নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > বাংলাদেশে ফসল রক্ষার চেষ্টা যেভাবে নারীবিদ্বেষে রুপান্তরিত হয়

বাংলাদেশে ফসল রক্ষার চেষ্টা যেভাবে নারীবিদ্বেষে রুপান্তরিত হয়

29 August 2018, আসাদ হোসেইন PrintShare on Facebook

বাংলাদেশি পত্রিকা দৈনিক প্রথমআলো বিগত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে ‘‘ফসলের মাঠে নারীদের যেতে মানা!’’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে বলা হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নে ‘ফসলের ক্ষতি’ ও ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর অজুহাতে নারীদের মাঠে যাওয়ার বিষয়ে মসজিদের ইমাম নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। ছয় ব্যাক্তির বক্তব্য দিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে শুধু মাত্র নারী হওয়ার কারনে মসজিদের ইমাম নারীদেরকে মাঠে না যাওয়ার জন্য ফতোয়া জারি করেছেন। প্রতিবেদনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেন

‘‘পর্দা শুধু নারীর নয়, পুরুষের জন্যও পর্দা আছে। পর্দার মধ্যে থেকে নারী ও পুরুষের কাজ করার অধিকার আছে। নারী কর্ম করতে পারবে না কোরআন-হাদিসে কোথাও বলা নেই। যাঁরা এ ধরনের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁরা অদক্ষ, অযোগ্য আলেম।’’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন

‘‘একদিকে উন্নয়নের রোল মডেলের কথা বলছি। অন্যদিকে ব্যাক গিয়ারে চলছি। নীতিনির্ধারকেরা যদি যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেন গ্রামগঞ্জে হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা ঘটতে সময় লাগবে না। এই ধরনের ঘটনা প্রতিহত করার এখনই সময় এবং তা সরকারকেই করতে হবে। এ ধরনের ঘটনা প্রশমন করা না গেলে, ব্যবস্থা না নিলে অন্যরাও এর সুযোগ নেবে। ...মসজিদ থেকে এ ধরনের ঘোষণা রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সরকারের ভিশন ২০২১, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিসহ সবকিছুরই বিরোধী। বিভিন্ন জায়গার এ ধরনের ঘটনাই একসময় বড় আকার ধারণ করে। অবৈধ ফতোয়া ও নির্দেশনা যাঁরা দিচ্ছেন তাঁদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা ছড়িয়ে যাবে। উত্তেজনা তৈরি করবে। আর যে নারীরা মাঠে কাজ করেন তা তাঁদের রুটিরুজির সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধরনের ঘোষণা ওই নারীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।’’

অন্য দিকে কল্যাণপুর জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন,

‘‘গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। মাঠে ফসলের তছরুপ হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা মাঠে বেশি যাচ্ছেন। তাঁরা ফসলের ক্ষতি করছেন। নারীরা কম গেলে ফসলের উন্নতি হবে। তাই সচেতন করা হয়েছে।’’

প্রথম আলো’র সাংবাদিক তাঁর বক্তাদের দিয়ে ইসলামি পর্দার কথা বলেছেন, নারীদের মানবাধিকারের বিষয় টেনে এনেছেন কিন্তু কোথাও নারীরা কিভাবে ফসলের ক্ষতি করে সেই বিষয়ে কোন বক্তব্য প্রকাশ করেননি। অথচ একই দিন বাংলাট্রাইবুনে প্রকাশিত ‘‘নারীদের মাঠে যেতে মাইকিং করে মানা, ইমাম আটক’’ নামক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শিলাইদহ ইউনিয়নের কিছু মহিলা গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য গাছের কলা, মোচা, পাতা ও রবিফসল কেটে ফেলেন। নিজেদের ফসল রক্ষা করার জন্য ৮ ডিসেম্বর জুমা নামাযের পর গ্রামবাসী মসজিদ প্রাঙ্গনে আলোচনার পর সম্মিলিতভাবে পশুমালিক মহিলাদের মাঠে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিন্ধান্ত নেন যা মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয় মাত্র। বাংলাট্রাইবুনের প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে বলা হয়:

‘‘আটক ইমাম আবু মুছা মঙ্গলবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত জুম্মায় বলেছিলাম, মাঠে ফসলের যে ক্ষতি হচ্ছে- তার কারণ সেখানে আমাদের মা-বোনেরা যায়। সেখানে গিয়ে গাছের কলা, মোচা ও পাতা কাটে এবং ফসল নষ্ট করে। এজন্য তাদের যদি বোঝাতে পারি, তা হলে সবাই উপকৃত হবো।’...মসজিদে বৈঠকে অংশ নেওয়া স্থানীয় কৃষক আফতাব আলী শেখ, আব্দুল আল মামুন, মইনুদ্দিন এবং হিয়াউর অভিযোগ করে বলেন, ‘কল্যাণপুরে কলার চাষ বেশি হয়। এছাড়া, অন্যান্য রবি ফসল তো রয়েছেই। এই এলাকার কিছু নারী মাঠে গিয়ে এসব ফসল কেটে নিয়ে যায়। এ কারণে নারীদের মাঠে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।’

অন্যদিকে ১২ই ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে স্বযত্নে এড়িয়ে গেলেও ১৩ই ডিসেম্বারের প্রতিবেদনে প্রথমআলো স্বল্প পরিসরে ফসলের তছরুপ করার ব্যাখ্যা দেয়। তাদের প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়:

‘‘গ্রামে প্রায় ৮০০ পরিবারের ২ হাজার ৪০০ মানুষের বাস। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাড়িতে থাকা নারীরা দুই থেকে চারটা করে ছাগল ও গরু লালনপালন করেন।...পুরুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব পশুর খাবারের জন্য নারীরা গ্রামের মাঠে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা ফসল কেটে নিয়ে আসেন। মাঠে থাকা ফসল তছরুপ করেন। তাঁদের বারণ করা যায় না। এসবের সঙ্গে গ্রামের শেখপাড়া ও কামারপাড়ার নারীরা বেশি জড়িত। তবে চুরির ঘটনার সঙ্গে কিছু পুরুষও জড়িত বলে জানান তাঁরা। অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা মসজিদে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন গ্রামের মাঠে কোনো নারী যেতে পারবেন না।’’

একদিন আগে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরীর বক্তব্যের মাধ্যমে সামান্য এই ঘটনাকে নারীবিদ্বেষি ফতোবাজিতে রুপান্তরিত করার ব্যপারে কোন অনুশোচনা নেই প্রথমআলোর। রাশেদা কে চৌধূরী কি সম্পুর্ন ঘটনা অবহিত হয়ে তাঁর বক্তব্য প্রদান করেছেন না কি প্রথমআলো সাংবাদিকের প্রতারনার স্বিকার হয়েছে বলা সম্ভব না হলেও বালা যায় সারা বিশ্বের মত আজকের বাংলাদেশে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করা ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। এই ব্যাপারে জার্মানভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ডয়েচ ভেল-এর ১৩ই ডিসেম্বর প্রকাশিত "ফতোয়ার স্টাইল: নারীরা ফসলের জন্য ক্ষতিকর" শিরোনামের প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রতিবেদনে ফসল রক্ষা করার প্রচেষ্টা নারীকে "ধর্মের নামে নানা কুপমণ্ডুকতায় বেঁধে" রাখার প্রচেষ্টায় পরিনত হয়ে যায়, ফসলি জমিতে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা "ঘরবন্ধী" হওয়াতে পরিনত হয়ে যায়, আর সমাজের সম্মিলিত সিন্ধান্ত হয়ে যায় "ফতোয়াবাজি"। উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ি ফতোয়া হচ্ছে কোন ইসলামি আঈন-বিশেষজ্ঞ কিংবা কোন বিচারকের কোরআন কিংবা পুর্ববর্তী কোন রায় থেকে কোন সমস্যার সমাধান দিতে ব্যার্থ হয়ে নতুন রায় প্রদান করা। গ্রামবাসীর বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত কিভাবে ফতোয়া হয় তা ব্যাক্ষ্যা করার মহানুভবতা হয়নি ডয়েচ ভেলের সাংবাদিক হারুন উর রশীদ স্বপন-এর। গ্রামের ইমাম সাহেবের ভূমিকা ও ইসলাম এখানে কিভাবে সংশ্লষ্ট তাও তিনি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এই ঘটনা থেকে একটা প্রশ্ন প্রতিয়মান হয়, বাংলাদেশে পগ্রতিবাদীরা কি ইসলামবিদ্বেষি?

Keywords

- - -