নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > বদরুদ্দীন উমর > বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার প্রসঙ্গে

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার প্রসঙ্গে

6 August 2019, বদরুদ্দীন উমর PrintShare on Facebook

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় এখন ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গু এখন মহামারীর আকার ধারণ করেছে। ডেঙ্গু কোনো নতুন রোগ নয়। বছরের সব সময়েই মানুষ অল্পবিস্তর ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে তার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়, যেমনটি এখন হয়েছে।

কিন্তু ডেঙ্গুর এই অবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এ ক্ষেত্রে উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার শেষ নেই। যে রোগ সারা বছর ধরেই লেগে থাকে তাকে নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা এদের নেই। সব মশার জাত এক নয়।

তাছাড়া সব মশার কামড় মানবদেহে একই ধরনের রোগ বিস্তার করে না। আগেকার দিনে মশাবাহিত প্রধান রোগ ছিল ম্যালেরিয়া। এখন ম্যালেরিয়ার দেখা বিশেষ পাওয়া যায় না। কিন্তু এক সময় ছিল যখন ম্যালেরিয়াও মহামারীর আকারে দেখা যেত।

ম্যালেরিয়া অনেক পুরনো মশাবাহিত রোগ। ইংরেজরা যখন এদেশে প্রথম আসে তখন তাদের মধ্যে অনেকেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেত। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধকারী নানা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এখন আর তা দেখা যায় না বললেই চলে।

এডিস মশা থেকে মানবদেহে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটে। এই মশা মারার জন্য বিশেষ ধরনের কীটনাশকের প্রয়োজন। কিউলেক্স মশা যে কীটনাশকে মারা পড়ে এডিস মশা তাতে মরে না। তার ওষুধ আলাদা।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মশা মারার জন্য যে কীটনাশক ব্যবহার করে তাতে শুধু কিউলেক্স মশাই মারা যায়। এর ফলে মশার ওষুধ যতই ছড়ানো হোক, এডিস মশা তাতে মারা পড়ে না। তাদের বৃদ্ধি এই কীটনাশকে রোধ করা যায় না।

তাছাড়া ভেজালের ব্যাপারও আছে। এর ফলে সিটি কর্পোরেশন মশার ওষুধ ছড়ালেও তাতে কিউলেক্স মশাও মরে না এবং শহরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব চলতেই থাকে।

এডিস মশা মারার জন্য বিশেষ ধরনের কীটনাশক না থাকার ফলে এই মশার জন্ম-বৃদ্ধি বড় আকারে হচ্ছে। সারা ঢাকা শহরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, মেট্রোরেলের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির ফলে রাস্তায় পানি জমে থাকছে। এগুলো এডিস মশার জন্মস্থান।

এছাড়া নানা কারণে চারদিকে পানি জমে থাকে বর্ষার দিনে। এই পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা জন্মায়। রাস্তায় এবং অন্যত্র যাতে পানি জমে না থাকে তার কোনো ব্যবস্থা নেই। জমা পানির ওপর এডিস মশা মারার ওষুধও দেয়া হচ্ছে না, কারণ ওষুধ নেই।

এখন এই ওষুধ আনার জন্য অর্ডার দেয়া হচ্ছে, যা আসতে সময় লাগবে। এদিকে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নেই। শুধু তাই নয়, ডেঙ্গুর ওষুধপত্র, রক্ত পরীক্ষা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও সংকট আছে।

এই নিয়ে হাসপাতালগুলোতে, বিশেষত সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তাররা হিমশিম খাচ্ছেন। তাছাড়া রোগীর তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যাও কম। অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক ডাক্তার অসুস্থও হয়ে পড়ছেন।

ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন ডাক্তারের মৃত্যুও হয়েছে ঢাকা এবং অন্যত্র।

ডেঙ্গুর জন্য রক্ত পরীক্ষাও এখন অসুবিধা শুধু নয়, বিপজ্জনকও হয়েছে। প্রথমত, এর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই। দ্বিতীয়ত, বেশকিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার কোনো রকম পরীক্ষা না করে রিপোর্ট দিয়ে দিচ্ছে।

এজন্য কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ধরাও হয়েছে। কিন্তু অবস্থা এত খারাপ যে এক্ষেত্রে সংকট থেকেই যাচ্ছে। আসলে অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই নানা ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে, যা ঠেকানোর মতো ব্যবস্থা নেই।

রোগীর সংখ্যাও এদিক দিয়ে এগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, ঈদের সময় ঢাকা থেকে লোকজন বাইরে গেলে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এজন্য ঢাকা থেকে যারা বাইরে যাবেন তারা যেন যাওয়ার আগে নিজেদের রক্ত পরীক্ষা করেন! এ ধরনের অদ্ভুত ও অবাস্তব কথা কিভাবে বলা হচ্ছে, বোঝার উপায় নেই।

যেখানে ডেঙ্গু রোগীদেরই রক্ত পরীক্ষার মতো ব্যবস্থা নেই, সেখানে যে লাখ লাখ লোক ঢাকার বাইরে যাবে তারা রক্ত পরীক্ষা করবে কিভাবে? যারা এভাবে রক্ত পরীক্ষা করতে বলছে, তারা যে বিষয়টি জানে না এমন নয়। কিন্তু আসলে তারা নানা ধরনের আবোলতাবোল কথা বলে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাই করছে।

দেশে এই জরুরি অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিদেশে গিয়েছিলেন! এটা বাংলাদেশেই সম্ভব। এদিক দিয়ে অবস্থা যে কত সাংঘাতিক এটা বোঝা যায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রীর এ সম্পর্কিত বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে আছেন কী নেই এটা কোনো কথা নয়, আসলে কাজ হচ্ছে কিনা সেটাই দেখা দরকার।

কিন্তু কাজ হচ্ছে কিনা সেটা দেখবে কে? কাজ দেখার জন্যই তো মন্ত্রী। তাকে ছাড়া যদি কাজ হয়, তাহলে জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় মন্ত্রী রাখার প্রয়োজন কী? সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর এই বক্তব্য অবশ্য তার দিক থেকে মানানসই।

কারণ বাংলাদেশে সড়ক ও সেতুর যতই বেহাল অবস্থা হোক, সড়কপথে যত হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হোক, তাতে তার কিছু যায় আসে না, আসল কাজ না হওয়ার কারণে।

বাংলাদেশের সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিটির অবস্থাই এরকম। এজন্য প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সংকট আছে এবং জনগণের জীবন নানাভাবে অতিষ্ঠ হচ্ছে।

আইসিডিডিআরবি থেকে এক বছর আগে ডেঙ্গুর ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছিল। ডেঙ্গু যে ছড়িয়ে পড়তে পারে একথা বলা হয়েছিল। বিগত মার্চ মাসে হাইকোর্ট ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন।

কিন্তু এসব সতর্কতা ও নির্দেশ সত্ত্বেও সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টনক নড়েনি। সমস্যা যখন সংকটজনক হয়ে নাকের ডগায় এসেছে, তখনই এদেরকে কিছু নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু যেহেতু ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নেই, এ কারণে এদের এই সামান্য নড়াচড়ায় এখন বিশেষ কোনো কাজ হচ্ছে না। বর্ধিত সংখ্যায় ডেঙ্গু রোগীরা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে, যা সামাল দেয়া হাসপাতালগুলোর পক্ষে মুশকিল হচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় সামান্য হলেও সেখানে যে চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে তাকে দুরবস্থাই বলা চলে।

তাছাড়া সরকারি হাসপাতালগুলোতে জায়গাও এখন নেই যা সব রোগীকে ঠাঁই দিতে পারে। কাজেই অধিকাংশ রোগী বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ভর্তি হচ্ছে।

এই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে স্কয়ার, ইউনাইটেড, অ্যাপোলোর মতো হাসপাতালগুলো একেকজন রোগীর জন্য লাখ লাখ টাকা বিল করছে এবং এর ফলে অনেকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন।

কলকাতা কর্পোরেশন নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগ ঠেকিয়ে রেখেছে এই মর্মে সংবাদপত্রে কিছু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। সতর্কতার কারণে তারা সারা বছর ধরে জমা পানি ইত্যাদির ওপর দৃষ্টি রাখে এবং এডিস মশা মারার ওষুধ ব্যবহার করে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাদের এই সাফল্যের কথা প্রচার হওয়ার পর এখন নাকি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও কলকাতা কর্পোরেশনের কর্তাদের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের ব্যবস্থা হচ্ছে!

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী কলকাতায় সেখানকার পৌরমন্ত্রী ও কলকাতার মেয়রের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

কিন্তু এ কনফারেন্স ও সাক্ষাৎ করে যে বিশেষ কোনো লাভ হবে এটা মনে করার কারণ নেই এজন্য যে, প্রতিরোধের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তা সামাল দেয়া ভিডিও কনফারেন্স করে সম্ভব নয়।

বুঝতে হবে যে, ডেঙ্গু যেভাবে বিস্তার লাভ করেছে এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে বেহাল অবস্থায় আছে তার সঙ্গে ডেঙ্গুর এই বিস্তার অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সরকারের বেপরোয়া উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই।

সরকার দেশের অনেক ‘উন্নয়ন’ করছে; কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন তাদের কর্মসূচির মধ্যে নেই। কাজেই এক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। তাছাড়া এসব কিছুর সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক পরিস্থিতিকে জটিল করছে।

আসলে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, সবকিছুর সঙ্গেই দুর্নীতির সম্পর্ক। দুর্নীতির জাল চারদিকে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যে তার বাইরে কোনো ক্ষেত্র নেই। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও দুর্নীতির রাজত্ব।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি কর্পোরেশন ও মিউনিসিপ্যালিটিগুলো দুর্নীতির আখড়া। দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে এই জরুরি অবস্থায় দেশের বাইরে ছিলেন এবং তার অনুপস্থিতিজনিত দায়িত্বহীনতার বিষয়টি সড়ক ও সেতুমন্ত্রী যেভাবে তুবড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন, এসবও দুর্নীতি ছাড়া আর কী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে?

এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু এক মারাত্মক রোগ হিসেবে এখন দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থা নাকি অক্টোবর মাস পর্যন্ত চলবে। এই সামনের তিন মাস জনগণের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে হুমকি থাকবে এবং তাদেরকে যে অবস্থায় থাকতে হবে একে এক বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

০৪.৮.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Keywords