন সবাই! সেদিনই কিন্তু বাংলাদেশের চুড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল! বিজয়ী হয়েছিলেন দখলদার হিংস্ত্র হায়েনারা।

পল্টনমোড়ে সেদিন প্রকাশ্যে দলবেধে খুনের নেশায় উম্মত্ত হয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন কারা? ওইসব হায়েনারা। হাজারো মানুষ আর শত শত পুলিশ। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভিডিও ক্যামেরাও ছিল। ছিলেন ফটো সাংবাদিক ক্যামেরা হাতে। সবার সামনেই সাপের মত পিটিয়ে ৪জনকে খুন করা হয়! খুন করেই থেমে থাকেননি তারা। লগি বৈঠার পিটুনিতে মৃত নিথর দেহের উপর নৃত্য করেছিলেন হায়েনারা। সেই হায়েনাদেরই পরবর্ততে বিচারাকি খুনের দাবীতে শাহবাগেও লাফালাফি করতে দেখা গেছে! ২৮ অক্টোবর লাশের উপর যারা নৃত্য করেছিলেন তারাই শাহবাগে শ্লোগান দিয়েছিলেন, বিচার নয়, ফাসি চাই! শাহবাগের সেই কথিত গণজাগরনের নেতা বাপ্পাদিত্য বসু ২৮ অক্টোবর পল্টনে লাশের উপর নৃত্য করছেন সেই ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তখনো। তাদেরই শ্লোগান ছিল একটা দুইটা শিবির ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর! এসব শ্লোগানের উস্কানিদাতা কারা?

এসব হায়েনাদের তখন উস্কানি দিয়েছে তথাকথিত দালাল মিডিয়া গুলো। দিনরাত তাদের উস্কানি দিয়ে আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে পৌছানো হয়। কোন মিডিয়া কি ২৮ অক্টোবরের কথা মোটেও ষ্মরণ করে? কারন ষ্মরণ করা যাবে না। তাদের উস্কানিতেই এমন ঘটনা। ভিন্নমতের মানুষকে পিটিয়ে মারলে কিছু যায় আসে না! এটাই তাদের মানবতার সংস্কৃতি! এ সংস্কৃতির ধারাবাতিকায়ই আবরারের খুন। খুনিরা জানেন, পিটিয়ে মারার পর লাশের উপর নত্যৃ করলেও কিছু যায় আসে না। তাও আবার প্রকাশ্যে রাজপথে হাজারো মানুষ এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে। দুনিয়াব্যাপি প্রচারিত হয়েছে, পিটিয়ে মেরে লাশের উপর নৃত্য করা হচ্ছে। তারপরও কিছু হয় না। তারাই নেতৃত্ব দেয় আরো খুনের শ্লোগানে! সুতরাং আবরারকে ঘরে রুমের ভেতর পিটিয়ে মারলে কি আসে যায়! এমনটাই ছিল খুনিদের ধারনা। মিডিয়া গুলো বসে ছিল এটাকে রহস্যজন মৃত্যু বলে চালিয়ে দিতে। যদি বেশি বাড়াবাড়ি হয় বলা হবে, শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে। তাইলে-ই ত কারবার ফতেহ! বিচারের বদলে পুরস্কৃত হওয়া যাবে। কারন শিবির যারা করেন, তারা মানুষ নন। তারা ‘শিবির’। খুনের এমন সংস্কৃতি তৈরি করেছেন কারা!

এর উত্তর পাওয়া যায়, আবরারের ঘটনায় দৈনিক প্রথম আলো নামে দেশ বিরোধী পত্রিকাটির প্রথম এবং দ্বিতীয় নিউজটি দেখলেই। তাদের প্রথম নিউজের শিরোনাম ছিল ‘বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু’। নিউজটি পড়লেই বুঝা যায়, খুব ইনিয়ে বিনিয়ে চেষ্টা ছিল আবরারের খুনকে রহস্যের ভেতরে ঠেলে দিতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। অন্য দু/একটি মিডিয়ায় ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়ে আবরাকে ছাত্রলীগ মেধাবী ছাত্রকে পিটিয়ে খুন করেছে। কারন আবরার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে দেশ বিরোধী চুক্তির মৃদু সমালোচনা করেছেন। তখন প্রথম আলো লজ্জায় পড়ে যায়। ছোট করে দ্বিতীয় নিউজ আপলোড করে। এতে শিরোনাম ‘আবরারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ’। খুব ছোট নিউজে তাঁকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ করে প্রথম আলো। রহস্য থেকে আবরারকে শিবিরের দিকে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টায় তখন! কারন তাদের সংস্কৃতি হচ্ছে শিবির মেরে ফেললে কারো কিছুই যায় আসে না। তাদের ত শ্লোগান-একটা দুইটা শিবির ধর-সকাল বিকাল নাস্তা কর! আবরারও সেই নাস্তার শিকার! তাই শিবিরের দিকে ঠেলে দিলে হত্যাকান্ড জায়েজ হয়ে যাবে! অতএব, ২৮ অক্টোবরের খুনের ধারাবাহিকতার শেষ শিকার হলেন আবরার!

যে দেশে প্রকাশ্যে দিবালোকে হাজারো মানুষের সামনে পিটিয়ে হত্যা করে লাশের উপর নৃত্য করলেও কিছু হয় না। খুনিরা বরং পুরস্কৃত হন নানাভাবে। সে দেশ কি হায়েনাদের কাছে পরাজিত নয়? নিজের মতের সাথে মিল থাকলেই কেবল মানবতার প্রশ্ন। ভিন্নমতের কোন মানবতা বা মানবাধিকার থাকতে নেই। এমনটাই কি প্রমান করে না ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পরবর্তী ঘটনা গুলো? আর এই সংস্কৃতি তৈরির পেছনের মূল কারিগর হচ্ছে, বাংলাদেশের হায়েনা বা মাফিয়া হয়ে গড়ে উঠা মিডিয়া।

শুধু আবরারের খুনের বিচার নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে যারা পিটিয়ে মানুষ খুন করেছেন, যারা এসব খুনের উস্কানি দিয়েছেন তাদেরও বিচার হতে হবে। নতুবা এ পরাজিত বাংলাদেশে এমন ঘটনা আরো ঘটতেই থাকেব।
এই যেমন ধরেন, আজ বের হচ্ছে বুয়েটের মত বিদ্যাপীঠে ছাত্রাবাসে টর্চারশেল গড়ে উঠেছিল। এটা কি একদিকে তৈরি হয়েছিল। টর্চার শেলের খবর বের হয় মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায়। এ গুলো কি একদিনে তৈরি হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফলেই পাড়ায় পাড়ায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে টর্চার শেষ গড়ে উঠেছে। এমন টর্চার শেলের খবর আগে বের হয়নি কেন!

সবচেয়ে আশ্চার্য্য হচ্ছে বুয়েট প্রশাসন আবরারের ঘটনার পর তাদের হলের সিসিটিভি ফুটেজ লুকিয়ে ফেলেছিল। এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কি হতে পারে! সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের প্রশাসন খুনিদের আড়াল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। আবরারের নির্যাতনের খবর পেয়ে পুলিশ রাতেই হলে গিয়েছিল। তাদের কে ঢুকতে দেয়নি! পুলিশকে ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে বলা হয়েছিল তখন! একটা রাষ্ট্র কত বিচারহীনতার পৌছালে এমন ঘটনা গুলো ঘটতে পারে! পুলিশের প্রধান কাজ হচ্ছে বিপদগ্রস্থ মানুষকে উদ্ধার করা। নির্যাতনের শিকার হলে তাঁকে উদ্ধার করা। কিন্তু পুলিশও সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলেন না কেন? এর উত্তর একটাই হায়েনাদের নিয়ন্ত্রণে চলতে হয় পুলিশকে।

২৮ অক্টোবরে পরাজিত বাংলাদেশকে উদ্ধার করতে হলে নতুন করে ভাবতে হবে। নতুবা সার্বভৌমত্ব হারানো পরাজিত বাংলাদেশই হবে ১৮ কোটি মানুষের ঠিকানা।

Keywords

- -