নতুন বাংলাদেশ

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > ফরহাদ মজহার > আফগানিস্তান: মাদ্রাসার হাফেজ ও শিশুকিশোর হত্যা

আফগানিস্তান: মাদ্রাসার হাফেজ ও শিশুকিশোর হত্যা

Thursday 5 April 2018, by chintaa.com
Updated: Saturday 7 April 2018

কিশোর হাফেজ হত্যার ক্ষরণ

আফগানিস্তানের কুন্দুজ প্রদেশে মাদ্রাসার শহিদ কিশোর ছাত্রদের ছবি মন ভয়ংকর ভাবে বিষন্ন ও শোকার্ত করে। এই কিশোরদের অনেকে সবে মাত্র মাদ্রাসায় তিরিশ পারা কোরান হেফজ ব মুখস্থ করেছে। হাফেজ হবার স্বীকৃতি ও সনদ পত্র পাবার জন্য মাদ্রাসার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় তারা জড়ো হয়েছিল। এই বাচ্চাদের মিলিটারি হেলিকপ্টার থেকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো কোয়ালিশানের ’পরামর্শদাতা’দের সহায়তায় আফগান এয়ার ফোর্স হত্যা অভিযানগুলো পরিচালনা করে। আল জাজিরার কাছে একজন প্রত্যক্ষদর্শী হাজি গোলাম বলছেন, ’আমি ক্ষেতে কাজ করছিলাম, এমন সময় আমি হেলিকপ্টার ও জেট বিমানের মাদ্রাসা হামলার আওয়াজ শুনলাম যেখানে নতুন ক্বারি, যারা কোরানের তিরিশ পারা মুখস্থ করেছে, তাদের স্বীকৃতি দেবার ও পুরষ্কৃত করবার জন্য তালেবানরা এসেছিল। এলাকায় তালেবানরা আছে, কিন্তু এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছিলো শিশু ও কমবয়েসী ছেলেরা"। (দেখুন, Afghan air attack ’kills children’ at Kunduz religious school Afghan air attack ’kills children’ at Kunduz religious school)।

কোরান ’হেফজ’ করা, মুখস্থ করা এবং স্মৃতির পৃষ্ঠায় জীবন্ত লিখে রাখবার চর্চা ইসলামের অতি আবশ্যিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত। ’ওহি’ হিশাবে কোরানুল করিম নাজিলের পর থেকে বিশ্বাসীগণ ছাড়াও এই চর্চা ও ঐতিহ্য সবসময়ই কবি ও দার্শনিকদের বিস্ময়, ধ্যান ও পর্যালোচনার বিষয় হয়ে থেকেছে। কোরানুল করিম ছাপাখানার বই নয়, আল্লার কোন আধুনিক প্রিন্টিং প্রেস নাই যেখান থেকে কোরান ছাপা হয়ে নবীজীর কাছে জিব্রাইল এনেছিলেন। এর প্রকাশ ঘটেছিল কলব বা হৃদয় ভেদ করে নবীজীর জীবিত কন্ঠস্বর হয়ে।

কোরান নাজিল হওয়া বলতে ইসলাম এ কারনে প্রাক-ইসলামি খ্রিস্টিয় চিন্তার মতো বাক্য বা খ্রিস্টিয় পরিভাষা অনুযায়ী ’লোজস’(logos )-এর মনুষ্য রূপ পরিগ্রহণ বা খ্রিস্টের রক্তমাংসের শরীর হিশাবে আবির্ভাব বোঝায় না। কোরান ’কেতাব’। ইসলামে ’কেতাব’ কথাটার সুনির্দিষ্ট তাৎপর্য রয়েছে; কোরানও নিজেকে ’কেতাব’ হিশাবেই পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু এই ’কেতাব’ ছাপাখানার বই নয়। এর তাৎপর্য তাই ছাপা বই পড়া এবং কোরানের মর্মকে শুধু ছাপা বই পড়ে আক্ষরিক বোঝা নয়। সেটা করার অর্থ কোরানকে আধুনিক প্রিন্টিং প্রেসের বইয়ে পর্যবসিত করার শামিল। যে কারনে কোরানুল করিম মুখস্থ করা, কোরানে ’হাফেজ’ হওয়া এবং সর্বোপরি কোরান তেলাওয়াত করে ’ওহি’ বা ঐশ্বরিক ভাষার প্রতীক, সৌন্দর্য, অলংকার ও উৎপ্রেক্ষা হৃদয়ঙ্গম করবার বিষয়।

আল্লার কেতাব ছাপাখানার বই নয়। কথাটা সহজ । কিন্তু সহজের মুখোমুখি হওয়া এবং সহজ কথা সহজ ভাবে বোঝা মস্তো বড় চ্যালেঞ্জ। ’কেতাব’ কথাটার তাৎপর্য তাই ছাপাখানার ছাপা বই নয়। অতএব কোরান পাঠের অর্থ ছাপা বই পরে অর্থ নির্ণয়ের ধারণা দিয়ে বোঝা যাবে না। কিম্বা ’ভাষা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ও বদ্ধ ধারণা দিয়েও কোরানের তাৎপর্য বোঝা যাবে না। কোরানের মর্মকেও ছাপা বই পড়ে আক্ষরিক ভাবে বোঝা বা মানে করার অর্থ আর দশটা বই হিশাবে গণ্য করা, কোরানকে আধুনিক প্রিন্টিং প্রেসের বইয়ে পর্যবসিত করার শামিল। এই দিকটি বুঝলে আমরা কোরানে হাফেজ হওয়ার গুরুত্ব, বা ছাপাখানার মৃত গ্রন্থের বিপরীতে কোরানকে জীবন্ত রাখবার ইসলামী চর্চার মানে বুঝব। কোরানুল করিম মুখস্থ করা, কোরানে হাফেজ হওয়া এবং সর্বোপরি কোরান তেলাওয়াত করে ওহি বা ঐশ্বরিক ভাষার প্রতীক, সৌন্দর্য, অলংকার ও উৎপ্রেক্ষা হৃদয়ঙ্গম করবার বিষয়টি ইসলামের অতিশয় কেন্দ্রীয় বিষয়; ইমান-আকিদার মুখ্য দিক ।

ঠিক। সহজ কথা সহজ ভাবে বোঝা মস্তো চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে কোরান ’এই কারনেই কেন কোরান নিজেকে ’লোজোস’-এর নিপরীতে ’কেতাব’ বলে তার মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে দার্শনিকদের আগ্রহ বিপুল। ’ওহী’ কথাটার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার সঙ্গে কোরান মুখস্থ এবং তেলাওয়াত করা অবিচ্ছেদ্য। এর সঙ্গে জীবন্ত মানুষের আবেগ, অনুভূতি এবং শারিরীক-মানসিক অভ্যাস ও প্রস্তুতি জড়িত। দর্শনের তর্কে বিষয়টি ভাষা ও অর্থের সম্বন্ধ বিচারের গোড়ার তর্ক যেমন তেমনি জীবন্ত মানুষের সঙ্গে ভাষার সম্বন্ধ বিচারও জড়িত। কন্ঠস্বর, শরীর ও হৃদয়ের সঙ্গে আক্ষরিক পাঠের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচারের দিক থেকে কোরানুল করিমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের তর্ক সে কারনে নিছকই আধ্যত্মিক তর্ক নয়, দার্শনিক তর্ক। অন্যদিকে একই কারনে কোরানে যাঁরা হাফেজ তাঁদের বিশেষ মর্যাদা মুসলিম সমাজ ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য চর্চা।এই চর্চা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কোরান অনুবাদ পড়ে কোরানের মর্ম বোঝা আদৌ সম্ভব কিনা সেই অতি পুরানা অথচ ইসলামের আভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ বাহাস। আক্ষরিক ভাবে কোরান পাঠ কিম্বা কোরান নানান ভাবে নানান জনে অনুবাদ করে অর্থ করা সম্ভবত ইসলামে মতভেদের প্রধান কারন। কোরানকে ছাপাখানার বইয়ে পর্যবসিত করলে এই দুর্দশা অনিবার্য। কোরানকে হৃদয়ে ও কন্ঠস্বরে ’মূদ্রিত’ রাখার গুরুত্ব অপরিসীম।

কোরান তেলাওয়াত মনকে দ্রবীভূত করে, বুদ্ধির চেয়ে হৃদয়ের দাবি অনুধাবনের সহায়ক হয় এবং ’ওহির’ মর্ম উপলব্ধির শর্ত তৈরি করে। আল্লাহকে ’প্রভু’ না ডেকে কেন ইসলামে ’রাহমানুর রাহিম’ বা পরম দয়ালু ডাকতে বলা হয়েছে সেটাও হৃদয় দিয়ে উপলব্ধির বিষয়। প্রভু হিশাবে আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দেওয়া ও পুরষ্কৃত করবার যে প্রাক-ইসলামি চিন্তা আরব দেশে প্রবল ছিল তার পরিবর্তে ইসলাম আল্লার সেই রূপকে প্রধান করতে চেয়েছে যেখানে তিনি সদাই ক্ষমাশীল ও করুণাময়। ইসলাম চায় মানুষ সব সময় সেই করুণাময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করুক এবং নিজের ভুলত্রুটি উপলব্ধি করে সঠিক ও সত্য পথে চলুক। করুণাময় আল্লার আশ্রয় প্রার্থী হবার মধ্যে নিজের ভুল নিজে শুধরিয়ে আল্লার নৈকট্য লাভের মানবিক ও সামাজিক চর্চার শর্ত হাজির রয়েছে। সেই শর্ত ইসলামে বিশ্বাসীরা কতোটা চরিতার্থ করতে পেরেছেন সেটা ভিন্ন তর্ক। তবে ধর্মতাত্ত্বিক কিম্বা দার্শনিক উভয় কারনেই কোরান মুখস্ত করা, হাফেজ হওয়া এবং তেলাওয়াত করতে শেখা এবং তেলাওয়াত করার গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিকটি মোমিনের খুবই স্পর্শকাতর জায়গা। কিশোর হাফেজদের হত্যা করে যে ক্ষত তৈরি হল, তার ক্ষরণ দীর্ঘকাল চলতে থাকবে। আফগানিস্তানে মাদ্রাসায় সদ্য হাফেজ হওয়া ছাত্রদের বোমা মেরে হত্যা একজন মোমিনকে কতো গভীরে ক্ষতবিক্ষত করে সেটা ইসলাম সম্পর্কে যারা জানেন না তাঁদের বোঝানো আসলেই কঠিন। কথাটি আমি কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুভুতি হিশাবে না বুঝে ধর্ম ও মতাদর্শ নির্বিশেষে দর্শন ও ইসলামের ইতিহাসের জায়গা থেকে বোঝার ক্ষেত্র তৈরি হয়, তার জন্য কথাগুলো খরচ করলাম।

গণমাধ্যমে অল্প, তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় সদ্য হাফেজ হওয়া কিশোরদের লাশের ছবি ছড়িয়েছে। ক্রোধ তৈরির জন্য সেই সব যথেষ্ট। শহিদ কিশোররা মাদ্রাসার ছাত্র, তাই তাদের হত্যাকে কে কিভাবে দেখায় সেটা একটা আলোচ্য বিষয় বটে। যারা ধর্ম বিশেষত ইসলামের প্রতি সদয় নন। বরং সন্ত্রাস নির্মূলের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসা ছাত্র হত্যার পক্ষপাতী, তারা একে যথার্থ মনে করতেই পারেন। তবে মাদ্রাসার ছাত্র হত্যা করা হোল বলে আমরা যথেষ্ট সংবেদনশীল না, বা প্রত্যাশিত ক্রোধ বা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি না, এই উপলব্ধি বাংলাদেশের সামাজিক বিভাজনে্র দিকেই শুধু ইঙ্গিত করে। একে অতি গুরুত্ব দিলে অন্ধ গলির মধ্যে ঢুকে পরার বিপদ আছে। যেখানে মুসলমান বনাম অমুসলমান জাতীয় বাইনারি থেকে আর বেরুবার কোন পথ থাকে না।

স্রেফ আক্ষেপ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার চরিত্র বোঝার সহায়ক নয়; আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধ নীতি বোঝার ক্ষেত্রেও কোন কাজে আসে না। যে হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল সেগুলো ছিল আফগান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। কূটতর্ক করতে চাইলে বলা যায় আফগানরাই আফগানদের হত্যা করেছে। আর, আফগানিস্তানে এটাই এখনকার আন্তর্জাতিক নীতি: আফগানরা আফগানদের হত্যা করবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর যৌথ বাহিনী এই হত্যার পরামর্শ দাতার ভূমিকা পালন করবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য নতুন নীতির কথা বলছেন। কিন্তু আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী পর্যুদস্ত এবং পরাজিত। শুধু সামরিক দিক থেকে নয়, নৈতিক ভাবে। সর্বোপরি বিশ্বশক্তির মোড়ল হিশাবে আফগানিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনকেও ত্বরান্বিত করেছে।

প্রাণের অপচয় বা তথাকথিত ’কোলেটারাল ড্যামেজ’

প্রাণের যে কোন অপচয়ই নিন্দা করার বিষয়। কিন্তু যুদ্ধ আদৌ অনিবার্য কিনা কিম্বা কাকে ন্যায় আর কাকে অন্যায় যুদ্ধ বলব সেই পুরানা তর্কের মীমাংসা আধুনিক কালেও হয় নি। অন্যদিকে যুদ্ধের নীতির মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, যার ফলে যুদ্ধ নিয়ে নৈতিক তর্কের ছকও আমূল বদলে গিয়েছে। সেই বিষয়ে কিছু কথা বলবার জন্য একটু পেছনের ইতিহাসে যাই।

ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হামলা, সাদ্দামকে অপসারণ ও ফাঁসির আগে দীর্ঘকাল দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ জারি ছিল। প্রচুর মানুষ এতে মারা যায়। তার মধ্যে ৫০ লক্ষ শিশুও খাদ্যাভাবে ও অপুষ্টিতে মরে। ম্যাডেলিন অলব্রাইট সেই সময় ক্লিনটন প্রশাসনের তরফে জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ’সিক্সটি মিনিট’ নামের একটি টেলিভিশন শোতে সাংবাদিক লেসলি স্টাহল মার্কিন রাষ্টদূতকে প্রশ্ন করেন: "আমরা শুনেছি যে ৫০ লক্ষ শিশু মারা গিয়েছে। বলতে চাইছি হিরোশিমাতে যতো শিশু মারা গিয়েছে তার চেয়েও এই সংখ্যা বেশি। আর আপনি তো জানেন এতো অতিরিক্ত মুল্য দেবার কি কোন অর্থ আছে? (Is the price worth it?)

ম্যাডেলিন অলব্রাইটের উত্তর: এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত, কিন্তু আমরা মনে করি এই মূল্য পরিশোধ যথার্থ (the price is worth it)।

ইরাকের ওপর অর্থনৈতিক বিরোধের ফল ছিল হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার ক্ষতি ও অপচয়ের চেয়েও ভয়ংকর। কিন্তু এই সামগ্রিক অবরোধ আরোপ করে সাধারণ মানুষ বিশেষত শিশু হত্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একা করে নি, অবরোধ আরোপ করেছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তাহলে দায় খোদ জাতিসংঘকেও নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ জতিসংঘ এই হত্যাযজ্ঞ নির্বিচারে ঘটতে দিয়েছে।

ম্যাডেলিন অলব্রিটের এই সাক্ষাৎকারটি মনোযোগ দিয়ে শুনুন

যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ জারি রাখা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অন্তর্নিহিত চরিত্র। পাশ্চাত্য এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে বেসামরিক জনগণকে হত্যা ন্যায্য প্রমাণ করবার নতুন পরিভাষা হচ্ছে ’কোলেটারাল ড্যামেজ’ বা ’অনিবার্য অপচয়’। নতুন ধরনের যে যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী চলছে তার পরিভাষাগুলো বাংলাদেশের জনগণকে বোঝানো এবং তারা যদি তাদের নিজেদের এবং তাদের সন্তানদের রক্ষা করতে চায় তাহলে বিশ্ব রাজনীতি ও বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থার কোন বিষয়গুলো ধর্মবাদী হোক কি সেকুলার, সকল পক্ষেরই জানা এবং পর্যালোচনা করা উচিত। আমাদের মনোযোগ প্রথমত সেই দিকেই নিবদ্ধ করা উচিত। পৃথিবী ব্যাপী জারি বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জনগণকে সজ্ঞান ও সচেতন করার পরিবর্তে আমাদের সংবেদনা ও প্রতিক্রিয়া যেন কোন অন্ধ গলিতে গিয়ে মাথা কূটে না মরে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার।

যে জেলায় হামলা হয়েছে তার নাম দাশতে আর্চি। দাশতে আর্চির গভর্ণর নাসিরুদ্দিন সাদী বলেছেন, মাদ্রাসার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাজার খানেক লোক উপস্থিত ছিল। সেখানে কিছু তালেবান সদস্যও ছিলেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আফগানিস্থানে ধর্মীয় সামাজিক অনুষ্ঠানে সমাজের নানান চিন্তা ও রাজনীতির মানুষ থাকবেন এটা তো খুবই স্বাভাবিক। তার জন্য সদ্য হাফেজ হয়েছে ছাত্রদের স্বীকৃতি ও পাগড়ি পরাবার অনুষ্ঠানে হেলিকপ্টার দিয়ে বোমা মেরে হত্যাকাণ্ড ঘটানো অবিশ্বাস্যই বলতে হয়।

কিন্তু মোটেও অবিশ্বাস্য না। অবিশ্বাসের কিছু নাই। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ রাদমানিশ গভর্নরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অনুষ্ঠান মোটেও ধর্মীয় ছিল না। তালিবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপ আফগান সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই খবর নাকি সরকারের কাছে ফাঁস হয়ে যায়। তাই এই অপারেশান: হেলিকপ্টার থেকে বোমা মেরে মানুষ সমেত অনুষ্ঠান উড়িয়ে দেওয়া। জেনারেলের দাবি একজন কমাণ্ডার সহ ২১ জন সন্ত্রাসী এই হা্মলায় নিহত হয়েছে। আর এলাকাটি নাকি আবাসিক এলাকাও নয়। শুধু সন্ত্রাসী আর তালেবানরাই এই এলাকায় বাস করে। এলাকায় কোন বেসামরিক লোক নাই।

যদি তাই হয় তাহলে কিশোর বয়সী এতো বাচ্চা এলো কোত্থেকে? কিন্তু সরকারী ভাষ্য নিয়ে কূটতর্ক এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সরকারী ভাষ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা থেকে নিজেদের গা বাঁচানো। যে বাস্তবতার দিকে আমাদের নজর নিবদ্ধ রাখতে হবে সেটা হোল এই হত্যাকাণ্ড খুবই পরিকল্পিত এবং পাশ্চাত্যের বর্তমান যুদ্ধনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ঠিক যে অর্থে ম্যাডেলাইন অলব্রাইটের নেতৃত্বে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ পাঁচ লাখ শিশু হত্যা করতে দ্বিধা করে নি, ঠিক একই যুক্তিতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান জেনে এবং সেখানে কিশোর হাফেজদের শিক্ষা সমাপ্তি স্বীকৃতি অনুষ্ঠান চলছে জেনেও ঠাণ্ডা মাথায়, শীতল হিশাবনিকাশ করেই বাচ্চাদের খুন করা হোল। এটা ন্যায্য, কারণ, একজন তালেবান কমাণ্ডার ও কিছু তালেবান সদস্যও হত্যা করা গেছে। বাচ্চারা এই ক্ষেত্রে ’কোল্যাটারাল ড্যমেজ’। আধুনিক যুদ্ধ নীতিতে ন্যায্য এবং নতুন যুদ্ধের ময়দানের পরিভাষার যুক্তিতে একশ ভাগ বৈধ।

ফলে মাদ্রাসার ছাত্র মারা গেলো নাকি আধুনিক কিণ্ডার গার্ডেনের ছাত্র — এটা একদমই অবান্তর তর্ক। মার্কিন -ন্যাটো সমর্থিত আফগান সেনাবিহিনীর কাছে এটা একটি তালেবান অঞ্চল। একজন তালেবান কমাণ্ডারকে মারতে গিয়ে কতোজন বেসামরিক মানুষ হত্যা করা হোল, সেই তর্ক আধুনিক যুদ্ধ নীতির জন্য একদমই অবান্তর তর্ক। বড় জোর কোলেটারাল ডেমেজ বা অপচয়ের হিশাব নিকাশের জন্য জরুরী। কিন্তু একান্তই ন্যায্য ও বৈধ সামরিক অপারেশান। আমাদের জন্য এইটুকুই শিক্ষণীয় যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ প্রচলিত সামরিক রীতিনীতির মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণকে এই নতুন বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন ও সজ্ঞান করে তোলাই এখন দরকারি কাজ। এই যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান হয়ে অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার হাজির হবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দক্ষিন এশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সেই লক্ষণ দানা বাঁধছে। য়াফগানিস্তান আগামি দিনের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের শিক্ষার ক্ষেত্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণ করে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। সামরিক যুদ্ধের ইতিহাসে এই যুদ্ধ হচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে প্রলম্বিত যুদ্ধ। ইতোমধ্যে কমপক্ষে দেড়লাখ আফগান নিহত হয়েছে। এর মধ্যে যোদ্ধা শুধু নয়, রয়েছে বেসামরিক জনগণও। মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে ৬০০০।

শুরু থেকেই এই যুদ্ধ রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়, বরং যুদ্ধ হচ্ছে ’যোদ্ধা শত্রু’ বা ’Enemy Combatant’-এর। ’যোদ্ধা শত্রু’ আরেকটি নতুন যুদ্ধের পরিভাষা। এর অর্থ এই সব যোদ্ধারা কোন দেশীয় বা আন্তর্জাতিক অধিকার ভোগ করবে না। সেই আইনী অধিকার তাদের নাই। একালের কজন দার্শনিকের ভাষায়, তারা ’ল্যাংটা জীব’ (Bare Life), তাদের আইনী সুরক্ষার কোন বিধান নাই, তাদের যে কেউই হত্যা করতে পারে। তার জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না। যুদ্ধবন্দিদের ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশানে যেমন কিছুটা সুরক্ষা স্বীকার করা হয় , ’এনিমি কমব্যাটেন্ট’দের ক্ষেত্রে সেটা খাটে না। ফলে এদের যেমন খুশি হত্যা করা যায় এবং ’আবু গারিব’ কিম্বা ’গুয়ানতানামো’ কারাগারে যেমন খুশি টর্চারও করা যায়। এদেরকে এক দেশে থেকে ধরে নিয়ে অন্য দেশে টর্চার করা যায়, ইত্যাদি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ’এনিমি কম্ব্যাটেন্ট’ সম্বন্ধে বক্তৃতা শুনুন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইন ও মার্কিন যুদ্ধনীতির মৌলিক রূপান্তর এবং তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বাংলাদেসের জনগণের জন্য কি হতে পারে সে বিষয়ে জনগণকে হুঁশিয়ার ও সচেতন করা বড় কাজ।

দ্বিতীয়ত এই যুদ্ধ ’অনন্ত’। অর্থাৎ এক সময় শেষ করার কথা নাই। অতএব কিভাবে সেটা শেষ হবে তার কোন নীতি কিম্বা পরিকল্পনাও নাই। যার কারনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা আজ অবধি আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ করবার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহন কিম্বা বাস্তবায়ন করতে পারে নি। এই যুদ্ধ যদি ’অনন্ত’ যুদ্ধ হয় তাহলে তো শেষ করবার কোন প্রশ্নই আসে না। যুদ্ধই এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থা, শান্তি বরং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তালেবানরা এখন ১৪ টি জেলা নিয়ন্ত্রণ করে (সারা দেশের শতকরা ৪ ভাগ) এবং ১৬৭ জেলায় (দেশের ৬৬%) ভাগ) তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। আফগান নিরাপত্তা বাহিনী তালেবানদের হাতে মার খাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন আফগান নীতির কথা বলছেন। মার্কিন সেনা কবে আফগান ছাড়বে তার কোন দিন তারিখ ট্রাম্প নির্দিষ্ট করে বলেন নি। ওদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপের দিকে গড়িয়েছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প অভিযোগও জানিয়েছেন যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবার ক্ষেত্রে পাকিস্তান দায়ী। ট্রাম্প এখন ভারতকে কাছে টানছেন এবং আফগান নীতি এমন ভাবে সাজাতে চাইছেন যেখানে ভারতের নির্ধারক ভূমিকা থাকবে। এতে অবশ্য সমস্যার কোন সমাধান হবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেবে। আফগানিস্তানে সামরিক উপস্থিতির শক্তি ট্রাম্প বাড়িয়েছেন বটে, কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার যে হাল তার দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিতে রাজি না। সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং এই ক্ষীন আশাটুকু ধরে রাখা যে তালেবানরা কোন এক সময় মস্তো কোন ভুল করবে এবং পাশ্চাত্য সেই সুযোগটা গ্রহণ করবে।

মাদ্রাসায় শিশুকিশোরদের হত্যা পাশ্চাত্য সমর্থিত আফগান সরকারের অবস্থা আরও নড়বড়ে করে দিল।

৫ এপ্রিল ২০১৮। ২২ চৈত্র ১৪২৪। শ্যামলী।