নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > যেভাবে সুপ্রিম কোর্ট কতৃক ‘রং হেডেড’ ঘোষিত হয়েছিলেন

যেভাবে সুপ্রিম কোর্ট কতৃক ‘রং হেডেড’ ঘোষিত হয়েছিলেন

12 June 2019, Shamsul Alam PrintShare on Facebook

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট ও সুপ্রিমকোর্ট বার সমিতির তৎকালীন সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ১ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি আবেদন করেন। তাতে অভিযোগ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ভারত থেকে ফিরে গত ২৯ জানুয়ারি গণভবনে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এমন সব বক্তব্য দেন, যার কিছু অংশ সুস্পষ্টভাবে আদালত অবমাননার শামিল। আবেদনের সঙ্গে তিনি ৩০ জানুয়ারি ১৯৯৯ তারিখের দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা সংযুক্ত করে প্রকাশিত কতিপয় বিবৃতি প্রধান বিচারপতির নজরে আনেন।

Daily ‘Dinkal’ পত্রিকায় খবর লেখা হয়…. “গত ২৫ ও ২৬ আগষ্ট দুদিনে হাইকোর্টে ১২শ মামলার জামিন হয়েছিল। এটা কখনো হতে পারে না। এরপর কোর্ট পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেননি।”
Daily ‘Sangram’পত্রিকায় খবর লেখা হয়….“বাংলাদেশের হাইকোর্টের এমন অবস্থা করে রেখে গেছে পূর্বের সরকার যে, দুই দিনে ১২শ মামলার জামিন হয়ে যায়। কিভাবে হলো, কেন হলো?এটা কোনদিন হয়? এটা প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনা হয়েছে। যদিও কোর্ট চেঞ্জ করা হয়েছে কিন্তু কোন ব্যবস্থা তিনি নেননি। যদি তদন্ত করা হতো এবং ব্যবস্থা নেয়া হতো তবে জুডিসিয়ারী অনেক দায় দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেত। জুডিসিয়ারী সম্পর্কে মানুষের কোন সন্দেহ দেখা দিত না।”

বিচারপতি হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়া তার বক্তব্যে বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে, “গত বছর ২৫ ও ২৬ আগস্ট ২ দিনে হাইকোর্ট ১২শ’ আসামীর জামিন দিয়েছে। এটা কি হতে পারে? এভাবে কেন হবে? এছাড়া এটা কি ন্যায়সঙ্গত? বিষয়টি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়েছে কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। উপরন্তু বেঞ্চ পরিবর্তন করা হয়েছে।” প্রকৃতপক্ষে দু’দিনে ১৫৫টি মামলায় ৩৬৭ জনের জামিন দেয়া হয়। শেখ হাসিনা ওয়াজেদের দেয়া এ তথ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তার দেয়া তথ্যকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তার দলের অনেকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন। সুপ্রিমকোর্টের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে তিনি (হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়া) মনে করছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া তথ্য উদ্দেশ্যমূলক ও আদালত অবমাননার শামিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাঁকে কারণ দর্শানো হোক যে, কেন তাঁর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হবে না এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার করে শাস্তি দেয়া হবে না।’ আবেদনে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এই অভিযোগ করা হয় যে, খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে এ ধরনের বক্তব্য সুপ্রিমকোর্টের বিজ্ঞ বিচারপতিগণ ও বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির ন্যায়পরায়ণতা ও বিচক্ষণতা নিয়ে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করবে। তথাপি তিনি এ ধরনের মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে সুপ্রিমকোর্টের বিজ্ঞ বিচারপতিগণ ও বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির উচ্চ ভাবমূর্তি এবং অভিযোগ করার অযোগ্য ন্যায়পরায়ণতা ও বিচক্ষণতাকে সচেতনভাবে খর্ব করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আবেদনকারী সুষ্ঠু বিচারের প্রার্থনা জানিয়েছেন।

১৯৯৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এটর্নি জেনারেলকে অবহিত করে আপিলেট ডিভিশনে শুনানির জন্য আবেদনটি তালিকাভুক্ত হয়। সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে আপিল বিভাগের ৮ নম্বর আইটেম ডাকার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জনাকীর্ণ হয়ে পড়ে। প্রধান বিচারপতি এটিএম আফজলের সভাপতিত্বে ৫ জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চ উভয় পক্ষকে শুনানী করে সর্বসম্মতভাবে আদেশ প্রদান করেন যে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে লিখিতভাবে এভিডেভিট প্রদান করতে হবে দু’সপ্তাহের মধ্যে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ আদেশে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে আনীত আদালত অবমাননার মামলাটি দেখলাম। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হাবিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ও বিজ্ঞ এটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শুনলাম। দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক সংগ্রামে গত ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যের প্রতি আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ তারিখের পত্রিকায় হাইকোর্ট কর্তৃক জামিন প্রদান ও প্রধান বিচারপতির করণীয় সংক্রান্ত ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছাপা হয়। ওই সংবাদের সংশ্লিষ্ট অংশটি আদালত আমলে নিয়েছে এবং এটর্নি জেনারেলের দৃষ্টিতে দিয়েছেন। এই সংবাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা বক্তব্য এটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে আদালতে পেশ করার জন্য বলা হচ্ছে।’

প্রধান বিচারপতি এটিএম আফজালের সভাপতিত্বে আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিগণ ছিলেন বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি মোঃ লতিফুর রহমান, বিচারপতি বিমলেন্দু বিকাশ রায় চৌধুরী ও বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমান।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশের প্রেক্ষিত্রে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নিজ সাক্ষরে এফিডেভিট জমা দেন, তাতে বলেন, “দেশে আইন শৃংখলা ও সেই প্রসঙ্গে প্রকাশিত সংবাদ/মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আমি এ অভিমত প্রকাশ করেছিলাম। এ অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বিচারকদের সততা সম্পর্কে কোন সন্দেহ প্রকাশ করিনি বা এ অভিমত প্রকাশ করার পেছনে আদালতের বা প্রধান বিচারপতির মর্যাদা ক্ষুন্ন করার বা বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করার কোন অভিপ্রায় আমার ছিলনা “

উভয় পক্ষের শুনানী শেষে ৪ মার্চ এক জনাকীর্ন আদালতে প্রধান বিচারপতি এটিএম আফজালের নেতৃত্বে আপিলেট ডিভিশন রায় ঘোষণা করেন যে, “প্রধান বিচারপতি তাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এহেন বক্তব্যে খুবই অস্বস্তি বোধ করছেন। সত্য ঘটনা কিংবা সংখ্যা দেয়ার পূর্বে প্রধানমন্ত্রীকে আরো সতর্ক ও সাবধান হওয়া উচিত ছিল এবং সংবাদপত্রের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করাটা ঠিক হয়নি। সঠিক সংখ্যা পেলেও আরো অনেক মামলায় ঐ জামিন মঞ্জুর করা হয়েছিল এমনটা মনে করে তিনি মন্তব্য করলেও আমাদের কিছুই বলার থাকতো না। কারণ প্রধান নির্বাহী হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কিত বিষয়ে তিনি নিজস্ব মন্তব্য দিতে পারেন।” আদালত অবমাননার বিচারের জন্য আপীল বিভাগের কাছে পেশ করা ঘটনাবলি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গিয়ে “রং হেডেড” এর ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি লর্ড এ্যাটকীনের বাণী এখানে উদ্ধৃত করেন, যা আদালত সর্বদাই বাণী মেনে চলেন। লর্ড এ্যাটকীন বলেছেনঃ “... The path of criticism is a public way: the wrongheaded are permitted to err therein: provided that members of the public abstain from imputing improper motives to those taking part in the administration of justice, and are genuinely exercising a right of criticism and not acting in malice or attempting to impair the administration of justice, they are immune. Justice is not a cloistered virtue: she must be allowed to suffer the scrutiny and respectful even though outspoken comments of ordinary men.”

প্রধানমন্ত্রীকে তার পদে থেকে সাংবিধানিক কার্যক্রম নিয়ে উপস্থিত মন্তব্য করার ব্যাপারে আরো সতর্ক হতে হবে বলে আদালত আশা করে। এসব কারণে উপরোক্ত মন্তব্যের আলোকে আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হল। রায়টি ডিএলআর 51 DLR (AD) (1999) 68 বিধিবদ্ধ রয়েছে।

Keywords

-