নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজ কোম্পানির সংঘাত

সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজ কোম্পানির সংঘাত

26 June 2019, Facebook PrintShare on Facebook

“... বহুদিন ধরে ঐতিহাসিকরা বলার চেষ্টা করছেন যে ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার যে-সংঘর্ষ (১৭৫৬-৫৭) বাধে, তার জন্য মূলত দায়ী নবাব সিরাজদ্দৌল্লাই। এই মতের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা এস. সি. হিল (S.C. Hill, 1905), যদিও এই বক্তব্যই বেশ চাতুর্যের সঙ্গে এবং খুব সূক্ষ্মভাবে (সােজাসুজি নয়) অধুনাতম গ্রন্থেও পরিবেশিত হয়েছে। উক্ত সংঘর্ষের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে হিল বলছেন, সিরাজদ্দৌল্লার ‘আত্মম্ভরিতা’ (vanity) এবং ‘অর্থলিপ্সাই’ (avarice) এ সংঘর্ষের মুখ্য কারণ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের যে কতগুলি নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিযােগ ছিল, হিল সাহেব সেগুলিকে ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ বলে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন। নবাব হওয়ার আগে হয়তাে সিরাজদ্দৌল্লা কিছুটা দাম্ভিক ছিলেন কিন্তু নবাব হওয়ার পরে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর আচরণে বা সম্পর্কে এমন কোনও ঘটনা বা তথ্য দেখানাে মুশকিল যাতে প্রমাণিত হয় যে সিরাজের দাম্ভিকতাই ইংরেজের সঙ্গে তাঁর বিরােধের অন্যতম কারণ। আর খােদ ইংরেজ কর্মচারীদের লেখা থেকেই সহজে দেখানাে যায় যে সিরাজের অর্থলিপ্সা যদি থেকেও থাকে, তা কিন্তু কোনওভাবেই এ-সংঘর্ষের জন্য দায়ী নয়। অন্যদিকে আমাদের কাছে এমন তথ্যপ্রমাণ আছে যা থেকে দেখানাে যাবে যে, যদি কোনও একটি কারণকে এ-সংঘর্ষের জন্য দায়ী করা যায় তবে তা হল কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির গভর্নর রজার ড্রেকের (Roger Drake) কঠিন ও অনমনীয় মনােভাব। হিল কিন্তু এ-সংঘর্ষে ড্রেকের ভূমিকা সম্বন্ধে আশ্চর্যরকমের (সুবিধেজনকও বটে) নীরব!
অধুনা ঐতিহাসিকদের মধ্যে যদিও পিটার মার্শাল বলছেন যে, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল নবাবের সঙ্গে ‘মিটমাট করার জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা নেয়নি’ তবু তিনি এবং অন্যান্যরা এখনও প্রচ্ছন্নভাবে এ-সংঘর্ষের জন্য সিরাজদ্দৌল্লাকেই বেশি করে দায়ী করেছেন।

ইদানীং ঐতিহাসিকরা বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে বিরােধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলার চেষ্টা করছেন যে, অষ্টাদশ শতকের প্রথম থেকে বাংলায় নবাবের সঙ্গে সামরিক অভিজাতশ্রেণী, ব্যবসায়ী গােষ্ঠী ও জমিদারদের মধ্যে যে নতুন শ্রেণীগত জোটবদ্ধতা (new class alliance) তৈরি হয়েছিল এবং যা মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি খান পর্যন্ত বাংলায় নবাবি শাসনের মূল ভিত্তি, সিরাজদ্দৌল্লার সময় তা ভেঙে পড়ে। তার ফলেই তরুণ নবাবের সময় বাংলার রাজনৈতিক জীবনে ‘সংকট’ ঘনীভূত হয়। আর সেই সুযােগেই ইংরেজরা বাংলায় নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। এটা ঠিকই, ১৭৫৬-৫৭ সালে বাংলায় যে সংকটের কথা বলা হয় তা সম্যক উপলব্ধি করতে গেলে, বাংলার নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে যে-সম্পর্ক তা ভাল করে বুঝতে হবে। এ-সম্পর্ক আবার অনেকটা নির্ভর করত একদিকে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির নিজস্ব অর্থাৎ কোম্পানির তরফে যে-সব ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যদিকে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার সমৃদ্ধি বা অবনতির ওপর। কিন্তু যেসব বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে সংঘর্ষের উৎপত্তি, সেগুলি ভাল করে বিশ্লেষণ করা দরকার, যাতে এ-সংঘর্ষের প্রকৃত কারণগুলি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।

কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির অধ্যক্ষ জাঁ ল’ লিখেছেন যে নবাব আলিবর্দি খানের মৃত্যুর আগে থেকেই ইংরেজদের প্রতি সিরাজদ্দৌল্লার বিরূপ মনােভাব ছিল। কিন্তু এ বক্তব্য মােটেই সঠিক নয়। এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সিরাজদ্দৌল্লা যখন নবাব হলেন, তখনও ইংরেজদের প্রতি তার কোনও বিরূপতা ছিল না, কোনও শত্রুতামূলক মনােভাবও নয়। সাধারণভাবে ইউরােপীয়দের প্রতি, ইংরেজসমেত, তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলিবর্দির মতােই। দুজনেরই এদের প্রতি মনােভাব দক্ষিণ ভারত এবং কর্ণাটকের ঘটনার প্রেক্ষিতেই আবর্তিত হত। দক্ষিণ ভারতে যা ঘটছিল, সেখানে কীভাবে ইংরেজ ও ফরাসিরা রাজনীতির দাবাখেলায় মেতে উঠেছিল এবং কীভাবে স্থানীয় শাসকদের তাদের হাতের পুতুল করে তুলছিল, সে সম্বন্ধে আলিবর্দি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। তার ভয় ছিল, ইউয়ােপীয়রা বাংলায়ও সে-খেলায় মেতে উঠতে পারে। তাই তারা যাতে বাংলায় তার পুনরাবৃত্তি করতে না পারে তার জন্য তিনি সচেষ্ট ও বদ্ধপরিকর ছিলেন। জাঁ ল’ বলছেন, আলিবর্দি ইংরেজ ও ফরাসিদের সমান সন্দেহের চোখে দেখতেন। তবে বৃদ্ধ নবাব বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলায় ফরাসিদের তুলনায় ইংরেজদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অনেক বেশি ছিল — সুতরাং ফরাসিদের চেয়ে তারাই বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। সিরাজদ্দৌল্লার উপলব্ধিও ছিল তাই। এটা এক অজ্ঞাতনামা ইংরেজ লেখকের পাণ্ডুলিপি থেকে সুস্পষ্ট: “নতুন নবাব তার রাজ্যে ইউরােপীয়দের শক্তিবৃদ্ধিতে শঙ্কিত বােধ করছিলেন এবং তা হ্রাস করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এদের মধ্যে যেহেতু ইংরেজরাই বেশি শক্তিশালী, তাই তিনি ন্যায্যভাবে [just policy] প্রথমে তাদের দমন করতে অগ্রসর হলেন।”

হলওয়েল (Holwell) অবশ্য লিখেছেন যে আলিবর্দি অনেকদিন ধরে ইউরোপীয়দের অস্ত্রসম্ভার ও দুর্গ ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছিলেন এবং মৃত্যুশয্যায় সিরাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইংরেজদের প্রথম শায়েস্তা করতে এবং তাদের কোনও দুর্গ বা সৈন্যসামন্ত রাখতে না দিতে। কিন্তু হলওয়েলের দেওয়া তথ্য বিশ্বাসযােগ্য নয়। কলকাতার ‘অন্ধকূপ হত্যার’ যে কাহিনী তার জনক তিনিই। তার সত্যবাদিতা ও বিশ্বাসযােগ্যতা সম্বন্ধে অনেক ইংরেজ কর্মচারীই সন্দিহান ছিল। নিজের বক্তব্যকে বিশ্বাসযােগ্য করার জন্য মিথ্যা ও ভুল তথ্য পরিবেশন করতে বা তথ্যকে বিকৃত করতে তিনি বেশ অভ্যস্ত ছিলেন। অন্য ইংরেজ কর্মচারীদের লেখা থেকে প্রমাণ করা যায় যে আলিবর্দির মৃত্যুশয্যায় সিরাজের প্রতি নির্দেশ একেবারেই আজগুবি গল্প। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটস, যিনি মুর্শিদাবাদ দরবারের হাঁড়ির খবরও রাখতেন, জানিয়েছেন যে, তিনি বা ওই কুঠির কেউ, এমনকী স্থানীয় লােকজনরাও মৃত্যুশয্যায় আলিবর্দির সিরাজের প্রতি নির্দেশের কথা শােনেননি। ওই কুঠির দ্বিতীয় প্রধান ম্যাথু কোলেট (Mathew Collet) হলওয়েলের বক্তব্যকে একেবারেই ‘আজগুবি গল্প’ (spacious fable) আখ্যা দিয়েছেন। এখানে স্মর্তব্য, এঁরা দুজনেই কাশিমবাজারে ছিলেন বলে পাশে মুর্শিদাবাদ দরবারে রােজ যা ঘটত, তার সবকিছুরই খবর রাখতেন। তারা কিছু জানতেন না অথচ হলওয়েল কলকাতায় বসে কী করে সব জানলেন? ইংরেজ কোম্পানির আরেকজন কর্মচারী, রিচার্ড বেচার (Richard Becher) লিখেছেন: “ইংরেজরা এমন অনেক কাজ করেছে যার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের ওপর রেগে গেছিলেন। তাদের প্রতি বিরূপ হওয়ার জন্য আলিবর্দির শেষ উপদেশের কোনও প্রয়ােজনই ছিল না।”
আগেই বলা হয়েছে প্রথমদিকে সিরাজ ইংরেজদের প্রতি একেবারেই শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন না। সিরাজ মসনদে বসার অনেক আগেই আলিবর্দি ইংরেজদের দেওয়া এক পরােয়ানায় জানিয়েছিলেন যে, সিরাজদ্দৌল্লা সবসময় আলিবর্দির সমক্ষে ইংরেজদের প্রশংসা করতেন এবং তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য শুভকামনা করতেন। ১৭৫২ সালের মে মাসে আলিবর্দি সিরাজদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনােনীত করেন আর ওই বছরের সেপ্টেম্বরেই হুগলির ফৌজদার ও আর্মানি বণিক খােজা ওয়াজিদের পরামর্শে ইংরেজরা সিরাজের সঙ্গে দেখা করেন। ফোর্ট উইলিয়ামের নথিপত্র থেকে জানা যায়, “সিরাজ ইংরেজদের প্রতি ডাচ বা ফরাসিদের চেয়েও বেশি সৌজন্য দেখান এবং যথেষ্ট হৃদ্যতামূলক আচরণ করেন।” নবীন যুবরাজের সহৃদয় ব্যবহারের খবর পেয়ে কোম্পানির পরিচালক সমিতি লন্ডন থেকে ফোর্ট উইলিয়ামে লিখে পাঠায় (২৩ জানুয়ারি ১৭৫৪) যে “তারা যেন ইংরেজদের প্রতি সিরাজদ্দৌল্লার এই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোেভাবের সুযােগ নিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্কের আরও উন্নতি করে।” আবার আরেকটি চিঠিতে পরিচালক সমিতি জানাচ্ছে (২৪ নভেম্বর, ১৭৫৪), “সিরাজ অন্য ইউরােপীয়দের চেয়ে ইংরেজদের প্রতি অনেক বেশি প্রসন্ন বলে মনে হচ্ছে এবং এটাকে যেন কাজে লাগানাে হয়।”

সাধারণভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, সিরাজ নবাব হওয়ার পর তখনকার রীতি অনুযায়ী ইংরেজরা তাকে কোনও নজরানা বা উপঢৌকন দেয়নি বলে তিনি ইংরেজদের ওপর অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু এটা বােধহয় ঠিক নয়। ইংরেজরা একটি চিঠি লিখে সিরাজকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং নতুন নবাবের কাছ থেকে অনুগ্রহ ও নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিলেন। এ চিঠি বেশ সাদরেই গৃহীত হয়েছিল। তরুণ নবাব দরবারে ইংরেজদের ‘ভকিল’ (vakil) বা প্রতিনিধিকে জানিয়ে দেন যে তিনি ইংরেজদের প্রতি তাঁর মাতামহ আলিবর্দির চেয়েও বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবেন। আসলে ইউরােপীয়দের প্রতি আলিবর্দির নীতি ছিল ‘ঋজু অথচ অন্যায্য নয়’ (rigid rather than unjust)। যাতে তার প্রবল আপত্তি ছিল তা হল, ইউরােপীয়রা নবাবের অধীন নয় — স্বাধীন, নবাবের তারা তােয়াক্কা করে না এমন মনােভাব। জাঁ ল’ জানাচ্ছেন, ‘আলিবর্দি কিন্তু ভালভাবেই জানতেন ঠিক কখন এবং কীভাবে এদের সমঝে দেওয়া প্রয়ােজন যে তিনিই বাংলার হর্তাকর্তা। তিনি চেয়েছিলেন যে ইউরােপীয়রা কেউই বাংলায় দুর্গ তৈরি করে নিজেদের সুসংহত না করে।’ তিনি দরবারে এসব কোম্পানির প্রতিনিধিদের বলতেন — “তােমরা সওদাগর, তােমাদের দুর্গ তৈরি করার প্রয়ােজনটা কী? আমার রাজ্যে তােমাদের এমন কোনও শত্রু নেই যাকে তােমরা ভয় করতে পার।” তিনি আরও বলছেন, ‘আলিবর্দি যদি আর কিছুদিন সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতেন, তা হলে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউরােপীয়দের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এত বৃদ্ধ ও এমন অসুস্থ ছিলেন যে তাঁর উত্তরসূরিকেই সেই কাজ করতে এগিয়ে আসতে হল।’ সিরাজদ্দৌল্লা প্রথম থেকেই ইউরােপীয় এবং ইংরেজদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন। জাঁ ল’ লিখেছেন, “সিরাজ ফরাসিদের প্রতি বেশ সন্তুষ্টই ছিলেন। তারাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে রায়দুর্লভ ও মােহনলালের মাধ্যমে তার সঙ্গে নিয়মিত যােগাযােগ রেখে চলত।”

কিন্তু সিরাজদ্দৌল্লার নবাব হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে, দু’পক্ষের স্বার্থের মধ্যে সংঘাতের ফলে, বিরােধ অপরিহার্য হয়ে উঠল। আসলে আলিবর্দির মৃত্যুর ঠিক আগে সিরাজ ইংরেজদের কিছু কাজকর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন কারণ এগুলির মাধ্যমে নবাবের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখানাে হচ্ছিল। ইউরােপে যুদ্ধ বাধার আশঙ্কায় এবং আলিবর্দির মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদে মসনদ নিয়ে বিরােধ অবধারিত ভেবে ইংরেজ ও ফরাসিরা উভয়েই প্রায় প্রকাশ্যে তাদের দুর্গগুলি সংস্কার ও সংহত করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলিবর্দি অত্যন্ত অসুস্থ এবং অন্যদিকে দিল্লি থেকে মুঘল সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী বাংলার বকেয়া রাজস্ব আদায় করতে অভিযান করবে এমন আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সিরাজ আপাতত ইংরেজ ও ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা মুলতুবি রাখতে বাধ্য হলেন।

সিরাজদ্দৌল্লার ইংরেজদের প্রতি বিরূপ হওয়ার আরও গভীর কারণ ছিল। তিনি আশঙ্কা করেন যে ইংরেজরা তার সিংহাসন প্রাপ্তির বিরােধিতা করতে পারে। তিনি যখন ১৭৫৬-এর এপ্রিলে নবাব হলেন তখন তার সন্দেহ হয় যে ইংরেজরা মসনদে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মদত দিচ্ছে। এ সন্দেহ কিন্তু একেবারে অমূলক নয়। বস্তুত ইংরেজরা প্রথম থেকে প্রায় ধরেই নিয়েছিল, সিরাজের পক্ষে নবাব হওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির প্রধান রেনল্ট বা জাঁ ল’র লেখা থেকে এবং অন্যান্য বেশ কিছু ইউরােপীয় তথ্য থেকেও জানা যায় যে ইংরেজরা সিরাজের বিরুদ্ধে একটা মতলব ভাঁজছিল এবং সিরাজের বিরুদ্ধ-গােষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সক্রিয় যােগাযােগ ছিল। রেনল্ট স্পষ্ট জানাচ্ছেন, ‘ঘসেটি বেগমের দলকে মসনদ দখলের দৌড়ে কেউ আটকাতে পারবে না এবং সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য, এই স্থির বিশ্বাসে ইংরেজরা ঘসেটি বেগমের সঙ্গে [সিরাজের বিরুদ্ধে] চক্রান্ত শুরু করেন।’ জাঁ ল’-ও লিখছেন যে অন্য অনেকের মতাে ইংরেজরাও ভেবেছিল, ‘সিরাজদ্দৌল্লা কখনও নবাব হতে পারবেন না, এবং তাই তারা কোনও কাজে তার দ্বারস্থ হত না। শুধু তাই নয়, তারা তাঁর সঙ্গে কোনওরকম যােগাযােগই রাখত না।’

ইংরেজরা যে সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিল তা অন্য একটি ফরাসি সূত্র থেকেও জানা যায়। তাতে বলা হয়েছে যে, লেখকের বিশ্বাস, ইংরেজরা ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের সঙ্গে সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তে যােগ দেয়। এখানে উল্লেখ্য, শওকত জঙ্গও ঘসেটি বেগমের মতাে মসনদের দাবিদার হিসেবে সিরাজের প্রতিপক্ষ ছিলেন। হলওয়েল নিশ্চিত ছিলেন যে সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগমের জেতার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। এমনকী ইংরেজ গভর্নর ড্রেকও যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে সিরাজদ্দৌল্লা ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে সফল হতে এবং আদৌ নবাব হতে পারবেন কি না। সিয়র-উল-মুতাখারিনের লেখক ও শওকত জঙ্গের পরামর্শদাতা গােলাম হােসেন খান সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে সমঝােতা করার জন্য শওকত জঙ্গকে বােঝাবার চেষ্টা করেছিলেন। কোম্পানির কর্মচারী রিচার্ড বেচার লিখেছেন যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের ওপর রেগে যাওয়ার যথেষ্ট ইন্ধন জুগিয়েছিল।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজদ্দৌল্লার নির্দিষ্ট অভিযােগগুলি যথার্থ কি না তা বিচার করার আগে তার আত্মম্ভরিতা ও অর্থলিপ্সা, যা সিরাজ-ইংরেজ সংঘর্ষের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তার দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। সিরাজ যদি সত্যিই দাম্ভিক হতেন এবং তাঁর দাম্ভিকতাই যদি বিরােধের অন্যতম কারণ হয়ে থাকে, তা হলে তার দুই প্রবল শত্রু ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গকে পরাভূত করার পরই তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে প্রতিশােধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। মসনদে বসার ক’দিন পরে তিনি রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে তার হাতে অর্পণ করার অনুরােধ জানিয়ে কলকাতায় চিঠি দেন। কৃষ্ণদাস ৫৩ লক্ষ টাকা মূল্যের ধনসম্পদ নিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। খুব সম্ভবত তাঁর পিতা রাজবল্লভ ইংরেজদের যােগসাজশে ওই ধনসম্পদ সমেত তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমের বিশ্বস্ত অনুচর — তার মৃত স্বামী নওয়াজিস মহম্মদ ঢাকার নবাব থাকার সময় রাজবল্লভ প্রথমে একজন সহকারী ছিলেন, পরে তিনি ঢাকার রাজস্ববিভাগের দায়িত্ব পান। তার বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করার অভিযােগ উঠেছিল এবং যখন এ-সব হিসেবপত্র পরীক্ষার কাজ চলছিল, তখন রাজবল্লভ ইংরেজদের কাছে তার পুত্র কৃষ্ণদাস ও পরিবারের জন্য কলকাতায় আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কৃষ্ণদাস কলকাতা পৌছােন ১৩ মার্চ ১৭৫৬ - আলিবর্দির মৃত্যুর প্রায় মাসখানেক আগে। কয়েক সপ্তাহ পরে, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর ইংরেজদের লিখে পাঠান, ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লাকে সুসংহত ও দুর্ভেদ্য করার জন্য যেন নতুন করে কিছু করা না হয় এবং ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামে যে প্রাচীর ও অপসারণীয় সেতু (draw bridge) সম্প্রতি বানিয়েছে তা যেন ভেঙে ফেলা হয়। ইংরেজ গভর্নর ড্রেক সিরাজের চিঠিকে শুধু উপেক্ষাই করেননি, পত্রবাহক মেদিনীপুরের ফৌজদার রাজারামের ভাই নারায়ণ সিংকে ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশকারী ও গুপ্তচর অপবাদ দিয়ে কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দেন। অথচ তখনকার কলকাতার সবচেয়ে ধনী ও সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী উমিচাঁদই নারায়ণ সিংকে পরিচয়পত্র দিয়ে ড্রেকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সিরাজদ্দৌল্লার দ্বিতীয় চিঠির উত্তরে ড্রেক যা লিখেছিলেন তাতে ইউরােপের সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ যদি ভারতবর্ষে বিস্তার লাভ করে, সেক্ষেত্রে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নবাবের সাধ্যে কুলােবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। এ-চিঠি পেয়ে সিরাজের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হল যে ইউরােপীয়রা, বিশেষ করে ইংরেজরা, দক্ষিণ ভারতে মাত্র কয়েক বছর আগে যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেছিল, বাংলায় তারা তার পুনরাবৃত্তি করতে পারে। নারায়ণ সিং-এর কলকাতা থেকে বহিষ্কারের খবর পেয়ে ওয়াটস শঙ্কিত হয়ে লিখেছেন: “যে মুহূর্তে আমি নারায়ণ সিং-এর ব্যাপারটি জানতে পারলাম, তখনই আমি নবাবের উচ্চপদাধিকারী এই কর্মচারীকে এভাবে অপমান করার ফল কী হতে পারে তা ভেবে আতঙ্কিত হলাম কারণ তরুণ নবাবকে ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে কিঞ্চিৎ বেসামাল মনে হয় এবং তার প্রত্যাশা তার আদেশ লােকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে।” জাঁ ল’-ও জানাচ্ছেন যে ইংরেজরা নবাবের দূতকে অপমান করেছে এবং নবাবের চিঠির উত্তরে বেশ চড়া (offensive) জবাব দিয়েছে। হুগলির ডাচ কুঠির কুঠিয়ালরাও লিখেছেন যে নবাবের মতাে শক্তিশালী বিপক্ষকে এমনভাবে সােজাসুজি অগ্রাহ্য করে ইংরেজরা হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছে।

বস্তুতপক্ষে পুর্ণিয়া রওনা হওয়ার (১৬ মে ১৭৫৬) আগে সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের মতাে ফরাসিদেরও আলিবর্দির শেষ অসুস্থতার সুযােগে তাদের কেল্লার সংস্কার ও সংহত করার জন্য যে-সব নির্মাণকার্য করেছিল, সেগুলি ভেঙে ফেলতে বলেন। ফরাসিরা জাঁ ল’র পরামর্শে, ইংরেজদের মতাে ঔদ্ধত্য না দেখিয়ে, নবাবের পত্রবাহককে বেশ সৌজন্য দেখায় এবং তাকে দিয়ে রিপাের্ট করায় যে ফরাসিরা বেআইনি কিছু করেনি। নবাব ২০ মে নাগাদ রাজমহলে এ-খবর পেয়ে বেশ সন্তুষ্ট হন। এদিকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল বুঝতে পারে নারায়ণ সিংকে কলকাতা থেকে ওভাবে বহিষ্কার করার ফলে নবাবের সঙ্গে সম্পর্কে বেশ তিক্ততার সৃষ্টি হতে পারে। তাই কাশিমবাজারে ওয়াটসকে নির্দেশ দেওয়া হল, তা যেন না হয় তার জন্য আগে থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে। ওয়াটস তড়িঘড়ি দরবারে নবাবের ঘনিষ্ঠ লোেকদের সঙ্গে যােগাযােগ করেন এবং ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমরা আগেই বলেছি, ড্রেকের চিঠিতে সম্ভাব্য ফরাসি আক্রমণের বিরুদ্ধে নবাব ইংরেজদের রক্ষা করতে পারবেন কি না তা নিয়ে নবাবের ক্ষমতার ওপর কটাক্ষপূর্ণ ইঙ্গিত ছিল এবং মনে হয় সিরাজ তাতে খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। আবার এমন একটা সময় এসব ঘটনা ঘটল যখন সিরাজদ্দৌল্লা তার এক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, ঘসেটি বেগমকে, কাবু করে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী শওকত জঙ্গের সঙ্গে মােকাবিলা করতে যাচ্ছিলেন। ফলে, অন্য সময় এসব ঘটলে সিরাজের ওপর যা প্রতিক্রিয়া হত, সেসব এ সময় ঘটায় তার প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি জোরালাে হয়ে দেখা দিল।

এর পরের যে ঘটনাবলী তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সিরাজদ্দৌল্লা এতসব সত্ত্বেও দম্ভসূচক বা হঠকারিতার কোনও কাজ করেননি। তিনি তার দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও অমাত্যদের ডেকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্বন্ধে পরামর্শ চাইলেন। মুজাফনামার লেখক করম আলির তথ্য অনুযায়ী, সিয়রের লেখক গােলাম হােসেন, জয়নাল আবেদিন, মীর্জা হাবিব বেগ, মীর হাসাউল্লা প্রমুখের নেতৃত্বে একদল পরামর্শ দিল, ইংরেজদের না ঘাঁটাতে, তারা আগুনের শিখার মতাে (’flames of fire’), অন্যদিকে খােজা ওয়াজিদ, রায়দুর্লভ, মীরজাফর প্রমুখের নেতৃত্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী গােষ্ঠী পরামর্শ দিল, ইংরেজদের প্রতি দৃঢ় কূটনীতির সঙ্গে প্রয়ােজনে ‘অস্ত্রধারণের নীতি’ (’a policy of firmness and diplomacy combined with a show of force’) অবলম্বন করতে। সেই (দ্বিতীয়) পরামর্শ অনুযায়ী সিরাজদ্দৌল্লা প্রখ্যাত আর্মানি বণিক খােজা ওয়াজিদকে ইংরেজদের সঙ্গে আপস-মীমাংসার দৌত্যে নিযুক্ত করলেন। ওয়াজিদের নিযুক্তি আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে বিরােধ মিটিয়ে নেবার জন্য তরুণ নবাবের সদিচ্ছারই প্রমাণ। এই দৌত্যের কাজে ওয়াজিদই যােগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন সন্দেহ নেই, কারণ এই আর্মানি বণিক তখন বাংলার অগ্রণী ব্যবসায়ীদের অন্যতম এবং ইংরেজ সমেত ইউরােপীয়দের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওয়াজিদের দৌত্য নিষ্ফল হল। ইংরেজ গভর্নর ড্রেক তাঁর সঙ্গে অপমানসূচক ব্যবহার করেন এবং তাঁকে কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দেন। উইলিয়াম ওয়াটসের লেখা থেকে জানা যায়, ওয়াজিদ চার বার কলকাতায় ইংরেজদের সঙ্গে দেখা করে নবাবের সঙ্গে একটা মিটমাটের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ইংরেজরা তাকে এই বলে শাসিয়েছিল যে এরকম প্রস্তাব নিয়ে ওয়াজিদ যেন আর কলকাতায় আসার চেষ্টা না করেন। এমনকী বাংলায় প্রুশীয় (Prussian) কোম্পানির প্রধান জন ইয়াং (John Young) নবাব ও বাংলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ইংরেজদের প্রতি ক্ষোভের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন: “ইংরেজদের সঙ্গে মিটমাটের জন্য যখন ফখর-উৎ-তুজ্জার (ওয়াজিদ) গেছলেন বা তাকে পাঠানাে হয়েছিল — কোনটা আমি ঠিক জানি না, কতবার তাও না — তখন আপনারা [ইংরেজরা] নাকি কোনও কথায় কর্ণপাত করতে বা কোনও কিছু মেনে নিতে একেবারে অনিচ্ছুক ছিলেন। উপরন্তু আপনারা নাকি তাকে একাজে আবার না আসার জন্য শাসিয়েছিলেন।”

খােজা ওয়াজিদ যখন নিষ্ফল দৌত্যে ব্যস্ত, সিরাজদ্দৌলা তখন দুর্লভরাম ও হাকিম বেগকে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি অবরােধ করার জন্য নির্দেশ দিয়ে শওকত জঙ্গের বিরুদ্ধে অভিযান করার জন্য পুর্ণিয়া অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু রাজমহল পৌঁছে ইংরেজদের উদ্ধত আচরণের, ড্রেকের চিঠির এবং নারায়ণ সিং-এর প্রতি দুর্ব্যবহারের খবর পেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তড়িৎগতিতে কাশিমবাজারের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতিমধ্যে, ২৪ মে তিনশাের মতাে নবাবের সৈন্য কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির সামনে উপস্থিত হয়। সিরাজদ্দৌল্লা কাশিমবাজার পৌছলেন ৩ জুন, তখন তার সৈন্যসংখ্যা ৩০,০০০। ৪ জুন কাশিমবাজারের ইংরেজকুঠি বিনা প্রতিরােধে নবাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কুঠির প্রধান উইলিয়াম ওয়াটস সিরাজের নির্দেশে এক চুক্তির শর্তাবলীতে স্বাক্ষর করলেন। এই শর্তগুলি হল: (১) নবাবের কোনও অপরাধী প্রজাকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়া চলবেনা (২) ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামে পেরিনের উদ্যানে যে দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও অপসারণীয় সেতু (draw bridge) তৈরি করেছে, তা ভেঙে দিতে হবে (৩) এশীয়/ভারতীয় বণিকদের কাছে ইংরেজরা দস্তক বিক্রি করতে পারবে না। এ থেকে পরিষ্কার, শর্তগুলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের নির্দিষ্ট অভিযােগের ওপর ভিত্তি করে রচিত। কাশিমবাজারের পতনের পর সিরাজদ্দৌল্লা ৫ জুন কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। তার নির্দেশে কাশিমবাজার কুঠির ওয়াটস এবং কোলেটও নবাবের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে কলকাতা চললেন। সিরাজ কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির গােলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া আর কিছুতে হাত দেননি বা বাজেয়াপ্ত করেননি— কোনও লুঠতরাজ বা হত্যাকাণ্ড হয়নি। কোনও নিষ্ঠুরতাও নয়।

এ পর্যন্ত ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার সম্পর্কে তার কোনও দাম্ভিকতা বা ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায় না। কলকাতা আক্রমণ করার আগে (১৬ জুন) সিরাজ আপস-মীমাংসার জন্য ইংরেজদের অনেক সময় দিয়েছিলেন, প্রথমে অস্ত্রধারণ না করে শুধু কূটনীতি ও দৌত্যের মাধ্যমে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে মিটমাটের চেষ্টা করেছিলেন। তা যখন ব্যর্থ হল, তখনই তিনি একদিকে দৌত্য এবং অন্যদিকে অস্ত্রধারণ করলেন। কাশিমবাজার কুঠি অবরােধ করার পেছনে বােধহয় সিরাজের উদ্দেশ্য ছিল, ওখানে ইংরেজদের নিরস্ত্র করে ওই কুঠির প্রধান ওয়াটসের মাধ্যমে কলকাতায় ইংরেজদের ওপর নবাবের সঙ্গে মিটমাট করে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা। ওয়াটসের সঙ্গে চুক্তির যে শর্তাবলী, সেগুলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযােগের ওপর ভিত্তি করা এবং মােটেই অযৌক্তিক কিছু নয়। তা ছাড়া এরকম ক্ষেত্রে ইউরােপীয় কোম্পানির কুঠি অবরােধ করা নতুন কিছু নয়, সিরাজের আগের নবাবরাও তা করেছেন। হুগলির ডাচ কুঠিয়ালরাও জানাচ্ছে যে ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গকে দুর্ভেদ্য করার জন্য যেসব নির্মাণকার্য করেছিল, সেগুলি ভেঙে দেবার জন্য নবাবের নির্দেশে তারা কর্ণপাতও করেনি। এভাবে তাকে অগ্রাহ্য করার জন্যই নবাব কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করেন।

সিরাজদ্দৌল্লার ‘অর্থলিপ্সার’ কোনও প্রমাণ কিন্তু সমসাময়িক নথিপত্রে পাওয়া দুষ্কর, যদিও শুধু হিল সাহেব নন, এমনকী অধুনাও কোনও কোনও ঐতিহাসিক সােজাসুজি বা প্রচ্ছন্নভাবে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোেগ্য, সিরাজ যদি অর্থলােলুপ হতেন, তা হলে কাশিমবাজার কুঠির পতনের পর ইংরেজদের ওখানকার সব ধনসম্পত্তি তিনি অনায়াসে আত্মসাৎ করতে পারতেন। তিনি কিন্তু কিছুতে হাত দেননি, শুধু ইংরেজদের অস্ত্রশস্ত্র ও গােলাবারুদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। তিনি তাদের কাছ থেকে কোনও অর্থও দাবি করেননি। তার চেয়েও বড় কথা, ওয়াটস যে-সব শর্তাবলীতে সই করেছিলেন, তাতেও অর্থের কোনও কথা ছিল না, যদিও এ রকম ক্ষেত্রে অর্থের দাবি করাটা প্রচলিত রীতি ছিল এবং বাংলার পূর্বেকার নবাবরা তা করেছিলেন। সিরাজদ্দৌল্লা যে ইংরেজদের সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন এবং তার তথাকথিত ‘অর্থলিপ্সা’ যে তাতে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, তা ওয়াটস ও কোলেটের চিঠি থেকে স্পষ্ট: ‘নবাব যে একটা আপস-মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন তার প্রমাণ তিনি কাশিমবাজারে যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম ছাড়া কোম্পানির অন্য কোনও জিনিসে হাত পর্যন্ত দেননি।’ পরে অবশ্য কলকাতা আসার পথে নবাবের দেওয়ান ও সেনাপতি দুর্লভরাম ওয়াটস ও কোলেটের কাছে অর্থের দাবি করেন — নবাব নন — তাও খুব একটা জোর দিয়ে নয়, অনেকটা তাদের যাচাই করার জন্য, অর্থের বিনিময়ে ইংরেজরা নবাবের কলকাতা অভিযান বন্ধ করতে রাজি কি না দেখতে হয়তাে। ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের অনেকে অবশ্য ভেবেছিল কিছু টাকাপয়সা দিয়ে নবাবের সঙ্গে একটা বােঝাপড়া করা যেত কিন্তু ইংরেজদের প্রতি সিরাজদৌল্লার অসন্তোষ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে শুধু অর্থ দিয়ে তা দূর করা সম্ভব ছিল না বলেই মনে হয়। অবশ্য এটা ঠিক যে, কলকাতা দখল করার পর মুর্শিদাবাদ ফেরার পথে তিনি ডাচদের কাছ থেকে সাড়ে চার লক্ষ টাকা ও ফরাসিদের থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা নজরানা হিসেবে নিয়েছিলেন।কলকাতার ইংরেজ কোষাগারে নবাব মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার মতাে পেয়েছিলেন। এখানে স্মর্তব্য, বাংলার সব নবাবই কোনও যুদ্ধজয়ের পর বা ওরকম উপলক্ষে বিদেশি বণিক ও দেশীয় সওদাগরদের কাছ থেকে প্রথাগত নজরানা আদায় করতেননজরানার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে বেশিও হত। তবু বেছে বেছে অর্থলিপ্সার অপবাদ সিরাজের ঘাড়ে চাপানো কেন?

সিরাজদ্দৌল্লার কলকাতা আক্রমণের সময় ইংরেজ কোম্পানির যে ক্ষয়ক্ষতি হয় (আনুমানিক বারাে লক্ষ টাকার মতাে) তা মূলত সংঘর্ষের সময় অগ্নিকাণ্ডের জন্যই। লুঠতরাজ অবশ্য হয়েছিল সন্দেহ নেই। ইংরেজ কোম্পানির সরকারি ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমের (Robert Orme) মতে তার জন্য দায়ী ছিলেন রাজা মানিকচাঁদ, সিরাজ নন। পরে সিরাজ তাকে এজন্য কারাদণ্ড দেন এবং দশ লক্ষ টাকা জরিমানা দিয়ে তিনি শেষে মুক্তি পান। সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে অর্থলােলুপতার অভিযােগ যে কত অসার এবং তা যে দু’পক্ষের মধ্যে বিরােধের জন্য একেবারেই দায়ী নয় তা এক অজ্ঞাতনামা ইংরেজের লেখা [লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত] পাণ্ডুলিপি থেকে স্পষ্ট। ওই লেখক বলছেন: ‘বাংলার সুবাদার [সিরাজদ্দৌল্লা] যা চেয়েছিলেন তা মােটেই অর্থ নয় — অর্থের ব্যাপারটা ছিল নিতান্তই গৌণ। তিনি আসলে চেয়েছিলেন, ইউরােপীয়রা নিজেদের সুসংহত করার জন্য দুর্গগুলিকে যেভাবে দুর্ভেদ্য করে তুলছিল, তার সম্পূর্ণ অবসান।’ এমনকী যে হলওয়েল সিরাজের প্রতি মােটেই সদয় ছিলেন না, তার ব্যাপারও প্রমাণ করে যে, সিরাজ মোটেই অর্থগৃধ্নু ছিলেন না। কলকাতার পতনের পর যখন হলওয়েলকে বন্দি হিসেবে নবাবের কাছে উপস্থিত করা হল, তখন তিনি নবাবকে জানান যে, যুদ্ধের ফলে তাঁর ব্যক্তিগত অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও নবাবকে ভাল পরিমাণ অর্থ দিয়েই তিনি তার মুক্তি কিনতে চান। সিরাজ এর উত্তর দিয়েছিলেন: “হলওয়েলের টাকা থাকলে তার নিজের কাছেই থাক। তার অনেক যন্ত্রণাভোগ হয়েছে, তাকে মুক্তি দেওয়া হােক।”
এ থেকে একটা জিনিস সুস্পষ্ট যে সিরাজদ্দৌল্লা অর্থলােলুপ ছিলেন না এবং অন্তত কিছুটা মানবিকতাবোেধও তার মধ্যে ছিল। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক তাকে যতটা ‘অমানুষ’ ভাবেন, ততটা অমানুষ হয়তাে তিনি ছিলেন না।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজদ্দৌল্লার তিনটে নির্দিষ্ট অভিযােগ ছিল এবং আমাদের কাছে যেসব তথ্যপ্রমাণ আছে তা থেকে স্পষ্ট যে এগুলি খুবই ন্যায়সঙ্গত। এগুলিকে ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য শুধু ‘মিথ্যা ওজর’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজদ্দৌল্লার অভিযােগ:
(১) ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও এটাকে দুর্ভেদ্য এবং সুসংহত করার প্রচেষ্টা। (২) দস্তকের বা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিপত্রের যথেচ্ছ অপব্যবহার। (৩) নবাবের অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয়দান।

খােজা ওয়াজিদকে ইংরেজদের সঙ্গে আপস-মীমাংসার দৌত্যে নিযুক্ত করার পর সিরাজদ্দৌল্লা তাঁকে একটা চিঠিতে ইংরেজদের প্রসঙ্গে তার নিজের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন: “তিনটে মুখ্য কারণে আমি আমার রাজ্য থেকে ইংরেজদের বহিষ্কার করতে চাই। প্রথমত, দেশের কোনও আইনকানুন না মেনে তারা বাদশাহি মুলুকে [বাংলায়] গড়খাই কেটে জোরদার কেল্লা বানিয়েছে। দ্বিতীয়ত, তারা দস্তকের যথেচ্ছ অপব্যবহার করেছে, এমন সব লােককে দস্তক দিয়েছে যারা কোনওমতেই তা পেতে পারে না এবং তাতে বাদশাহের [রাজ্যের] রাজস্বের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। তৃতীয়ত, নবাবকে অগ্রাহ্য করে নবাবের অপরাধী প্রজাদের নবাবের বিচারের হাত থেকে তাদের রেহাই দিতে কলকাতায় আশ্রয় দিচ্ছে।”

... ইংরেজদের বাংলা বিজয় কোনওক্রমেই ‘আকস্মিক’ বা ‘অনিচ্ছাকৃত’ ঘটনা নয়। পলাশির বিপ্লব বাংলার অভ্যন্তরীণ কোনও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটের ফলও নয়। এটাকে ক্ষমতাসীন শাসকগােষ্ঠীর সঙ্গে নবাবের বিরােধের ফলে উদ্ভূত ঘটনাও বলা যায় না। অনুরূপভাবে, পলাশি সম্বন্ধে ‘কোলাবােরেশন’ থিসিসও অচল — যাতে বলা হয়, ইউরােপীয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে (বিশেষ করে ইংরেজদের সঙ্গে) বাংলার ব্যবসায়ী ব্যাঙ্কার শ্রেণীর স্বার্থ এমনই ওতপ্রােতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল যে তারা, নবাব বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করবেন, এটা কোনওমতেই সহ্য করতে পারেনি এবং সেজন্যই নবাবকে তাড়াতে তারা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। আসলে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্যের স্বার্থেই ইংরেজদের বাংলা বিজয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এইসব কর্মচারীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে প্রভূত ধনােপার্জন করা এবং তা নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে তােফা আরামে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাকি জীবন অতিবাহিত করা। কিন্তু মধ্য-অষ্টাদশ শতকে এই ব্যক্তিগত বাণিজ্য চরম সংকটের সম্মুখীন হয় এবং ফলে এই বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক কমে যায়। আর এই ব্যক্তিগত বাণিজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্যই কোম্পানির কর্মচারীরা সাব-ইম্পিরিয়ালিজম (sub-imperialism) বা স্বায়ত্ত্ব-সাম্রাজ্যবাদের আশ্রয় নেয়। অর্থাৎ তারা নিজেদের কার্য ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য বাংলায় কোম্পানির আর্থিক ও সামরিক শক্তিকে কাজে লাগায় এবং তার ফলেই ইংরেজদের বাংলা বিজয় সম্ভব হয়।

ইংরেজরাই যে মূলত পলাশি বিপ্লব সংগঠিত করেছিল সে-বিষয়ে সন্দেহে কোনও অবকাশ নেই। ক্লাইভ এবং ওয়াটসনকে বাংলায় পাঠাবার সময় মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিল যে-নির্দেশ তাঁদের দিয়েছিল তার মধ্যেই পলাশি বিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল এবং তাতেই ষড়যন্ত্রের সদর দরজা খুলে গিয়েছিল। অবশ্য একথা অস্বীকার করা যায় না যে, মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নবাবের বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত করার চেষ্টা করছিল। তবে এ ব্যাপারে যেটা বিশেষভাবে প্রণিধানযােগ্য তা হল, ইংরেজদের মদতেই এই চক্রান্ত চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং তাদের সক্রিয় অংশ ছাড়া এই ষড়যন্ত্র পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটাতে পারত না। ইংরেজরাই নবাবের বিরুদ্ধে দরবারের অমাত্যদের একটা বড় অংশকে নানা প্রলােভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে তাদের নিজেদের পরিকল্পিত বিপ্লব সফল করতে ওই অভিজাতবর্গকে নিজেদের দলে টেনে আনে। পলাশি যুদ্ধের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তারা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল, যাতে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে মসনদ থেকে হঠানােয় স্থিরসংকল্প থাকে। তা ছাড়া পলাশি বিপ্লবের পরিকল্পনা যাতে তাড়াতাড়ি সফল করা যায় তার জন্য ইংরেজরাই ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীদের চেয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। সুতরাং এটা ঠিক নয় যে, পলাশির ষড়যন্ত্র ‘দেশীয় ষড়যন্ত্র’। স্থানীয় চক্রান্তকারীরা ইংরেজদের পরিকল্পনার পুরাে ছকের তাৎপর্য উপলব্ধিই করতে পারেনি এবং সেই নির্বুদ্ধিতার জন্য অচিরেই তাদের বিরাট মূল্য দিতে হয়েছিল। নতুন বিজেতাদের হাতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ধনেপ্রাণে মারা পড়ল, ভবিষ্যতের কোনও আশাও রইল না।

এ-প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায় — মুর্শিদাবাদ দরবারের প্রভাবশালী একটি বেশ বড় অংশ নবাবের বিরুদ্ধে গেল কেন এবং কেনই বা তারা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলাল? তার মূল কারণ, খামখেয়ালি ও দুঃসাহসী তরুণ সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ায় উপরােক্ত অমাত্যগােষ্ঠী শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এই গােষ্ঠীতে ব্যবসায়ী ব্যাঙ্কার, জমিদার ও অভিজাত সেনানায়করাও ছিল। এরাই নবাবি আমলে এতদিন সম্পদ পুঞ্জীভবনে লিপ্ত ছিল। সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর এরা শঙ্কিত হয়ে পড়ে যে এদের অবিরত সম্পদ আহরণের মূল উৎসগুলি সিরাজ বন্ধ করে দিতে পারেন এবং ফলে এদের বৈভবের পথে তিনি এক মূর্তিমান বাধা।

ব্যাপারটা একটু বিশদ করে বললে বুঝতে সুবিধে হবে। জগৎশেঠদের বিপুল ঐশ্বর্য নানারকম একচেটিয়া ব্যবসা বাণিজ্যের ফলে সঞ্চিত হয়েছিল। এগুলি হল, টাকশালের প্রায় একচ্ছত্র অধিকার, পুরনাে মুদ্রাকে নতুন মুদ্রায় পরিবর্তিত করার একচেটিয়া ব্যবসা, বাট্টা নিয়ে অন্য জায়গার মুদ্রা বিনিময় করা, রাজস্ব আদায়ের অধিকার ইত্যাদি। সিরাজের পূর্ববর্তী বাংলার নবাবরাই এই বিশেষ সুযােগ সুবিধেগুলি তাঁদের ব্যক্তিগত দাক্ষিণ্য ও অনুগ্রহ হিসেবে জগৎশেঠদের প্রদান করেছিলেন এবং এগুলির মাধ্যমেই শেঠদের বিপুল সমৃদ্ধি। ঠিক এভাবেই উমিচাঁদ পেয়েছিলেন সােরা, শস্য ও আফিং-এর একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার। আর্মানি বণিক খােজা ওয়াজিদের লবণ ও সােরার একচেটিয়া ব্যবসাও নবাবের দাক্ষিণ্যে। সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর এইসব বণিকরাজাদের আশঙ্কা হল যে, তারা নবাবদের দাক্ষিণ্যে এতদিন যেসব সুযােগসুবিধে ভােগ করছিলেন এবং যার জন্য তাদের এত সমৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে, সেগুলি থেকে সিরাজ এখন তাদের বঞ্চিত করতে পারেন। মীরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লতিফের মতাে অভিজাত সেনানায়ক ও ভূস্বামী শ্রেণী, যাঁদের সঙ্গে ব্যবসায়ী ব্যাঙ্কার শ্রেণীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তারাও শঙ্কিত হলেন যে, তাদের পক্ষে অনুকূল ক্ষমতার যে কায়েমী ব্যবস্থা চলে আসছে তরুণ নবাব তার আমূল পরিবর্তন করতে পারেন। এক কথায় বলতে গেলে, মুর্শিদাবাদ দরবারের ক্ষমতাসীন গােষ্ঠীর একটি বড় অংশ, যার মধ্যে বণিক ব্যাঙ্কার থেকে জমিদার ও অভিজাত সেনানায়ক পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল, সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের সমৃদ্ধি অক্ষুন্ন ও অব্যাহত রাখার পক্ষে বিপজ্জনক বাধা হতে পারে ভেবে আশঙ্কিত হয়ে পড়ে।
তাদের আশঙ্কা যে খুব অমূলক নয় এবং তাদের সামনে যে বিপদ তার স্পষ্ট সংকেত পাওয়া গেল মীরবক্সির পদ থেকে মীরজাফরের অপসারণ, রাজা মাণিকচাঁদের কারাদণ্ড এবং সর্বোপরি বাংলা থেকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ হাকিম বেগের বিতাড়নের মধ্যে। একদিকে এই সব ঘটনা এবং অন্যদিকে নতুন ও উদীয়মান একটি গােষ্ঠীর — যার মধ্যে মােহনলাল, মীর মর্দান, খাজা আব্দুল হাদি খান প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং যারা এখনও পর্যন্ত সম্পদ পুঞ্জীভবনে লিপ্ত হয়ে পড়েননি — সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ক্ষমতাসীন গােষ্ঠী তাদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেওয়াল লিখন স্পষ্ট দেখতে পেল। হাকিম বেগকে অপসারণ করায় এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সিরাজ নবাব আলিবর্দির একান্ত ঘনিষ্ঠ অমাত্যদের ওপরও আঘাত হানতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না। হাকিম বেগ ছিলেন আলিবর্দির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং মুর্শিদাবাদের পরাক্রমশালী ‘পাচোত্রা দারােগা’ (শুল্ক বিভাগের দারােগা)। তার ক্ষমতার প্রধান উৎস ছিল আলিবর্দির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। নানারকমের জোরজুলুম ও একচেটিয়া ব্যবসা করে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কুখ্যাত হয়ে ওঠেন। এত প্রভাবশালী ও পূর্ববর্তী নবাব আলিবর্দির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এমন একজন অমাত্যকে সিরাজদ্দৌল্লা দেশ থেকে বিতাড়ন করায় দরবারের ক্ষমতাসীন গােষ্ঠী নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
আবার মীরবক্সির পদ থেকে মীরজাফরের অপসারণের ফলে ওই গােষ্ঠীর মনে নবাবের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহই রইল না। রায়দুর্লভ কোনও মতেই মেনে নিতে পারলেন না যে মােহনলাল তাঁর কাজকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করবেন। অন্যদিকে খাজা আব্দুল হাদি খান মীরজাফরের পদে নিযুক্ত হওয়ায় স্বভাবতই তা তার অসহ্য মনে হয়েছিল। জগৎশেঠ ও অন্য দুই বণিকরাজা উমিচাদ ও খােজা ওয়াজিদের আশঙ্কা হল তাদের বিপুল উপার্জনের প্রধান উপায় একচেটিয়া ব্যবসা বাণিজ্যের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে এবং যে বিশেষ সুযােগসুবিধেগুলি তারা এতদিন ভােগ করে আসছিলেন সেগুলি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। তরুণ ও বেপরােয়া নবাব সিরাজদ্দৌল্লা থাকলে তাদের কায়েমী স্বার্থ ও ক্ষমতার সৌধ বিনষ্ট হয়ে যাবে। সেজন্য সিরাজকে হঠানাে দরকার, যাতে তাদের সম্পদ পুঞ্জীভবনের উপায়গুলি রুদ্ধ না হয়ে যায়, যাতে মােহনলাল ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে যে নতুন গােষ্ঠীর আবির্ভাব হচ্ছে তাদের হাতে ক্ষমতা চলে না যায়, যাতে নবাবের ঘনিষ্ঠ এই নতুন গােষ্ঠী ক্ষমতাসীন গােষ্ঠীর ওপর আঘাত হানতে না পারে।

তা সত্ত্বেও ইংরেজদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া পলাশির বিপ্লব সম্ভব হত না। সিরাজদ্দৌল্লার উত্থান ইংরেজদের পক্ষেও বিপজ্জনক ছিল, বিশেষ করে, ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের স্বার্থের দিক থেকে, যদিও কোম্পানির দিক থেকে ততটা নয়। তরুণ নবাব কোম্পানির কর্মচারীদের অসদুপায়ে অর্থোপার্জনের যে কল্পতরু একদিকে বেআইনিভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্য অন্যদিকে দস্তকের যথেচ্ছ অপব্যবহার — তার মূল ধরে সজোরে নাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের বিপুল উপার্জনের এই দুটি সহজ পথ থেকে সরে আসতে কোনওমতেই রাজি ছিল না। তার ওপর সিরাজ এ-সব অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুললেন এমন সময় যখন কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য এক নিদারুণ সংকটের সম্মুখীন। তরুণ নবাব ইংরেজদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি আগেকার নবাবদের মতাে দস্তকের অপব্যবহার বা কর্মচারীদের বেআইনি ব্যক্তিগত বাণিজ্য কোনওটাই বরদাস্ত করবেন না। এসব কর্মচারীরা এশীয় বণিকদের কাছে দস্তক বিক্রি করত যা দেখিয়ে এশীয় বণিকরা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করতে পারত। দস্তক বিক্রি করে কোম্পানির কর্মচারীরা প্রচুর উপার্জন করত। তবে নবাব এটা বন্ধ করে দিতে পারেন বলে তারা খুব একটা ভয় পায়নি তাদের আরও অনেক বেশি ভয়ের কারণ ছিল নবাব যদি তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। সেটা নিয়েই তারা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। কারণ বাংলায় তাদের ধনােপার্জনের সবচেয়ে বড় উপায় ছিল এই ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্য। তাই তাদের কাছেও সিরাজদ্দৌল্লা ছিলেন বিপজ্জনক। ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ও ক্লাউন্সিলের সদস্যসহ কোম্পানির সব কর্মচারীই ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে ধনসম্পদ আহরণের এমন লােভনীয় উপায় বন্ধ করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক ছিল না। সুতরাং তারা সবাই নবাবকে হঠাতে উদগ্রীব হয়ে উঠল।
অবশ্য ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল যে মুর্শিদাবাদ দরবারের ক্ষমতাসীন গােষ্ঠীর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তাদের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনায় সামিল করতে না পারলে বিপ্লব করা সম্ভব হবে না। এই কারণেই কলকাতা আসার কিছুদিন পরে এবং চন্দননগরের পতনের আগেই ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটির সঙ্গে একযোেগে কাশিমবাজারে উইলিয়াম ওয়াটসকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন যথাসাধ্য চেষ্টা করে যান যাতে জগৎশেঠ পরিবার আমাদের স্বার্থের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন। তা ছাড়াও নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ সদস্যদের সমর্থন ও সাহায্য পাওয়ার জন্য ইংরেজরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দরবারের অধিকাংশ অমাত্যই ছিল চুপচাপ, সুযােগের সন্ধানে — পলাশিতে ইংরেজ বিজয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা যাকে বলে বেড়ার ধারে দাড়িয়ে ছিল, কিছুমাত্রও এগিয়ে আসেনি। খুব সম্ভবত তাদের পরিকল্পনা ছিল, শেষপর্যন্ত যে-দল জিতবে তাদের সঙ্গে যােগ দেওয়া অর্থাৎ ইংরেজরা নবাবকে পরাজিত ও বহিষ্কৃত করলে একমাত্র তখনই তারা ইংরেজদের স্বাগত জানাবে কারণ নবাব ইংরেজদের মতাে তাদেরও স্বার্থের পরিপন্থী। কিন্তু পাছে নবাবের জয় হয় এবং সেক্ষেত্রে তার রােষানলে পড়ার ভয়ে প্রায় কেউই সামনাসামনি ইংরেজদের সমর্থন করতে এগিয়ে আসেনি।
অন্যদিকে ইংরেজদের পক্ষে নবাবের বিরুদ্ধে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না কারণ এই নবাব রাজত্ব করতে থাকলে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্যের, যেটা তখন খুবই সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল, পুনরুদ্ধার কোনওমতেই সম্ভব ছিল না। একমাত্র সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে পারলে তা সম্ভব হবে। তাই সিরাজদ্দৌল্লার পর কে নবাব হবে বা কে হলে ভাল হয় তা নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা ছিল না। ভালমন্দ যে কেউ নবাব হলেই চলবে, যদি সে সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। সেইজন্য যখন ইয়ার লতিফকে নবাব পদে প্রার্থী হিসেবে পাওয়া গেল, তার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু না জেনে বা খোঁজখবর না নিয়ে তারা তাঁকে লুফে নিল। এমনকী ক্লাইভ ইয়ার লতিফের প্রার্থীপদ অনুমােদন করলেও লতিফ হিন্দু না মুসলমান, ব্যক্তি হিসেবে ভাল না মন্দ, এ-সব কিছুই জানতেন না। তারপর যখন ইংরেজরা জানল যে মীরজাফর নবাব হতে আগ্রহী তখন সঙ্গে সঙ্গে তারা ইয়ার লতিফকে বাতিল করে তাকেই নবাব পদে প্রার্থী হিসেবে মনােনীত করল। কারণ, মীরজাফর যােগ্যতর ব্যক্তি বলে নয়, তিনি ইয়ার লতিফের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী, নবাবের প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ এবং অনেক বেশি জোরালাে প্রার্থী। অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি জগৎশেঠদের খুব কাছের লােক। ইংরেজরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছিল যে, জগৎশেঠদের অনুমােদন ছাড়া বাংলায় কোনও বিপ্লব সম্ভব নয় এবং সেজন্যই তাদের ইয়ার লতিফকে ছেড়ে মীরজাফরকে প্রার্থী করতে হল। আবার এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে ইংরেজরা পলাশি বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য শুধু নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ অমাত্যদের ওপর নির্ভর করে বসে ছিল না। সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাতে তারা এতটাই আগ্রহী এবং অস্থির হয়ে পড়েছিল যে, যদি কোনও কারণে মুর্শিদাবাদের ক্ষমতাসীন গােষ্ঠীর সাহায্যে তারা বিপ্লব সংগঠিত করতে না পারে, তা হলে তারা বাংলা বিজয়ের জন্য মারাঠা অথবা দিল্লির বাদশাহের প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল।

সুতরাং আমাদের চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, ইংরেজদের এবং মুর্শিদাবাদ দরবারের অমাত্যদের একটা বড় অংশের, উভয়ের স্বার্থেই, সিরাজদ্দৌল্লার সিংহাসনচ্যুতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল এবং সেজন্যই পলাশি বিপ্লব। ইংরেজরাই পলাশি চক্রান্তের মূল উদ্যোক্তা, ষড়যন্ত্রে তাদেরই মুখ্য ভূমিকা। তারাই নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ গােষ্ঠীকে তাদের পরিকল্পিত বিপ্লবের ষড়যন্ত্রে টেনে আনে এবং এভাবে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটায়। সেই পতনে শেষপর্যন্ত কারা এবং কী পরিমাণ লাভবান হয়েছিল ভারতবর্ষের পরবর্তী দু’শাে বছরের ইতিহাস তার সাক্ষী॥”
— সুশীল চৌধুরী / পলাশির অজানা কাহিনী ॥ [ আনন্দ পাবলিশার্স (কলকাতা) - জানুয়ারি, ২০০৪ । পৃ: ৩৭-৪৬ / ১৭৪-১৭৮ ]

Keywords