নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > তৈমূর আলম খন্দকার > তিন স্তরের মানবজীবন

তিন স্তরের মানবজীবন

18 May 2019, nayadiganta PrintShare on Facebook

ভারতবর্ষের চাণক্য পণ্ডিত মানুষকে ‘দ্বিজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ‘দ্বিজ’ বলতে তিনি দ্বিতীয়বার জন্মকে বুঝিয়েছেন। হিন্দুধর্মে পুনঃজন্মের কথা বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে পুনঃজন্মের কথা বলা নেই। তবে জবাবদিহিতার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেমন-প্রত্যেক মানবকেই জবাবদিহি করতে হবে, অর্থাৎ বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এবং কর্মফল অনুযায়ী তার অবস্থান (জান্নাত বা জাহান্নাম) নির্ধারিত হবে। চাণক্য পণ্ডিতের বক্তব্য ধর্মীয় শাস্ত্র মতে নয়, বরং অভিজ্ঞতার আলোকে তার নিজস্ব মতবাদ। তিনি পুনঃজন্মের কথা না বলে মানুষের দ্বিতীয় জন্ম হয় বলে ‘দ্বিজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন কেন? ভাষাগত পার্থক্যেই বুঝা যায় যে, পুনঃজন্ম আর জীবিত থেকেই দ্বিতীয় জন্ম এক নয়। আগে সমসাময়িক দু’জন দার্শনিকের মতবাদকে উপস্থাপন করা হলো।

ইটালির জেলখানার চিকিৎসক যিনি দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেছেন সেই ঈবংধৎব খড়সনৎড়ংড় বলেছেন, মানুষ জন্মগতভাবেই অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে। শারীরিক গঠন প্রক্রিয়াই একটি মানুষের স্বভাব চরিত্র কী হবে তা বলে দিতে পারে। তিনি বলেছেন, বড় ধরনের নাক ও কান, চিকন-লম্বা দাঁত, লম্বা চোয়াল একটি অপরাধী মানুষের শারীরিক চিহ্ন। তৎসময়ের অন্যতম চিকিৎসক ও দার্শনিক ঈবংধৎব ইবপপধৎরধ বলেছেন, মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী হয়ে জন্মায় না। সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান একটি মানুষকে অপরাধী হতে বাধ্য করে। এ দু’টি পারস্পরিক বিরোধী মতবাদদাতাদের নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। কিন্তু অপরাধ জগৎ যেভাবে বিস্তৃতি লাভ করছে তা কি শুধু জীবন জীবিকার তাগিদে বা পারিপার্শ্বিক অবস্থানের কারণে? তিন বছরের একজন শিশু যখন ধর্ষিত হয় এবং ধর্ষণের পর যখন তাকে হত্যা করা হয় তখন এই অপরাধকে কোন শ্রেণীতে ফেলা যাবে? মাদরাসার অধ্যক্ষ (অভিযোগ মতে) প্রেম প্রার্থনায় ব্যর্থ হয়ে ছাত্রীকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেয়ার মতো জঘন্য অপরাধকে কিভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে?

অপরাধপ্রবণতা কি শারীরিক না মানসিক, না জৈবিক? জীবন জীবিকার স্বার্থে অর্থাৎ জৈবিক প্রয়োজনে মানুষ অপরাধ করে। যেমন ১২ মে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, একজন মানুষ দোকান থেকে দুধ চুরির অপরাধে গণপিটুনির শিকার হলেন। এ ঘটনায় খিলগাঁও অঞ্চলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার চুরির কারণ জিজ্ঞেস করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বলেন, ‘আমি পেশাগত চোর নই, তবে আমার ছেলের খাওয়ার দুধ নাই। দুধের টাকা জোগাড় করতে পারি নাই বলে চুরি করেছি।’ এ কথা শোনার পর পুলিশ অফিসারের নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ে যায় এবং তখনি তিনি ৫০০ টাকা দিয়ে দুধের দাম পরিশোধ করে বাকি টাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে দিতে বলেন। পুলিশের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও এ মহানুভবতাকে শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করতে হয়।

অভিযুক্ত ব্যক্তি চুরি করলেও এটা ছিল তার জৈবিক কারণ। জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মানুষ অপরাধ করার যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু তিন বছরের একজন শিশুকে ধর্ষণ করা বা ধর্ষণের পরে তাকে হত্যা করার পেছনে কী যুক্তি আছে? ১১ মে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত ‘মা’ দিবস উদযাপিত হয়ে গেল। মায়ের জাতিকে সম্মান করা ও নিরাপত্তা দেয়ার জন্যই এ দিবসটি পৃথিবীব্যাপী উযাপিত হয়ে আসছে। অথচ মায়ের জাতিই আজ সর্বক্ষেত্রে নির্যাতিত। সর্বত্র সব বয়সের নারীই গণধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। সবাই এসব ঘটনার শাস্তি দাবি করছেন এবং অবশ্যই শাস্তি হওয়া দরকার। তিন বছর থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী ধর্ষিত হওয়ার মহামারী সৃষ্টি হওয়ার পেছনের কারণ কী তা অবিলম্বে গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার।

আইন অমান্য করাই ‘অপরাধ’। উবারধহপব কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু সমাজ কর্তৃক ধিকৃত বিষয়। আইন ও সমাজ উভয় কর্তৃক ধর্ষণ ঘৃণিত। ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র অনেক কঠিন আইন প্রণয়ন করেছে বটে, কিন্তু এটা বন্ধ করার মনস্তাত্ত্বিক কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, বরং এতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সংস্কৃতির নামে নারীকে পণ্য হিসেবে বিক্রির উৎকট প্রতিযোগিতা চলছে।

জৈবিক চাহিদা বা অভাবকে মোকাবেলা করেও মানুষ অপরাধে না জড়ানোর দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। জাতীয় পত্রিকায় ১৪ মে প্রকাশিত একটি সংবাদ তুলে ধরা হলো। ‘টাকাভর্তি ব্যাগ রাস্তায় পেয়ে মালিককে ফিরিয়ে দিয়ে অসাধারণ সততার নজির স্থাপন করলেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলা সদরের মোটরসাইকেল মেকানিক আল আমীন বেপারি (২৫)। ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার দুপুরে উপজেলা সদরের গৌরনদী বন্দর এলাকায়। জানা গেছে, উপজেলার চরগাধাতলী গ্রামের মরহুম দলিল উদ্দিন বেপারির চতুর্থ ছেলে মোটরসাইকেল মেকানিক আল আমীন বেপারি প্রতিদিনের মতো গত রোববার সকাল থেকে গৌরনদী বন্দরের নিজের মোটরসাইকেল গ্যারেজে বসে কাজ করছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজের গ্যারেজের সামনের রাস্তার ওপর কালো রঙের একটি অফিসিয়াল ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে নেন। এরপর ব্যাগ খুলে দেখেন, ভেতরে ৭০ হাজার টাকা ও ২০ হাজার টাকার একটি চেকসহ মূল্যবান কাগজপত্র রয়েছে। এরপর আল আমীন খুঁজতে থাকেন ব্যাগের ভেতরে মালিকের কোনো মোবাইল নম্বর আছে কি না। একপর্যায়ে একটি মোবাইল নম্বর পেয়ে সেটিতে ফোন দিয়ে আল আমীন ব্যাগের প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করেন এবং পুরো টাকাসহ ব্যাগটি তার মালিককে ফিরিয়ে দেন।’

নৈতিকতা বোধ (সচেতন বা অবচেতনভাবে) যেকোনো ব্যক্তির উদ্ভব হতে পারে। দু’টি বিষয় একজন মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারে; যথাÑ নৈতিকতা ও শাস্তির ভয়। অন্য দিকে ঘবপবংংরঃু ফড়বং হড়ঃ শহড়ি ঃযব ষধি অর্থাৎ ‘চাহিদা আইন চেনে না’ - প্রবাদটি দীর্ঘদিন চলে আসছে। তবে এ প্রবাদের ওপর ভিত্তি করে চললে দুনিয়াতে ‘সভ্যতা’ বলে কিছু থাকবে না। যখনই কোনো রাষ্ট্রের শাসক বেকায়দায় পড়ে এবং তার ইচ্ছাশক্তিকে প্রয়োগের জন্য কোনো আইন বা পন্থা খুঁজে না পায়, তখন অবৈধ কর্মকে জায়েজ করে একটি মতবাদের মাধ্যমেÑ যা উড়পঃৎরহব ড়ভ ঘবপবংংরঃু নামে পরিচিত। ‘১/১১’ সরকার এ দেশে আলোচ্য মতবাদের দোহাই দিয়েই অনেক কার্য সম্পাদন করেছে।

মূল আলোচনাটি চাণক্য পণ্ডিতের ‘দ্বিজ’ অর্থাৎ ‘দ্বিতীয় জন্ম’ থেকে শুরু করছি। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কারো মতে, মানুষ অপরাধের মনোবৃত্তি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। ভিন্ন মতে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে অপরাধ করে। তবে দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করার বিষয়টি কী হতে পারে? পশু প্রাণী বা বৃক্ষ তরুলতার সাথে মানুষের তারতম্য কী?

মানুষসহ পৃথিবীর সব কিছুই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে মানুষ ছাড়া সবাই আপনা আপনি নিজস্ব অবস্থান থেকে বেড়ে ওঠে এবং কোনো প্রকার জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থেকেই জীবনের স্বাদ গ্রহণ করে। ব্যতিক্রম শুধু মানুষের বেলায়। কারণ মানুষও একপ্রকার প্রাণী, কিন্তু তারা সামাজিক প্রাণী। এ কারণেই ‘জবাবদিহিতার’ সৃষ্টি। ফলে মানুষের জন্ম অর্থাৎ শারীরিক জন্ম মানবজীবনের প্রথম ঝঃধমব এবং জবাবদিহিতামূলক জীবন শুরু করা হলো দ্বিতীয় ঝঃধমব। ‘জন্ম হউক যথাতথা, কর্ম হউক ভালো’ প্রবাদটি প্রণিধানযোগ্য। আগেই বলেছি, নৈতিকতাবোধ অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখতে পারে। মানুষের মনে নৈতিকতার সৃষ্টি হওয়ার জন্য অনেকেই ‘শিক্ষার’ ওপর গুরুত্ব দেন, তবে ‘শিক্ষা’ নৈতিকতার সম্পূরক, কিন্তু একক নিয়ন্ত্রক নয়। শুধু ‘বিবেকই’ নৈতিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

প্রকৃতিগত বিবেক মানুষের ভেতরই আছে বা থাকার কথা, যার নেই সে নিছক প্রাণী মাত্র। বিবেকের কারণে মানুষ হয়েও কেউ সমাজের আশীর্বাদ, কেউ অভিশাপ। ধর্মীয় মূল্যবোধই জবাবদিহিতামূলক বিবেককে শাণিত করে। যারা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেন কথিত সংস্কৃতিমনা বুদ্ধিজীবীরা তাদের ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে আখ্যায়িত করছেন, যে বুদ্ধিজীবীদের অনেকে অবাধ যৌনাচারকে ভিন্ন পন্থায় উসকিয়ে দিচ্ছেন। আকাশ সংস্কৃতি যৌনাচারকে মহামারীতে পরিণত করেছে, যা আইন করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। ফলে বিষয়গুলো গভীরভাবে তলিয়ে দেখা জরুরি।

সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, একজন মানুষ জীবনের তিনটি স্তর অতিক্রম করে, যথা- জন্মগ্রহণ, মৃত্যু ও একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করা। নতুবা ‘মানুষ’ শুধু একটি প্রাণীই থেকে যায়, কিন্তু মানবিক গুণসম্পন্ন একজন ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। একটি প্রাণী (জীব) ও সামাজিক প্রাণীর মধ্যে তারতম্য হলো, একটি প্রাণী তার চাহিদা পূরণ করে নিজের ইচ্ছামতো এবং একজন সামাজিক প্রাণী নিজের চাহিদা পূরণে সমাজের ঈযবপশ ধহফ ইধষধহপব কে নিশ্চিত করে। স্মরণ করা দরকার, মানুষ নিজে একটি প্রাণী, তবে ঝড়পরধষ অহরসধষ। একজন মানুষের ‘বিবেকের’ ওপরই নির্ভর করে তার মনুষ্যজীবনের সার্থকতা। মানুষ যখন বিবেক বর্জিত হয়ে পড়ে, তখন হিংস্র পশুর চেয়েও বেশি বর্বর হতে কুণ্ঠা বোধ করে না। তখন হিংস্র প্রাণী ও মানুষের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না, বরং মানুষ অধিক মাত্রায় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সমাজের প্রভাবশালী এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমতাবানদের মধ্যেই এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)

taimuralamkhandaker@gmail.com

Keywords